রহস্যে ঘেরা মায়ানদের অদ্ভুত কীর্তিকলাপ

Please log in or register to like posts.
News

মায়ান সভ্যতার ইতিহাস বেশ মজার ও রহস্যে ঘেরা। এর প্রকৃত ইতিহাস জানতে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। মানুষের জন্মের বহু পূর্বে হাজারো প্রজাতির প্রাণীদের আগমন ঘটেছে এই পৃথিবীতে। তবে বর্তমান সময়ে তাদের অস্তিত্ব বেশিরভাগেরই নেই। তেমনি একটি প্রাণী ডাইনোসর পৃথিবীতে এসেছিল কোটি কোটি বছর আগে। আর প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে পৃথিবী থেকে। মানুষের জন্ম ধরা হয় আজ থেকে মাত্র ৭০ লক্ষ বছর পূর্বে যখন মানুষের আকৃতি ও প্রকৃতি ছিল বর্তমান থেকে ভিন্ন।  তারা নিচু হয়ে বানর বা শিম্পাঞ্জির মত চলাফেরা করত, কথা বলতে পারত না। এখন যেমন মানুষ বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তা করে নিজের ভবিষ্যৎ ঠিক করে কিন্তু তখন শুধু খাবার আর আশ্রয়ের চিন্তা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে তারা চিন্তা করতে পারত না। তারা বাস করত গাছে, বড় কোটরে নয়তো গুহায়। পর্যায়ক্রমে আগুন জ্বালাতে শেখা, আকার-ইঙ্গিতে মনের ভাব প্রকাশ করা, তারপর কথা বলা ইত্যাদি তারা রপ্ত করে নিল। বনের হিংস্র পশুদের হাত থেকে বাঁচতে তারা দলবদ্ধভাবে থাকা শুরু করল। একটা সময়ে বুদ্ধির বিকাশ ঘটে সমস্যা সমাধানে নিজেরাই এর সঠিক প্রয়োগ শিখল। আর এভাবেই দলবদ্ধ বা গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ নিজেদের ক্রমে উন্নত করে নীল, তাদের সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণে নিজেদের নিয়োজিত করল। ধারণা করা হয় প্রায় ২ লক্ষ বছর আগে প্রথম মানবসভ্যতার উদ্ভব হয়েছিল আফ্রিকা মহাদেশে। তার অর্থ দাড়ায় আফ্রিকা আমাদের আদি নিবাস। সেসময় থেকে প্রায় ৭০ হাজার বছর পর, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার বছর পূর্বে মানুষ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো আফ্রিকার বাইরে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গাতে। প্রায় ৯০ হাজার বছর আগে তারা ইউরোপে আর মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায় মানুষ। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, যে আমেরিকাকে শিক্ষাধিক্কা ও প্রযুক্তিতে সবার চেয়ে আমরা এগিয়ে রাখি, সেখানেই মানুষ পৌঁছায় সবার শেষে আজ থেকে মাত্র ১৫ হাজার বছর আগে!

কিন্তু ইতিহাসে প্রমাণ আছে সেসময়কার মানুষজন যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিল। একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়গায় সে নিদর্শন পাওয়া যায়। আর এই সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর নাম মায়ান। তাদের তৈরি সভ্যতাকে আমরা মায়ান সভ্যতা হিসেবে চিনি। এই মায়া সভ্যতার মানুষদের ব্যাপারে ভাবলে মনে প্রশ্ন জাগে সেই চার হাজার বছর পূর্বে কীভাবে তারা এত উন্নত হয়েছিল? পৃথিবীর মানুষ তখনতো নিজেদের জন্য বাড়িঘরই বানাতে খুব একটা শেখেনি, আগুন জ্বালিয়ে কেবল খাবার পুড়ে খেতে শিখেছিল। আর ঠিক সেই আমলে তারা কিভাবে আস্ত পাথর দিয়েই তৈরি করেছিল বিশাল বিশাল স্থাপনা ও ঘরবাড়ি!  আর এসব ইমারতগুলির উচ্চতা বর্তমান সময়ের বিশ পঁচিশ তলা বিল্ডিংয়ের সমান ছিল!

                    মায়ান ক্যালেন্ডার

জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে মায়ানরা যথেষ্ট জ্ঞানী ছিল। চাঁদ, তারা, গ্রহ নক্ষত্র নিয়েও তারা গভীরভাবে গবেষণা করত। আর তারা খালি চোখেই গ্রহ নক্ষত্রদের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করে হিসেব করে তাদের গতি-প্রকৃতি প্রথম নির্ণয় করেছিল। সমসাময়িক সময়ে অধিকাংশ জাতির ভাষাই পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, কিন্তু তখন মায়ানরা নিজেদের এগিয়ে নিয়েছে বহুগুন। তারা তাদের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং নিজেদের ক্যালেন্ডারও বানিয়েছে। ওরা নিজেদের রচিত গান গাইত, কবিতা লিখত এবং সাহিত্য চর্চা করতো! আর গোটা আমেরিকা মহাদেশজুড়ে মায়ানদেরই একটা জাতি ছিল যাদের প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে নিজস্ব লেখা ভাষা ছিল এবং তারা সুন্দর করে তা পড়তে এবং লিখতে জানতো। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে বর্তমান সময়ের মত সেই আদিম যুগেও কিভাবে মায়ানরা এতো বিকশিত হল বা উন্নত হলো? কীভাবেই বা জন্ম হলো মায়া সভ্যতার?  

ইতিহাসে এর সঠিক সময় নিরূপণ করা যায়নি কবে মায়া সভ্যতার মানুষজনের উত্থান ঘটে। তবে যিশু খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় ২০০০ বছর আগের মায়ান ভাষায় লেখ্য রূপ এর সন্ধান মেলে। আর এই সময়ের পূর্বে মায়ানরা যাযাবর প্রকৃতির ছিল। খাদ্য, পানি এবং আশ্রয়ের জন্য তারা স্থানান্তরিত হত। খ্রিষ্টপূর্ব ১৮০০ সাল থেকে তারা পশুপালন শুরু করে, আর মাটি দিয়ে তৈরি করতে শিখে থালা, বাটি, হাঁড়ি প্রভৃতি। তারা পশু থেকে মাংস আর মাটি থেকে তৈরি তৈজসপত্র তৈরি করতে শেখায় তাদের খাবারের এবং খাবার রাখার পাত্রের অভাব ঘুচে গেল। তাদের অঞ্চলে মায়ানরাই প্রথম বাড়িঘর তৈরি করে নগরী প্রতিষ্ঠার মাধম্যে আধুনিক মানব সভ্যতার সুচনা করে। মায়ান সভ্যতার কথা উঠলেই সবার প্রথম পিরামিড বা মমির বিষয়টি সামনে চলে আসে। সকলেই তাদের এই বিশেষ দিকটি নিয়েই বেশি চেনে। মায়ানরা মৃতদেহ সৎকার করা শিখে গেল, একটা সময় তারা মৃতদেহের ওপর সমাধি নির্মাণ করতে শুরু করলো। মূলত এভাবেই মায়ানরা পিরামিড ও মমি নির্মাণের সুচনা করল। মিসরের এখন যে সুউচ্চ পিরামিড এবং মমি দেখতে পাওয়া যায় তার মতো বিশাল না হলেও সেই ছাঁচের মমি ও পিরামিড তৈরি করতো মায়ানরা। তাদের স্থাপত্যশিল্পের জন্য মায়া সভ্যতা আজও বিখ্যাত হয়ে আছে। তাদের তৈরি বিশাল বিশাল ঘরবাড়ি, পিরামিড এবং মূর্তিগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় কেন তারা সেসময় এত বিখ্যাত ছিল। তারা তাদের ঘরবাড়ি ও স্থাপনা বানাত লাইমস্টোন নামের এক ধরনের পাথর দিয়ে যাকে বাংলায় চুনাপাথর বলা হয়। আর সেই চুনাপাথরগুলোকে সুন্দর মসৃণ করতে ব্যবহার করা হতো সিমেন্টের মতনই এক ধরনের পদার্থ। তাদের তৈরি কয়েকটা বিখ্যাত স্থাপত্যের মধ্যে নর্থ আ্যাক্রপলিস, টিকাল, চেচেন ইটজা, গুয়াতেমালা এন্ড বলকোর্ট আ্যাট টিকাল, এল মিরাডর উল্ল্যেখযোগ্য। মায়ানদের কোনো রাজধানী ছিল না, তাদের প্রতিটি শহরই ছিল বিজ্ঞান-সংস্কৃতি-বাণিজ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাদের তৈরি শহরগুলোর মধ্যে  উল্ল্যেখযোগ্য ছিল আক্সাকটান, আলটানহা, টিকাল, পালেনক, কোপান, কালাকমূল, ডসপিলাস, তারপর বোনামপাক। আর ক্যানচুয়েন হল তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত সৌধটির নাম যেটি ছিল তাদের রাজপ্রাসাদ এবং প্রার্থনালয়।  তাদের তরি একটি পাথরের মূর্তির নাম ছিল ‘টেটান’ বা পাথুরে গাছ। আর এই মূর্তিটিই ছিল মায়ানদের সকল বীরত্বপূর্ণ কাজ ও তাদের সর্বশক্তিমান শাসকের প্রতীক। মায়ানরা ধর্মের দিক থেকে প্রকৃতি বিশ্বাসী ছিল। তারা বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তিকে দেবতা ভেবে পূজা করত নরবলির মাধ্যমে। তাদের আরাধ্য দেবতাদের খুশি করতেই অন্য গোত্রের মানুষদের দিয়েই নরবলি দিত। মায়ানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর চিচেন ইতজা ছিল নরবলির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। এক্ষেত্রে মায়ানদের একটু দুর্নাম ছিল বৈকি!

নীল রং আর সিরামিকসের প্রথম প্রচলন করেছিল এই মায়ানরাই। মায়ানরা ব্যবসা-বাণিজ্যেও পারদর্শী ছিল। যেহেতু কল-কারখানা আবিষ্কার হয়নি তাই তাদের বাণিজ্য ছিল মূলত কৃষি নির্ভর। তাদের ভোগ্য খাদ্যের মধ্যে প্রধান ফসল ছিল- আলু, ভুট্টা, সিম, স্কোয়াশ। টাকা পয়সার প্রচলন না থাকার কারণে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করত বিনিময় প্রথার মাধম্যে। তারা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছিল।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় ৯০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মায়ানদের স্থিতিশীল জীবনব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে যখন তারা তাদের সভ্যতার কেন্দ্রগুলো ছেড়ে চলে যেতে শুরু করে। ১৫ শতকের গোরায় নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে করতে নিঃশেষ প্রায় মায়া জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে স্পেনীয়রা তাদের সবকিছুই দখলে নিয়ে নেয়। মায়ানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান-ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নত হলেও সামরিকের কৌশলগত দিক দিয়ে, এবং অস্ত্র-শস্ত্রে স্প্যানিশদের তুলনায় বেশ পিছিয়ে ছিল। এরপরও শক্ত প্রতিরোধের মুখে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ করে ১৬৯৭ সালে এসে পুরো মায়া সভ্যতাই স্প্যানিয়ার্ডরা দখল নেয়।  তাদের সংখ্যা সংকুচিত হলেও পৃথিবী থেকে মায়ানরা বিলীন হয়ে যায়নি। বর্তমানে গুয়াতেমালা, বেলিজ, মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চল, এল সালভেদরের উত্তরাঞ্চল এবং হন্ডুরাসের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ৬০ লক্ষ মায়ান বাস করছে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বজায় রেখে। মায়ানদের পূর্বপুরুষের স্থাপনাগুলো সগৌরবে পৃথিবীর বুকে এখনো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

Reactions

0
0
0
0
0
2
Already reacted for this post.

Reactions

2

Nobody liked ?

Leave a Reply