সাহিত্য কথা

নিয়তির খেলা

মাঘ মাসের কোনো এক শীতের সকাল…………

কেবল নীলক্ষেতের চায়ের দোকানগুলো খুলছে। দূর থেকেই দেখা গেলো একটা ছেলে হেঁটে আসছে। এই শীতের দিনেও যার পরনে কেবল নিউমার্কেট থেকে কেনা ১৫০ টাকার গেঞ্জি আর জিন্স প্যান্ট ছাড়া কিছুই নেই। লক্ষ্য করলাম ছেলেটি এসে ঢাকা কলেজের খোঁজ করছিল। জিঞ্জাসা করতেই বললো গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা। আর কথা বেশি না বাড়িয়ে সে ওয়ান টাইম কাপের এক কাপ চায়ে চুমুক দিতে দিতে এগিয়ে চললো। ছেলেটির যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খেয়াল করলাম তার কাঁধে একটি ব্যাগ থাকলেও তাতে তেমন কিছু নেই। চা টা শেষ করে আমিও আমার পথ ধরলাম।

৪ দিন পর……………

বিকালে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় হঠাৎ একটি ছেলে দোকানের ভিতর থেকে বের হয়ে এসে বলল, “একটু সরে দাড়ান, জায়গাটা পরিষ্কার করব।”  আমি দেখে কিছুটা অবাক হলাম কারন ছেলেটি সেদিনের সেই চায়ের দোকানের ছেলেটি যে কিনা ঢাকা কলেজের খোঁজ করছিলো।

আগ্রহের সাথে জিঞ্জাসা করলাম, ” তুমি এখানে কি করছো?”

বললো, “তেমন কিছুই নয়। দোকানদার চাচাকে একটু সাহায্য করছিলাম আরকি।”

আমি বললাম, “তুমি কি ঢাকা কলেজে পড়ো?”

উত্তরও আসলো হ্যাঁ বোধক। তবে সে বেশ হাসি খুশির সাথে জায়গাটা পরিষ্কার করে বললো, “আমি আজ আসি। একটা কাজও আছে।”

তবে ২য় দিনে তার পোশাক দেখে বেশ অভিজাত শ্রেণীর মনে হলো। ছেলেটি আমার কৌতূহলের কারন হলেও অন্যদের সাথে কিছু শেয়ার করলাম না। সেদিন রাতে রুমে ফেরার পর হঠাৎ মনে পড়ল যে আগামীকাল থিসিস পেপার জমা দেয়ার শেষ তারিখ। দ্রুত তা শেষ করতে বসে গেলাম।

রাত ১২ঃ৩০…………

ফেসবুকে ঢুকতেই দেখি, টাইমলাইনে একটা ছবি। হঠাৎ খেয়াল করলাম ছবিটা আমার সাথে পরিচিত হওয়া সেই ছেলেটির। দেখে বেশ অবাক হলাম। বড় ভাই তামিমকে বললাম আইডিটা সম্পর্কে একটু ঘাটিয়ে দেখতে। আমার না দেখার কারন অবশ্য ফ্রী ফেসবুক চালানো। রূমমেটদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে রাত ৩টার দিকে ভাইয়ের ফোন পেলাম। ভাই যা বললো শুনে তো আমি পুরাই থ। ভাই বললো, “ছেলেটি আসলে অনেক বড়লোক পরিবারের ছেলে। আমরা তো ওর কাছে কিছুই না।” আমি তো হতবাক। আমি ভাবলাম, ভাই ভাল মত না দেখে ভুল ভাল বকছে। কিন্তু স্ক্রিশটগুলো দেখার পর উপলব্ধি করতে পারলাম। পরেরদিন থিসিস পেপার জমা দিয়েই এসে ছেলেটিকে খুঁজতে চলে গেলাম সোজা ঢাকা কলেজে। যথারীতি তাকে গিয়ে পেলাম ইনডোর গেমসের কক্ষে। আমাকে দেখেই বলে উঠল, “আরে ভাই আপনি এখানে…!!!” আমি সরাসরি বললাম, “তোমার আসল পরিচয় কি জানতে পারি?” সে একটু মুচকি হেসে বললো, “কি আর শুনবেন ভাই …!”

তার হতাশাজনক কথা শুনলেও মুখে হাসি ছাড়া আর কিছুই দেখা গেলো না। কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পর সে আমাকে বলা শুরু করল, “আপনারা এখন যা দেখছেন, তা আমার বর্তমান জগৎ। আর ফেসবুকে যা দেখেছেন তা আমার আরো ২ বছর আগের জগৎ ছিল। যা এক অস্বস্তির জীবন। টাকা, বাড়ি, গাড়ি, বিলাসবহুল জীবন। আরো কত কি। কিন্তু এসব আমার মোটেও পছন্দ নয়। তাই বাড়ি ছেড়ে এখন একাই এখানে থাকি। যদিও পরিবার আমার সাথে যোগাযোগ রাখে। কিন্তু বর্তমান জীবন অনেক ভালো।”

বুঝলাম ছেলেটি হয়তোবা কোনো কষ্ট বুকে চেপেই কথাগুলি বললো। তবে সে আর আমাদের সাথে না থেকে বেরিয়ে গেলো। কিছুক্ষন পর বের হবো, এমন সময় পাশের সিটের এক ভাই বললো, ” আপনারা কিছু মনে করবেন না। আসলে ও বাসা থেকে নিজে আসে নি। ডাক্তারের পরামর্শে এখানে ওকে নিয়ে আসা।” শুনে বেশ অবাক হলাম। আমার কৌতূহল দেখে সে বলে চলল, ” ও আসলে এখানকার ছাত্র নয়। একটি বেডের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। জীবন কাটাচ্ছে। ও আসলে মানসিক ভাবে অনেক অসুস্থ।”

কথাটা শুনে আমার মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়লো। আমি উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি আরো বললেন, “ওর আসলে সবকিছুই আছে। কিন্তু পরিবার ওকে ত্যাগ করায় ও আজ মানসিক রোগী। কিন্তু দিব্যি ভাল ব্যবহার করে। তবে ওর সাথে দিন দুয়েক থাকলে বা রাতে থাকলেই বুঝতে পারবেন।”

আমি আর কিছুই বলার মত অবস্থায় নাই। উনাকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে আসলাম। ছেলেটার মেধাও আমাকে হতবাক করেছে। কারন তার কথা বলা, চাল চলন দেখে আমি কখনো বুঝতেই পারি নি যে ও বদ্ধ উন্মাদ। তাই হতাশা ভরা মন  নিয়ে ফিরতে হলো। এমনকি তামিম ভাইও আমার কথা শুনে অবাক।

এরপর নিজেদের নানা ব্যস্ততায়, আর ওদিকে যাওয়া হয়নি। আর ছেলেটারও তেমন খোঁজ নেয়া হয় নি।

 

প্রায় বছর খানেক পর……………………

 

একটা জরুরী কাজে নিউমার্কেটের ওদিকে যেতে হল। সারাদিন অনেক ঝামেলার পর কাজ শেষ করে, ঢাকা কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ সেই ছেলেটির কথা মনে পড়লো। একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলাম তাকে। কাছে আসার জন্য ডাক দিতেই কেমন যেন ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। মনে হল চিনতে পারে নি। কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর সে যেদিক থেকে আসছিল, সেদিকে চলে গেল। তার যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম আজো ছেলেটি সেই চঞ্চল মন নিয়ে ছুটে চলছে। কিন্তু তার মনের অবস্থা কেউ জানে না।একদিন হয়তো সে সেই হলের কাউকেও চিনতে পারবে না, যেমন আমাকে চিনতে পারেনি।

 

এটাই বাস্তবতা। যার সবকিছু থাকার পরও যেন কিছুই নাই।

সবই নিয়তির আজব খেলা………

হয়তো একসময় আমিও তার কথা ভুলে গিয়ে নিজের গন্তব্যে ছুটে চলব…………

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

জ্বীন সমাচার – সত্য ঘটনা অবলম্বনে গল্প- পর্ব ৩য়

Rohit Khan fzs

একটি আবেগশূন্য টাকার মেশিন

Pritom pallav

আজও কেন এমন হয় — পর্ব—২

Salina Zannat

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy