সাহিত্য কথা

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৪)

তৃতীয় পর্বের পর থেকে……..

 

আমি আসলে ঠিক কি জবাব দেবো,  বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

দোটানায় পড়ে গেলাম। আমি যে ইসাবেলাকে ভালোবাসিনা তা নয় কিন্তু। আমি চাইলাম,  একটু ভিন্নভাবে জবাব দিতে, তাই বললাম, আমি তো পাশেই আছি, আর কোথায় যাবো বলো?

জানিনা, আমার জবাব তার কাছে মনঃপূত হয়েছিল কিনা। ওভাবেই এই সেই গল্প করতে করতে তার চোখে ঘুম চলে এলো, আমি তাই তাকে বিদায় দিয়ে বাসায় চলে এলাম।

বাসায় এসে ভাবতে লাগলাম, ইসাবেলার সাথে যদি সম্পর্কে জড়াই, তবে কি হবে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ? কারণ, আমি আসলে চাইনা কোনো বিদেশী কন্যা আমার জীবনসঙ্গিনী হোক। বিদেশিনীর জীবনধারা ভিন্ন যদিও ইসাবেলা যে মাত্রায় প্রেমামাইসিন খেয়েছে, তাতে করে বলা যায় সে আমার জীবনধারাতে অভ্যস্ত হতে বেশীদিন সময় নেবে না। আর একটা ব্যাপার,  তা হলো ভাষা। আমি যতই ইংরেজি ভালো জানি বা পারি না কেন, তা আমার মাতৃভাষা নয়। আর মাতৃভাষায় আপনি আপনার ভালোবাসার মানুষের সাথে আবেগের যে লেনদেন করতে পারবেন, তা অন্যভাষাতে কখনোই সম্ভব নয়। আর এটাই বাস্তব সত্য।

সারারাত এইসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলো। ফলে কাজেও দেরী।

পৌছানোর পরে মশিউর ভাই একটু রসিকতা করে গান ধরলেন, “কি জাদু করিলা, পিরিতি শিখাইলা…….” আমি বললাম,  ভাই মজা নেন,  তাইনা? উনি বলেন, মজা নেবো কেন? মজা তো আমি এমনিই পাচ্ছি, আজকাল সারারাত এপাশ ওপাশ করেও দেখি সাহেবের ঘুম আসেনা, কাজে আসেন দেরী করে, আপনার সেকশন বসেরও কাজে মনোযোগ কম। মনে হচ্ছে, একটা কাজী অফিস খোলা ফরজ হয়ে পড়েছে? বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন।  উনার কাজই হলো আমাকে ক্ষেপানো,  মজা করা। উনার মজা করার প্রেক্ষিতে আমিও একটু মজা নিলাম, বললাম, ভাই, আপনি কাজী হলে আগে নিজেই নিজের বিয়ে পড়বেন, তাহলে লাইসেন্স পাবেন, আমি লাইসেন্সহীন কাজীর কাছে বিয়ে করবো না। ( কথাগুলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, মজা করে বলা)

সেদিন কাজ শেষে ইসাবেলা তার BMW তে করে আমাকে শপিং-এ নিয়ে গেলো।  প্রতি সপ্তাহেই সে শপিং করে, কেনাকাটা ছাড়া থাকতেই পারেনা, কিন্তু সবচাইতে অবাক করা ব্যাপারগুলো কি জানেন?

এই কেনাকাটা সে তার নিজের জন্য করেনা, করে ইউরোপের কিছু গরীব দেশের গরীব মানুষের জন্য, সিরিয়া থেকে আসা রিফিউজি বাচ্চাগুলোর জন্য। পথের পাশে পড়ে থাকা হোমলেস মানুষগুলোর জন্য। যদিও হোমলেস মানুষ নেদারল্যান্ড -এ নেই একদমই। হোমলেসদের জন্য একটা সংস্থায় সে ওগুলো দান করে দেয়- চলে যায় অন্য দেশে।

তার এমন গুণ জেনে আমার চোখ থেকে পানি চলে এসেছিল। মনে হয়েছিল, কত টাকা জীবনে এদিক সেদিক করেছি, অথচ নিজের দেশের না খেয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে কখনো তাকাইনি। হ্যাঁ, আমি স্টুডেন্ট ছিলাম, সেভাবে সম্ভব ছিলোনা,  কিন্তু বন্ধুদের সাথে অহেতুক যে টাকা উড়িয়েছি এদিক সেদিক?

ইসাবেলা এক অন্য মানুষ, অন্য উচ্চতার মানুষ। সে আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে,  আমার জন্য H&M,  Denim, Boss যত ব্রান্ড আছে, সেগুলোর পোশাক, পারফিউম গিফট করলো। খুব খুশি হয়েছিলাম তার থেকে গিফট পেয়ে। ভাবছিলাম,  আমি কি গিফট করবো তাকে? আম্মুকে তাই ফোন করে বললাম, আম্মু, একটা সুন্দর জামদানী শাড়ি কিনে পাঠাও আমাকে। আম্মুও মজা করতে ছাড়েনা, বলে শেষমেশ আমার ছেলের শাড়ি পড়ার শখ হয়েছে? আমি জানি, এমন প্রশ্ন কেন করেছে, যাতে করে বলে দিই আসলে কার জন্য লাগবে। আর সেটিই হলো। বললাম,  ধূর, কি যে বলোনা,  পাগল নাকি যে আমি শাড়ি পড়বো?  আম্মু বলে, তো আমার পাগল ছেলেটা কোন পাগলীকে শাড়ি গিফট করবে? – উফফ আম্মু, তুমি খুব চালাক।

কেনরে, চালাকির কি করলাম? আমাকে বলো,  দেখি তার জন্য আরো বাংলাদেশী কিছু পাঠাতে পারি কিনা, শুধুই শাড়ি কেন? আমার দেশের কি আর কিছু নেই? বললাম, আচ্ছা, তোমার আরো যা ইচ্ছে হয়, তুমি কিনে পাঠাও কিন্তু তার নাম বলা যাবেনা। আম্মুও কম যায় না, বলে, নাম দিয়ে কি কাজ সোনা? তুমি আমাকে ভাইবার-এ ছবি পাঠাও, না হলে কোনো পার্সেল নেদারল্যান্ড যাবেনা। কেমন?

কি আর করা, বাধ্য ছেলের মত তার ছবি পাঠিয়ে দিলাম, আম্মুর তো খুব পছন্দ তাকে, বলে, মেয়ে যদি সত্যিই ভালো হয়ে থাকে, তবে এই বিদেশিনী ঘরের বউ হয়ে এলেও আমাদের কোনো সমস্যা নেই। মেয়ের মুখ দেখেই মনে হচ্ছে, নরম স্বভাবের ভদ্র একটা মেয়ে। কি সুন্দর গালে টোল পড়ে? আম্মু পুরোই পাগল হয়ে গিয়েছে বুঝলাম। আম্মু ফোন করেছিল, বললো, পাঠিয়ে দিয়েছে পার্সেল। তিন-চারদিনের ভেতর পৌছে যাবে।

এদিকে ইসাবেলার সাথে অনেক ঘুরাঘুরি হয় প্রতিদিন। বেলজিয়াম এর রাজধানী ব্রাসেলস গিয়েছিলাম দুজন।  সেখানে গিয়ে হোটেলে তিন রাত এক বিছানায় ছিলাম। কি খুব খারাপ শোনাচ্ছে? ফুল সামার, ডাবল বেডরুম সব বুকড। টুরিস্টে ভরপুর আমস্টারডাম ব্রাসেলস, দুই দেশের রাজধানীই। শেষ দিন রাতের বেলা জিজ্ঞেস করেছিলাম,  তুমি কি সেক্সের প্রতি ইন্টারেস্টেড না? এই যে তিন রাত আমার সাথে একই বিছানায় থাকলে, তোমার ভেতর কোনো নমুনাই তো পেলাম না, অথচ ইউরোপে ভালোবাসা মানেই সেক্স।

ও আমাকে বললো, ইউরোপের ৯৫% মানুষই কিন্তু সেক্স লাইফে বিলিভ করে। ভালোবাসা হলেই সেদিকে ঝুঁকে পড়ে, এটাই ইউরোপিয়ান কালচার। আজ একজনের সাথে,  কাল আরেকজন। খুব ভালো করেই জানো বেশির ভাগ ইউরোপিয়ানরা ৩৫-৪০ বছর পর্যন্ত জীবনটাকে উপভোগ করে। তো আমি বোধহয় বাকি ৫% এর ভেতর পড়ে গিয়েছি। আর সবচাইতে বড় কথা কি জানো, ভালোবাসার মানুষের প্রতি সম্মান। তুমি একবার বলেছিলে সেই বয়স্ক ডাচ শেফকেঃ যে তুমি নাকি বিয়ের আগে সেক্স করতে আগ্রহী নও। আমি শুনেছিলাম তোমার সেই কথা, তোমার প্রতি সেদিন সম্মানটা আরো বেড়ে গিয়েছিল। কারণ, আমাদের ধর্ম কিন্তু এমনটাই বলে, তোমার কোরআন শরীফে যেমন বলা আছে, আমার বাইবেলেও তেমন বলা আছে। হয়তো আমি, ধর্ম কর্ম তেমন করিনা, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমার ধর্মের কথাকে। তাছাড়া, আজ একজন, কাল আরেকজন- নাহ এটা কোনো জীবন হতে পারেনা। এর চাইতে তোমাদের দেশে তোমরা অনেক সুখী। তোমরা যদি একজনের সাথে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারো, আমরা কেন পারবোনা বলো?

আমি যতই ইসাবেলার কথা শুনি, ততই অবাক হই। জানিনা, এই মেয়ে কোন ধাতুতে গড়া, এই কিনা ব্রিটিশ কন্যা?

আমরা রটার্ডাম ফিরে এলাম, দেখি মশিউর ভাই পার্সেল রিসিভ করেছে। খুলে মশিউর ভাইকে দেখাতে চাইলাম, উনি বললেন, একবারে ইসাবেলার সামনে খুলতে, সেটাই ভালো হবে।

খুব উল্লসিত আমি এই ভেবে যে ব্রিটিশ কন্যা অবশেষে বাংলাদেশী জামদানী শাড়ি গায়ে জড়াবে। ওকে দেখা করতে বলবো বলে কল দিতে ফোন বের করলাম, ঠিক এমন সময় ইসাবেলার কল, বললো, “ফেরদৌস, আগামীকাল তুমি একটু কিচেনটা সামলাবে তাই সকাল সকাল যেও, আমি বসকে (মশিউর ভাই) বলে দিচ্ছি আসতে পারবো না, ছুটি লাগবে। সপ্তাহখানেকের জন্য লন্ডন যেতে হবে। ইমারজেন্সী”

চলবে…………

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

ম্যানস্ পার্লার!

Maksuda Akter

পথের শেষে [১ম পর্ব]

Ikram Jahir

স্বল্প দৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী – শেষ পর্ব

Rohit Khan fzs

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy