সাহিত্য কথা

পারমিতার দিনলিপি পর্ব (০২)

প্রথম পর্বের পর

নীলা এক নিঃশ্বাসে বারকয়েক আমার কাছ থেকে জানতে চেয়েছে,আমি আসলে তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি?

আমি নিজেই তখন একটু ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম।দু-মিনিটের মধ্যে আমি নীলাকে একটা রুমের সামনে নিয়ে দাঁড় করালাম।ভেতর থেকে একজন মাঝবয়সী লোক এসে আমাকে ডেকে নিল।আমার হাতে একটা সাদা কাগজও ধরিয়ে দিল।উনি যখন আমাকে বিষয়টা বুঝিয়ে দিতে লাগলেন,তখন নীলা আমার দৃষ্টি আর্কষণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।আপনারাও হয়তো নীলার মতো বিরক্ত হয়ে পড়েছেন তাই না?আসলে আজকের দিনটা আমার আর নীলার জন্য খুবই আবেগঘন একটা দিন,কেননা আজকের পর নীলার অন্ততপক্ষে একটা দুঃখ আমি ঘুচাতে পেরেছি বলে মনে করব।গতরাতে মারা যাওয়া পারমিতার জন্ম দেয়া যে কন্যা সন্তানটি ছিল তা পারমিতার ইচ্ছার কারণেই আমি দত্তক নিচ্ছি।এই কাজটা আমি লিগ্যালী করছি কেননা ভবিষ্যতে যেন কোন সমস্যায় পড়তে না হয়।নীলা যেখানে সন্তান জন্মদানের অপরাগতার দায় মাথায় নিয়ে আমাকে ছেড়ে যেতে চেয়েছে,সেই অর্থে তার জন্য এটা নিঃসন্দেহে ভাল কিছু হবে।আজকের পর নীলাকে মা ডাকার জন্য তো কেউ আসছে বাসায়।আমাদের দুজনের ঘরটা আলোকিত করে রাখবে এই ফুটফুটে শিশুটি।

আপনাদের মনে উৎকন্ঠা কেনই বা আমি পারমিতার মেয়েটিকে এতো সহসাই পেয়ে যাচ্ছি।এই বিষয়ে রহস্যে উন্মোচনের জন্য আপনাকে একটু পিছনে যেতে হবে।পারমিতা বিয়ের পর থেকে দুটো সন্তানের জন্ম দিয়েছে যার দুটোই মেয়ে ছিল।এই মেয়ে সন্তান জন্মানোর দায় বা অপরাধ নিয়ে মেয়েটি দুনিয়া ছেড়েছে।তার মনে হয়তো আক্ষেপ থাকবে কেনই বা সে একটি মেয়েকে এখানে ছেড়ে গেছে।শেষ মুহুর্তে আমার কাছে হয়তো তার শেষ অবলম্বনকে নিরাপদ ভেবেছে তাই ডাক্তারের কাছে আমার কথাই নাকি বলে গেছে।এই বিষয়ে পারমিতার শ্বশুড়বাড়ির লোকের কোন আপত্তি নেই।তারা অনেকটা উদাসীন বললে চলে।এটা আমার জন্য পরম সৌভাগ্যও বটে।আমার আর নীলার কোল জুড়ে আলো আসলেও আমাদের চারদিকে একটা ঘোর অন্ধকার নেমে আসল।এই যে দত্তক নেয়া সন্তানের জন্য আমাদের অনেকে বাঁকা চোখে তাকাতে লাগল।এই বিষয়টা নতুন করে নীলার জন্য বিব্রতকর।একটা সময় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম,এই শহরের কাঠিন্য আর বাস্তবতার জটিল ক্যানভাসের বাইরে গিয়ে কোথাও ঘর বাঁধব যেখানে আমাদের নতুন কোন পরিচয় হবে।আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।ছোট্ট মেয়েটিকে দত্তক নেয়ার রাতে আমি শহর ছাড়লাম।রাতের আকাশের একলা চাঁদটাই যেন আমাদের যাত্রাপথের সাথী ছিল।

সকালের কুয়াশাস্নাত ভোরে নতুন শহরে আমাদের পদযাত্রা শুরু হলো।যেখানে নতুন একটা স্বপ্নকে অবলম্বন করে শুধু ভালবাসার শক্তিতে পথচলা।আমার চাকরির সুবাদে যদিও বেগ পেতে হয়েছে এসব করতে,তবে আমার কিছু শুভাকাঙ্খী ছিল যারা আমাকে বেশ সহায়তা দিয়েছে।তাদের সেই বন্ধুসুলভ ভালবাসা কখনো ভুলবার নয়।সেদিনের সকালটা আমার জীবন স্মৃতির পাতায় চিরসজীব হয়ে থাকবে।নীলা আমাকে এই অকৃত্রিম উপহারের জন্য বারকয়েক শুকরিয়া জানিয়েছে।আমি এই মেয়ের নাম কি রাখব তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলাম কেননা তার জন্য উপযুক্ত কোন নাম যে পাচ্ছিলাম না।একটা সময় সিদ্ধান্ত নিলাম তার নাম আমি পারমিতা রাখব।কেননা আমি এই পারমিতাকে তো আমার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে দিতে পারি না।পারমিতার স্বপ্নগুলো না হয় আমার বাহুডোরে থেকে লালিত হবে।কোন এক উজ্জ্বল দিনে উপযুক্ত মঞ্চে মঞ্চায়িত হবে সমস্ত নাটকের পালা।

পালাবদলের খেয়ায় ভেসে আমি আর নীলা আজ অনেকটা পরিণত।আমাদের এখন অনেক দায়বদ্ধতা নীলা তো আমাকে প্রতিদিন পাঠ শিখিয়ে যায়।এই বিষয়টা আমার বেশ ভালোই লাগে কেননা তাদের মা মেয়ের ভালবাসা আমাকে প্রেরণা জুগিয়ে যায় নিরন্তর।আমি আমার নতুন বাসার দেয়ালে পারমিতার প্রতিবছরের একটা করে ছবি রেখেছি।আমার চোখের সামনে এই যে ভালবাসার মানুষের বেড়ে উঠা তা আমি ফ্রেমবন্দী করে রেখেছি।পারমিতা আধুনিক একটা সমাজে বেড়ে উঠছে যেখানে প্রতিটা পদক্ষেপ বন্ধুর আর কোন এক অজানা বিপদের হাতছানিতে মোড়ানো।আমাদের উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা বেড়ে যায় যখন দেখি পারমিতার বয়সী কোন মেয়ে কোথাও এক নরপশুর কুলিপ্সার শিকার হয়।

পাশাপাশি বিশ্বায়নের প্রভাবে আমার মতো হাজারো বাবা-মা তাদের সন্তানের সামনে মেলে ধরেছে কোন এক সুবিশাল সিলেবাস।যেখানটায় প্রতি পাতায় থাকে বিস্তৃত কোন এক স্বপ্নের বয়ান।আমি আর নীলা পারমিতাকে এই ক্ষেত্রে ভিন্ন আঙ্গিকে তার জানার জগতটাকে খুলে দিয়েছি।পারমিতা যেদিন নিজের স্বপ্নের কথা লিখতে শিখেছে বা বুঝতে শিখেছে স্বপ্ন আসলে কি ?সেদিন ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতে লিখেছে সে নাকি শিক্ষিকা হতে চাই।তার কাছে ব্যাখা চাওয়া হলে বলে স্কুলের টিচারকে নাকি তার খুব ভাল লাগে।তাই ভাললাগার কাজটা করতে অর্ন্তপ্রাণ মেয়েটি।এবার বুঝলাম তার স্বপ্নের গন্ডি বড় হওয়া দরকার।আমি নিজে তার এই কাজে সাহায্য করলাম।

পারমিতা বন্ধু দিবস আর ভালবাসা দিবসে লেখা উইশ কার্ডে আমার জন্য দুটো কার্ড বরাদ্দ রাখে,কেননা আমি নাকি তার ভালবাসার এবং বন্ধু দুটো শাখায় পছন্দের পাত্র।আমি আর নীলা এখনো কোনদিন পারমিতাকে স্কুলের যে স্থান অধিকারের প্রতিযোগিতা তাতে উৎসাহিতও করি নি।মেয়েটা আমার প্রথম ধাক্কা খেয়েছে প্রথম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়।আমাদের আসলে খেয়ালই ছিল না,চারিদিকে এতো সাজসাজ রব এই সম্মানের যুদ্ধের জন্য তা তো ঘূর্ণাক্ষরে খেয়াল করিনি।কোমলমতি এই মেয়েটি যখন প্রথমবার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় বসতে গেছে তখন সে আসলে এই ফলাফল নিয়ে এতো বাগবিতন্ডা হয় তার সম্পর্কে অবগতও ছিল না।পরীক্ষা শেষে যেদিন পারমিতার রেজাল্ট আসে সেদিন নাকি সবাই তাকে কটাক্ষ করেছে।কেননা পারমিতা যে এ+ পাই নি।অনেকে নাকি গোল্ডেন না পাওয়ায় স্কুলে কেঁদেছে,এইসব বিষয় আমাকে বাসায় এসে হাসতে হাসতে বলেছে।আমি সেদিন খুব ভাগ্যবান মনে করেছিলাম কেননা আমি যে তাঁকে কোন দৌড়ের সওয়ারী করি নি।এটা নেহায়েৎ তার সৌভাগ্য বটে।সেই থেকে আজ অব্দি মেয়েটি আমার মাঝারি মানের স্টুডেন্ট হয়ে দৌড়াচ্ছে।এই দৌড়ে কোন ক্লান্তি নেই কেননা তার তো কোন প্রতিদ্বন্ধী নেই।এখানে প্রতিনিয়ত নিজের সাথে নিজের একটা হালকা প্রতিযোগিতা হয়।এমন সুন্দর একটা ট্র্যাক কোন বাবা-মা হয়তো তাদের সন্তানকে দিতে পারবে না।তবে এমনটাই করা উচিত।পারমিতা মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে আজ উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে।এই সময়ে তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।কিশোরী থেকে আজ সে আঠারো বছরের তরুণী হওয়ার পথে।এই বয়সন্ধির পরিবর্তনে তার সাথে ছিল নীলা।এখন সময়ের প্রেক্ষিতে এসে মেয়ে পারমিতাই যেন নীলার মা বনে গেছে।একটা দুর্ঘটনায় নীলার পা বিকল হয়ে যাওয়াতে সে এখন হুইল চেয়ারে বন্দী।এই সময়ে নীলার কাছে একমাত্র অবলম্বন পারমিতা।পারমিতা ধীরে ধীরে মাতৃসম গুণাবলী গুলো রপ্ত করছে এমনটাই মনে হলো।

এই দুর্বার তারুণ্য আর আঠারোর গন্ডিতে সবসময় কোন এক অভূ্তপূর্ব ঘটনার জন্মের অপেক্ষায় থাকি।আমি তার চোখে আমার সমস্ত স্বপ্নের রং দেখি আর আমার স্বপ্ন ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে

আমি কি স্বপ্নের পানে পৌঁছাতে পারব ? এই প্রশ্ন না হয় সময়ের জন্য তোলা থাক……..

চলবে…………..

 

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

প্রতিশোধ -পর্বঃ ৭

Tondra Bilashi

পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী কিছু দেশের উত্থান-পতনের গল্প

Ariyan Mahmud Rokon

বিনিময় প্রথা

Ferdous Sagar zFs

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy