ইন্দোনেশিয়ার রহস্যময় পিরামিড পাহাড়

Please log in or register to like posts.
News

পিরামিড! পাথরের তৈরি বিস্ময়কর এই সমাধি স্থাপনা নিয়ে আগ্রহ গবেষক থেকে সাধারণ মানুষ সকলের। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে, মিসরীয় স্বর্ণযুগে নির্মিত পিরামিড প্রাচীনকাল থেকেই রহস্যে আর ধাঁধার জন্ম দিয়ে আসছে। গঠন কৌশল শুরু করে থেকে নির্মাণের সময়কাল, ভৌগোলিক অবস্থান থেকে আকার-আকৃতি সব কিছুতেই স্বাভাবিক যুক্তি ঘোলাটে করে দেয় এই পিরামিড। এখানেই বিস্ময়ের শেষ নয়। মিসর থেকে প্রায় ছয় হাজার মাইল দূরে অবস্থিত ইন্দোনেশিয়ার পিরামিড পাহাড় বলে খ্যাত যে স্থান রয়েছে, সেখানকার স্থাপনার বয়স মিসরের পিরামিডেরও চারগুণ!

গুনুঙ্গ প্যাডাঙ্গ (Gunung Padang) নামের এই পাহাড় দেখতে অবিকল বিশালাকার পিরামিডের মত। ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভা অঞ্চলে এর অবস্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৮৫ মিটার উঁচু এই পাহাড়। আশেপাশের অন্যসব পাহাড়ের মত সারা গায়ে গাছপালা ঢাকা নির্জন এক পাহাড়। অদ্ভুত এই আকৃতির কারণে নির্জন এই পাহাড় পর্যটকদের নজরে আসে। গুনুঙ্গ প্যাডাঙ্গ সর্বপ্রথম নথিভুক্ত করা হয় ১৯১৪ সালে। এরপর পরবর্তী একশ বছরে বহুবার আলোচনায় এসেছে এই পাহাড়। স্থানীয়দের কাছে পাহাড়টি পবিত্র একটি এলাকা। স্থানীয় সুদানীয় ভাষায় ‘গুনুঙ্গ প্যাডাঙ্গ’ শব্দের অর্থ ‘আলোর পাহাড়’। তাদের প্রাচীন লোকগাথা অনুযায়ী অনেক কাল আগে সিলিওয়াঙ্গি নামের একজন রাজা, একরাতের মধ্যে পাহাড়ের উপর একটি প্রাসাদ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। পাহাড়ের চুড়ায় সেই প্রাসাদের অংশই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

পর্যটকদের জন্যে যাতায়াতের সুবিধার্থে এই পাহাড়ে রয়েছে সিঁড়ির ব্যবস্থা। চুড়ার ছড়িয়ে আছে রহস্যময় পাথরগুলো। স্থানীয়দের রহস্যময় বিশ্বাস আর পাহাড়ের আকৃতির উপর ভর করেই নয়, বরং সেখান থেকে উদ্ধারকৃত প্রাচীন শিল্পদ্রব্য আর অদ্ভুত পাথরগুলো বিশেষজ্ঞদের নজর কাড়ে। পাহাড়ের একেবারে উপরের অংশে দুইটি আলাদা স্থানে পাথরগুলো দেখতে পাওয়া যায়। কালচে রঙের পাথরগুলো দেখলে মনথেকেই কেন যেন মনে হয়, প্রাকৃতিক ভাবে এগুলো সেখানে যায় নি। মানুষ কোন না কোন ভাবে এর সাথে জড়িত। আধুনিক বয়স নির্ণয় পরীক্ষা ছাড়া কেবল অনুমানের উপর ভিত্তি করে এই ধ্বংসাবশেষের নির্মাণকাল ১৫০০ থেকে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্ব বলে ধরা হত।

ইন্দোনেশীয় সরকারের আগ্রহ এবং পৃষ্ঠপোষকতায়, ২০১১ সালে ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞ ভূতত্ত্ববিদ ডঃ নাতাউইজ্জাজা (Natawidjaja) এবং তাঁর দল গুনুঙ্গ প্যাডাঙ্গ পাহাড়ে খনন এবং গবেষণার কাজ শুরু করেন।  পরবর্তীতে কয়েক ধাপে এই প্রকল্প পরিচালিত হয়। প্রাথমিক গবেষণা শুরু করা হয় পাহাড়ের উপরে অবস্থিত পাথরের বয়স নির্ধারণের মাধ্যমে। ডঃ নাতাউইজ্জাজা ও তাঁর দল সর্বপ্রথম কার্বন-ডেটিং পরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করেন, পাহাড়ের চুড়ার এই পাথরের বয়স ৫০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়ের মধ্যে। বিশেষ এই খনন অভিযানে ব্যাবহার করা হয় সর্বাধুনিক থ্রিডি স্ক্যানিং যন্ত্র, মাটির নিচে অস্বাভাবিক কিছু খোঁজার জন্যে বিশেষ যন্ত্র, ধাতু নির্ণয়ের যন্ত্র এবং আধুনিক কার্বন-ডেটিং পদ্ধতি। পাথরের বয়স নির্ধারণ পরীক্ষার সাথে পাথরের উৎপত্তি বিষয়েও জানা যায়। ফলাফলে বলা হয়, প্রাচীনকালে কোন এক অগ্নি উৎপাতের ফলে এই পাথরগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর সে সময়কার মানুষ পাথরগুলো এক যায়গায় বয়ে এনে, আকৃতি পরিবর্তন করে সেগুলো দিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করে। প্রাচীন এই পাথরগুলোর গড়ন অনেকটা আধুনিক ইটের মতই। গড়ে প্রায় দুই মিটার করে লম্বা আর ভীষণ ভারী। বেশ কিছু অদ্ভুত ধরনের পাথর সেখানে দেখতে পাওয়া যায়। খনিজ পদার্থের সঙ্কর হওয়ায় এর অনেকগুলোতে চৌম্বকত্ব রয়েছে। এছাড়া দুইটি এমন পাথরের সন্ধান সেখানে পাওয়া গেছে যেগুলোর বিশেষ যায়গায় আঘাত করলে অদ্ভুত সুরের সৃষ্টি হয়।

শুধু পাথর নয় সেই সাথে খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন আমলের মানুষের নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীর অংশবিশেষ। আবিষ্কারের নেশা অভিযানের গতি আর পরিধি দুটোই বাড়িয়ে দেয়।। গবেষণার আকার বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজন পরে দক্ষ এবং কর্মঠ খনন কর্মীর। ইন্দোনেশিয়ান আর্মির বেশ কিছু সৈনিককে পাঠানো হয় খনন কাজে বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তা করার জন্যে। পাহাড়ের উপরের পাথর নিয়ে গবেষণা করতে যেয়ে এই দলের ভূতাত্ত্বিকদের চোখে ধরা পরে বিস্ময়কর কিছু তথ্য। পাহাড়ের গভীরে আরও পাথরের খণ্ডের আভাস পাওয়া যায়। সেই সাথে স্ক্যানারের চোখে ধরা পরে মাটির গভীরে কুঠুরির মত অংশ। যেগুলো চুড়া থেকে প্রায় ১২-১৩ মিটার মাটির নিচে রয়েছে। সেই থেকে তাদের ধারনা জন্মায় উপরের এই ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন কোন সভ্যতার একটি অংশ মাত্র। মাটির নিচে বিশাল কোন সমাধিক্ষেত্র অথবা জটিল আকৃতির কোন স্থাপনা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

ধীরেধীরে পাহাড়ের গভীরে খননের কাজ শুরু হয়। ভারী খোদাইয়ের যন্ত্রপাতির আর বিশাল লোকবলের সাহায্যে এই খনন এগুতে থাকে। পাহাড়ের এক এক স্তরের পাথরের বয়স এক এক রকম সময়ের ইঙ্গিত দেয়। মাটির নিচে প্রায় ৩ থেকে ৪ মিটার গভীরে ৬৫০০ বছর থেকে ১২৫০০ বছর আগেকার পাথরের সন্ধান পাওয়া যায়। ২৫ মিটার মত গভীরে যে পাথর পাওয়া যায় এর বয়স ২০০০০ থেকে ২২০০০ বছর! বিশেষজ্ঞদের সর্বশেষ ধারনা অনুযায়ী, পাহাড়ের ভেতরের অনেকটা অংশই মানুষের তৈরি। তবে সেগুলো একটি নির্দিষ্ট যুগে তৈরি নয় বরং আলাদা আলাদা চার যুগে তৈরি।

সুপ্রাচীন যুগের এমন আধুনিক সভ্যতা একেবারে হারিয়ে গেল কিভাবে অথবা তাদের উত্তরসূরিদের কোন খোঁজ মিলে না কেন? এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন অভিজ্ঞ গবেষক ডঃ নাতাউইজ্জাজা। তিনি বলেন   খ্রিস্টপূর্ব ৯৬০০ এর পূর্বে পুরো পৃথিবীতে চলছিল বরফ যুগ। সে সময় ইন্দোনেশিয়া কোন আলাদা দ্বীপপুঞ্জ ছিল না বরং এশিয়ার মূল ভূখণ্ডের অংশ ছিল। তাঁরা যে সভ্যতার কথা ভাবছেন তা সেই বরফযুগের সময়কার হতে পারে। তাঁর মতে বরফ যুগের শেষে প্রকৃতির পালাবদলের কারণে যেমন প্রাণীচক্রে পরিবর্তন এসেছিল, ম্যামথের মত বিশাল প্রাণী হয়েছিল বিলুপ্ত, তেমনই এই স্থাপনা যারা গড়ে তুলেছিল তারাও বিলুপ্ত হয়ে যায়।

অভিযানের অপর বিশেষজ্ঞ ডঃ হিলম্যানও একজন অভিজ্ঞ ভূতত্ত্ববিদ। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ মাত্রই সবাই বুনো আর আদিম ছিল এ ধারনার সাথে ডঃ হিলম্যান একমত নন। সভ্যতার বিবর্তনের সাথে জীবনযাপনের ধারা বদলে গেলেও প্রাচীন মানুষের মাঝেও সমাজ ব্যবস্থা ছিল বলে তাঁর বিশ্বাস। গুনুঙ্গ প্যাডাঙ্গ এর এই পাহাড়ের বিভিন্ন স্তরের ব্যাখ্যায় তিনি জানান, কোন এক যুগে এই স্থানে মানুষের বসবাস শুরু পর একটি যুগের শেষে সেই স্থাপনার উপর অন্য যুগের স্থাপনা গুলো তৈরি করা হয়। প্রতি বছর একতলা করে বাড়িয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের মত। পার্থক্য কেবল এই বিশাল আকৃতির স্থাপনা তৈরি হয়েছে কয়েক হাজার বছরে। কেবল প্রাকৃতিক কিছু পাথর আবিষ্কারে বিশেষজ্ঞদের এত আগ্রহী করে নি। ডঃ হিলম্যান জানান, তাঁরা মানুষের ব্যবহার্য হাতিয়ার, তৈজসপত্র এবং কিছু মুদ্রাও আবিষ্কার করেছেন। কার্বন-ডেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে যাদের বয়স ১২০০০ বছরের পুরনো বলে নির্ণয় করা গেছে। এ ছাড়া চুড়া থেকে প্রায় ১৫ মিটার নিচে এমন সব পাথরের সন্ধান পাওয়া গেছে যেগুলো একটির সাথে আরেকটি প্রাচীন কোন আঠার সাহায্যে জোড়া লাগানো। সেগুলো কোন কক্ষ অথবা উপাসনালয়য়ের অংশ বলে অভিজ্ঞ এই বিশেষজ্ঞের বিশ্বাস।

সরকারের আগ্রহ এবং একদল ধৈর্যশীল বিশেষজ্ঞের এই কাজের আলোচনা আর প্রশংসা যেমন হয়েছে তেমনি সমালোচনাও কম হয়নি। ইন্দোনেশিয়ার ৩৪জন গবেষক এই অভিযানের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। তাদের ভাষ্যমতে এই গবেষণায় খনন কাজে যে পদ্ধতির ব্যবহার হয়েছে এবং কাজের জন্যে যেই কর্মীদের নিয়োগ করা হয়েছে তাতে করে প্রাচীন এই স্থাপনা এবং ইতিহাসের ক্ষতি হচ্ছে। আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ সুতিকো ব্রন্তো ধারনা করেন, এই পাহাড় আদৌ কোন মানুষের সৃষ্টি স্থাপনার অংশ নয়। এটি প্রাচীন কোন আগ্নেয়গিরির উপরের অংশ। আর আবিষ্কৃত পাথরগুলো আসলে আগ্নেয় শিলা, যা বছরের পর বছর প্রাকৃতিক ভাবে ক্ষয় হয়ে এমন আকার ধারণ করেছে। সভ্যতা কেন মানুষের সাথেই এর কোন সম্পর্ক নেই। অপর একজন বিশেষজ্ঞের মতে, এই পাহাড়ের ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রাচীন আমলের মানুষের ব্যবহৃত যে সামগ্রী আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলো পাথর আর হাড়ের তৈরি। তিনি প্রশ্ন তোলেন যদি এতো কাছেই একই সময় আধুনিক একটি সভ্যতা থেকে থাকে তাহলে আশেপাশের মানুষের সাথে এর পার্থক্য থাকে কি করে?

ইন্দোনেশিয়া সরকার বরাবরই এই অভিযানের পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে কিন্তু এরপরও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নির্বাচন জটিলতায় কাজ বার বার পিছিয়ে গেছে। বিশেষ কোন সমাধি অথবা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ না পাওয়া যাওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার এই রহস্যময় স্থাপনা বিষয়ে বিশ্বে তেমন ভাবে আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু হয়তো একদিন এই কুয়াশা ঘেরা পিরামিড পাহাড়ের কারণেই বদলে যাবে মানব সভ্যতার ইতিহাস।

 

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?