Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৫)



এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৫)

চতুর্থ পর্বের পর……….

ইসাবেলার ইমারজেন্সী নক পেয়ে মনে হলো আমি হাসপাতালের ইমারজেন্সীতে চলে যাচ্ছি। কারণ অনেক আশা নিয়ে ফোনটা বের করেছিলাম গিফট গুলো দেবো – এই কথা বলার জন্য। অথচ………?

যাই হোক, ব্যাপার না, সময় সব সময় আপনার সাথে ভালো আচরণ দেখাবে এমনটা নয়, সময় বড়ই অদ্ভুত। এই সময়ের সাথে সাথেই আমাদের চলতে হয়, আরো কত কি! সময় নিয়ে এখানে মহাকাব্য লিখতে চাইনা। তাহলে ইসাবেলা কষ্ট পাবে, আমার প্রিয় পাঠকেরা মনঃক্ষুণ্ণ হবেন।

মশিউর ভাই এর কাছে পরে জেনেছিলাম, বাবার কি এক ব্যবসায়িক কাজে ইসাবেলা হঠাৎ লন্ডন গিয়েছে নাকি। নিজের দেশ, নিজের শহর বলে কথা। আমি আর কথা বলিনি তারপর। আমাকে সে ফেসবুকে কল দিয়েছিল, কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে কথা হয়নি, আবার আমি যখন কল দিয়েছিলাম, সে ফোন কেটে দিয়ে মেসেজ করেছিল, বাবা-মা এর সাথে কথা বলছে। এভাবেই আমাদের ব্যস্ততা আমাদেরকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়। আমার মনে সে যে ঝড় তুলেছিল, তা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। আমি এমন প্রেমে পরবো জানলে এই শহরে কোনোদিন আসতাম না। কিন্তু আপনারাই বলেন, প্রেম কি বলে কয়ে আসে? নাহ! প্রেম আসে হঠাৎ বৃষ্টির মতো করে। আবার এসে চলেও যায় দমকা হাওয়ার মত।

দুই সপ্তাহ কেটে গেল, ইসাবেলার কোনো খোঁজ নেই। অথচ সে গিয়েছিল এক সপ্তাহের জন্য। এদিকে তার জায়গাতে এসেছে নতুন ইটালিয়ান সেকশন বস। ব্যাটা বেশী একটা সুবিধার না, মূর্খ টাইপের কিন্তু কাজে ওস্তাদ। মশিউর ভাই এর বন্ধু সে, আর আমি যেহেতু এতদিন ইসাবেলার স্থানে কাজ করেছি, সবাই আমাকে একটু সম্মানের সাথেই দেখে। আসলে যে যত ভালো কাজ পারবে, তার সম্মানটাই বেশী। আবার কেউ কাউকেই ছোট করে দেখেনা। সবাই সবাইকে সম্মান করে বলেই এরা এতো উন্নত।

আমি ইসাবেলার নাম্বারে, ভাইবারে, ফেসবুকে কোথাও কল করে পাচ্ছিলাম না। এদিকে আগষ্ট মাস শেষের দিকে। সেপ্টেম্বরে আমি চলে যাবো EINDHOVEN – আমার ভার্সিটি খুলে যাবে। হঠাৎ মনে পড়লো, আমাদের অফিসের ডিরেক্টরিতে তার লন্ডনের স্থায়ী ঠিকানা দেখেছিলাম, ব্যস, মশিউর ভাই ঠিকানা বের করে দিল। পরদিনই আমি DEN HAAG এ অবস্থিত ইংল্যান্ড অ্যাম্বাসিতে চলে গেলাম। আমার আগে ভিসা থাকায় নতুন ভিসা পেতে খুব একটা অসুবিধা হলোনা। দশদিনের মাথায় শর্ট টার্ম ভিজিট ভিসা পেয়ে গেলাম। এর মধ্যে একবার ওর সাথে কথা হয়েছিল, ও বলেছিল ও অনেক ভেতরের একটা গ্রামের দিকে ছিলো একটা কাজে। সেখানে নেটওয়ার্ক একটু ঝামেলা করে। এখন নাকি ও বাসাতেই আছে। ও বাসাতে থাকলেই হবে, ওকে চমকে দেবো।

দুপুর নাগাদ LONDON CITY AIRPORT- এ পৌছালাম, একটা বাঙ্গালী রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে ঠিকানা অনুযায়ী রওনা দিলাম, ওদের বাসা একেবারে শহরে না, একটু গ্রাম অঞ্চলের দিকে। মাঝে একটা ট্রেন মিস হওয়াতে পৌছাতে পৌছাতে সন্ধ্যাঁবেলা। বাসার দরজাতে নক করলাম। প্রায় ৩মিনিট পর এক বয়স্ক ভদ্রলোক দরজা খুললেন, বুঝলাম সে ইসাবেলার বাবা। নিজের পরিচয় দিলাম, উনি খুব খুশী হয়ে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। বসতে দিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ইসাবেলা কোথায়? সে কি বাসায় নেই? ওর বাবা জানালো, ও নাকি আবার সেই গ্রামাঞ্চলে গিয়েছে তার মা’র সাথে। মাঝে এসে দুইদিন ছিলো কিন্তু আবার যেতে হয়েছে। সমস্যা হলো, ওদিকে হঠাৎ বন্যায় বেশ কিছু গ্রাম তলিয়ে গিয়েছে।uk flood.jpg

কি ভাবছেন, ইউরোপেও বন্যা হলে শহর কিংবা গ্রাম তলিয়ে যায়? হ্যাঁ, আসলেই তাই, অনেক জায়গা আছে যা খুব নিচু এলাকা, বাঁধ শক্ত হলেও প্রবল জোয়ারে পানি চলে আসে। মানুষ মারাও যায়। এটা খুবই সাধারণ ঘটনা। তো, ইসাবেলা গিয়েছে সেই সব দূর্গত এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে। নেটওয়ার্কও বিচ্ছিন্ন, যোগাযোগ নেই বললেই চলে। নাহ, আমি আসলে এইবার হতাশ হইনি তার সাথে দেখা হলোনা বলে, বরং ইসাবেলা আর তার পরিবারের উদারতায় আমি মুগ্ধ। তার বাবার সাথে কথা বলে জানলাম, উনি উচ্চশিক্ষিত এবং নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য আছে। নিভৃতে থাকার জন্য শহরের এক কোণায় স্থায়ী হওয়া, দুইদিন ছিলাম ওদের বাড়িতে। ওর বাবা অনেক ভালো রান্নাও জানেন। আমাকে ইংলিশ ফুড খাওয়ালেন, নিজের গাড়িতে করে অনেক স্থান ঘুরিয়ে আনলেন। ফ্যামিলি ফটো এলব্যামে দাদা-দাদীর সাথে ছোট ইসাবেলাকে দেখালেন। তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কেও অনেক ভালো জানেন, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সব দিকেই উনি খোজঁ রাখেন, উনার পূর্ব পুরুষদের একজন সম্পর্কে তার চাচা নাকি এক সময় ব্রিটিশ ইন্ডিয়াতে আমাদের বেঙ্গল অঞ্চলে দায়িত্বরত ছিলেন এবং সেখানেই একজন বাঙ্গালী নারীকে বিয়ে করে স্থায়ী হয়েছিলেন।

এদিকে আমি কি করবো তাই ভাবছিলাম, ইসাবেলার সাথেও মনে হয়না সহজে দেখা হবে। যেহেতু এক সপ্তাহের জন্য এসেছি, তাই ভাবলাম, লন্ডনে গিয়ে মামাতো ভাই এর সাথে দেখা করে আসি। ইসাবেলার বাবাকে বললাম, ইসাবেলার সাথে যোগাযোগ হলে অবশ্যই যেন আমার কথা বলেন আর আমার সাথে যেন যোগাযোগ করে। মামাতো ভাই এর বাসায় গিয়ে ছিলাম দুইদিন। সারা লন্ডন শহর ঘুরেছি। ইসাবেলা ছাড়া ঠিক ভালো লাগেনি। অথচ ইচ্ছা ছিলো ইসাবেলার সাথে লন্ডনের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে ঘুরে বেড়াবো। ভালোবাসার নতুন এক অধ্যায় শুরু করবো। তার টোল পড়া গালে আমার ভালোবাসা একেঁ দেবো। নাহ! কিছুই হয়নি। ওর বাবা আমাকে কল দিয়ে জানালো, “ইসাবেলার সাথে যোগাযোগ হয়নি, তুমি আমার এখানে এসো, দেখি আমরা সেখানে যেতে পারি কিনা, এতো কষ্ট করে এলে, আমি কোনো উপকারে আসতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো”। হাতে ছিলো আর দুইদিন। রিটার্ন টিকেট কাটা আছে, যেতেই হবে, তাছাড়া ভার্সিটিতে Re-enrollment করতে হবে। ডেডলাইন পার হয়ে গেলেই বিপদ।

ওদের বাড়িতে পৌছালাম। সকাল বেলাটা একা একা এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করেই কাটলো। বিকেলে রওনা দেবো। রওনা দেয়ার আগে পাশেই একটা কফি শপে টিভি দেখছিলাম আর কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো কফি শপে ইসাবেলার মতো কেউ ঢুকেছে। প্রথম পলকে পাত্তা না দিলেও আবার বাধ্য হয়ে ভালো করে দেখলাম এটাই ইসাবেলা, ঘাড়ে ব্যাগ, সাথে একজন মহিলা, মানে ওর মা। তার মানে ওরা এখানে এসে পৌছেই বাসায় না গিয়ে সরাসরি কফি শপে ঢুকেছে কিছু খেতে কিংবা কিনতে। আমি আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম যে আমার মনের ইচ্ছাটা তিনি পূরণ করেছেন। দেখলাম ওরা সামনের দিকে একটা টেবিলে কফি আর কেক নিয়ে বসেছে। আমি ধীর পায়ে ইসাবেলার পেছনে গিয়ে পেছন থেকে দুই হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরলাম আর ওর মা কে ইশারা দিয়ে জানালাম আমি ফেরদৌস। ওর মা ওর মুখোমুখি বসা ছিল। আমাকে দেখে ওর মা খুব খুশি। আমার কন্ঠ শুনলে চিনে যাবে বিধায় ওর মা ইসাবেলা কে জিজ্ঞেস করলো, কে বলোতো? প্রথমে কি বুঝেই বলে, কে? বাবা তাইনা? আমি তো চুপিচুপি হাসি আর ওর মা ও হাসে, ও বুঝতে পারে ওর বাবা না। তাই দুই হাত দিয়ে আমার হাত, আঙ্গুল স্পর্শ করে হঠাৎ বলে ওঠে, Who is this? I know this hand, Ferdous? বলেই আমার হাত সরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে আমি। পাগলের মতো আমাকে জড়িয়ে ধরেই কান্নাকাটিঃ Oh Ferdous, I missed you, I missed you too much! I tried a lot to make a connection but I couldn’t. I am so sorry. পুরো কফি শপের সব মানুষের নজর এদিকে। সবাই হাত তালি দিয়ে ওঠে। ও লাজুক স্বভাবের হওয়াতে হাত তালির শব্দে লজ্জা পেয়ে শান্ত হয়। আমার হাত সে মোটেও ছাড়বেনা। হাতের আঙ্গুলগুলো হাতের ভেতর নিয়ে রেখে দিয়েছে যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবো, ওর মা ব্যাপারটা লক্ষ্য করে মিটিমিটি হাসছিল। আমাকে পেয়ে ইসাবেলার খুশী ধরেনা, আর আমার কথা নাই’বা বললাম। এই কয়দিন কিভাবে কি হয়েছে সব বললাম, এর মধ্যে ওর বাবাও কফি শপে এসেছে আমাকে খুজঁতে কিন্তু এসে দেখে এদিকে মিলনমেলা বসে গিয়েছে।

চলবে…………….

About The Author
Ferdous Sagar zFs
Hi, I am Ferdous Sagar zFs. I am a Proud Bangladeshi living in abroad for study purpose. I love to write and it's my passion or hobby. Thanks.
7 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment