Now Reading
লজিক্যাল ফ্যালাসি এবং অন্যান্য (পর্ব -১)



লজিক্যাল ফ্যালাসি এবং অন্যান্য (পর্ব -১)

আমরা হয়ত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বেশ কিছু স্টেরিওটাইপ ঘটনা দেখে অভ্যস্থ | এই যেমন- “মায়ের কথা শুনে বাইরে গিয়েছ এই জন্যই তো পা টা ভাঙ্গলো !” কিংবা, “তোমার মত গাধা ছাত্র যা বলবে তাই ভুল !”, “আমি এই বিষয়ে নিয়ে একাডেমিক পড়াশুনা করেছি কাজেই, আমার কথা সত্য !” কিংবা হয়তবা আরো ভয়ংকর যেখানে, একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে নেচে-কুঁদে বিচিত্র ভঙ্গিতে গালিগালাজ, অপমান করে শেষমেষ দাবি করছে অপরপক্ষের বক্তব্য পুরোপুরি ভুল ! আসলে সত্যি কথা হলো এসবগুলোই একেকটা লজিক্যাল ফ্যালাসি !

আজকের, পর্বে আমরা তাই এরকম কিছু লজিক্যাল ফ্যালাসি নিয়ে আলোচনা করব এবং আমরা যে প্রায় প্রতিদিনের কথাবার্তায় এইসব ফ্যালাসি ব্যবহার করে থাকি সেইসব বিষয়েও জানব এবং এসব থেকে নিজেরা যথাসম্ভব দুরে থাকার চেষ্টা করব |

 

লজিক্যাল ফ্যালাসি কি ?

শুধু ফ্যালাসি হলো একধরনের ভুল-ক্রুটি | যেমন- ফ্যাকচুয়াল ভুল থাকা একধরনের ফ্যালাসি কিন্তু, এইটা কোনো লজিক্যাল ফ্যালাসি নয় | অপরপক্ষে লজিক্যাল ফ্যালাসি হলো যুক্তিতে কোনো ভুল থাকা | লজিক্যাল ফ্যালাসি সাধারণত ৪ ধরনের হয় | যেমন- “Formal fallacy”, ”Informal fallacy”, “Condition fallacy” এবং “Fallacious argument style”| এর মধ্যে আবার আরোও অনেক ক্লাসিফিক্যাশন আছে |

তবে, এইখানে ঐসব শ্রেণীবিভাগ নিয়ে যাবনা | সরাসরি এর অধীনস্থ লজিক্যাল ফ্যালাসি নিয়েই আলোচনা করব |

 

Ad Hominem

এইটা সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত একটা লজিক্যাল ফ্যালাসি | যেখানে, একজন ব্যক্তি কোনো ক্লেইম উপস্থাপন করে এবং অপরপক্ষ সেই তথ্যকে ভ্রুক্ষেপ না করে বরং সরাসরি সেই ব্যক্তিকে আক্রমন করে বসে এবং ফলাফল হিসেবে প্রথম ব্যক্তির ক্লেইমকে ভুল হিসেবে দাবি করে !

এইটা মূলত ২ টা স্টেপে ঘটে | যেমন- প্রথম স্টেপে ২য় (যিনি আক্রমন করে থাকেন !) ব্যক্তি ১ম ব্যক্তিকে (যিনি ক্লেইম করেন) ব্যক্তিগত আক্রমন করে বসে | এরপরে তিনি সেই আক্রমনটাকে ১ম ব্যক্তির করা সেই ক্লেইম কে ভুল প্রমান করার মাধ্যম হিসেবে দাবি করেন !

 

এর গাণিতিক ফর্ম অনেকটা এরকম :-

  •     ১ম ব্যক্তি একটা ক্লেইম X করেন |
  •     ২য় ব্যক্তি ১ম ব্যক্তিকে আক্রমন করে বসেন |
  •     অতএব, ১ম ব্যক্তির X ক্লেইমটা মিথ্যা/ভুল |

 

উদাহরণ দেয়া যেতে পারে :-

দৃশ্যপট ১ :-

১ম ব্যক্তি: আমার মনে হয় পৃথিবীটা গোলাকার !

২য় ব্যক্তি: মাথা গোলাকার হলে এরকম অনেক কিছুই মনে হতে পারে !

অতএব, ১ম ব্যক্তির ক্লেইম ভুল ! এখানে, ২য় ব্যক্তি ১ম ব্যক্তির স্টেটমেন্ট নিয়ে বিন্দুমাত্র কথা না বলে সরাসরি তাকে ব্যক্তিগত আক্রমন করে তার করা ক্লেইমকে ভুল দাবি করে বসলো |

 

দৃশ্যপট ২ :-

    ১ম ব্যক্তি: আমার মনে হয় পৃথিবী ফ্ল্যাট কারণ তা না হলে, আমরা পৃথিবী থেকে ছিটকে পরে যেতাম !

২য় ব্যক্তি: তবে, তোমার মাথা গোলাকার | কাজেই, তুমি তা মনে করতেই পারো !

অতএব, ১ম ব্যক্তির ক্লেইম ভুল | এখানে, এই অংশটুকু একটু ট্রিকি কারণ, ১ম ব্যক্তির স্টেটমেন্ট যদিও হয়ত সত্য না কিন্তু, তিনি একটা যুক্তি দিয়েছেন | কিন্তু, ২য় ব্যক্তি তা ভ্রুক্ষেপ না করে সরাসরি তাকে আক্রমন করে বসলো | কাজেই, এইটা নিসন্দেহে একটা Ad Hominem !

 

এর বাস্তব উদাহরণ বলতে, বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের সাথে ছাত্রের অবস্থার তুলনার করা যেতে পারে | যেখানে, ছাত্র কোনো বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে কোনো গাণিতিক সমাধান করলে দেখা যায় তাকে কেবল বকা-ঝকার মাধ্যমেই তা ভুল প্রমান করছে !

এছাড়াও বাবা মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কের বিষয়ে বলা যেতে পারে | যেখানে, সন্তানের কোনো যৌক্তিক দাবিও বাবা মায়েরা পাত্তা না দিয়ে বরং তাকে নিয়ে কটুক্তির মাধ্যমেই বিতর্কের অবসান ঘটাচ্ছে |

 

Ad Hominem Tu Quoque

এইটা আসলে, Ad Hominem এর একটা ক্লাসিফিক্যাশন এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আরেকটি জনপ্রিয় লজিক্যাল ফ্যালাসি | এইক্ষেত্রে মূলত, ব্যক্তির ক্লেইমকে গুরুত্ব না দিয়ে তার পূর্বের কোনো কাজ কিংবা বক্তব্যের সাথে বর্তমান ক্লেইমের অসঙ্গতি তুলে ধরে তার বর্তমান ক্লেইমকে ভুল হিসেবে দাবি করে থাকে |

এইক্ষেত্রে, মূলত ২টা বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয় | যেমন- ১. ব্যক্তি যেই ক্লেইম করছে তা তার পূর্ববর্তী কোনো বক্তব্যের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ | কিংবা, ২. ব্যক্তি যেই ক্লেইম করছে তার পূর্ববর্তী কোনো অ্যাকশন এর সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ |

 

এর গাণিতিক ফর্ম অনেকটা এরকম :-

  •     ১ম ব্যক্তি একটা ক্লেইম X করলো |
  •     ২য় ব্যক্তি দাবি করলো ১ম ব্যক্তির বর্তমান ক্লেইম তার পূর্ববর্তী কোনো কাজ কিংবা বক্তব্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় |
  •     অতএব, ১ম ব্যক্তির X ক্লেইমটা ভুল !

 

উদাহরণ দেয়া যেতে পারে :-

দৃশ্যপট ১ :-

         ১ম ব্যক্তি : ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর |

২য় ব্যক্তি : তুমি এইটা কিভাবে দাবি কর যেখানে, তুমি নিজেই ধুমপান কর |

অতএব, ১ম ব্যক্তির ক্লেইমটা ভুল ! এখানে, ২য় ব্যক্তি, ১ম ব্যক্তি ধুমপান করে এই দাবি করে ১ম ব্যক্তির করা স্টেটমেন্টকে ভুল হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে |

 

দৃশ্যপট ২ :-

১ম ব্যক্তি : ধর্ষণের জন্য ধর্ষকের অসুস্থ মানসিকতাই দায়ী |

২য় ব্যক্তি : কিন্তু, তুমি এইটা কিভাবে বল যেখানে তুমি আগে তাদের পোশাককে দায়ী করতে !

অতএব, ১ম ব্যক্তির ক্লেইমটা ভুল এবং সে একজন হিপোক্রিট ! এখানে, ১ম ব্যক্তি পূর্বে এক মতাদর্শে বিশ্বাস করত কিন্তু, পরবর্তিতে তা পরিবর্তন হয় | কিন্তু, ২য় ব্যক্তি কেবল তার পূর্বের বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে তাকে হিপোক্রিট দাবি করছে এবং একইসাথে তার বর্তমানে করা ক্লেইমটাও ভুল বলছে ! যেইটা নিসন্দেহে একটা লজিক্যাল ফ্যালাসি |

এর বাস্তব উদাহরণ বলতে, “সে নিজেই তো একজন সমকামী কাজেই, সমকামিতাকে তো সে জেনেটিক ভ্যারিয়েশন হিসেবে দাবি করবেই !”

 

এসব, ছাড়াও আরো অনেক উদাহরণ আমাদের বাস্তব জীবনেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে | আমরা চাইলেই হয়ত খুঁজে বের করতে পারি |

 

যাইহোক, আজকে এই পর্যন্তই আশা করি সবার ভালো লেগেছে | সবাইকে ধন্যবাদ |

 


 

References:

  1. http://rationalwiki.org/wiki/Ad_hominem
  2. http://www.nizkor.org/features/fallacies/ad-hominem.html
  3. http://www.nizkor.org/features/fallacies/ad-hominem-tu-quoque.html
About The Author
Jannatul Firdous
Studying in Computer Science & Engineering (CSE)
5 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment