Now Reading
হারানো শহরের গল্প (কিনু-১)



হারানো শহরের গল্প (কিনু-১)

কিনু-১

চারিদিকে নীরব নিস্তব্ধতা । আধার আর নিস্তব্ধতা মিলিয়ে আমাবস্যার চাঁদ ছাড়া অগণিত তারার নিচে নিজেকে হারাইয়া, শহরের কোলাহল মুহূর্ত গুলো কে পিছনে ফেলিয়া, একটা প্লাস্টিক এর চেয়ারে পুরাতন কথাগুলিকে মনের বাহির করিয়া একটু আরামে বসিয়া আমাবস্যার রাতের এই সুন্দর মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করিতেছিলাম ।চারিদিকের বনের ঝি ঝি পোকার ডাক আর মৃদু বাতাসে মনে হইতেছিল আমি আর আমাতে নেই। কালো আধার আর মৃদু বাতাসে মিশে একাকার হয়ে গেছি।

হটাৎ কোথা থেকে দুইটা নরম কোমল হস্ত আমার বন্ধ দুটি চোখ কে ঢেকে দিল । আচমকা এরুপ অনুভুতিতে নিজের জগৎ টা থেকে বের হইয়া চিৎকার করিয়া বলিতে ইচ্ছা করিল ……….কে…… কে ??????

কিন্তু না। এই মনটা একটা মিষ্টি সুবাস আর নরম কোমল স্পর্শে কোন প্রকার কোলাহল সৃষ্টি করিতে চাইল না।বুঝিতে পারলাম তিনি এক জন তনয়া । না না আমাকে ভুল বুঝিবেন না । আসলে  রোজ কার দিন শুরু হইতেই হাজারও মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়া, তাদের সাথে কাজ, কথা বার্তা আর তাদের সান্নিধ্যে গিয়ে অন্তত পুরুষ আর মহিলা পৃথক করার সে অভিজ্ঞতা টা হয়ত আমার হইয়াছে । কিন্তু কৌতহলি যুবকের মত নিস্তব্দতা ভাঙ্গিয়া স্বভাব বশত জিজ্ঞাসা করিলাম …………. কে???????

একটা মৃদু হাসির উপস্থিতি অনুভুত হইল । দুষ্টু বালিকার মত হাসিবার সময় তাহার কিছু কেশ রাশি মৃদু বাতাসে উড়িয়া আমার মুখ মণ্ডলে আসিয়া পরিল । আশে পাশে কামিনি বা হাস্না হেনার গাছ না থাকিলেও মনে হতে লাগিল তাহারা মৌমাছিদের আকর্ষিত করিবার জন্য তাহাদের সাধ্য মত করে প্রান পন দিয়ে গন্ধ বিলাইয়ে যাইতেছে।

আমার জানিবার বা বলিবার অনেক কিছু থাকিলে ও সকল জ্ঞানেন্দ্রিয় গুলি অকেজো হয়ে পড়িবার ফলে মুখ হইতে কোন শব্দ বের হইতে পারিল না । হয়ত বা চাইলে ও পারিত না । জোর করিয়া ও সম্ভব না । অবাক অপলক দৃষ্টি তে তাহার দিকে তাকাইয়া রইলাম । এভাবে কিছুক্ষণ কাটিল । অন্ধকার এই রাতে তাহাকে দেখিবার কোন অবকাশ না থাকিলেও অবয়ব দেখিয়া এততুকু বুঝিতে পারিলাম তনয়া টী শাড়ি পরিধান করিয়া আছেন। আমি আর আমার পিসতুতো দাদা এই বাড়িটায় থাকি । চারিদিকে গাছ পালার মধ্যে ছোট্ট একতালা বাড়িটিতে আমি আর আমার দাদা ছাড়া আর কোন পুরুষ থাকিবার কথা নয় । চারিদিকে উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এই বাড়িটি তে আমরা দুই ভাই বেশ কিছু দিন হইল উঠিয়াছি । আসে পাশের এলাকা সন্মন্ধে জানার ইচ্ছা থাকিলেও কর্মব্যস্ত জীবনে তাহা আর হইয়া ওঠে না । দাদা গিয়ে পাশের এক মাসিমা কে আমাদেরকে রান্না করিয়া দেবার কথা বলিয়া আসিয়াছিলেন । তিনি মাঝ বয়সী একজন মহিলা কে এই কাজে নিয়জিত করিয়াদিলেন । তিনি রোজ সকাল ৭ টা নাগাদ আসিয়া সকালের নাস্তা তৈরি করিয়া দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে চলিয়া যান । তো তার চলিয়া যাইবার পর থেকে আর কোন রমণীর এই বাড়িতে থাকিবার কথা না আর থাকিতে পারেন ও না । কিন্তু তাহাকে দেখিয়া বা অনুমান করিয়া একেবারেই কাজের মাসিমার মত মনে হচ্ছে না । কৌতুহল মনের মাঝে উঁকি দিয়ে আকি বুকি করিতে থাকিল।

এভাবে বেশ কিছুখন কাটিয়া গেল । কিন্তু দুই পক্ষ থেকে কোন রকম ভদ্রতা বোধক শব্দ বা ধ্বনি বের না হইবার পর তনয়াটি হটাৎ নিস্তব্ধতা ভাঙ্গিলেন । বলিলেন ” বসিতে বলিবেন না??”

আমি হতচকিত হইয়া ইতস্তত উঠিয়া সামনের মোড়া টার দিকে যাইয়া উহা টিকে কাছে টানিয়া প্লাস্তিকের চেয়ারটাতে হাত দেখাইয়া তাহাকে বসিবার জন্য ইঙ্গিত করিলাম । তিনি বসিলেন কিন্তু আমি কেন জানি বসিতে পারিলাম না । হটাৎ কোথা থেকে একটা জোনাকি পোকা উড়িয়া আসিয়া তাহার মুখের উপর যেন বসিল । মনে হইল এই আমাবস্যার মধ্যে কেউ প্রদিপ জ্বালিয়া কাউকে খুজিবার চেষ্টা করিতেছে ।তাহার মুখ পানে একটুখানি তাকিয়াই নিজের কাছে নিজেকে বড্ড অপরিচিত লাগিতে শুরু করিল । যথারীতি জোনাকির আলোটা দীর্ঘায়িত হইল না । আমি যেন কোথাও হারাইয়া গিয়াছি ।তার দিকে অপলক দৃষ্টি তে তাকাইয়া একগুচ্ছ জোনাকি পোকার আগমনের অপেক্ষা করিতে লাগিলাম । কিন্তু ওই অবুঝ জীব যদি আমার মন এর অবস্থা একটু সময়ের জন্য বুঝিত……………।

আমি বসিলাম। তনয়াটি বলিলেন ” কি অবাক হচ্ছেন? আমাকে চিনতে পারছেন না বোধ করিতেছি …” আমার মুখ থেকে কোন শব্দ বের হল না । তিনি বলিতে থাকিলেন ” আমাকে তো আপনি চিনেন। প্রতিদিন আমাদের দেখা হয়, কথা হয় ।কর্মব্যস্ত জীবনে আপনি যাহাকে রোজ খুঁজে বেড়াচ্ছেন আমি তো সেই ……”

তবুও আমার মুখ থেকে কোন শব্দ বের হইতে চাহিয়াও বের হইতে পারিল না। সুধু মুখের উপরিভাগে একটু ব্যাথা অনুভুত হইল । মনে হল কোন মশা নিশব্ধে রক্ত চুষিয়া তাহার উদর ভর্তি করিতেছে । আমার ডান হস্ত টী নিশব্ধে উঠিয়া সঃশব্দে পড়িল । বুঝিলাম মশাটি বেশ খাইয়াছে । কিন্তু তনয়া টী কোথায় ???????? আর আমিও বা চেয়ারে কেন?????

মনের ভিতর থেকে আমার শত্রুটা অট্টহাস্যে বলিতে লাগিল গাধা তুই স্বপ্ন দেখছিস !!!!!!!!!!

 

7 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment