Now Reading
ধর্ষণের বৈধতা নয় সম্পর্ক



ধর্ষণের বৈধতা নয় সম্পর্ক

আজকাল বাংলাদেশে প্রচুর ধর্ষণের সংবাদ পাচ্ছি ফেসবুকে ঢুকলেই। আট বছরের বাচ্চা মেয়ে থেকে শুরু করে দুই বাচ্চার মা পর্যন্ত সবাই এর স্বীকার। এসব সংবাদ তো আমরা খবর পাচ্ছি। ঠিক একইসাথে অনেকগুলা হয়তো পাচ্ছিনা যারা কিনা লজ্জায়,ভয়ে এসব লুকিয়ে রেখেছে। আর এই ধর্ষণের হাতিয়ার হিসাবে অনেকেই এখন ব্যবহার করছে সম্পর্ককে। প্রেমের নামে কিছু কুলাঙ্গার ভণ্ড মেয়েদেরকে ফাঁদে পেলে তাদের কুৎসিত ইচ্ছা চরিতার্থ করছে। আর বহু আগে থেকেই বিয়ের পরে স্ত্রীর উপরে জোরপূর্বক শারীরিক নির্যাতন চলে আসছে।

বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়েরা বরাবরই নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে বহুকাল ধরে। ধর্মের কু ব্যাখ্যা দিয়ে, সমাজকে রক্ষা করার নামেও সবসময়ই হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে তার ধরণও পাল্টেছে।

বর্তমান যুগ ডিজিটাল যুগ। প্রাপ্তবয়স্কদের হাতে যেমন প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় স্মার্ট ফোন,ট্যাবলেট,ল্যাপটপ,কম্পিউটার চলে আসছে তেমনি ঠিক অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতেও এখন তা বেশ সহজলভ্য। আপনি যদি একটু খোজ নিয়ে দেখেন স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও এখন প্রেমে মত্ত হচ্ছে। স্কুল কলেজের বেশীরভাগ মেয়ের এখন প্রেম হচ্ছে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে। প্রেম জিনিসটা খারাপ তা মোটেও বলছিনা। মানবজীবনে প্রেম না থাকাটাই অস্বাভাবিকতা। কিন্তু এই প্রেমকে পুঁজি করে কেউ যখন কুকর্ম করে  বেড়ায় তখনই তা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই স্কুল কলেজের বেশীরভাগ ছোট ছোট মেয়েদের অজ্ঞতার সুযোগে এক শ্রেণীর লম্পটের উদ্ভব হয়েছে যারা কিনা নির্জনে দেখা করার নামে প্রেমের দোহাই দিয়ে কোমল মতি মেয়েদের ধর্ষণ করে যাচ্ছে। কেন বলছি তাদের  সম্মতিতে হচ্ছেনা,কারণ আমি নিজে এর প্রমাণ দেখেছি বেশ কয়েক বছর ধরে।

বেশ কয়েক বছর আগে আমার এক পরিচিত মেয়ের ডায়েরী আমার কাছে এসে পরে কাকাতালীয়ভাবে। তার ডায়েরী থেকে জানতে পারি তার প্রেমিক তার এলাকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগে অনার্স করছে। একদিন তার ফাকা বাসায় তাকে যেতে বলে তাকে ধর্ষণ করে। এরপরেও প্রেমের দোহাই দিয়ে তাকে বারবার ধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে সে লিখতে বাধ্য হয় যে তাকে কি যে যৌন বস্তু হিসাবে ব্যবহার করছে কিনা। এই ঘটনা যখন ঘটেছে মেয়েটি তখন ক্লাস নাইনে পড়ত।

ফাকা বাসা বা বহুল প্রচলিত লিটনের ফ্ল্যাটেও চলছে একই কাহিনী। কিছুদিন আগেও একটি ঘটনা শুনলাম যে একটি মেয়েকে তার প্রেমিক বিভিন্ন ধরণের ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রায় ৪ বছরের বেশী প্রেম করেছে। মেয়েটি যখন ভার্সিটিতে ভর্তি হয় তখন সে এই বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করতে চায়। সে যাতে এরকম না করতে পারে  এর জন্য ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে বাসায় নিয়ে যেয়ে ধর্ষণ করে। মেয়েটি পরবর্তীতে এই ঘটনা সইতে পারে বাসায় জানিয়ে দেয়। এখনো সেই ছেলে তাকে হুমকি ধমকি দিচ্ছে।

যারা স্বেচ্ছায় এসব করছে যাকে আমরা অনৈতিক বা অবৈধ যাইই আখ্যা দেই না কেন তারা তাদের নিজের ইচ্ছায় করছে। তাদেরকে আমাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু যারা এরকম জোরপূর্বক শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে তাদেরকে সচেতন হতে হবে যাতে সম্পর্কের নামে আপনি কখনো ধর্ষণের স্বীকার না হন।

এখন কথা উঠতে পারে মেয়েগুলো খারাপ। তারা ভাল না খারাপ সেটার চেয়ে তাদের সাথে অন্যায় হয়েছে সেটার প্রতিবাদ করাটা বেশী জরুরি। না হলে আস্তে আস্তে সেই কুলাঙ্গারদেরই জয় হবে। ধরুন এই মেয়েগুলো আপনার মেয়ে বা বোন সেক্ষেত্রে আপনি কি করতেন ।

তাই মেয়েদের বলব আপনার যদি কোন ইচ্ছা না থাকে এসব করার তবে কখনোই একা নির্জন জায়গায় যাবেন না দয়া করে সে যতই বিশ্বাসী হোক না কেন। আপনার নিরাপত্তা আপনাকেই দেখতে হবে। যা ক্ষতি হওয়ার তা কিন্তু আপনারই হবে। সেক্ষেত্রে আপনাকে তার দায়ভার গ্রহণ করতে হবে।

আর বিয়ের আগে এ ধরণের শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এসেছে ইসলামে কড়া হুমকি। তাই আপনি কি করবেন তা একশবার ভেবে করবেন। ভাবিয়া করিও কাজ,করিয়া ভাবিয়ো না ।

অনেকে মেয়ে আছে আবার ইচ্ছা করে প্রতিশোধস্বরূপ বা প্রেমিককে ফাঁসানোর জন্য এসব নিয়ে মামলা করে থাকে। সেক্ষেত্রে ছেলেদেরও ভাবা উচিত আপনি করছেন।

এতো গেল প্রেমের কথা। এই ঘটনাগুলোও একটু আধটু জানা যায়। যেইটা আপনি কখনো শুনতে পারবেন না তা হল বিয়ের পরে ধর্ষণ।

বিয়ে নরনারীর মানসিক এবং শারীরিক চাহিদা পূরণের জন্য একটি সামাজিক এবং ধর্মীয় স্বীকৃতি। স্বামী স্ত্রী দুইজনের সম্মতি ছাড়া যেমন একটি বিয়ে চলতে পারেনা তেমনি সবকিছুতেই দুইজনের সম্মতি থাকা দরকার। সমরেশ মজুমদারের বিখ্যাত উপন্যাস “সাতকাহন” যদি পড়ে থাকেন দেখবেন  উপন্যাসের নায়িকা দীপাবলির বৈবাহিক জীবনে তার স্বামী কর্তৃক কিভাবে ধর্ষণের স্বীকার হচ্ছে।

এখন সবারই মতামত প্রকাশের অধিকার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কল্যাণে কিছু কিছু ঘটনা নামে বেনামে জানা গেলেও অধিকাংশ ঘটনাই আমাদের অগোচরে থেকে যাচ্ছে। দিনের পর দিন মানসিক অশান্তি নিয়ে অনেক নারী এখনো দিনাতিপাত করছে তার সংসারজীবনে। তারা কারো না কারো মা,খালা,বোন। অথচ আমরা তা জানিনা। প্রতিবাদ করতে পারছেনা তারা এটা অন্যায় জেনেও।

এই সমস্যার উত্তরণে প্রয়োজন নিজের মন মানসিকতার প্রয়োজন। একজন নারী কেবল ভোগ্যবস্তু নয়। একজন নারী একজন মা,একজন প্রেমিকা,একজন স্ত্রী যাদের সহযোগিতায় আমরা আজ বেড়ে উঠেছি।

মা হিসাবে সকল  নারীদের উচিত হবে তার ছেলে সন্তানকে মেয়েদের শ্রদ্ধা দিতে শেখানো। যারা ধর্ষক তারাও কিন্তু কোন না কোন নারীর সন্তান। উল্টো দেখা যায় তারা তার সন্তানকে সাপোর্ট দেন। আপনার সন্তানকে তাই শিক্ষা দেন। এর দায়দায়িত্ব মায়েদের উপরও পড়ে।

মাদক এবং পর্ণ সাইটগুলো আমাদের সমাজে মাত্রাতিরিক্তভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। এর করাল গ্রাস থেকে উত্তরণে প্রয়োজন তাই সরকারী উদ্যোগ।

সরকারের উচিত এই ধরণের বিষয়গুলোর জন্য বিচারের ব্যবস্থা করা।

একজন  মানুষ হিসাবে অন্য একটি মানুষকে সম্মান দিতে হয় তার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে হয়। তা কি পারছি আমরা তা নিজেদেরকেই জিজ্ঞেস করি।

দুনিয়ার সকল নারী নিরাপদ থাকুক সেই হোক আমাদের প্রত্যাশা। তাই নারী পুরুষ হাতে হাত মিলিয়ে এই পৃথিবীকে গড়ে তুলি যেখানে নিরাপদ থাকবে সব  মানুষ।

 

 

 

About The Author
Jubair Sayeed Linas
6 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment