Now Reading
আমার একটি দিন



আমার একটি দিন

 

— একটু চমকে উঠে ঘুম ভেঙ্গে গেলো আমার। সাইড টেবিলের রিষ্ট ওয়াচটিতে পৌনে চার বাজে। এই সময়টিতে আমার জেগে উঠার কথা নয়। তাহলে কি নিরার কিছু হয়েছে? পাশে তাকালাম, নাহ্‌। নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে ও। আমার আড়াই বছরের ছোট্ট মেয়েটি। বাবা মায়ের মাঝখানে শুয়ে কোন স্বপ্ন দেখছে হয়তো। ডিম লাইটের মৃদু আলোয় ওর ঠোটের হাসি দেখলাম। ঠোঁট নাড়াচ্ছে, যেন কিছু খাচ্ছে, বলা হয় বাচ্চাদেরকে ফেরেশতারা মধু খাওয়ায়। তাই ওরা ঘুমের মাঝে ঠোঁট নাড়ে ।  ওর কাঁথা ঠিক করে দিলাম। ওর ছোট্ট হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখ বুজবার আগে তাকালাম ওপাশে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আমার বরটির দিকে। কেমন কোমল লাগছে আনিসকে ।

— চোখ বুজে ভাবলাম। আরেকটু ঘুমাই। এখনও বেশ দেরি আছে। অফিসের জন্য নয়টায় বেরুতে হবে। বুয়া তার আগেই এসে কিছু কাজ গুছিয়ে দিয়ে যায়। আজ অফিসে একটি জরুরি মিটিং আছে। আমার কিছু প্রেজেন্টেশান আছে। সেটা বস তার ফরেন পার্টনারকে শো করবেন। নতুন একটি প্রজেক্টের জন্য ।

— যখন ঘুম ভাঙ্গল ধড়মড় করে উঠে বসলাম। অভ্যাসের চোখ বুঝে নিল দেরি করে ফেলেছি। লাফিয়ে বাথরুমে ছুটলাম।

— ব্যস্ত হাতে কাজ করছি আর ঘড়ির দিকে তাকাছি। কেউ যদি আমাকে দেখত তো আমাকে বলতো কিরে অমন মুখ কালো করে আছিস কেন। আজকেই বুয়ারও  না আসার মানে কি ? বহু আগেই তো এসে যায় ।  ভাবছি। টেবিলে নাস্তা দিতে দেরি হওয়ায় আনিস বিরক্ত হলো। ওর একটা স্বভাব হোল রাগ বা বিরক্ত হলে অনবরত এটা ওটা বলতে থাকে। আমি শুনছি আর কাজ করছি। আটটা বেজে গেছে। নিরা না উঠলেই হয়। ও উঠলে আরও সমস্যা হবে। আমার দোষের তালিকা শুনতে শুনতে আমি নাস্তা বানিয়ে দুপুরের রান্নাটাও শেষ করে ফেললাম। এটাই আনিস দুপুরে  দোকান থেকে এসে খাবে । আমি দুপুরে আসতে  পারিনা । বাসা থেকে আমার অফিস অনেক দূরে ।  আনিসের কথায় কান দেবার সময় বা ইচ্ছা কোনটাই নেই। আমাকে এগারোটার আগে বসকে  প্রেজেন্টেশান  সাবমিট হবে। তারপর উনার পার্টনারকে এটা বুঝাতে হবে যে এ প্রকল্পে তার ইনভেসট  কতোটা লাভজনক। এটা  খুব জরুরি একটা মিটিং।

— আনিস বেরিয়ে গেলো আমি জলদি গোসল সেরে রেডি হতেই নিরা জেগে উঠলো। নিরাকে ফ্রেশ করে  আধা-সিদ্ধ-ডিম  আর পায়েস চামচ দিয়ে ওকে খাওয়াচ্ছিলাম। আর ভাবছিলাম। বিনুর মা যদি না আসে খুবই সমস্যা হবে। আর পনেরো মিনিটের মধ্যে আমাকে বের হতেই হবে।

— প্রতিদিন নিরাকে পায়েশ বিনুর মা খাইয়ে দেয়। আমি রান্নাকরে রেখে বলে যাই। আর দুপুরের জন্য ওর খিচুড়ি আমি সব সাজিয়ে রাখি। বিনুর মা সেটা রান্না করে নিরাকে খাইয়ে দেয়।

— খিচুড়ির সব ভার আমি চাইলে বিনুর মাকে সব দিতে পারতাম। কিন্তু ও সবজি দেখে শুনে কাটে কিনা এই ভয়ে আমি নিজেই সব ঠিক করে যাই। ও শুধু রাঁধে।

— বিনুর মা বুয়াকে বার বার ফোন করছি । সুইচড অফ, কিযে  হবে? আজ নিরাকে পাশের ভাবির কাছে রেখে যেতে হবে। পাশের ভাবিটা খুব হেল্পফুল, এমন প্রয়োজনে পাশে এসে দাঁড়ায়। তা না হলে কি হতো জানিনা । বুয়াকে শেষ বারের মতো চেষ্টা  করে দেখলাম, না, বন্ধ ফোন। ফোনটা ব্যগে ভরে নিলাম। নিরাকে পাশের বাসায় দিয়ে এখুনি রওনা হবো। পেছন ফিরে খাটে নিরাকে দেখেতো  আমার মাথায় হাত। বমি করেছে । সব পায়েশগুলো বমির সাথে বেরিয়ে গেছে। ওর পাশে রাখা আমার ওড়নায়ও লেগেছে। আমি দ্রুত ওর কাছে গিয়ে ওকে ধরে মুখ মুছিয়ে বাথরুমে নিয়ে মুখটা ধুয়ে জামা বদলে দিলাম। ওর গা একটু গরম মনে হচ্ছে। উঁ উঁ  করে কাঁদছে শুধু। কি হল ওর? আমার হাসি খুশি মেয়েটা এমন কান্না করছে কেন? বমি করলো, গা টাও  গরম, মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকলাম কিছুক্ষন। আমার সাথে লেগে রইলো। ও জানে আমি একটু পরেই চলে যাবো। তাই ও আমাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। কষ্টে বুঝিয়ে ওকে ছাড়লাম কোল থেকে। খাট পরিস্কার করে ওড়নাটা ধুলাম, ড্রেসটাও পালটাতে হবে। ড্রেস পালটাতে গিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে গেলাম। ও গড। সাড়ে দশটা বাজে। মেয়ের চিন্তায় মনটা এতই খারাপ আছে যে সময়ের কথা খেয়ালই ছিল না ।

— পাশের শাহানা ভাবির কাছে মেয়েটাকে রেখে এলাম। আমার বাসার সামনে রিকশা পাওয়া খুব কষ্ট।  দুই মিনিটের মতো হাঁটলে তিন রাস্তার মোড়টি। তাড়া হুড়ায় সকাল থেকেই কিছু খাওয়া হয়  নি। মাথা ঘুরাছে। টিফিনটাও নেয়া হল না। খাওয়াটা তেমন সমস্যা নয়। ভাবিকে যে বাসায় পেয়ে নিরাকে রেখে আসতে পেরেছি সেটাই বড় কথা।ভাবির জন্য কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে আছে। উপকারির উপকার করতে হয়। ভাবির জন্য কখনও কিছু করতে পারবো কিনা জানিনা। তবে ভাবির উপকারটুকুর বদলা অন্য কারও জন্য হলেও করে নেব। বিধাতার সৃষ্টির  কেউ না কেউ তো উপকৃত হবে।

— একটা খালি রিকশা সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। ‘এই রিকশ, এই ।‘   আমার কথা শুনে রিকশাটা থামল তো না-ই উল্টো স্পিড বাড়িয়ে চলে গেলো। রিকশা খুজতে খুজতে যতদূর সম্ভব সামনে এগুচ্ছি। জানিনা আজ কপালে কি আছে।

— আজ সকালে আনিসের বকা খেয়েছি। অফিসে গিয়ে বসের, বস সারাটা দিন আমাকে নানা ভাবে ওয়ার্নিং দিলেন। বসের পার্টনার বেরিয়ে যাবার শেষ মুহূর্তে আমি হাজির হতে পেরেছিলাম। মুখ বুজে বসের কথা শুনতে শুনতে প্রেজেন্টেশান সাবমিট করতে হলো।

— বাসায় ফিরছি। মাঝে মাঝে এক একটা দিন কেন যে এমন হয় যেন চেইনের মত। একটার পর একটা সমস্যা। একটার সাথে জুড়ে আরেকটা ঝামেলা চেইনের মত আসতে থাকে, যেন আগে থেকেই কেউ খুব সুক্ষ ভাবে ঝামেলার এই চেইনটা সাজিয়ে রেখেছে। ঝমেলা কম হবে মনে করে যদি উত্তরে যাই  তো দেখি যে দক্ষিনটাই  ভালো ছিল। সমস্যা বাড়বে মনে করে  একটা কাজ যদি বন্ধ রাখি তো দেখি যে সেটা করে ফেলাই ঠিক ছিল। ওই সময়টুকুতে যদি ভাবি যে এটাই ঠিক কাজ তো দেখি সেখানেই ভুল ছিল । সেটার পাশ দিয়েও যাওয়া উচিত ছিল না ।

—সব দিনেই যে ঝামালা থাকে তা নয় । সাধারন ভাবেই কাটে সে  দিনগুলো । আনিসের রোমান্স যেন ছলকে পড়ে দিনভর ।  তবে এমন দিনও  আসে সবই হয় নিজের অনুকুলে। ছুরিতে মাখন কাটার মত কোমল ভাবে দিনটা বয়ে যেতে থাকে। মনের ভেতর বাজতে থাকে সুমধুর কোন সংগীত।

— রিকশায় বসে ভাবছি। দেরি হয়ে গেলেও বসকে বুঝিয়ে ঠাণ্ডা করে আজকের মত বিপদটাকে কাটানো গেলো। নিরার জন্য সারাদিন চিন্তা হচ্ছিল, ভাবি ফোনে বললেন মেয়েটার গায়ে বেশ জ্বর এসেছে। আমার ছোট্ট বাবুটাকে কখন যে দেখবো। ইচ্ছে হচ্ছিল রিকশা থেকে নেমে দৌড়োই। রিকশা আলাও আজ যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চালাচ্ছে। যাবার সময় রিকশার চেইন পড়ে গিয়ে দেরি হওয়াটা বেড়ে গেছিল, আর এখন মনে হচ্ছে মহাশয় তন্দ্রায় আছেন। তাড়া দিলেও ওর কানে যাচ্ছে না। মাথা দুলাতে দুলাতে দুলকি চালে যাচ্ছে। রাগ আর কষ্টের মিশেল আনুভতিতে আমি চোখ কুঁচকে বসে আছি।

— নিরাকে যখন আমি বাসায় নিয়ে এলাম আমাকে দেখে খুব কাঁদল প্রথমে। তারপর কোলের ভেতর চুপটি করে শুয়ে থাকলো । গায়ে বেশ জ্বর।  ভাবি সারাদিন  চেষ্টা করেও ওকে তেমন কিছু খাওয়াতে পারেন নি।

— বাবুটার জন্য খিচুড়ি রান্না করে রাতের খাবারের আয়োজনে লেগে গেলাম, এর মধেই আনিস বাসায় ফিরল । ঢুকেই বলল ,  ‘তুমি পুডিং বানিয়েছো তো ? ওটা ফ্রিজে রাখো । ও পুডিং ঠাণ্ডাই পছন্দ করে , মনে নেই ?’

—আমার মাথায় কিছুই ঢুকছিল না । বললাম ,  ‘কিসের পুডিং ? কে খাবে ?’

— ‘ও মাই গড । তার মানে তুমি ওটা বানাও নি ? জানতাম একটা ঝামেলা তুমি তৈরি করবেই ।‘

— মনে মনে ভাবলাম ইয়া আল্লাহ, অয়নের আজ  আসার কথা । গত সপ্তাহে অস্ট্রিয়া থেকে এসেছে ছুটিতে । আমার হাতের বানানো পুডিং খেতে চাইছিল । আজ রাতে তার আসার কথা । ভেবেছিলাম অফিস থেকে ফিরে বানিয়ে নেব । কেমন করে যে একদম ভুলে গিয়েছি । আনিসকে বললাম , ‘এইতো বাবুকে খাইয়েই বানাতে যাচ্ছি । ভেবনা , সময় লাগবে না ।‘

—আনিসের রাগ একটুও কমল না । ‘ এমন ভুলো মন কেন তোমার ? নাকি এটা আমার ক্ষেত্রেই করো । অয়ন এই এলো বলে ।  তখন পুডিং টা কি জাদুর কাঠি দিয়ে আনবে ?‘ বলতে বলতে ও বেরিয়ে গেলো । আজকে আনিসকেও খুব অধৈর্য মনে হচ্ছে । আজকে ও বাবুকেও একটু কোলে নিল না । অয়ন যেন ওকে গিলে ফেলেছে । ভাবলাম , ‘কেন ? কি হতে পারে এটা  ? অয়নের জন্য এমন উতলা হয়ে থাকাটা ।’

—নিরাকে তাড়াহুড়ো করে সামান্য খিচুড়ি খাইয়ে  খাটে বসিয়ে দিলাম কিছু খেলনা দিয়ে । বাটিটা সাইড টেবিলে রেখে দিলাম পরে  আবার খাওয়াব বলে ।

—ফ্রিজ খুলে এবার ভয়ই পেয়ে গেলাম । দুধ খুব সামান্য আছে এতে পুডিং হবেনা । এখন কি করা ?বাড়ির নিচেই একটা মুদি দোকান আছে ছুটে গেলাম । নেই । ওখানেও নেই । সামান্য দুরেই বড় একটি সুপার সপ আছে । ওখানে যেতে হবে । আরে আনিসই তো আনতে পারে । যদিও একথাটা বলার পর ওর মেজাজ আকাশে উঠবে । তবুও বলতে হবে । আনিসকে ফোন দিতেই আমার পাশেই সোফায় ফোনটা বেজে উঠলো । রাগের কারণে ও ফোনটাই নিতে ভুলে গেছে । আমাকেই যেতে হবে । দেখি নিরা কি করে ।

—শোবার ঘরে ঢুকেই শক খেলাম যেন । নিরা খাট থেকে নেমে  খিচুড়ির বাটিটা টেবিল থেকে নিচে ফেলে দিয়েছে । আর মাটিতে বসে বাটি থেকে খিচুড়ি নিয়ে খাবার চেষ্টা করছে নিজে আর  পাশাপাশি খাওয়াতে চেষ্টা করছে ওর আশেপাশের সব জিনিসকে । মনে মনে ভাবলাম , বাহ এলাহি কাণ্ড আমার মেয়ের । সব জড় বস্তুকে খিচুড়ির দাওয়াত দিয়ে ভালভাবেই সার্ভ করছেন তিনি । ভাবছি,  আজকে সব কাজই যেন খিচুড়ির মত গুলিয়ে  এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ।

—নিরাকে এই রাতে গোসল করাতে হল । গরম পানি হলেও জ্বর বাড়তে পারে । নিরার জন্য টেনশান নিয়ে ঘর পরিস্কার করতে করতেই আনিস তার বন্ধু অয়নকে নিয়ে ঢুকল ।

—রাত প্রায় সাড়ে নয়টার মত হবে । নিরাকে আনিসের কোলে দিয়ে আমি দুধ কিনতে বেরিয়ে এলাম । জানিনা  কোথায় পাবো ।

—রাতে অয়ন এখানেই খাবে , অনেক কাজ ।  দ্রুত হাঁটছি । মেয়েটার জ্বরের অবস্থা কেমন কে জানে । এখন আমার নিরার কাছে থাকার কথা । পাশে থেকে ওর যত্ন নেবার দরকার । আমার ছোট্ট অসুস্থ মেয়েটা সারাটাদিন মায়ের স্পর্শ মায়ের যত্ন পায়নি । কান্না আসছিলো । ছলছল চোখে খুজে বেরাচ্ছি দোকান ।

— অয়ন  খুব ভালো ছেলে । বহুদিনের পারিবারিক বন্ধু । আনিসের ক্লাস ফ্রেন্ড । অয়ন আমাকে খুব ভালো জানে । আমার রান্না খুব পছন্দ করে ।  ওর কথা দৃষ্টি আচরন দেখে মনে হয় একটু বেশিই ভালো জানে । কাল আনিস খুব হাসছে আর বলছে যে , অয়ন নাকি এবার আনিসের মায়ায় পাগল হয়েই দেশে এসেছে । আসলেই কি আনিসের জন্য ? একজন সুপুরুষের যতটা গুন আর প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন তা আনিসের আছে ।  আনিস তো বন্ধু প্রেমে পাগল আর প্রশংসায় উচ্ছসিত । ওকে কি বলবো ? আর কাকেই বা বলা যায় ? এটা শুধু দেখার আর অনুভবের , নিজের ভেতরে গুমরে যাবার । বর্ণনার নয় ।

মাঝে মাঝে সব কিছু খুব বোর লাগে  যখন , মেয়েটার কথা ভাবি । নিরা । আমার মেয়ে । আমার সন্তান । একমাত্র সন্তান । আমার এই তুচ্ছ জীবনটায় নিরবচ্ছিন্ন প্রেরনার বহমান আনন্দময় উৎস । আমার বার বার বেঁচে উঠা ।

© সেলিনা জান্নাত

রচনাকাল

০৪/০৬/২০১৭ইং

About The Author
Salina Zannat
Salina Zannat

You must log in to post a comment