Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৩)



এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৩)

 

দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে………..

ইসাবেলাকে জুস বানিয়ে খাওয়াবো নাকি খাওয়াবো না- এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলাম না; কথার টপিক ঘুরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাবা-মা কে জানিয়েছ যে তুমি অসুস্থ? ও বললো, থাক দরকার নেই। আমি তো আগামীকাল নাগাদ আশা করি সুস্থই হয়ে উঠবো,  তাদের টেনশন দিয়ে লাভ নেই। এই বলে ও ভেতরে চলে গেল।

DSC 3008.jpg

মশিউর ভাই এসে ইসাবেলাকে দেখে গেল আর গাড়িটা নিয়ে গেল। সাথে আমাকে সতর্কবাণী।  তার গাড়ি বা জরিমানা নিয়ে টেনশন না; টেনশন হলো আমাকে নিয়ে। কারণ এতে করে আমার রেসিডেন্স হারানোর ভয় আছে।

পরদিন থেকে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি এক ব্যাগ আম এনে ইসাবেলার সামনেই কিচেনের এক কোণায় ফেলে রাখলাম। কাজ চলে কাজের গতিতে কিন্তু আড্ডা কমে গেছে। আমিও অত আগ্রহ দেখাই না, ইসাবেলাও হঠাৎ চুপচাপ। এভাবেই সপ্তাহখানেক কেটে গেল। পরের সপ্তাহও ওভাবেই কাটছিল, দেখলাম আমগুলো আর এক সপ্তাহ ওভাবে থাকলেই পঁচে যাবে। যাক না! টেবিলের এক পাশে ওগুলো ছিল। লাঞ্চ শেষ করে মাত্র কিচেনে ঢুকেছি আর ইসাবেলা হিংস্র বাঘিনীর মতো করে এসে আমার হাতটা ধরে দ্রুত পায়ে দোতলার স্টোর রুমে নিয়ে গেল। গিয়েই অঝোরে কান্না। আমি জানতাম, থমথমে আবহাওয়ার পরে এমন ঝড়-বৃষ্টিই আসবে। আমাকে তার প্রশ্ন, “কি করেছি আমি? কি দোষ আমার? সেদিন হসপিটালে আমাকে কোনো উত্তর না দিয়েই চলে গেলে, আম নিয়ে এসে এক কোণায় ফেলে রাখলে। কথা বলো না ঠিক করে। কি করেছি আমি বলো?”

তারপর আবার কান্না। জানি মেয়েদের চোখের কোণায় কান্না রেডিই থাকে। তারা অনেক কাঁদতে পারে, আর এই অভিমানের কান্নার সৌন্দর্য সেই বুঝতে পারে যে সেই মেয়েকে ভালবাসে। আমি আসলেই অবাক, কারণ ইউরোপিয়ান মেয়েদের আবেগ খুব সামান্যই কাজ করে, এরা অঝোরে সহজে কাঁদতে পারেনা। এদের কাছে কোনো একজনের প্রতি ভালোবাসা আর আবেগ সাময়িক।

কিন্তু এই ব্রিটিশ কন্যা আমার সকল ধারণাকে পালটে দিতে শুরু করলো। আসলে কাছ থেকে কারো সাথে না মিশলে অনুধাবন করাটা বেশ কঠিনই।

সত্যি কথা বলতে আমি অমনটা করেছিলামই আমার প্রতি তার আবেগ কিংবা অনুভূতি বোঝার জন্য। ও চুপ করে তখন দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম বুকের ভেতরে। ও ওভাবেই রইলো। বুঝলাম,  অভিমান ভাঙেনি। কপালে ছোট করে একটা চুমু দিয়ে আমি ওকে ছাড়তে যাবো, ঠিক তখনই ও আমার হাতটা টেনে ধরলো। বেশ কিছুক্ষণ দুজন দুজনার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিলো, বছরের পর বছর যদি ওভাবে নীল নয়নার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারতাম? এমন ভাবতে ভাবতেই নিচ থেকে কলিগের ডাকে ঘোর ভাঙলো। ওরা বুঝতে পারছিলো,  আমাদের ভেতরে এক ঠান্ডা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

আমি নিচে এলেও ইসাবেলা উপরেই রয়ে গেল। পরে ও নিচে নেমে এলো, কোনো কথা হলোনা আর। বাসায় আসার সময় আমগুলো নিয়ে এলাম; আমার মনের অবস্থা তখন খুব খারাপ। শেয়ার করারও কেউ নেউ। মশিউর ভাইকেও বলতে পারছিনা লজ্জায়। ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছি, ভালোবাসার আগুন কি ভয়ানক টের পাচ্ছিলাম তখন।

ইসাবেলাকে একটা কল দিলাম, ফোন ধরলো না। কিছু সময় পর ও নিজেই নক করলো, বললো গোসলে ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, এখন কিসের গোসল? ও জবাব দিল, “আমার যখন মন খারাপ থাকত তখন আমি বিয়ার খেতাম, কিন্তু কাউকে প্রতিজ্ঞা করার পর আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে শাওয়ার এর নিচে গিয়ে নিজেকে শান্ত করছি।”

ভালো করছো বলে ফোনটা রেখে দিলাম। তারপর রান্না ঘরে গিয়ে মশিউর ভাই এর জন্য কিছু আম রেখে সব আম বের করে কেটে ব্লেন্ডার এর ভেতর দিলাম।

আধা ঘন্টার ভেতর পুরো তিন জগ জুস বানিয়ে ৬ লিটারের বড় বোতলে ভরে রওনা দিলাম ইসাবেলার বাসার উদ্দেশ্যে। ওকে না বলেই। ওর বাসার সামনে গিয়ে কল দিলাম, জিজ্ঞেস করলাম, বাসায় আছে কিনা! বললো, হ্যাঁ, ডিনার রেডি করছি, কেন? কিছু বলবে?

আমি ঐ মানসিক কষ্টের সময়টাতেও কিভাবে যেন রসিকতা করে বললাম, তোমার জন্য একটা “ওয়ার্কার-রোবট”  পাঠিয়েছি। দরজা খোলো, বাইরে সে দাঁড়িয়ে আছে।

দরজা খুলে আমাকে দেখে সে একটুও বিস্মিত হয়না। বুঝেছিল হয়তো যে আমিই হবো কারণ ওয়ার্কার রোবট খুব দামী আর সেটা কেনার সামর্থ সবার নেই। জুসের বোতলটাও কালো কাপড়ের ব্যাগে ঢুকিয়ে এনেছিলাম। আমাকে ভেতরে ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এদিকে কি কাজে এসেছিলে? বললাম, আমস্টারডাম থেকে এক বন্ধু কিছু জিনিস এনেছিল আমার জন্য; সেগুলো বাস স্টপেজ থেকে আনতে আরকি! জিজ্ঞেস করলো, ডিনার করেছো? না বোধক উত্তর পেয়ে আমার অনুমতি না নিয়েই আমার জন্যও ডিনার রেডি করছিল। দুজন নীরবে ডিনার করলাম। একটা দুইটা কথা হয়েছিল মাত্র। আমি খাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম, খুব বেশী  আবেগী মেয়েদের অভিমানটাও খুব বেশী হয় আসলে। ইসাবেলার ক্ষেত্রে সেটাই প্রযোজ্য। বড় বেশী অভিমানী।

চিন্তায় চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম, আমের জুস দিয়েও অবশেষে তার রাগ ভাঙবে কিনা।

খাওয়া শেষে ও কিচেনে ঢুকলে আমি সাথে সাথে ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে টেবিলে রাখি আর রান্না ঘরে গিয়ে পেছন থেকে ওর দুই চোখ হাত দিয়ে চেপে ধরি। ও একটু ভয় পায়, জিজ্ঞেস করে, কি করছো তুমি? বললাম, আমাকে ভয়ের কিচ্ছু নেই। আমার সাথে চলো, এই বলে ওর চোখ বেঁধে ওকে টেবিলের কাছে এনে ওর চোখ খুলে দিলাম। আমের জুস দেখেই মুখে হাসি তার। ভাবলাম বেঁচে গেলাম এইবারের মতো। কিন্তু না। এক ঝলক হাসি দিয়েই সে থম করে থমথমে মুখ নিয়ে গাল ফুলিয়ে আবারো চেয়ারে বসে পড়লো।

বুঝলাম কি করতে হবে।

তার পাশে চেয়ার নিয়ে বসে এক গ্লাস জুস নিয়ে নিজ হাতে খাইয়ে দিলাম, বললো, আরো দাও; তিন গ্লাস জুস শেষ করে হঠাৎ আমার বুকের উপর মাথা এলিয়ে দিল। এমন আচরণে আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।

ইসাবেলা আমার বুকে মাথা রেখে খুব আবেগী কন্ঠে বললো, “ফেরদৌস, আমি খুব একা, আমাকে ছেড়ে যেওনা প্লিজ।”

আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কি জবাব দেবো ভাবছিলাম।  এমন মুহূর্তে আসলে কি জবাব দেয়া উচিত?

 

চলবে………..

About The Author
Ferdous Sagar zFs
Ferdous Sagar zFs
Hi, I am Ferdous Sagar zFs. I am a Proud Bangladeshi living in abroad for study purpose. I love to write and it's my passion or hobby. Thanks.

You must log in to post a comment