Now Reading
ভারত ভ্রমনের ৫ম দিন (রাজস্থান দা পিংক সিটি )



ভারত ভ্রমনের ৫ম দিন (রাজস্থান দা পিংক সিটি )

৫ম দিন ভারতটা ইতিমধ্যে বন্ধু হয়ে গেছে । পরম আত্মীয়তা । ঘুম থেকে উঠলাম ৬ টায়। আগেরদিন রাতেই হোটেলের একজন কে আমাকে উঠাতে বললাম।(ভাল বিছানা পেলে কার নিজে থেকে উঠতে মন চায়?) যথারীতি আমাকে উঠিয়ে দিল। ৬ টায় ব্রেকফাস্ট হয় নি। তাই আগ্রায়ও ব্রেকফাস্ট করা হল না কারন ঠিক ৭.১৫ তে ট্রেন ছাড়বে রাজস্থান এর উদ্দেশ্যে । ট্রেন স্টেশন আমার হোটেল থেকে দূরে থাকায় ৬.৩০ এর মধ্যে চেক আউট করে বের হয়ে আসলাম। ৭.১০ এ স্টেশন এ পৌঁছে ট্রেন এ উঠে পরলাম, ঠিক ৭.১৭  তে ছাড়ল । বেশ গতি ,আমি ভাবলাম ১ ঘণ্টায় রাজস্থান পৌঁছে যাব । কিন্তু পথ টা যে এত লম্বা কে জানে? হোটেলে বসে একবার গুগল ম্যাপ থেকে দেখেছিলাম মাত্র ২ টা বিন্দু  ।ঐ দুইটা বিন্দু যে ২২৮ কি.মি কে জানে, ঐভাবে দেখাও হয় নি । যেতে সময় লাগল অনেক। রাজস্থান গিয়ে নামলাম  তখন ঘড়ির কাটায় ১২.৫০ ।দুপুর বেলা অনেক গরম। কি করব ভাবতে ভাবতে একটা ট্যাক্সি নেই হোটেল খোজার জন্য। ট্যাক্সিওয়ালা হোটেলে নিয়ে গেলে রুম বুক করে একটু ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিলাম। না, এই ৪ দিনের মত আজ আর বিরিয়ানি খেলাম না। বাংগালি খাবার পেয়ে খাওয়া শুরু করলাম দাম একটু বেশি হওয়া সত্যেও । কারন জয়পুর (রাজস্থান এর রাজধানী) শহরে বাঙালি  খাবার পাওয়া মুশকিল হি নেহি না মুমকিন হ্যায় সেটা আমি জানতাম। খাবার খেয়ে হোটেল রুম এ গিয়ে দেখি সর্বনাশ বেলা ১.৩০ টা বাজে। দিন ত একটা শেষ করে ফেললাম, চট করে বের হলাম ট্যাক্সির খোজে হোটেল থেকে গাড়ি দিতে চাইলেও এই ৫ দিনে আমি অনেক বুজদার হয়ে গেছি ,ওরা টাকা বেশি নিবে ।তাই নিজেই একটা গাড়ি ঠিক করলাম। খুব ই নরমাল। কিন্ত টাকার পরিমান কম তাই আমার মুখে ছিল  হাসি। তা  ঠিক ২ টার দিকে আমার ভ্রমন শুরু।  চলে গেলাম পিংক সিটিতে । সব বড়ি , দোকান পিংক। যেদিক তাকাবেন এক রং,এক নকশা,এক উচ্চতা । সবাই যেন জমজ ভাই। সত্যি কথা বলতে আপনার মনে হবে আপনি সেই স্বপ্নের ডিসনি ল্যান্ড এ চলে এসেছেন । আমি এমন ধরনের টুরিস্ট যে এক জিনিষ সারাদিন বসে দেখে না । হুম,সত্যি পিংক সিটি ছিল অমায়িক এর মানে এই না এক জিনিষ সারা দিন দাড়িয়ে দেখব ।  নতুনের সন্ধানে বের হলাম। সামনেই চরম ভিড় । মনে মনে ভাবতে লাগলাম এত ভিড় কেন? শুধু এখানেই কেন? ভিড় ঠেলে ভিতরে গিয়ে দেখি বিশাল এক মন্দির। আমি খুব বেশি সন্তুষ্ট হলাম না,কিন্তু মন্দিরের ভিতরে ঢুকে মন্দির নির্মাতাদের শত সালাম। ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেলাম মন্দিরের নকশার কাজে ছিলেন একজন মুসলিম । গর্বে বুক ভরে গেল । এক বস্তা ভালোবাসা নিয়ে বের হয়ে আসলাম । ভাবতে লাগলাম নাহ,রাজস্থান শুধু বইতেই সুন্দর । আমার গাড়িওয়ালাকে ফোন করলে সে এসে আমায় তেমন একটা খুশি না দেখে প্রশ্ন করল স্যার কিছু হারিয়ে গেছে? নাহলে জায়পুর এসে কেউ গোমরা মুখে থাকে না। তখন বাজে বিকাল ৫ টা। আমি বললাম আজকের দিন ত শেষ কিছুই দেখতে পালাম না। উনি বললেন স্যার চলেন নিয়ে যাই অ্যাম্বার( Amer fort)দুর্গে। সত্যি কথা বলতে আমি তখন প্রথম বিদেশ যাই, কোথায়  কোন জায়গা ঘুরবো ঠিক না করেই পাড়ি দেই।এইটা ঠিক না বাংলাদেশে  বসেই সব ঠিক করে যাওয়া উচিত । ত অ্যাম্বার দুর্গে গেলাম,যেতে যেতে ৬.০০ টা। রাস্তাটা দারুন, মরুভূমি কেটে করা। আমি  এখনো মানি না যে ঐ রাস্তা মানুষের বানানো ।হাহা,  ভাবছেন আমি সেকেলে,নাহ। কিন্ত আপনি নিজের চোখে দেখলেও একই কথা বলবেন। অ্যাম্বার দুর্গের কোন সিমানা নাই। এর বিশালতা আমি বলে বুঝাতে পারব না। এই দুর্গে ইংরেজ শাসনের অনেক কিছুই পাবেন ।কামান,গলাবারুদ ইত্যাদি । মাটির উপরে উঠতে উঠতে ক্লান্ত তবু নতুনের টানে আমি উন্মাদ । ভেতরে ঢুকতে যাব সেই মুহূর্তে বাধা । স্যার,প্রাসাদের অন্দর মহলে যেতে আপনাকে গুনতে হবে ৫০০ রুপি। সন্ধ্যা তখন ৭ টার বেশি । এক বিদেশিনী আমায় পরামর্শ দিলেন ভিতরে ঘুরতে আপনার মিনিমাম ৪ ঘণ্টা লাগবে । এখন ৭ টা,  আপনি আর এক ঘণ্টা ঘুরতে পারবেন তারপর বন্ধ হয়ে যাবে। আমি বিদেশিনী কে ধন্যবাদ দিলেও দুর্গের দালাল দের ব্যাবসা বন্ধ করায় বিদেশিনী কে বকা শুনতে হল । এরপর অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, শত শত বছর  আগের খোদাই করা পাথর দেখে মন টা ভরে গেল,ইতিহাস কে যেন তালুবন্ধি করে ফেলেছি। যাই হোক ,আমার সময় শেষ । বের হয়ে শত শত গাড়ির মধ্যে আমার টা বের করে নিতে সময় লাগল। সোজা হোটেল। রাত তখন ঠিক ৯.০০ টা। হোটেলে খাবার আইটেম দেখে মেজাজ খারাপ, শরীর টা ভাল না। গরম ছিল অনেক। তাই খেতে মন চাইল না ।বাইরে থেকে কিছু চকলেট আর বিস্কুট  কিনে রুম এ গিয়ে ঘুম। দিনটা অনেক মজার ছিল কিন্ত ততটাও না যতটা আমি রাজস্থান দিয়ে আশা করি । চিন্তা করলাম কালকে একটা দিন থাকব নাকি । ফোন করলাম ড্রাইভার কে আমার ফোন পেয়ে খুশি মনে বল্ল জী স্যার বলেন। আমি জিজ্ঞাস করলাম আর কি কোন  জায়গা দেখার আছে? আমাকে একটু উপহাসের  সুরে  বলল স্যার আপনি ত কিছুই দেখলেনই  না। রাজস্থান ঘুরতে কম করে হলেও ১০ দিন লাগে। আমি ড্রাইভার কে বললাম কালকেও আস। কাজের সন্ধান পেয়ে খুশি ।ওর আনন্দ দেখে আমিও খুশি । রাত ১১.০০ টায় ঘুম দিলাম কাল খুব তাড়াতাড়ি উঠতে হবে সেই পরিকল্পনায় । যেই কথা সেই কাজ, ভোর ৬.০০ টায় উঠলাম । বাইরে গিয়ে রাস্তার চা খেলাম । সাথে দুইটা ইয়া বড় বড় রুটি । সকালের খাবার শেষ (আমি একটু খাই কম, চিকন মানুষ ) নাস্তা শেষ করে ড্রাইভার এল ৭.০০ টায়। বলল চলেন ঘুরে আসি ।আজকে ওর মনটা ভাল দেখাচ্ছে । বললাম চল যাই। ২ ঘণ্টা পর কোথাও একটা গেলাম সব  বালি আর বালি , এটা আবার কি? নিজেকে প্রশ্ন করতে করতে আবিষ্কার করলাম বিশাল মরুভূমি । সাথে শত শত উঠ। আমার জীবনে মরুভূমি এই প্রথম ।আর উঠ  এক সাথে এত দেখিনি। অসম্ভভ গরম ।তাও হাটা দিলাম আমার ব্যাগে থাকা এক বোতল পানি খুব সাহায্য করল । একটু পর ঘটল এক অভূতপূর্ব ঘটনা যা আমি আর আমার ড্রাইভার কেউ আশা করিনি। আপনারা কেউ ভারতীয় কমেডিয়ান কাপিল শর্মা কে চিনেন কিনা জানি না তবে আমার খুব পছন্দের একটা মানুষ । ওর জীবনের প্রথম ছবির শুটিং হচ্ছিল । একটা গান ধারন করা হচ্ছে । সামনা সামনি দেখে আমি ত আবেগে লুতুপুতু হয় গেছি। কথা বলার অনেক চেষ্টা করেও বলতে পারলাম না কারন ওখানে প্রচুর গরম আর ওরা যত তাড়াতাড়ি পারে ওখান থেকে কাজ শেষ করে চলে যাবে। অগত্যা  মন খারাপ করে উঠের কাছে গেলাম। পিঠে উঠব। টাকার পরিমান শুনে আমার গলা শুকিয়ে গেল । এক ঘুললি ৩০০ রুপি। অনেক চাপাবাজি করেও কিছু কমাতে পারলাম না। শেষে উঠলাম উঠের পিঠে । বেশ ভালই লাগছিল সাথে ভয় ছিল অনেক। নিজেকে বাহাদুর প্রমান করতে ভয়টা সামনে আনলাম না। এরপর ফিরে গেলাম শহরের দিকে। ড্রাইভারের সাথে একটা আত্মার সম্পর্ক হয়ে গেল। শহরে গিয়ে দুজনে বেশ আচ্ছা করে ছাগলের মাংস দিয়ে একটা মুসলিম হোটেলে ভাত খেলাম। এরপর গেলাম বিখ্যাত হাওয়ামহলে, যার নাম শুনেছি হাজারবার আর ভারতের সবাই হাওয়ামহল কে একটা আলাদা সন্মান দেয়। মনে হয় ধর্মীয় কোন সম্পর্ক আছে কিন্ত অনেকের কাছে জিজ্ঞেস করেও এই ব্যাপারে কিছু জানা গেল না । রাত ৮.০০ টায় হোটেলে গেলাম একটু বেশিই ক্লান্ত ছিলাম । হোটেলে আমার রুমেই ফ্রিজে ঠাণ্ডা পানীয় রাখা ছিল,খেয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। রাতের খাবার আর হল না। কাল ভোরে ফিরে যেতে হবে দিল্লী কারন টার্গেট কাশ্মীর যাব ফ্লাইট এ। সকালের ট্রেন ধরার লক্ষ্যে ঘুমিয়ে গেলাম খুব তাড়াতাড়ি আর শরীরটাকেও ত একটু বিশ্রাম দিতে হয়।  কাশ্মীর আমার ছোটবেলার স্বপ্ন তাই অনেক সুন্দর একটা মন নিয়ে ঘুমালাম। কাল সূর্য উঠলেই কাশ্মীরের পানে ছুটে যাব এই স্বপ্নে ঘুম…………

এখানে জেনে রাখা ভাল । ১. রাজস্থান এমন একটি জায়গা যেখানে আপনি ১০ হাজারেও ঘুরতে পারবেন আবার ১০ লক্ষ নিয়েও ঘুরতে পারবেন। ২. রাজস্থান এ সব রকমের খাবার পাবেন । ৩. গরম যদি আপানার কাছে ভয়ের নাম তাহলে শীতের দিনে যান। ৪. মরুভূমিতে  যাওয়ার আগে বড় জুতা আর স্যালাইন পানি নিয়ে যাবেন। ৪. রাজস্থান এ খুব কম দামে ভাল হোটেল আছে ,শুধু একটু ঘুরে দেখতে হবে। ৫. আগে থেকেই একটা প্লান করে রাখেন কোথায় কোথায় ঘুরবেন।৬.ভুলেও হোটেলে আপনার রুমে রাখা কিছু খাবেন না যেগুলো ফ্রি না । কারন আমি এক বোলত পানি খাই ১৫ রুপি দামের,কিন্ত হোটেল চেক আউটের সময় দেখলাম বাড়তি ৪০ টাকা দিতে হবে কারন আমি ফ্রিজে রাখা ১৫ রুপির পানি খেয়েছি।  (তবে আপনার যদি এমন অবস্থা হয় যে পানি না খেলে আর বাচব না সেক্ষেত্রে খেয়ে নিবেন, টাকার চেয়ে জীবনের মুল্য অনেক বেশি,হাহাহাহাহা)
আশা করি সাথেই থাকবেন, কাশ্মীর ভ্রমন আসছে পরবর্তীতে খুব তাড়াতাড়ি ।
(চলবে)

About The Author
FAHAD BIN HUSNE ALI
FAHAD BIN HUSNE ALI
Like to Travel a lot.Fond of travel writing.i am a part time poet.Student of diploma in computer .
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment