Now Reading
সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি কতখানি সৃজনশীল করেছে আমাদের ?



সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি কতখানি সৃজনশীল করেছে আমাদের ?

নকল করে পাশ করার যে একটা খারাপ প্রথার প্রচলন ছিল তার গন্ডি থেকে বেরিয়ে এলেও বর্তমান সময়ে ভিন্ন সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা।বর্তমান সময়ে এই সমস্যা তেমন দৃশ্যত কোন প্রভাব তৈরি না করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অনেকাংশে নেতিবাচক প্রভাবই তৈরি করবে। দেশের প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির আলোকে যেকোন শিক্ষার্থীর একটা ভাল ভিত্তি তৈরি হয় মূলত মাধ্যমিকে পড়াকালীন সময়ে। মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে যখন কোন শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষার দ্বারে প্রবেশ করে তখন তার জ্ঞানার্জনের পরিধি যে অনুযায়ী বিস্তৃত হওয়া দরকার,আমাদের দেশে সে অনুপাতে হচ্ছে বলে মনে হয় না।

প্রায়শই দেশের জাতীয় দৈনিকসহ সংবাদ মাধ্যম গুলোতে ব্যাপক সমালোচনা হয় প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে। এই আলোচনা আর সমালোচনার বিশাল একটা অংশ জুড়ে ছিল বর্তমানে শিক্ষার্থীদের উপর আরোপিত শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে।

প্রতিবেদনসূত্রে দেখা যায় পরীক্ষার প্রশ্নে শিক্ষার্থীকে যখন প্রশ্ন করা হয় কুনোব্যাঙ বা ‍উভচর প্রাণীর  বৈশিষ্ট্য নিয়ে লিখতে।এ বিষয়টা অনুতাপের বটে শিক্ষার্থী উত্তরপত্রে যা লিখেছে তাতে প্রশ্ন অনুযায়ী উত্তর না হলেও যা লিখা হয়েছে তা যেন প্রশাসনকে নড়েচড়ে বসার যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছে।

দেশের প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতিকে সংস্কার করার প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষা ব্যবস্থার যে প্রচলন করে তাও প্রায় অর্ধযুগ পেরিয়েছে। এখনো কি আমরা এই পদ্ধতির সুফল পেয়েছি ? এমন প্রশ্নের জবাবে অনেকে দ্বিমত পোষণ করবে;এটাই স্বাভাবিক বরং আমাদের আরো কৌশলী হয়ে চিন্তা করা উচিত যে কিভাবে এই জিনিসটাকে সার্বিকভাবে ফলপ্রসু করা যায়। একটা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে কয়েকটা ব্যাচ যাচ্ছে তাদের সামনে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু নিয়ে আসা হয় যা রপ্ত করতে না করতে আরো একটা নতুন ধারণা সংযোজন যার ফলে মোটের উপর একটা স্থিতি অবস্থা না হয়ে বরং তটস্থ হয়ে আছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকেরা। এই বিষয়গুলো খুবই গৌণ হলেও কর্তৃপক্ষের সুষ্টু নজরদারির মাধ্যমে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা উচিত। যা কিনা এখন সময়ের দাবী। যখন কোন নতুন একটা পদ্ধতির অবতারণা করা হয় দেখা যায় বির্তকের পাশাপাশি সেটা নিয়ে শিক্ষার্থী মহলে ব্যাপক আলোড়ন এবং উৎকন্ঠা বিরাজ করে। শিক্ষাপদ্ধতির সংস্কার কিংবা বহাল রাখার জন্য কেন শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন বা প্রতিবাদের ভাষা বাছাই করে নিতে হয় ? এই পদ্ধতি কি তাদের জন্য হিতকর নয়? এই শিক্ষা ব্যবস্থা কাদের জন্য কারা এর সুফল ভোগ করবে ?

এই ধরনের পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করার আগে যাচাই বাছাই করা প্রয়োজন। এই নীতিটা গ্রহণ করার জন্য আসলে তৃণমূলসহ সর্বস্তরে শিক্ষার্থীরা তৈরি কিনা হোক সেটা মানসিক বা অবকাঠামোগত দুটোই।

সৃজনশীল পদ্ধতিগৃহীত পদক্ষেপ হিসেবে কতখানি উপযুক্ত ?

শিক্ষার্থীদের নোট কিংবা গাইড বইয়ের উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে এই পদ্ধতির প্রচলন। এমন একটা  প্রচেষ্টা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার, উন্নত বিশ্বে যেখানে লেখাপড়ার বিষয়টাকে ফলিত পদ্ধতি বলে বিবেচনা করা হয়,সেখানে এই ধরনের বিষয় সংযোজন অবশ্য নতুন মাত্রা যোগ করবে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই পদ্ধতি যুগোপযোগী যেখানে বিশ্বে প্রতিনিয়ত একটা ক্রমপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচ্ছে সেখানটায় তাল মিলিয়ে চলতে এমন কিছুই মূলত দরকারী বটে।

সৃজনশীল  শিক্ষা পদ্ধতি   তৃণমূলে কতটা প্রভাব সৃষ্টি করেছে?

শিক্ষার প্রসার বা প্রচলন কেবল নগরকেন্দ্রিক নয়। আমরা যদি কেবল নগর বা জেলা পর্যায়ের স্কুল ও কলেজগুলোকে আর্দশের মানদন্ড বলে ধরে নিই, তবে তা মূলত বিস্তর পার্থক্য দেখাবে সমীক্ষা আর বাস্তবতায়। আমাদের দেশে প্রতিটা উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামোগত অবস্থার উন্নয়ন তেমনভাবে না হওয়ায় এই সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভাব তেমনভাবে চোখে পড়ে না । দেশের পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে এইসব আধুনিক ব্যবস্থা বা পন্থা যাওয়ার গতি খুবই শ্লথ যার কারণে উন্নয়নের কথা বলা হলেও তা দৃশ্যমান নয়। চট্টগ্রাম বিভাগের কথাই যদি বিবেচনা করি প্রতি বছর এস.এস.সি কিংবা এইচ.এস.সি পরীক্ষায় পার্বত্য অঞ্চলগুলোর ফলাফলের কারণে মোটের উপর চট্টগ্রাম বোর্ড বরাবর সমীক্ষায় পিছিয়ে থাকে। এই সমস্যার আশু কোন সমাধান থাকে না।

আমরা খবর পড়ে বা দেখে অবাক হই কেননা এখনো এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে কেউই উর্ত্তীণ হতে পারে না। এই বিষয়টা পরিস্কার ধারণা দেয় সৃজনশীলতার প্রভাব অবশ্যই সবখানে সমানভাবে পড়ে নি।

শিক্ষকদের কতখানি অংশীদারীত্ব বা দায়বদ্ধতা রয়েছে ? এই প্রশ্নটা এখন কোটি টাকার ?

সৃজনশীল বা যেকোন শিক্ষাব্যবস্থায় সবার অংশগ্রহণ জরুরী হোক সেটা শিক্ষার্থী বা শিক্ষকমন্ডলী। শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীলতার মতো পদ্ধতি নিয়ে আসার পূর্বে জরুরী ছিল কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে আসা। এই যেমন উপযুক্ত বা দক্ষ শিক্ষক প্যানেল তৈরি করা । তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা । এই বিষয়টা করে আসছে তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলা যায়। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের উদাসীনতা বরং লক্ষণীয়,নয়তো এতদিনে এই ব্যবস্থার সার্বিক একটা প্রভাব কেন সৃষ্টি হবে না ? এমন অনেক শিক্ষক আছে যারা কিনা কেবল নির্দিষ্ট কিছু সুযোগ সুবিধার লোভে কেবল প্রশিক্ষণ গুলোতে অংশগ্রহণ করে তাদের উদ্দেশ্য বা এখতিয়ার অতটুকুই। প্রশিক্ষণে কি শিখল তার কোন ফলপ্রসু প্রয়োগ করতে দেখা যায় না।

এখনো গ্রামাঞ্চলে দেখা যায় ক্লাসগুলোতে যথেষ্ট শিক্ষক সংকট তাছাড়া শিক্ষকেরা কোচিং নির্ভর হয়ে ক্লাসে তেমন কোন পাঠদান করানোর চিন্তাই করে না। এখনো গাইড, শীট বা কথিত সাপ্লিমেন্ট না হলে যেন শিক্ষার্থীদের পোষায় না। পরীক্ষায় নির্ধারিত কিছু পূর্ব বছরের প্রশ্নের আলোকে প্রশ্নপত্র প্রণয়ণ যেন শিক্ষার্থীদের কূপমন্ডুক করে রেখেছে। এবারের এইচ.এস.সি পরীক্ষায় বিশেষভাবে চট্টগ্রাম বোর্ডের ইংরেজী ২য় পত্রের পরীক্ষায় গ্রামার পার্টে কনটেন্টগুলো সমসাময়িক বিষয়ের আলোকে দেওয়াতে অনেক শিক্ষার্থী প্রশ্ন ভালভাবে বুঝে উঠতে পারে নি। ঐ যে তাদের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তেমন চর্চা নেই বললে চলে। ধরা যাক আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতির নাম তথা ব্যবহারিক নাম কি ?

আবদুল হামিদ এডভোকেট নাকি এডভোকেট আবদুল হামিদ এমন প্রশ্নের জবাবে অনেকে ভুল করবে।এইসব বিষয় নিয়ে আমাদের চর্চা থাকে না।আমরা সাহিত্য বিচারে রবীন্দ্রনাথ নজরুল নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয় আসলে কোনটা উপযুক্ত তা নিয়ে চিন্তা করি। এটাতো সৃজনশীলতার গন্ডিতে পড়ে না।

একজন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হয়ে তাকে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি পদার্থ,রসায়ন বা জীববিজ্ঞানের বইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি সমসাময়িক আবিস্কার বা গবেষণা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা চাই। এই যেমন ব্ল্যাকহোল কি বা স্টিফেন হকিং কে এসব বিষয়ে জ্ঞান থাকা চাই। তেমনি ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষার্থীর জানা উচিত স্টক মার্কেট কি ? শেয়ার বাজার আর নিত্যনৈমিত্তিক বাজারের পার্থক্যটা কোথায় ? মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী যদি অর্থনীতি পড়তে গিয়ে অভাবের প্রায়োগিক সংজ্ঞা বা অর্থ দাঁড় করাতে না পারে,ভূগোল পড়তে গিয়ে দ্রাঘিমা বা অক্ষাংশ কি তার কোন সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দিতে পারে না তখন বুঝে নিতে হয় সৃজনশীলতা এখনো আমাদের আঁকড়ে ধরতে পারে নি।

লেখাপড়ায় কতখানি সৃজনশীলতার প্রভাব বিদ্যমান ?

এমন প্রশ্নের জবাবে কেবল বলা যায় গ্রাম আর শহরকে আলাদা করলে গ্রাম অনেকখানি পিছিয়ে। এই পিছিয়ে পড়াটা আমাদেরকে একটা সময় ভোগান্তির মধ্যে ফেলবে এটা নিশ্চিত। তথ্য প্রযুক্তি বা আইটি শিক্ষার লক্ষ্যে যে প্রচলন তা এখনো খাতা কলমে রয়ে গেছে কেননা এই বিষয়ে যে ব্যবহারিক পরীক্ষা নেয়া হয় তা মূলত হাস্যকর বলা চলে। আইটি বা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষার সময় মৌখিক প্রশ্ন করে ছেড়ে দেয়া হয় তা অবশ্যই ভাবনার বিষয়। আমরা কি শিখছি ইনপুট কি নিচ্ছি বা আউটপুট কি দিবো  তা সময়ের কাছে তোলা রইল।

এত বাধা বিপত্তি থাকা স্বত্তেও যেসব শিক্ষার্থী উঠে আসছে তার পেছনে কিছু শিক্ষক আর প্রাইভেট টিউটরের অবদান বলা যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই পদ্ধতির আলোকে উপযুক্ত বা দক্ষ শিক্ষকের অনুপাতিক হার নগণ্য। শহর বা মফস্বলগুলোতে কলেজ পড়ুয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশন পেশায় মূলত একটা ভারসাম্য রেখেছে। এই সময়ে টিউশনটা যেন একটা আশীর্বাদপুষ্ট পেশা।

শিক্ষাব্যবস্থার এমন দুর্দশার জন্য সর্বোচ্চ স্তরের উদাসীনতা যেমন দায়ী তেমনি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে নিযুক্ত শিক্ষকের প্রায়ই ৬০ শতাংশ আছে যারা সৃজনশীল পদ্ধতি বা সে অনুযায়ী বিষয়াদি নিয়ে ওয়াকিবহাল নয়। আইটি কিংবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তৃণমূলে শিক্ষকের রয়েছে যথেষ্ট জড়তা। সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিকে সুচারুরুপে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে দরকার গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ।বর্তমানে শিক্ষাপেশায় নিয়োজিত অধিকাংশ শিক্ষকই নতুন পদ্ধতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারায় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়ছে।আমাদের উচিত যুগোপযোগি শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে আধুনিক তরুণ-তরুণীদের শিক্ষকতা পেশায় উৎসাহী করা।সর্বোপরি একটা ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষক প্যানেল গড়ে তোলা যা দ্বারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছে আমরা পৌঁছে দিতে পারব এই সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ উপযোগিতা।ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে আর এই পরিবর্তনের নেতৃত্বদান করবে বর্তমানের নবপ্রজন্ম এমনই প্রত্যাশা রইল।সৃজনশীলতার বিকাশে আলোকিত হোক জ্ঞানের প্রতিটা ধাপ,এই আলোর বিচ্ছুরণ হোক সমাজের প্রতিটি স্তরে।

 

About The Author
Rajib Rudra
Rajib Rudra
2 Comments
Leave a response
  • Shahed Hasan
    June 21, 2017 at 9:57 pm

    আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূলেই দুর্বলতা। সৃজনশীল পদ্ধতির উদ্যেগটা খুবই ভালো কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এর প্রয়োগ সঠিকভাবে ঘটছে না। বইগুলোকে সৃজনশীল এর আলোকে করা হচ্ছে না। আমি পরীক্ষা দিতে গিয়ে অনেকসময় লক্ষ্য করেছি প্রশ্নগুলোও মানসম্মত না। আশা করি, আমাদের শিক্ষকগণকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

You must log in to post a comment