সাহিত্য কথা

গল্পঃ চন্দ্রকথন

শুভ্র আজ সকাল থেকেই কেমন যেন অস্থিরতা অনুভব করছে।আজকের দিনটা তার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আজ একটা জায়গায় যেতে হবে তার। সকাল-সকাল নাস্তা সেরে বেরিয়ে পরল। বাসে উঠে চুপ-চাপ বসে বাহিরের প্রকৃতি দেখছিল আর ভাবছিল।অনেক দূর যেতে হবে তাকে। তবুও প্রতিবারের মত এইবারও শুভ্রর পুরনো স্মৃতি গুলো ভাবতে-ভাবতে সময় কেটে যায়। একটা সময় বাস পৌঁছে গেল। আরও পাঁচ কিলো পথ রিকশায় যেতে হবে। বাস থেকে নেমে সে ঘড়ি দেখল। রাত আটটা বেজে গেছে। চারদিক বেস নিরব। আজ পূর্ণিমা। শুভ্র জানে কিন্তু সে কেন যেন আকাশের দিকে তাকাল না। আশে-পাশে কোন রিকশা দেখছিল না। প্রায় পাঁচ মিনিট পর শুভ্র দেখতে পেল, টিম-টিমে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে খুব দ্রুত গতিতে একটা রিকশা আসছে। রিকশাটা কাছে আসতেই শুভ্র বলল, ‘মামা যাবেন।’
মামা বেস তাড়াহুড়ো করে বলল, ‘কোথায়?’।
শুভ্র বলল, ‘মায়া নদীর ঘাটে’।
মামা বলল, ‘উঠেন’।
শুভ্র দেরি না করে উঠে বসলো। নিরিবিলি পথ ধরে চাঁদের আলয় আগিয়ে চলছে রিকশা। রিকশা যত এগিয়ে যাচ্ছিল, শুভ্রর মনে একটা নারী চেহারা স্পষ্ট হচ্ছিল। একটা সময় রিকশা মায়া নদীর ঘাটে পৌঁছে গেল।
মামা বেস তাড়াহুড়ো করে বলল, ‘মামা নামেন, চইলা আসছি।’
শুভ্র রিকশা থেকে নেমে পকেট থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট মামা কে দিয়ে বলল’ ‘ভাড়া রাখেন’।
মামা পাঁচশো টাকার নোট টা হাতে নিয়ে বলল, ‘ ভাংতি নাই’।
শুভ্র বলল, ‘মামা আমার কাছেও তো নাই। আশে-পাসে কোন দোকানে ভাংতি পান কিনা দেখেন’।
মামা বলল, ‘সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে’। শুভ্র আশে-পাসে তাকিয়ে দেখল আসলেই সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।
রিকশাওয়ালা মামা টাকাটা ফেরত দিয়ে বলল, ‘ভাড়া লাগবে না, যান।’
শুভ্র কিছুটা ইতস্তত করে জিজ্ঞাস করল, ‘মামা আপনার নাম? না মানে পরে আপনাকে খুজে টাকাটা দিয়ে যাব।’
মামা বলল, ‘ জুবায়ের প্রামাণিক।’
এরপর শুভ্র আস্তে আস্তে মায়া নদীর তীরে এগিয়ে গেল।
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে শুভ্র এবার চাঁদের দিকে তাকাল। শুভ্রর চোখে পানি জমতে থাকল। চাঁদের আলোয় তার চোখ জ্বল-জ্বল করছিল। হঠাৎ চোখ মুছতে গিয়ে শুভ্র দেখল তার থেকে প্রায় আট-দশ হাত দূরে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখও জ্বল-জ্বল করছে। শুভ্র সন্ত্রস্ত পায়ে লোকটার কাছে এগিয়ে গেল। দেখল লোকটা আর কেও না, সেই রিকশাওয়ালা মামা, জুবায়ের মামা।
শুভ্র ডাকল, ‘জুবায়ের মামা’।
জুবায়ের মামা চমকে তাকিয়ে বলল, ‘ মামা আপনে? এত রাতে নদীর পারে কি করেন?’
শুভ্র উত্তর না দিয়ে বলল, ‘আপনে কি করেন?’।
জুবায়ের মামা বলল, ‘ভালবাসার শব্দ শুনি’।’
শুভ্র বলল, ‘ তাই নাকি? কিভাবে?’
জুবায়ের মামা ইতস্তত করে বলল, ‘মামা সে অনেক কথা। আপনে বুঝবেন না।’
শুভ্র নাছোড়বান্দার মত বলল, ‘ বুঝব, আপনার অনেক কথা গুলো বলেন, আমি শুনব।’
জুবায়ের মামা বলল, ‘ আচ্ছা বলতেসি, কিন্তু শোনার পর কিন্তু হাসবেন না।’
শুভ্র জুবায়ের মামাকে আশ্বস্ত করল, সে হাসবে না।
জুবায়ের মামা বলতে শুরু করল-
মামা তখন আমার জুয়ান বয়স। পড়া-লেখা করি নাই। অনেক দূর থিকা চাচা-বড় ভাইগো সাথে কাজের জন্য এই গ্রামে আসি। তখন এই গ্রামে সব চেয়ে প্রভাবশালী আর অনেক জমির মালিক ছিল আব্দুল মতালিব। আমরা সবাই তারে হুজুর বইলা ডাকতাম। আমার চাচারা তার জমিতে কামলা খাটতো, হুজুরের বাইরের ঘরে থাকত, হুজুরের ঘরেই খাইত। হুজুর আবার মুজুরিও দিত। তো নতুন আইসা আমিও চাচাগো সাথে কামলা খাটা শুরু করলাম। ভালই কাটতেছিল দিনগুলা। হুজুরও খুব ভাল পাইতেন আমারে। হুজুরের সংসারে ছিল তার স্ত্রী, এক ছেলে আর তার ছোট মেয়ে। ছোট মেয়ের নাম ছিল নাজমা বেগম। বয়স খুব বেশি হইলে পনের কি ষোল। কিন্তু সে ছিল খুব চঞ্চল, আর দেখতে ছিল পরীর মত। আমরা যখন জমিতে কাজ করতাম, তখন নাজমা জমির আশে-পাসে ঘুইরা বেরাইত। আমি দেখতাম সে আমার দিকে বেস নজর রাখত। আমিও তাকায় থাকতাম পরীর দিকে। আস্তে-আস্তে আমি তারে ভালবাইসা ফেললাম। সেও যে আমারে ভালবাসত আমি বুঝতাম। একদিন অনেক সাহস কইরা গোপনে ওরে বললাম। ভাবছিলাম লজ্জা পাইবো। কিন্তু সে আমারে অবাক কইরা দিয়া বলছিল ‘এতদিনে বুঝলেন?’ এরপর থেকে আমাদের প্রেম শুরু। আমি ওরে পরী কইয়া ডাকতাম। যখন হুজুর কোন কাজে শহরে যাইতেন, তখন আমি আর পরী এই মায়া নদীর তীরে হাইটা বেরাইতাম। প্রায় এক বছর পর হুজুর কইল পরীর নাকি বিয়ে ঠিক করছেন। ভিন গ্রামের চাকুরীজীবী ছেলে। সামনে মাসেই বিয়ে। দুই দিন পর হুজুর বিবাহর কেনা-কাটা করতে শহরে গেলেন। আমি আর পরী আবার নদীর তীরে আসলাম। আমার খুব মন খারাপ ছিল। পরীরও মনে হয় মন খারাপ ছিল, কিন্তু সে আমারে বুঝতে দিল না। হঠাৎ কইরা পরী বলল, ‘চল পালায় যাই।’ আমি বললাম, ‘কেমনে? কই যামু? আমার কাছে তো টাকাও নাই।’ পরী বলল, ‘ওইসব আমি বেবস্থা করমুনে। তুমি এখন যাও। আমি রাইতে বাইরের ঘরে আসলে তুমি বাইর হইও।’ আমরা যে যার মত চইলা আসলাম। ভোর রাইতে পরী বাইরের ঘরে আসলো। আমি নিঃশব্দে বাইর হইলাম। পরী আমার হাতে একটা গামছা বান্ধা পোটলা দিল। দেখলাম ভেতরে সব সোনার গয়না। পরীরে আমি যতবারি কিছু বলতে যাই পরী আমার মুখ চাইপা ধরে। দেখলাম পরীর চোখে পানি। নিঃশব্দে কাঁদতেছিল। ওর কান্না দেইখা আমি ওরে জড়াইয়া ধরলাম। মনে হইতছিল অন্য এক দুনিয়ায় আছি। হঠাৎ একটা শব্দ পাইয়া চেতন ফিরল। দেখলাম হুজুর ওযু করার পানি হাতে আমার দিকে তাকায়া আছেন। হুজুর তখন আর কিছু বললেন না। পরী দৌড়াইয়া ঘরে ঢুইকা গেল। আমি হতবুদ্ধি হইয়া দাঁড়াইয়া ছিলাম। দেখলাম হুজুর নামাজে গেলেন। নামাজ থেকে আইসা আমারে ডাকলেন। আমি বের হইয়া দেখলাম হুজুরের সাথে আরও দুইজন কামলা। তারা আমারে বেদম মাইরধর করল। প্রায় আধঘণ্টা পর হুজুর আমারে বললেন, ‘তোর জিনিসপত্র গুছাইয়া চইলা যা। আর একটা কথা, আর কোন দিন যাতে তোরে এই গ্রামে না দেখি।’ আমি সব গুছাইয়া যখন বাইর হইলাম তখন পরী দৌড়াইয়া আইসা একটা চিঠি আমার হাতে দিয়া আবার দৌড়াইয়া চইলা গেল। আমি গ্রাম ছাইড়া বের হইয়া চিঠিটা খুললাম। দেখলাম পরী লেখছে, ‘অনেক ভালবাসি তোমারে। সারাজীবন ভালবাসমু। জানি অনেক কষ্ট হইতাছে তোমার। যত দিন আমারে ভুলতে পারবানা ততদিন প্রতি পূর্ণিমা রাইতে ওই মায়া নদীর পারে আসবা। দেখবা ওই চাঁদ তোমার সব কষ্ট ভুলায় দিব। আর আমারে কখনো দেখতে আইস না। ভাল থাইক।’ এরপর আমি পাশের গ্রামে কষ্টে-বিস্টে থাকা শুরু করি। রিকশা চালাই। আর প্রতি পূর্ণিমা রাইতে এই মায়া নদীর পারে আসি।
জুবায়ের মামার কথা থামল। কিছুক্ষণ নীরব থাকল। এরপর শুভ্র বলল, ‘আপনার পরী এখন কেমন আছে?’
জুবায়ের মামা বলল, ‘ভাল, দুইটা ছেলে সন্তান আর স্বামীরে নিয়া ভালই আছে।’
শুভ্র বলল, ‘আপনি বিয়ে করেছেন?’
জুবায়ের বলল, ‘না মামা। অপেক্ষা করি কবে এই চাঁদ আমার সব কষ্ট ভুলাইয়া দিবে।’
শুভ্র চুপ করে রইল। জুবায়ের মামা বলল, ‘মামা আপনে এইখানে আসছেন ক্যান?’
শুভ্র একটু চুপ করে থেকে বলল আমারও একটা গল্প আছে। হয়ত সেই গল্প অন্যরকম। তবে সেই গল্পেও চাঁদটা খুব কষ্টের। সেই গল্পও ভালবাসার গল্প। আবার কোন পূর্ণিমাতে আপনাকে সেই গল্প শোনাবো।
এরপর মায়া নদীর তীরে দুই জন নীরব বসে থাকে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে-মনে কি যেন বলে। চাঁদের সাথে তাদের যেন কত কথা। আস্তে-আস্তে সময় যায়, আর চাঁদটাও সরে যেতে থাকে। অস্ফুট স্বরে শুভ্র বলতে থাকে, ‘চন্দ্রমায়া, চন্দ্রমায়া অনেক ভালবাসি তোমাকে’।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

আমার ভালবাসার রাজকন্যা : পর্ব -০২

TANVIR AHAMMED BAPPY

সিডরে হারানো ছবি

Md Masum Billah

বালা লাগছে প্রেম করছি কইফত দিমু ক্যালা পর্ব—১

Salina Zannat

6 comments


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Rubiks_Cube June 6, 2017 at 1:36 pm

Valo likha…..


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Rockib Hasan June 6, 2017 at 11:38 pm

Thank you so much.


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Footprint Police June 6, 2017 at 7:22 pm

Spelling Error = Yes


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Rockib Hasan June 6, 2017 at 11:39 pm

Sorry about the errors. Next time thik hoye jabe inshaAllah.


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Mohammad Johirul Islam June 6, 2017 at 10:23 pm

banan er dike aktu monojogi hon boss


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Rockib Hasan June 6, 2017 at 11:40 pm

obossoi.Asha kori porer lekha gulo te vul hobe na. Dhonnobad porar jonno.

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: