গর্বিত পাইলটিয়ানদের একজন

Please log in or register to like posts.
News

স্মৃতির পাতায় ঝলমল করা ১৯৯৯সাল, এখনো অনুভুত হয় এইতো সেদিনই ছিল দিনগুলি। স্মরণীয় হয়ে থাকা দিনগুলি ছিল যেমন মধুময় ঠিক তেমনি দূরে সরে যাওয়ার বেদনায় ভরা। সালটা উল্ল্যেখযোগ্য এই কারনেই যে সেই বছরই অন্যতম একটা ব্যাচকে বিদায় দিয়েছে স্কুল। স্কুল থেকে বিদায় নেয়া যে কত কষ্টের যারা এই পরিস্থিতিতে পড়েছে কেবল তারাই বুজবে। স্কুল থেকে বিদায়ের দিন বেশ বিষণ্ণতায় ভুগছিলাম যা আগে কখনো অনুভব করিনি। স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছি, বন্ধুদের সাথে হাসি ঠাট্টা করেছি কিন্তু এর পরও বেদনা ছুঁয়ে গেছে পুরো শরীরটায়। ভেতরে ভেতরে কিসের যেন হাহাকার! বেশ বুজতে পারছিলাম নিয়মিত আর আগমন ঘটবেনা এই আঙিনায়। মাঠের দুরন্তপনা, টেবিল চাপড়ে ভাণ্ডারী গান করা, স্কাউটিং ইত্যাদিতে নিজেকে আর দেখা যাবেনা কখনই। ধূসর রঙের দ্বিতল দালান, প্রিয় শিক্ষক মণ্ডলী, আয়া, বন্ধু সবাইকে ছেড়ে যেতে বড্ড খারাপই লাগছিল।

এ স্কুলের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও সহপাঠীদের সান্নিধ্যে কেটেছে আমার সেই রঙিন দিনগুলি। তাই আজ আমার প্রিয় স্কুলকে নিয়ে লিখতে বসে স্বভাবতই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছি। মনে পড়ে যায়- একদিন এই স্কুলের গন্ডিতে পা রেখেছি মায়ের হাত ধরে। নিজেকে সৌভাগ্যবান বলতেই হবে কারণ তৎকালীন স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক শ্রদ্ধেয় নিধু ভূষণ আচার্য স্যার সর্বপ্রথম আমাকে কোলে তুলে বরণ করে নিয়েছিলেন। আমার এও ভেবে ভীষণ গর্ববোধ হয় তিনি আমার প্রয়াত পিতারও শিক্ষক ছিলেন। আমার বাবা এই স্কুলের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন অর্থাৎ ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৫৮সালে, তখন অবশ্য আমাদের স্কুলটি জুনিয়র হাই ছিল। স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়ে শুরুতে সহপাঠী হিসেবে যাদের পেয়েছি তাদের মধ্যে মানস, বাবলু, শওকত, সিরাজ, নজরুল, লিংকন, জন রড্রিক্স, অহিদ, রোমেন, আনোয়ার, মুরাদ, বশীর, বিষু, মিন্টু, সালাউদ্দিন, আলমগীর, আরমান, মফিজ, সাইফু, লোকমান, বাপ্পি, প্রশান্ত, খোরশেদ ১-২, আশরাফ, দেবু, ইকবাল, ত্রিদিপ চক্রবর্তী  ছিল উল্লেখযোগ্য।

ভর্তি হয়েছিলাম বিজ্ঞান বিভাগে, ভাল ছাত্র ছিলাম এমনটা দাবী নেই। তবে  ক্লাস করতে ভালোই লাগতো আমার, মাসিক রুটিন এর গ্রাফে ক্লাস ফাঁকি নেই বললেই চলে বরং বাড়িতেই সময় কাটতো না। শ্রদ্ধেয় মোসলেম উদ্দিন স্যারের ক্লাস বেশ ভাল লাগত তিনি আমাদের ইংরেজি পড়াতেন, শ্রদ্ধেয় বিষু কুমার স্যার সাবলীলভাবে পড়াতেন উচ্চতর গণিত। ক্লাসে মৃণাল মুহুরি স্যার এর ক্লাস ভীষণভাবেই উপভোগ করতাম সবাই কেননা পড়া পারলেই তিনি সুন্দর একটি ডায়লগ দিয়ে বলতেন ব্রেশ অর্থাৎ বেশ। বাবার বন্ধু বলে নিজের সন্তানের মতই স্নেহ করতেন শ্রদ্ধেয় মাবুদ স্যার। মনে পড়ে শ্রদ্ধেয়া দীপ্তি বীষাঙ্গি ম্যাডামের কথা তিনি সবসময় উপদেশ দিতেন সঠিকভাবেই যেন পড়া লেখা সমাপ্ত করি। ফেনীর আঞ্চলিক ভাষার সাথে পরিচয় ঘটেছে প্রিয় ভুপাল স্যারের কল্যাণে। শ্রদ্ধেয়া আরেফা ম্যাডামকে ভীষণ পছন্দ করতাম তিনি খুব স্নেহ করতেন। শ্রদ্ধেয় মনজুর আলম স্যারের হাত ধরেই স্কাউটিং এ প্রথম অংশগ্রহণ। তিনি আমাকে স্কুল ইউনিটের পেট্রোল লিডার মনোনীত করেছেন। জীবনে দারুণ পরিবর্তন আনা স্কাউটিং এর এই সাফল্যে তাই প্রিয় স্যারের অবদান কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারিনা। অন্যান্য শ্রদ্ধেয় শিক্ষক যারা আছেন তাঁদের সকলের কাছেই শ্রদ্ধাবনত হয়ে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তাদের শাসন, শিক্ষা, স্নেহ, ভালবাসায় আজ এতদূর আসতে পারা।

সুখ-স্মৃতিময় অতীতকে নিয়ে ভাবতেই প্রত্যেকেই বড্ড ভালোবাসে। যদি সেটা শৈশব-কৈশরের স্মৃতি বিজড়িত অতীত হয় তবেতো কথাই থাকে না। প্রায় প্রতিটি মানুষকেই প্রবলভাবে আকর্ষণ করে সে অতীত। সত্যিকার অর্থে মানুষের জীবনের সেরা সুন্দর সময় হচ্ছে তার শৈশব-কৈশোর এর ফেলে আসা দিনগুলো। আমিও এর ব্যতিক্রম নই, প্রবলভাবে আকর্ষণ করে আমার শৈশব-কৈশোরের সেই মধুমাখা স্মৃতিগুলো। মনে পড়ে যায় স্কুল জীবনের সেই হাসি-আনন্দেভরা দিনগুলোর কথা। আমার ভালবাসার বিশেষ স্থান এই স্কুল তাই আমি আমার স্কুলকে ভীষণ ভালবাসি।

স্কুলের স্মৃতি রোমন্থনে কিছু মজার স্মৃতি আছে। আমাদের ব্যাচ ‘৯৯ এ প্রায় ২০০জন ছাত্র-ছাত্রী ছিল। ছাত্ররা নিচ তলায় আর ছাত্রীরা আলাদাভাবে দ্বিতীয় তলায় ক্লাস করত। বলতে আজ দ্বিধা নেই এই একসাথে ক্লাস করতে না পারার বৈষম্যে উপরের তলার প্রতি একটু বাড়তি জোঁক তৈরি হত সবার। যদিও কিছু কম্বাইন্ড ক্লাসে সবাই একসাথে হতাম কিন্তু অনেকের কাছে আবার এই একসাথে হওয়াটাও বিড়ম্বনার ছিল। পূর্বের দিনে স্যারের দেয়া শ্রেণী পাঠ এর নির্ধারিত পড়া শিখে না আসার শাস্তি বন্ধুদের সামনে হজম করা গেলেও বান্ধবীদের সামনেতো কোনভাবেই নয়। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়ে ক্লাসের অমনোযোগী বন্ধুটিও শ্রেণী পাঠে কিছু আয়ত্ত করে আসার চেষ্টা করত।

পার হয়ে গেল দীর্ঘ ১৯টি বছর ব্যাচের প্রত্যেকেই স্বস্ব পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত আজ। কেমন জানি সবাই কাছে থেকেও নেই, দীর্ঘদিনের এই দূরত্ব ঘুচাতে গত ১৩ অক্টোবর ২০১৭ইং অনেক শ্রম ও সময়ের বিনিময়ে আয়োজন করলাম আমাদের ৯৯ ব্যাচের রিইউনিয়ন এবং প্রাক্তন শিক্ষকদের সন্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান। র‍্যালি, পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত, স্মৃতি চারণ, স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন,প্রাক্তন শিক্ষকদের সন্মাননা প্রদান, বন্ধুদের সকলেই প্রিয় শিক্ষকদের হাত থেকে শুভেচ্ছা স্মারক গ্রহণ, প্রাণবন্ত আড্ডা, গ্রুপ ছবি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে বেশ সফলভাবেই সম্পন্ন করেছি তা।

ব্যাচের এই একটা প্রোগ্রামের কারণে আবারো বেশ কাছাকাছি চলে এলাম স্কুলের। বর্তমান প্রধান শিক্ষক শ্রদ্ধেয় মঈনুল আবেদীন নাজিম স্যার বেশ সাদরে আমাদের আপন করে নিলেন। উনার আতিথেয়তা, ব্যাবহার ও ভালবাসায় পূর্বের মতই স্কুল এর প্রতি ভালবাসা অনুভব করলাম। তাইতো স্কুল এর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী পরিষদ এর ব্যানারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এই ৯৯ ব্যাচ। জাতীয় করন তালিকা হতে অন্যায়ভাবে বাদ দেয়ার প্রতিবাদে অন্যান্য ব্যাচকে সংঘটিত করে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ এর আয়োজন করেছি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজন করেছি সাংবাদিক সম্মেলন এর। দলবদ্ধ হয়ে ছুটে গেছি সুদূর ঢাকায় সেখানেও জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন ও অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছি, তুলে ধরেছি প্রিয় বিদ্যালয়ের সাথে বিমাতা ও বৈষম্যমূলক আচরণের খুঁটিনাটি। আমাদের এই আন্দোলনের প্রতিটি খবরই জাতীয় দৈনিকসহ টিভি চ্যানেল গুলো গুরুত্বসহকারে ফলাও করে প্রচার করেছে। ক্রমেই আমরা স্কুল সংশ্লিষ্ট সকলের খুব আপন হয়ে উঠলাম। তাই প্রাক্তন হয়ে গেলেও স্কুলের প্রতি আলাদা একটা দায়িত্ব আছে বলে ব্যাচের প্রত্যেকেই এখন ধারণ করি। যদিও অনেকেই বলেছেন আমাদের কি স্বার্থ উত্তরে বলেছি কেবল- ভালবাসি স্কুলকে। মনে মনে ব্যাচের সকলেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কোন অবস্থাতেই ছেড়ে যাবনা স্কুলকে।

আমাদের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন উৎসবের মধ্য দিয়ে পালিত হতে চলেছে। ১৯৫৮-২০১৮ দীর্ঘ ৬০বছরের বর্ণিল পথ পরিক্রমায় আগামী ৩এপ্রিল ২০১৮ইং পালন হতে যাচ্ছে হীরক জয়ন্তী উৎসব। স্কুলের এই অর্জন একদিন প্রিয় গোমদণ্ডী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়কে পৌঁছে দেবে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে। সমগ্র বোয়ালখালী তথা বাংলাদেশে শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে সেই প্রত্যাশাই করি। জয় হউক হীরক জয়ন্তীর, জয় হউক পাইলটের।

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?

Leave a Reply