সাধারন জ্ঞান

চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর ( চতুর্থ পর্ব)

চেরনোবিলের পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রর দুর্ঘটনা এবং প্রিপিয়াট শহর নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করা হয়েছে এই সিরিজের বিগত পর্বগুলোতে। এই পর্ব এবং আগামী পর্বে থাকবে বিস্ফোরণ ঘটার পরে ইউক্রেন অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন কিভাবে সেই দুর্যোগ মোকাবেলা করেছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

গভীর রাতে যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল তার প্রাথমিক ধাক্কা সকাল হতেই সামলে নেয় স্থানীয় দমকল বাহিনীর কর্মীরা। শক্তিকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রনকক্ষ আর কর্মচারীদের যাতায়াতের অংশের আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কিন্তু চুল্লীর মূল অংশ যেখানে পারমাণবিক জ্বালানী রয়েছে সেখানের আগুন নেভানো সম্ভব হয় না। বিষাক্ত এই জ্বালানী নিয়ন্ত্রণের বাইরেই থেকে যায়। প্রচণ্ড উত্তাপ ছাড়াও এর থেকে উৎপন্ন তেজস্ক্রিয় বাষ্প বাতাসে মিশে ক্রমাগত দমবন্ধকারী ধোঁয়া সৃষ্টি করতে থাকে। বর্ণ গন্ধহীন এই বিষ এতোটাই ক্ষতিকর আর ভয়াবহ ছিল যে, সেই বাতাসে কয়েক মিনিট নিঃশ্বাস নিলে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়া নিশ্চিত। সেই সাথে মৃত্যুর সম্ভাবনাও বেড়ে চলে প্রতি মুহূর্তে। পারমাণবিক চুল্লীর আশেপাশের এলাকায় সেই বাতাস দ্রুত ছড়িয়ে পরতে শুরু করে। মেঘের সাথে তেজস্ক্রিয় কণা মিশে সৃষ্টি হয় ভয়ানক তেজস্ক্রিয় মেঘের। হাওয়ায় ভেসে সেই মৃত্যু দূত এগুতে থাকে দেশের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপের অন্য দেশগুলোর দিকে।

আন্তর্জাতিক ভাবে পারমাণবিক বিপর্যয় নিয়ে যতই লুকোচুরি করুক সোভিয়েত ইউনিয়ন, দুর্ঘটনার মোকাবেলা তাদের মুখ ফিরিয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনীর মত, দেবতাদের সাথে মানুষের অসম লড়াইয়ের এক কাহিনী যেন শুরু হয় চেরনোবিলের পারমাণবিক চুল্লী আর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের মাঝে। প্রাথমিক ভাবে প্রিপিয়াট শহর আর এর আশেপাশের মানুষজন সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় তাদের মূল যুদ্ধ। সামরিক প্রহরার মাধ্যমে প্রথমেই সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ চেরনোবিলের সাথে সমগ্র ইউক্রেনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই সাথে দুর্ঘটনা এলাকার ত্রিশ কিলোমিটারের মধ্যে যাতে কেউ বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে না পারে সেই ব্যবস্থা নেয়। এই প্রস্তুতির অনেকটুকুই অফল হয় কারণ, পারমাণবিক বিষাক্তটা আর এর ভয়াবহতা তখনও সবার কাছে নিতান্তই তাত্ত্বিক বিষয়। সরকারের পক্ষ থেকে চেরনোবিল অঞ্চলে অবস্থানরত সৈন্য এবং বিশেষজ্ঞ কর্মীদের বায়ু বিশুদ্ধিকরণ মুখোশ এবং বিশেষ পোশাক পরার নির্দেশ দেয়া হলেও অনেকেই সেই বিষয়ে অনীহা দেখায়। ফলাফল স্বরূপ সমস্যা সমাধানকারী দলের সদস্যরাও আক্রান্ত হতে থাকে পারমাণবিক বিষাক্ততায়।

প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার অভাব এবং সেই সাথে ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে সম্পূর্ণ ধারনা না থাকায় বিশেষজ্ঞ দল নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পরে। প্রাথমিক ভাবে তারা সিদ্ধান্ত নেয় বাতাসে বিষাক্ত পারমাণবিক পদার্থগুলো মেশা বন্ধ করতে হবে। সে জন্যে চুল্লীর ভেতর জ্বলতে থাকা পারমাণবিক জ্বালানীর উপর বিশেষ আস্তরণ তৈরির কথা তারা চিন্তা করেন। চুল্লীর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বালু আর বরিক এসিডের ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চুল্লীর মুখের ভেতরে বালু আর বরিক এসিড নিক্ষেপের জন্যে পুরো সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সামরিক হেলিকপ্টার আনানো হয়। ৬০০ জন অভিজ্ঞ পাইলট এই অভিযানে অংশ নেন। পালাক্রমে সারা দিন-রাতে তারা শতশত বার চুল্লীর উপর দিয়ে যাওয়া আসা করেন বস্তা ফেলার জন্যে। সে সময় বাতাসে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ এতোটাই বেশি ছিল যে হেলিকপ্টার থেকে ধারণ করা ভিডিও এবং স্থির ছবিগুলোতে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে দুইপাশে অনেকখানি ঝলসে যেতে দেখা যায়। আস্তরণ তৈরির কাজে নিয়োজিত একটি হেলিকপ্টার পার্শ্ববর্তী ক্রেনে ধাক্কা লেগে ভূপাতিত হয়। ঘটনাস্থলে মারা যায় ভেতরে আটকা পরা সকলেই। আস্তরণ তৈরির এই পরিকল্পনা প্রাথমিক ভাবে সফল হয়। কুন্ডুলী পাকিয়ে উঠতে থাকা মৃত্যুর ধোঁয়ার বেগ কমে আসতে শুরু করে। কিন্তু বিস্ফোরণে পারমাণবিক চুল্লী এতোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে, রাসায়নিক এই আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা তারপরও সম্ভব হচ্ছিলো না। বালু আর বরিক এসিডের পর সীসার আরও একটি আস্তরণ দেয়া হয় একই উপায়ে। তেজস্ক্রিয়তা বাইরে বের হওয়া বন্ধের জন্যে সীসা ব্যবহার করা হয়েছিল।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সঠিক ভাবে জানার জন্য সোভিয়েত সরকারের পক্ষ থেকে গোপনে তদন্তে পাঠানো হয় কেজিবিকে। ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর সর্বপ্রথম ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লীর ভিডিও ধারণ করে কেজিবি। কিন্তু সেই ভিডিও সোভিয়েত ইউনিয়ন বাইরে প্রচার করেনি। সোভিয়েতদের সাথে স্নায়ুযুদ্ধের বিপরীত শক্তি আমেরিকার গোয়েন্দা বিমান চেরনোবিল থেকে গোপন ভিডিও চিত্র পাঠানোর পর আমেরিকা সহ বিশ্বের অন্য সব দেশ জানতে পারে আসল ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বীকার করতে বাধ্য হয় ইউক্রেনের পারমাণবিক চুল্লী বিস্ফোরণের কথা। মৃত্যুর বালি ঘড়ি উল্টে যাবার পর স্বীকার অস্বীকারে যদিও খুব বেশি পার্থক্যের সৃষ্টি করে না। ইউক্রেন, রাশিয়া আর বেলারুশের গণ্ডি পেরিয়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পরতে শুরু করে সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে সহ অন্যান্য দেশে। স্বাভাবিকের তুলনায় চার-পাঁচগুণ তেজস্ক্রিয়তা ধরা পরে এই সব অঞ্চলে। ফ্রান্স আর যুক্তরাজ্যের নানান অংশেও বিষাক্ত মেঘের আনাগোনা শুরু হয়। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মত অদৃশ্য কোন ভিনগ্রহবাসীর আক্রমণে যেন আক্রান্ত হতে থাকে গোটা ইউরোপ। খবর আসতে থাকে তেজস্ক্রিয় বৃষ্টিপাতের প্রভাবে বিভিন্ন স্থানে ফসল নষ্ট হবার। সেইসব এলাকার মানুষ এমনকি গবাদি পশু আর বন্যপ্রাণী সবই তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা দেখা দেয় ।

বাইরের দেশগুলো যখন নিজেদের দেশের বায়ু নিরাপদ রাখতে লড়ছে তখন ইউক্রেন তথা সোভিয়েত ইউনিয়নের সামনে নতুন আরও একটি বিপদের আশঙ্কা দেখা দেয়। প্রাথমিক তদন্তের শেষে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লীর ভেতরে ১৮৫ টন পারমাণবিক জ্বালানীতে তখনও পারমাণবিক বিক্রিয়া চলছে। এই ১৮৫ টন পারমাণবিক জ্বালানীর ঠিক নিচেই রয়েছে ৫ মিলিয়ন গ্যালন ধারণ ক্ষমতার জলাধার। এই জলাধারের পানিই ব্যবহৃত হত চুল্লীর শীতলীকরণে কাজে। ক্রমাগত জ্বলতে থাকা পারমাণবিক জ্বালানির উপর যে আস্তরণ দেয়া হয়, সেই সীসা, বালি আর বরিক এসিড পারমাণবিক জ্বালানীর সাথে মিশে উত্তপ্ত লাভার মত এক পদার্থের সৃষ্টি করে। ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক চুল্লীর একেবারে তলানিতে জমে থাকা এই জ্বলন্ত লাভা আর জলাধারের মাঝে ছিল কেবল একটি কনক্রিট স্ল্যাব। বিস্ফোরণের ফলে সেই স্ল্যাবে ফাটলের সৃষ্টি হয়। কেবল বিস্ফোরণ নয় সেই সাথে পারমানবিক কেন্দ্রের ত্রুটিপূর্ণ গঠন এর জন্যে দায়ী। উত্তপ্ত রাসায়নিক লাভা ধীরে ধীরে স্ল্যাবের ফাটল দিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করে।  পারমাণবিক এই লাভা পানির সংস্পর্শে আসলে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ধ্বংস হবে পুরো পারমাণবিক চুল্লী, সেই সাথে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটবে পার্শ্ববর্তী অন্য তিনটি চুল্লীতেও। যার ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে ইউরোপের অর্ধেকের বেশি দেশ আর সেই সব এলাকার অনেক অংশ অন্তত পাঁচ লক্ষ বছরের জন্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ অন্যদিকে শতাব্দীর ভয়াবহতম বিস্ফোরণের সম্ভাবনা, কিভাবে এই সব কিছুর সমাধান করে ক্ষমতাশীল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কোন উপায়ে তারা আটকে দেয় অদৃশ্য এই মৃত্যু দানবকে, সেই প্রশ্নের জবাব থাকবে আগামী পর্বে।

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (তৃতীয় পর্ব)

Abdullah-Al-Mahmood Showrav

ইতিহাস বিখ্যাত অবাক করা কিছু ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা।

Rysulislam

পৃথিবীর সবচেয়ে ১০ টি দামী সুপারকার

Kongkon KS

5 comments


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Footprint Police June 17, 2017 at 6:50 pm

Spelling Error = Yes


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Mohammad Johirul Islam June 17, 2017 at 10:59 pm

protekta porbo oshadharon chilo


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Abdullah-Al-Mahmood Showrav June 19, 2017 at 10:22 am

অনেক ধন্যবাদ


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
SHUVO DIP June 18, 2017 at 4:06 pm

ভালো লিখেছেন ভাই।
প্রতিটি পর্বে ধারাবাহিক ছিল লেখনী।


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Abdullah-Al-Mahmood Showrav June 19, 2017 at 10:27 am

পড়ে ভালো লেগেছে শুনে সত্যি ভালো লাগলো ভাই। মূল্যবান মতামতের জন্যেও ধন্যবাদ।

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: