Now Reading
বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – সপ্তম পর্ব (তিন গোয়েন্দা)



বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – সপ্তম পর্ব (তিন গোয়েন্দা)

হ্যালো, কিশোর বন্ধুরা, আমি কিশোর পাশা বলছি, আমেরিকার রকি বিচ থেকে। বাংলা রহস্য-রোমাঞ্চের ক্ষুদে পাঠকদের জন্যে খুবই পরিচিত একটি সূচনা। সেবা প্রকাশনীর অন্যতম সিরিজ ‘তিন গোয়েন্দা’ এর প্রতিটি বইয়ের শুরু হয় এই লেখা দিয়ে। রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের এই পর্বের আলোচনা এই তিন গোয়েন্দা সিরিজ নিয়ে।

আজ থেকে প্রায় বত্রিশ বছর আগে তিন গোয়েন্দা সিরিজের যাত্রা শুরু হয়। সেবা প্রকাশনী সে সময় কুয়াশা, মাসুদ রানার মত চরিত্র তৈরি করে রোমাঞ্চ প্রিয় পাঠকদের মনে শক্ত আসন গেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সেই দুর্দান্ত স্পাই আর পাগলাটে দুর্ধর্ষ বৈজ্ঞানিকদের কাহিনী যেন একটু বড়দের জন্যে লেখা। স্কুল পড়ুয়া ক্ষুদে পাঠকদের জন্য তাই নতুন এক সিরিজের শুরু করল সেবা। স্কুল পড়ুয়া ডানপিটে কিশোররাই সে গল্পের মূল চরিত্র। সেই সিরিজের নাম তিন গোয়েন্দা। ১৯৮৫ সালে ‘তিন গোয়েন্দা’ নামে সিরিজের প্রথম বই প্রকাশ পায়। সুলেখক রকিব হাসানের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় সেবা প্রকাশনীর আরও একটি অসাধারণ সিরিজ বইয়ের।

রকিব হাসান রহস্য-রোমাঞ্চের একজন স্বনামধন্য লেখক। অনুবাদ হোক বা মৌলিক গল্প, শ্বাসরুদ্ধকর রহস্য থাকুক অথবা গা শিরশির করানো ভৌতিক কাহিনী, সব ক্ষেত্রেই অসাধারণ লেখার হাত তাঁর। সেবা প্রকাশনীর নিজস্ব পত্রিকা ‘রহস্য পত্রিকার’ একজন সহকারী সম্পাদক ছিলেন রকিব হাসান। লেখালেখির শুরুটা অনুবাদক হিসেবে ‘ড্রাকুলা’ আর ‘টারজান’ এর মত বিখ্যাত বইয়ের অনুবাদ দিয়ে। পরবর্তীতে নতুন সিরিজ লেখার গুরু দায়িত্ব তুলে দেয়া হয় তাঁর কাঁধে। সেই দায়িত্ব সাফল্যের সাথে প্রায় বিশ বছর পালন করেন তিনি। সেই সময়ের মধ্যে ১৫০এর বেশি তিন গোয়েন্দার অভিযান পাঠকদের জন্যে উপহার দেন এই গুণী লেখক। এরপর হঠাৎ করেই সেবা প্রকাশনী থেকে সরে আসেন রকিব হাসান। কেন? কি কারণে? তিনি সেবা ছাড়েন সে রহস্য আজও অস্পষ্ট থাকলেও, যে সিরিজ তিনি শুরু করে দিয়ে গিয়েছিলেন সেই তিন গোয়েন্দার প্রকাশ চলতে থাকে। লেখক হিসেবে ‘শামসুদ্দীন নওয়াব’ এর নামে নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে এই সিরিজের বই। জানামতে এই নামে সত্যিকারের কোন লেখক নেই। এই নামের আড়ালে তিন গোয়েন্দার অভিযান লিখে চলছেন অনেক অজানা লেখক। সেই তালিকায় সেবার নিয়মিত লেখকরাও আছেন।

রকিব হাসান ছাড়া যেমন সেবা প্রকাশনী থেকে তিন গোয়েন্দার প্রকাশ থেমে থাকেনি, তেমনি রকিব হাসানও এই সিরিজের লেখা থেকে হারিয়ে যান নি। তিন গোয়েন্দা লেখা বিষয়ে প্রথমে প্রকাশ স্বত্ব নিয়ে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হলেও, পরবর্তীতে ‘গোয়েন্দা কিশোর মুসা রবিন সিরিজ’ নামে মূলত প্রিয় তিন গোয়েন্দা সিরিজের বই ধারাবাহিক ভাবে লিখে চলেছেন তিনি। পছন্দের চরিত্রদের প্রকাশনী আর সিরিজের নাম বদলে গেলেও রহস্যের গন্ধে ছুটে চলা তিন কিশোরের চেনা জগত কিন্তু একই আছে।

রবার্ট আর্থারের জুনিয়রের লেখা ‘থ্রি ইনভেস্টিগেটরস’ এর ছায়া অবলম্বনে বাংলায় তিন গোয়েন্দা সিরিজের সৃষ্টি। বিদেশী গল্পের অবলম্বনে হলেও, চরিত্রের নাম থেকে শুরু করে তাদের বিবরণ, তাদের আশেপাশের বিবরণ আর ঠিকানা সবই নিজের মত করে তৈরি করেছেন রকিব হাসান। তিন গোয়েন্দার স্থায়ী নিবাস আমেরিকায় লিখলেও বাংলাদেশ আর বাংলা ভাষাকে সবসময়ই সিরিজের গল্পের মাঝে পাওয়া যায়।

তিন গোয়েন্দা এমন এক সিরিজ যেখানে তিনটি মূল চরিত্র এক সাথে কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এরপরও গল্পের প্রধান তো কেউ থাকা চাই। সেই প্রধান হচ্ছে কিশোর পাশা। গল্পের বিবরণী তার মাধ্যমেই আমাদের কাছে এসে পৌছায়। চাচা চাচীর কাছে বড় হওয়া কিশোরের বাবা মা ছোট বেলায় মারা গিয়েছে বলে বলা হয়েছে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কিশোরের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির বলেই তিন গোয়েন্দার অভিযানগুলোর সমাধান পাওয়া যায়।

মুসা আমান, ব্যায়ামবীর, আমেরিকান নিগ্রো। হাসলে যার ঝক ঝকে দাঁত বেরিয়ে পরে। বন্ধুদের জন্য জীবন দিতে হাজির মুসার কেবল সমস্যা ভূত নিয়ে। এর বাইরে আকাশ পাতালের সব কিছু কব্জা করার ক্ষমতা সে রাখে তার শক্ত খুলির গুঁতো দিয়ে আর নাহয় সম্মুখ মারামারিতে।

আইরিশ আমেরিকান, রবিন মিলফোর্ড বইয়ের পোকা। তিন গোয়েন্দার সব অভিযানের বিবরণী আর রহস্যের সমাধানের যাবতীয় তথ্যের ভাণ্ডার এই রবিন। সোনালী চুলের লাজুক রবিন প্রয়োজনে হয়ে উঠতে পারে দুরন্ত পর্বতারোহী আবার সমাধান করতে পারে ভীষণ প্যাঁচালো কোন ধাঁধার।

জড়পদার্থ হলেও ‘পাশা স্যালভেজ ইয়ার্ড’ গল্পের অন্যতম চরিত্র বলতেই হবে। সেখানে লোহা-লক্কড়ের জঞ্জালের নিচে পুরনো একটা মোবাইল হোম-এ তিন গোয়েন্দার হেডকোয়ার্টার। এই হেডকোয়ার্টার এর ভেতরের চমৎকার বিবরণ আর যাওয়া-আসা করার মজাদার সব রাস্তার ব্যাখ্যা এতোটাই জীবন্ত যে পুরো স্যালভেজ ইয়ার্ডকে মনে হয় নিজদের বাসায় যাওয়ার পথ আর নিজের ঘরের মতই পরিচিত।

আরও বেশ কিছু চরিত্র আছে এই সিরিজে যাদের তিন গোয়েন্দার অভিযানে বহুবার দেখা গেছে। মূল চরিত্র না হলেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে এদের কথা উল্লেখ করতেই হবে। তিন গোয়েন্দার ছোটবেলার বন্ধু জিনা আর তার বুদ্ধিমান কুকুর রাফিয়ান এদের মধ্যে অন্যতম। ছোট বেলার বন্ধুর মত ছোট বেলার শত্রুও আছে একজন। টেরিয়ার ডয়েল যাকে তিন গোয়েন্দা ‘শুঁটকি টেরি’ বলে ডাকে। যে কোন ভালো কাজের মাঝে ভেজাল লাগানোয় অথবা কিশোর মুসা রবিনদের বিপদের মুখে ঠেলে দেয়ায় তার জুড়ি নেই।

এছাড়া পাইলট ওমর শরিফ, খোঁড়া গোয়েন্দা ভিক্টর সাইমন, বিখ্যাত পরিচালক ডেভিড ক্রিস্টোফার, রোলস রয়েসের ড্রাইভার হ্যানসন, পাশা স্যালভেজ ইয়ার্ডের দুই কর্মী বেরিস আর রোভার, বিভিন্ন বইয়ে নিজেদের ছাপ রেখে যেতে সক্ষম হয়েছে।

তিন গোয়েন্দার অভিযানের আলাদা আলাদা সিরিজ প্রকাশ করত সেবা এবং তাদের অঙ্গসংগঠন প্রজাপতি প্রকাশনী। তিন বন্ধু সিরিজ, কিশোর থ্রিলার (তিন গোয়েন্দার মূল সিরিজ), কিশোর চিলার (ভৌতিক ঘরানার কাহিনী নির্ভর) এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

সময়ের সাথে পাঠকের যেমন বয়স বাড়ে সেই সাথে বদলে যায় পছন্দের তালিকা। কিন্তু প্রথম জীবনে পড়া বইয়ের স্মৃতি গুলো যেভাবে মনে দাগ কেটে থাকে, সেই অনুভূতি বদলানোর ক্ষমতা অন্য কোন বইয়ের সম্ভব হয় না। আমার মত অনেকের হয়ত আজ আর তিন গোয়েন্দার সাথে অভিযানে বের হওয়া হয় না, তাই বলে তাদের ডাকে সারা দিয়ে রহস্য রোমাঞ্চের পৃথিবীতে যাত্রা করার পাঠক আগেও যেমন ছিল আজও আছে থাকবে আগামীতেও।

About The Author
Abdullah-Al-Mahmood Showrav
সাধারণ মানুষ, সাধারণেই বসবাস। লিখতে ভালবাসি, লিখতে শেখা হয়নি এখনো। অপেক্ষায় আছি একদিন ঠিক শিখে যাব।
2 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment