Now Reading
বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনঃ নান্দনিক সৌন্দর্যের মসজিদ



বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনঃ নান্দনিক সৌন্দর্যের মসজিদ

বাংলাদেশের যে গৌরবময় অতীত রয়েছে তার প্রমান হচ্ছে আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলো দ্বারা বুঝা যায় আমাদের দেশে কোন শাসকরা কোন সময়ে শাসন করেছেন, তাদের শিল্প কলার প্রতি ভালোবাসা কতটুকু ছিল, তাদের সৃষ্টি কর্ম কেমন ছিল তা বুঝা যায়। এর আগের দুটি পর্বে বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এর বিভিন্ন নগর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে আপনাদের মাঝে তুলে ধরেছিলাম। এ পর্বে আমাদের দেশে যেসব মুসলিম শাসক ছিলেন তাদের সময়ে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক মসজিদ গুলোর কথা আপনাদের কাছে তুলে ধরবো। বাংলাদেশ বা এই ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের ব্যাপক ভাবে আগমন ঘটে ১২০৬ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির লখনৌ দখলের পর থেকে। এর পর পারস্য থেকে বিভিন্ন মুসলিম শাসকগণ উপমহাদেশে আসা শুরু করেন। তখন থেকে উপমহাদেশে শুরু হয় ইসলামের ব্যাপক প্রসার। মুসলমানদের ইবাদাতের জন্য তৈরি করতে হয় অনেক মসজিদ। তাহলে শুরু করা যাক আমাদের দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশে গড়ে উঠা কিছু বিখ্যাত মসজিদ এর কথা।Shat-Gombuj-Masjid.jpg

ষাট গম্বুজ মসজিদঃ
ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলোর মাঝে সর্বপ্রথম বিশ্ব ঐতিহ্যের খেতাব প্রাপ্ত নিদর্শন হলো ষাট গম্বুজ মসজিদ। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশের দক্ষিন- পশ্চিমে অবস্থিত এই মসজিদটিকে ইউনেস্কো “World Heritage Sites” হিসেবে মর্যাদা দান করেন। ষাট গম্বুজ মসজিদটি বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত। মসজিদটির গায়ে কোন রূপ শিলালিপি না থাকায় এটি কোন সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল এবং কে নির্মাণ করেছেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি কিন্তু এর স্থাপত্য শৈলী দেখে বুঝা যায় যে এটি ১৫ শত খ্রিস্টাব্দের শুরুতে খান জাহান আলীর নির্মাণ করা স্থাপত্য। মসজিদটির নাম ষাট গম্বুজ মসজিদ হলেও এইখানে গম্বুজ এর সংখ্যা ৬০ টির বেশি তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। এইখানে টি মিনারের গম্বুজ নিয়ে প্রায় ৮১ টি গম্বুজ রয়েছে। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন মসজিদের সামনের দিকে সাতটি সারিবদ্ধ গম্বুজ থাকার কারণে এর নাম সাত গম্বুজ মসজিদ এবং তা থেকে ষাট গম্বুজ মসজিদ নাম করন করা হয়েছে। মসজিদের ভিতরের দেয়ালে বিভিন্ন নান্দনিক টেরাকোটা নিদর্শনও রয়েছে যা মসজিদের ভিতরের সৌন্দর্যকে বর্ধিত করেছে।Choto-Sona-Mosjid-Top20170416132700.jpg

ছোট সোনা মসজিদঃ
“সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন” হিসেবে অ্যাখ্যায়িত বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদ হল ছোট সোনা মসজিদ। সুলতান আলাউদ্দিন শাহ এর শাসনামলে মনসুর ওয়ালী মুহাম্মদ বিন আলী নামে এক ব্যক্তি এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। এই মসজিদটির বয়স প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি। বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় এই মসজিদটি অবস্থিত। এই মসজিদের গঠন প্রকৃতি দেখে অনেকেই ধারণা করেছিলেন এটি তৎকালীন সময়ে জেনানা মহল হিসেবে ব্যবহৃত হতো কিন্তু বেশির ভাগ প্রত্নতাত্ত্বিক গণ মনে করেন এটি সুলতানদের নিরাপদে নামাজ আদায়ের জন্য ব্যবহার করা হতো। এক সময় এই মসজিদের উপর সোনালী রঙ্গের আস্তরণ ছিল যা সূর্য ও চাঁদের আলোতে ঝলমল করতো।এই মসজিদের প্রাঙ্গণের অভ্যন্তরে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দুটি আধুনিক কবর রয়েছে। কবর দুটির একজন বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরশ্রেষ্ট ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এর এবং অন্যটি মেজর নাজমুল হক টুলুর । তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে নবাবগঞ্জ শহরের নিকট পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হোন।Bagha-Mosque2.jpg

বাঘা মসজিদঃ
বাংলাদেশের ৫০টাকা নোটে স্থান প্রাপ্ত রাজশাহীতে অবস্থিত মসজিদটি হচ্ছে বাঘা মসজিদ। ১৫২৩ সালে সুলতান নুসরত শাহ এটি নির্মাণ করেন। মসজিদটির ভিতরে আমগাছ,শাপলা ফুল সহ বিভিন্ন ফার্সি ভাষার কারুকাজ খোদাই করা আছে। প্রতি বছর ঈদুল ফিতরের সময় এই মসজিদের সামনে ৩ দিন ব্যাপী একটি “ বাঘার মেলা” বসে। মেলাটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো।kusumba.jpg

কুসুম্বা মসজিদঃ
বর্তমানের পাঁচ টাকার নোটে মুদ্রিত প্রায় সাড়ে চারশত বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে নওগাঁর ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ। এটিও সুলতানি আমলের একটি পুরাকীর্তি। শূর বংশের শাসক গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহের আমলে সুলাইমান নামের ধর্মান্তরিত মুসলমান ব্যক্তি এই মসজিদটি ১৫৫৮-১৫৫৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন। প্রায় ৪৬০ বছরের এই মসজিদটিতে কিছুটা বাংলা স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে।Star-Mosque.png

তারা মসজিদঃ
মুঘল স্থাপত্য শৈলীর আদলে গড়ে উঠা তারা মসজিদটি পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় আবুল খয়রাত রোডে অবস্থিত। ১৮ শতকের শেষের দিকে মির্জা গোলাম পীর বা মির্জা আহমদ জান নামে এক ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেন।মসজিদের গম্বুজে নীল রঙের তারা খচিত আছে। ১৯২৬ সালে এর সংস্কার কাজ করার সময় মসজিদটিতে জাপান থেকে নিয়ে আসা রঙিন মোজাইক ব্যবহার করা হয়েছে।17201209579_0c4fecd949_b.jpg

সাত গম্বুজ মসজিদঃ
সাত গম্বুজ মসজিদটি ঢাকার মোহাম্মদপুরের জাফরাবাদ এলাকায় অবস্থিত। এই মসজিদটি মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আমলে তার পুত্র উমিদ খাঁ ১৬৮০ সালে নির্মাণ করেন। মসজিদটিতে চারটি মিনার ও তিনটি গম্বুজ রয়েছে এ কারণে মসজিদটির নাম সাত গম্বুজ মসজিদ নাম করণ করা হয়েছে।Atiya-Mosque-tangail-3.jpg

আতিয়া জামে মসজিদঃ
বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদের মধ্যে অন্যতম আতিয়া মসজিদ। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এর শাসনামলে তার নিযুক্ত শাসন কর্তা সাঈদ খান পন্নী “বাবা আদম কাশ্মীরের” কবর এর সাথে আতিয়া মসজিদটি নির্মাণ করেন। বাবা আদম কাশ্মীর এই এলাকায় প্রথম ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য আসেন তারই স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। টাঙাইল জেলায় অবস্থিত এই মসজিদটি বর্তমানে বাংলাদেশের ১০ টাকার ব্যাংক নোটে মুদ্রিত রয়েছে। এই মসজিদটিতে মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন রয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশে ১৫ শতকের দিকে গড়ে উঠা আরও অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে। প্রাক মুঘল সময়ে ঢাকায় নির্মিত বিনত বিবির মসজিদ, মুসা খান মসজিদ , চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর চামচিকা মসজিদ, রংপুরের লালদীঘি শাহী মসজিদ, নরসিংদী জেলার আশরাফপুর মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদ এর নির্মাণ শৈলী দেখে বুঝা যায় বাংলাদেশে যেসব মসজিদ রয়েছে সেসব মসজিদ নির্মাণ কালের শাসক গণ শিল্প কলার প্রতি অনুরাগী ছিলেন। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এর শেষ পর্বে বাংলাদেশে অবস্থিত মন্দির গুলোকে এর পর আপনাদের কাছে তুলে ধরব যার মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই জানতে পারব বাংলাদেশীরা যুগ যুগ ধরে শিল্প কলাকে ধারণ করে আসছে।

About The Author
Muhammad Masud Rana
MasudRana
I'm a shadow.
5 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment