Now Reading
“ বাংলাদেশের ” বিদায়ে রঙ হারালো চ্যাম্পিয়নস ট্রফি!!



“ বাংলাদেশের ” বিদায়ে রঙ হারালো চ্যাম্পিয়নস ট্রফি!!

লাল সবুজের পতাকা ইংল্যান্ডের আকাশে আর মাঠে বাংলার ছেলেরা বীরদর্পে লড়েছে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। ১লা জুনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যে চ্যাম্পিয়ন ট্রফির যাত্রা তা শেষ হয় ভারতের সাথে সেমিফাইনাল ম্যাচে হেরে  কাঙ্খিত ফাইনালের স্বপ্নভঙ্গ দিয়ে।

এবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বা খেলা দুটোই ছিল সমালোচকদের জন্য বিশেষ কিছু।কেননা ক্রিকেটে বাঘা বাঘা সব দলের ভীড়ে কয়জনই ভেবেছিল বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মতো আসরে সেমিফাইনাল খেলবে।বাংলাদেশ সেমিফাইনালে উঠার পর থেকে দেশ বিদেশের ক্রিকেট বোদ্ধারা প্রশংসাই করে গেলেন।এদের মধ্যে খোদ ছিলেন  ভারতের রবি শাস্ত্রী ও পাকিস্তানের রমিজ রাজা।গত সপ্তাহের  “টক অব দ্যা উইক” বলেন অর “টক অব দ্যা ডে বা টপিক” যাই বলেন না কেন সবখানে ছিল বাংলাদেশের সেমিফাইনাল যাত্রা।

দেশের হয়ে ক্রিকেটারদের এমন পারফরম্যান্সে দর্শক সমর্থকদের মনে প্রত্যাশার পারদ যেন কয়েকগুণ উঁচু হয়ে গিয়েছিল।এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক প্রথমবারের মতো কোন মর্যাদার আসরে ফাইনাল খেলার অমিত সম্ভাবনার হাতছানি যে দিচ্ছিল বাংলাদেশকে সাথে ছিল র‌্যাংকিংয়ে উন্নতি। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ভালো খেলার সুবাদে বাছাই পর্বের ম্যাচ না খেলে সরাসারি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ সব মিলিয়ে একটা বর্ণিল সপ্তাহ কাটিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে যখন সেমিফাইনালে উঠে তখন একটা নতুন সম্ভাবনা সামনে চলে এসেছিল কেননা সেমিফাইনালিস্ট চার দলের দুটিই কোন সময় চ্যাম্পিয়নস ট্রফির কাপ জিততে পারে নি।তাই নতুন একটা দল যারা কিনা শিরোপা উঁচিয়ে ধরবে এমন সুযোগ তৈরি হয়েছিল।সবচেয়ে বড় কথা সেমিফাইনালে ছিল পুরোটাই এশিয়ার আধিপত্য কেননা স্বাগতিক ইংল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশ,ভারত ও পাকিস্তান জায়গা করে নিয়েছিল। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অসাধারণ কামব্যাক হিসেবে ধরলেও আনপ্রেডিক্টবল পাকিস্তান তাদের তকমাটা আরো জোরদার করল।নিজেদের জেতা ম্যাচ হেরে যাওয়া আর অপ্রত্যাশিত ম্যাচে জয়ে দর্শককে অবাক করা যেন তাদের অভ্যাস।স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে দর্শক বানিয়ে পাকিস্তান ফাইনালে তাদের সামনে আবারো শিরোপা জয়ের সুযোগ তা ও আবার ৯২ বিশ্বকাপের পর কোন ওয়ানডে টুর্নামেন্টে।

বাংলাদেশ আর পাকিস্তান যদি ফাইনাল হতো তবে নিশ্চিত আমরা একদল নতুন চ্যাম্পিয়ন পেতাম যেটা কিনা বাংলাদেশও হতে পারতো।বাংলাদেশী সমর্থকরা ভবিষৎের জন্য আবারো আশায় বুক বেঁধে আছে। বাংলাদেশের এই অগ্রগতিকে ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখতে পারে, তবে সেই দিন বেশি দূরে নয় যেদিন আমরা বিশ্বমঞ্চে উঁচিয়ে ধরব শিরোপা।ইতিমধ্যে ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশ নতুন পরাশক্তি হিসেবে জানান দিয়েছে যার কারণে ভারত-পাকিস্তানের মতো উত্তেজনা পূর্ণ দ্বৈরথ যে ম্লান হতে চলছে এমনটাই ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতামত।

সেমিফাইনাল ম্যাচ ছিল বাংলাদেশের জন্য রোমাঞ্চকার ম্যাচ কেননা কোন আসরের সেমিফাইনাল ম্যাচ যেখানটায় জিতলে থাকে ফাইনাল খেলার সুযোগ আর ফাইনাল মানে শিরোপা নয়তো রানার্স আপ। এই চাপ নিয়ে খেলতে নেমে আমরা হয়তো চাপকে উপেক্ষা করতে পারি নি।পাকিস্তান উল্টাপাল্টা ক্রিকেট খেললেও ইংল্যান্ডের সাথে তাদের ম্যাচ ছিল বেশ গুছানো যেখানটায় প্রতি পদে ছিল সাবধানতা।

এবার আসি বাংলাদেশ ভারত দ্বৈরথ উত্তেজনা ।২০০৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশ যেন ভারতের জন্য গলার কাঁটা হয়ে আছে। এই দুই দলের ম্যাচ যেন হাইভোল্টেজ ম্যাচের মর্যাদা পায় তার সাথে ভক্ত সমর্থকের বাড়তি উত্তেজনা তো আছে। বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ; আর ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ; আর বাংলাদেশ –পাকিস্তান ম্যাচ এই তিন ম্যাচের মাঝে আপনি ক্রিকেট মাঠের উত্তেজনার বাইরে আরো বাড়তি কিছু আঁছ করতে পারবেন। এই দেশের সমর্থকরা ক্রিকেট মাঠের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে সরগরম করে তোলে গ্যালারি।সামাজিক যোগাযোগ সাইট আর মাধ্যমগুলোতে ট্রল আর মীম করে খেলোয়াড়দের নাস্তানুবাদ বা উৎসাহ দেয়ার নানা ফিরিস্তি দেখা যায়।এই ক্ষ্যাপাটে সমর্থকদের সাথে সাবেক ক্রিকেটাররা যোগ দিলে তা বাড়তি মাত্রা পায়।এই তিন দেশে ক্রিকেট এমন বাড়তি সমাদর পায় যা কিনা কোন কোন অংশে রাজনৈতিক ইস্যুকে ম্লান করে  দেয়। এইসব কারণে আর্ন্তজাতিক আসরে বাংলাদেশ,ভারত আর পাকিস্তানের অংশগ্রহণ মানে বিশ্বগণমাধ্যমগুলো সরব হয়ে উঠার একটা সুযোগই বলা যায়। এবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারত,পাকিস্তান আর বাংলাদেশের প্রবাসীদের কারণে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে খোদ ইংল্যান্ডের সমর্থকরা।

সেমিফাইনাল ম্যাচে ভারতীয় সমর্থকদের টিকেট নিয়ে আধিপত্য বাংলাদেশী সমর্থকদের খেলা দেখা নিয়ে অনিশ্চয়তা যেন তৈরি হয়েছিল।

একটা দলে সিনিয়র খেলোয়াড়ের কতটা ভূমিকা তা যেন তামিম,মাশরাফি,সাকিব,মুশফিক,মাহমুদল্লাহ দেখিয়ে দিয়েছে। আমাদের উচিত বাংলাদেশের এই সফলতাকে এপ্রিশিয়েট করা যাতে তারা ভবিষ্যৎে আরো ভাল খেলার উৎসাহ পায়।বাংলাদেশ ভারতের সেমিফাইনাল ম্যাচে বলতে গেলে বাংলাদেশ কেবল অভিজ্ঞতার দিক দিয়ে পিছিয়ে ছিল।বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুতে উইকেট পড়ে যাওয়ার পর তামিমের ধীরস্থির ব্যাটিং ভালো একটা ভীত গড়ে দিয়েছে।মির্ডল অর্ডারে মুশফিকের ব্যাটিং দৃঢ়তা আবারো প্রমাণ করল বাংলাদেশের জন্য কেন তিনি নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান।সাকিব আর মাহমুদল্লাহ আগের ম্যাচের মতো উজ্জ্বল না হলেও তাদের কাছ থেকে প্রতিদিন এমন কিছু আশা করাটা নিছক এক দর্শক হিসেবে বোকামি ছাড়া কিছু না। একজন খেলোয়াড় হিসেবে কতটা চাপ নিয়ে ব্যাটিং বা বোলিং করতে হয় কেবল তারাই জানে।বাংলাদেশের ইনিংসের শেষের দিকে ক্যাপ্টেন মাশরাফি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা স্বার্থেও নিজের স্বভাবসুলভ আগ্রাসী ব্যাটিং করে ছোট খাট একটা ক্যামিও ইনিংস প্রমাণ করে তিনি ক্রিকেটের প্রতি কতটা অর্ন্তপ্রাণ।

বাংলাদেশের বোলিংয়ের ক্ষেত্রে একমাত্র মাশরাফি ছাড়া সবাই নিষ্প্রভ ছিল তা মোটের উপর অভিজ্ঞতার কমতি।কালকের ম্যাচে নিছক একটা বড় ম্যাচ এমন ম্যাচে কিভাবে চাপ সামলিয়ে বল করে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে ব্যাকফুটে ফেলতে হয় তেমন অভিজ্ঞতা আমাদের ঝুলিতে কম আছে।তাসকিন মোস্তাফিজকে দোষারোপ করার কোন মানে হয় না।এবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেমিফাইনাল খেললাম সামনের বার ফাইনাল খেলব।আমরা তো দক্ষিণ আফ্রিকার মতো চোকার না যারা কিনা এখনো সেমিফাইনালের ভুত তাড়াতে পারে নি। গতকাল ভারত ম্যাচ জেতার কারণ তাদের অভিজ্ঞতা কেননা এমন বড় ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নিছক কম না।

বাংলাদেশের ভক্তকূলের হৃদয় আশাহত হলেও ১৮ই জুন ফাইনালে ঐতিহ্যবাহী এক দ্বৈরথ হবে।ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানে ক্রিকেট ছাড়াও জাতিস্বত্তা আর রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকবে না তা কি হয় ? গতবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত এবার চিরপ্রতিদ্বন্ধী পাকিস্তানের সামনে।এই ম্যাচটা যেন পাকিস্তানের জন্য বেশ অস্বস্তির কেননা তারা এখনো যে ভারতকে আর্ন্তজাতিক কোন টুর্নামেন্টে হারাতে পারে নি।এবার যদি এই গ্যাঁড়াকল ভাঙ্গতে পারে পাকিস্তানের ঝিমিয়ে পড়া ক্রিকেট চমক জাগানিয়া কিছু করবে যা কিনা পারে নি ওয়াকার ইউনুস, ওয়াসিম আকরাম,ইমরান খান ,ইনজামামের মতো গ্রেট ক্রিকেটাররা। এমন কিছু কি করবে সরফরাজ বাহিনি ? সরফরাজ কি আবার ধোঁকা দেবে পাকিস্তানের সমর্থকদের ? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে অপেক্ষা করতে হবে ১৮ই জুনের ফাইনালের জন্য।

বর্তমানে ভারতের ব্যাটিং লাইন আপ নিয়ে কারো সন্দেহ হওয়ার কথা নয় কেননা ভারত বরাবরই একটা ঈর্ষণীয় ব্যাটিং লাইন আপ নিয়ে তাদের দল গড়ে।এটাই তাদের মূল শক্তির জায়গা। ডিপেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন তকমা নিয়ে ভারত যদিও চাপে থাকবে শিরোপা পুনরুদ্ধারের ব্যাপার থেকে যায়। পাকিস্তানের সেই অর্থে নির্ভার থাকা চলে। কৌশলী পাকিস্তান মোহাম্মদ আমেরকে বসিয়ে রেখে ফাইনালের জন্য বরাদ্দ রেখেছে এটা যেমন সন্দেহাতীত তেমনি ভারতের ফিনিশার মাহেন্দ্র সিং ধোনির ব্যাট কিন্তু এখনো জ্বলে উঠে নি।ভারতের প্রতিটা জয়ে এই মারকুটে ফিনিশারের ছোঁয়া না লাগলে যেন তা পূর্ণতা পাই না।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে বৃষ্টির হানা না হলে ক্রিকেট সমর্থকরা শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপে রোহিত শর্মা,বিরাট কোহলি,যুবরাজ সিং আর মাহেন্দ্র সিং ধোনির ব্যাটিংয়ের সাথে  মোহাম্মদ আমের,হাসান আলী,জুনায়েদের বোলিং তোপ দেখবে। সব মিলিয়ে একটা রোমাঞ্চকর ফাইনাল হতে যাচ্ছে ১৮ই জুন।।

বাংলাদেশের এবারের সফলতার জন্য নিরন্তর ভালবাসা আর শুভকামনা থাকবে।

About The Author
Rajib Rudra
Rajib Rudra
2 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment