Now Reading
একটি কন্সার্ট জয় এবং শিরোনামহীন !!



একটি কন্সার্ট জয় এবং শিরোনামহীন !!

দিনটা ছিল ৭ই মার্চ ২০১৭। ৩য় বারের মত এই দিনে ঢাকা আর্মি স্টেডিয়ামে ইয়াং বাংলা নামক একটি সংগঠন দেশের নামকরা আটটি ব্যান্ড নিয়ে একটা বড় কনসার্ট এর আয়োজন করেছিল। কনসার্ট টির নাম ছিল জয় বাংলা কন্সার্ট। আমি ২০১৫ সালের কনসার্ট টা টিভিতেও ভালমতো দেখতে পারিনি। ঢাকা শহর থেকে দূরে থাকায় ঢাকার কোন কন্সার্টই আমার দেখা হয়ে ওঠে না। তবুও বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীত এর প্রতি টান থাকায় টিভি তে আর ইউটিউবে অনেক কন্সার্টই আমি দেখতাম। ২০১৭ তে আমার ঢাকায় আসার কথা। তাই সেই ২০১৫ এর ৭ই মার্চই আমি ঠিক করে ফেলেছিলাম যে এই কন্সার্ট আমি মিস করবো না। আমি আর আমার খালাতো ভাই মিলে একসাথে কন্সার্টে যাওয়ার পণ করেছিলাম। আর আমার আসল টার্গেট ছিল শিরোনামহীন। ছোট থেকেই এই ব্যান্ড, ব্যান্ডের সাথে জড়িত মানুষগুলো আর গানগুলোর প্রতি আলাদা ভালোবাসা আর টান টান ছিল।

২০১৭ সালে ঢাকাতে ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি হলাম। মার্চ মাস চলেও আসলো। আমরা পুরোপুরি ভাবেই রেডি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমার ভাই যার সাথে কন্সার্টে যাওয়ার কথা ছিল ওর হয়ে গেল মারাত্মক একটা বাইক এক্সিডেন্ট। এক্সিডেন্টের কারণে ওর হাত পা সহ আরও অনেক জায়গা তে সাদা ব্যান্ডেজ পড়লো। আমাদের কন্সার্টে যাওয়া প্রায় অনিশ্চিত। কিন্তু এতদিন ধরে যার জয় অপেক্ষা তা এভাবে কাছাকাছি এসেও হাতছাড়া হয়ে যাবে ? না রেজিস্ট্রেশন করে ফেললাম। আমার ভাই  আমাকে একা যাওয়ার কথা বললো। কিন্তু আমি তো ওকে নিয়েই যাবো। কিন্তু ওর এই অবস্থায় ভিড়ের মধ্যে যেয়ে দাঁড়ানোও তো অসম্ভব। আশা ছাড়লাম না আমরা। কন্সার্টের দিন পর্যন্ত আশা রাখলাম একটা ব্যবস্থা ঠিক হবে।

কন্সার্টের আগের দিন রাতে একটা ভি আই পি পাস এর ব্যবস্থা হল ভাই এর জন্য। আমরা কিছুটা স্বস্তি পেলাম। কন্সার্টের দিন আমার ছিল ল্যাব এক্সাম। আবার এক বাধা আসলো সামনে। এক্সাম এর টাইম টা আবার বিকাল সাঁরে চারটায়। কি আর করা প্রথম কয়েকটা মিস দেওয়ায় লাগবে। তখন মন কে সান্ত্বনা দিলাম শিরোনামহীন পেলেই আমি খুশি। আমি ল্যাবের ১ ঘণ্টার এক্সাম ১৫ মিনিটে শেষ করে বের হয়ে দৌড় দিছি। উত্তরা থেকে আর্মি স্টেডিয়াম যেতে হবে। রাস্তায় অনেকটা জ্যাম পড়বে। ভাই কে নিয়ে অনেক সাবধানে একটা ফাকা বাস পেলাম। বাসে উঠে বসলাম। কোন সি এন জি পেলাম না। জ্যামের কারণে কেওই ওদিকে যেতে চায় না। নিরুপায় হয়ে বসে আছি বাসে উঠে আর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছি। ৫ টা ৩০ মিনিটে শুরু করে আমরা পৌঁছলাম রাত ৯ টায়। সাথে হাত পা ভাঙ্গা মানুষ না থাকলে অনেক আগেই  নেমে হেটে আসতাম। স্টেডিয়ামের সামনে এসে স্বস্তি পেলাম যে একটু পর শিরোনামহীন উঠবে। কিন্তু রাস্তার পাশে লাইনের দৈর্ঘ্য দেখে আমার শিরোনামহীন কে দেখার স্বপ্ন শেষ। কারণ এই লাইনে আমি দাড়াতে পারলেও আমার ভাই এর দ্বারা দাঁড়ানো সম্ভব না। দুজনই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থা। আমি বললাম এসেছি যখন ভিতরে যেয়ে দেখে তারপর বাসায় যাবো। চাপা চাপির লাইনের ভিতর ভাই কে সামনে নিয়ে দুই হাত দিয়ে দুই দিক থেকে ধরে সামনের দিকে গেলাম। এভাবে একটু একটু করে সামনে যাচ্ছি। ওদিকে তুহিন ভাই স্টেজে উঠে কথা বলা শুরু করে দিয়েছেন। আমার সামনে এমন লম্বা লাইন। আশা ছেড়ে দিয়েও মন কে শক্ত করে আছি। আমরা গেইটের প্রায় কাছে আর প্রথম গান শুরু। “জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো” গান হতে হতেই আমরা গেইটের ভিতরে চলে গেছি। ভি আই পি টিকিট থাকলে তাকে ১ নম্বর গেইট দিয়ে যেতে হবে। আর তার জন্য কোন লাইন নাই। আর ভিতরে বেশি চাপা চাপিও নাই। ভাই কে ১ নম্বর দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে আমার ১৫ নম্বর গেইটে চলে গেলাম। তখন  প্রথম গান শেষ করে পরের গান শুরু করেছেন তুহিন ভাই। “মোরা একটু ফুল কে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি”। সামনে একটু লম্বা লাইন গেইট দিয়ে টিকিট চেক করে ভিতরে ঢুকানো হচ্ছে। আমি জানি এই গানটা শেষ হলেই শিরোনামহীন তাদের মৌলিক গান করবে। আর আমি যদি এতদূর এসেও মিস করি ? টিকিট চেক শেষ করলাম ভিতরে আরও কয়েক ধরণের চেক। সব চেক শেষে ২য় গানটাও শেষ হল। আমি স্টেডিয়ামের ভিতর ঢুকতেই বুলেট কিংবা কবিতা গানের মিউজিক শুরু। ১৫ নম্বর গেট থেকে সোজা সামনের দিকে দৌড় দিলাম। গানের মিউজিক এর সাথে সাথে আমিও গুলির বেগে ছুটছি। আমাকে যে কাছে যেয়ে ওদের সাথে গলা মেলাতে হবে। কাছাকাছি আসলাম আর তারপর যতদূর পারলাম ঠেলে ঠেলে সামনে গেলাম। আর তারপর তাদের কাছ থেকে দেখতে পেলাম প্রথম বারের মত। আমার সামনে আমার থেকে আরও লম্বা মানুষজন থাকায় আমি ভালমতো দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবুও লাফিয়ে লাফিয়ে দেখার চেষ্টা। “নিয়ন আলোর রাজপথে” একসাথে গলা মেলালাম। পাশে কে আছে কাওকে চিনিনা। তবুও সবাই একই সূরে গান আর একি তালে নাচ। তারপর একে একে বন্ধ জানালা আর আবার হাসিমুখ গেয়ে শেষ হল শিরোনামহীন পর্ব। আমি টিভিতে দেখেছিলাম তুহিন ভাই তুমি চেয়ে আছো তাই আমি পথে হেটে যায় এই লাইনের সময় দর্শক দের দিকে মাইক্রোফোন দিয়ে দেন। এবারো দিলেন আর সবার সাথে আমিও গলা মেলালাম।

একটা স্বপ্ন পূরণ হল। সাথে একটা দারুণ অভিজ্ঞতা। আমি হার মানিনি। আমরা যাদের দেখার প্রত্যাশা নিয়ে গেছিলাম তাদের দেখেই ফিরেছি।

About The Author
Ahmmed Abir
Ahmmed Abir
জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বাচতে শিখেছি। নিজেকে চ্যালেঞ্জ করে সামনে এগিয়ে যেতে শিখেছি। পছন্দ করি গান গাইতে গীটার বাজাতে আর গেইম খেলতে।

You must log in to post a comment