মিডিয়া-সিনেমা

প্রাক্তন – চলচ্চিত্র

“প্রাক্তন” শব্দটি এই বাংলিশ ভাষার যুগে কম ব্যবহৃত শব্দ। ইংরেজিতে  ex বলা হয়, আমরা সচরাচর ফেসবুকে এই এক্স  শব্দটাই ব্যবহার করে থাকি। তবে সত্যি কথা বলতে প্রাক্তন শব্দটার একটা ওজন আছে। বেশ একটা ভাবাবেগের জন্ম দেয়। চলচ্চিত্রে নামটা যখন শুনলাম, তখনই একটা দেখার ইচ্ছা হল। কারণ এই চলচ্চিত্র যারা পরিচালনা করেছেন তারা কিছুদিন আগেই “বেলাশেষে” সিনেমা দিয়ে বাজিমাত করেছিলেন।

“বেলাশেষে”  সিনেমাটি পরিচালনা করেছিলেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় । এটি রিলিজ হয় ২০১৫ সালে। মুক্তির পর বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিল চারিদিকে। এর মূল কারণ ছিল স্ক্রিপ্ট। সে হিসাবে  শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় জুটির পরিচালনার পরের সিনেমার প্রতি স্বাভাবিকভাবেই একটা আগ্রহ জন্মায়। “বেলাশেষে” এর কাহিনীর মত এটিও ভালবাসার অম্ল-মধুর সম্পর্ক কে প্রাধান্য দিয়ে বানানো। এই সিনেমার কাহিনী ও সম্পর্কের টানা পড়েন নিয়ে। দম্পতির মধ্যে স্পেস সমস্যা নিয়ে। সবাই নিজের ক্যারিয়ার, অফিস কিংবা অন্যান্য বাহ্যিক প্রভাব কিভাবে পরিবারে টেনে আনে, এইসব কিভাবে সম্পর্কগুলোকে প্রভাবিত করে এই নিয়েই কাহিনী। ভালবাসা মানেই নিজেদের সত্তাকে বিসর্জন দেওয়া নয়, আমার ভালবাসার মানুষের চেয়ে নিজের চিন্তা ভাবনা, নিজের জেদ গুলোও সবসময় বড় করে দেখা উচিত নয় – এমন একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে এইখানে। আবার ট্রেনের সহযাত্রীরাও কিভাবে কিছু সময়ের জন্যে মনের কথা প্রকাশের একটা মাধ্যম হয়ে ওঠে সেইটা ও প্রকাশ পেয়েছে। উত্তম কুমারের নায়ক যারা দেখেছেন তারা জানেন ট্রেন কিভাবে চলচ্চিত্রের একটা বিশেষ জায়গা করে নিতে পারে। এই চলচ্চিত্রের সম্পূর্ণ কাহিনীই ট্রেনের কিছু যাত্রী ও তাদের জীবনকে ঘিরে। তারপরও বেশ উপভোগ্য। সমালোচকদের বিচারে হয়ত বেশ কিছু দুর্বলতা বেরিয়ে আসবে, তথাপি আপনি একবার শুরু করলে বুদ হয়ে থাকবেন এইটা বলতে পারি।

তবে এখানে অনেক ধরণের প্রাক্তন বোঝানো হয়েছে। শুধুমাত্র হালের এক্স-লাভার, এক্স-হাজবেন্ড, এক্স-ওয়াইফই নয়, সেটা হতে পারে প্রাক্তন ব্যান্ড দলের সদস্য, পুরাতন কোলকাতা, বাঙালীর জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া বাংলা কবিতা – এইসব নানা রকম প্রাক্তন। এই যেমন ১৫ বছর পর নায়ক-নায়িকার দেখা, ‘ভূমি’ বাংলা ব্যান্ডের সুরজিৎ ও সৌমিত্রের রিইউনিয়ন, সৌমিত্র চট্টপাধ্যায় যখন তার স্ত্রীকে রবিঠাকুরের ‘হঠাৎ দেখা’  কবিতা আবৃতি শোনাচ্ছিলেন তার  মাধ্যমে বাংলা কবিতাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।

তবে এই চলচ্চিত্রে প্রধান দুটি চরিত্র উজান এবং দিপাকে ছাপিয়ে গেছে পার্শ্বচরিত্র মালিনী। চলচ্চিত্রটি দেখা শেষে মনে রাখার মত এই একটা চরিত্র থেকে যায়।অনেক হাস্যরসের মাঝে অনেক গভীর ভাবাবেগের একটা মানুষ বলা যায়। প্রসেনজিৎ-ঋতুর্পণার উজান ও দিপার বাইরেও যে তাকে মনে পড়ে,  এইখানেই স্ক্রিপ্টের একটা দুর্বলতা বলা যায়। এমন অনেক কিছুই আছে যেটাকে বাড়তি মনে হয়েছে। হয়ত ১৫ মিনিট ছেটে ফেললেও চলচ্চিত্রটি আগের মতই থাকত। বিশ্বনাথ ও মানালির দুটি চরিত্র বেশ হাসির জন্ম দেয়।

তবে একটা কথা সত্যি সবার অভিনয়ই প্রশংসার দাবিদার। যতটুকু দুর্বলতা আছে সেটা স্ক্রিপ্টে। জনপ্রিয় বলিউড সিনেমা “ইজাজত” এর সাথে কিছুটা মিল আছে। তবে একঘেয়ে লাগে না একেবারে। একটানা দেখার মত চলচ্চিত্র। যারা বেলাশেষের প্রত্যাশা নিয়ে দেখতে চাচ্ছেন তাদের জন্য কিছুটা অপ্রাপ্তি ঘটবে বৈকি।

 

সংক্ষেপে সিনেমাটির গল্প বলে ফেলি। উজান ও দিপার প্রেম করে বিয়ে। সুখের সংসার ছিল। তবে সবার সংসার জীবনে যা হয়, কিছুটা ভুল বোঝাবুঝিতে তাদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হতে থাকল। দিপা চাইল তারা একসাথে যদি কোথাও ঘুরে আসে তাহলে হয়ত সম্পর্কটা আগের মত হবে। কিন্তু সেখানেও দেখা গেল বিপত্তি। একসময় তারা আলাদা হয়ে গেল। উজান বিয়ে আবার করল, সেই সাথে দিপার দ্বিতীয় বিয়ে। হঠাৎ একদিন দিপা, উজানের দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে ভাগ্যক্রমে একটি ট্রেনের যাত্রায় একই কামরাতে এসে অবস্থান করল। তারা একে অপরের কথা শেয়ার করতে থাকে। দিপা কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারে ইনিই তার প্রাক্তন স্বামীর বর্তমান স্ত্রী। তাদের একটি সন্তানও হয়েছে। মালিনী তার সুখের সংসারের কথা যখন তার কাছে বলছিল, দিপা তখন তার সংসার জীবনের ফেলে আসা দিনের কথা স্মরণ করতে থাকে। মালিনী চরিত্রটি আমাদেরকে অনেক কিছু শিক্ষা দেয়। যেমনঃ কিভাবে সংসারকে আগলে রাখতে হয়, ভাল স্ত্রীর গূণাবলী। এখানে দিপা তার থেকে বুঝতে পারে হয়ত একটু অন্যভাবে চিন্তা করলে সে উজানের সাথে থাকতে পারত। যাই হোক, অবশেষে তারা ট্রেন থেকে নেমে যায়। দিপা, উজানের আবার দেখা হয়। এইদিকে দিপার স্বামী তাকে নিতে আসে। এই কাহিনীর বাইরেও আরও তিনটি কামরার গল্প আসে। কিছু ব্যান্ডের সদস্য, নব্য বিবাহিত দম্পতি, এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দম্পতি।

অনেক মজার দৃশ্য রয়েছে। দেখলে অবশ্যই ভাল লাগবে। বেলাশেষের মত হয়ত দাগ কাটবে না, কিন্তু সম্পর্ক নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাবে। কারো প্রাক্তন থাকলে তাকে নিয়ে নতুন করে হয়ত ভাবতে বসে যাবেন।

এই সিনেমার গানগুলো মনে দাগকাটার মত। “তুমি যাকে ভালবাস” গানটার জন্যে ফিল্মফেয়ার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছেন অনুপম রয়।

চলচ্চিত্রটির পুরষ্কার প্রাপ্তি এক ঝলক দেখে আসিঃ

জিও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, বাংলা ২০১৭

সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী : অপরাজিতা আঢ্য (প্রাক্তণ)

সেরা মিউজিক অ্যালবাম : অনুপম রায় ও অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় (প্রাক্তণ)

সেরা গীতিকার : অনুপম রায় (তুমি যাকে ভালোবাস, প্রাক্তণ)

সেরা সংগীতশিল্পী (নারী) : ইমন চক্রবর্তী (তুমি যাকে ভালোবাস, প্রাক্তণ)

সমালোচকদের বিচারে সেরা অভিনেত্রী : ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত (প্রাক্তণ)

 

ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

সেরা সংগীতশিল্পী (নারী) : ইমন চক্রবর্তী (তুমি যাকে ভালোবাস, প্রাক্তণ)

সেরা গীতিকার : অনুপম রায় (তুমি যাকে ভালোবাস, প্রাক্তণ)

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

ঢাকা অ্যাটাকের বিশ্বজয় ভ্রমণ কাহিনী

Md Rafiqul Islam

সপ্তপদী

Farhana Afrose

লাভ রানস ব্লাইন্ড ( এল আর বি )

Rohit Khan fzs

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy