চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (পঞ্চম পর্ব)

Please log in or register to like posts.
News

চতুর্থ পর্বের পর থেকে,

পারমাণবিক যে লাভা ধীরে ধীরে ফাটল বেয়ে নেমে আসছিল পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক অংশকে গ্রাস করতে, বিশেষজ্ঞরা এর নামকরণ করেন ‘এলিফেন্ট ফুট’। আকৃতিতে কিছুটা মিল থাকায় হাতির পায়ের সাথে মিলিয়ে এই নাম রাখা হয়। এর আকার প্রায় দুই মিটার আর সব মিলিয়ে ওজন হবে ২০০ টন। উত্তপ্ত লাভার মত এই পদার্থকে এখনো বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক পদার্থগুলোর একটি বলে গণ্য করা হয়। ‘এলিফেন্ট ফুট’ এর তেজস্ক্রিয়তা এতোটাই বেশি যে, বিশেষ পোশাক ছাড়া এর কাছাকাছি গেলে ৪ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে মৃত্যু ঘটতে পারে একজন মানুষের। এই গলিত মৃত্যুর ধারা জলাশয়ের পানির সংস্পর্শে এলে যে বিস্ফোরণ ঘটবে সেটি হবে হিরোশিমার আণবিক বিস্ফোরণের কমপক্ষে দশগুণ বড়!

পারমাণবিক এই টাইমবম্বকে পানির সাথে মিশতে না দেবার একটাই উপায় তখন সামনে খোলা ছিল। চুল্লীর নিচের জলাশয় থেকে সব পানি অপসারণ করে ফেলতে হবে। এরপর এই জলাশয়কে এমন ভাবে আটকে দিতে হবে যাতে করে উত্তপ্ত লাভা আর এগুতে না পারে। পরিকল্পনার চূড়ান্ত হবার পরই এর ত্রুটিও সবার চোখে ধরা পরে। বিস্ফোরণের ফলে, জলাশয়ে থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্যে যে এক জোড়া গেট ভালভ ব্যবহার হতো সেগুলো অকেজো হয়ে পরে। জলাশয়ের ভেতরে প্রবেশ না করে সেই ভালভ খোলার আর কোন উপায় নেই। এদিকে ধীর পায়ে হলেও ‘এলিফেন্ট ফুট’ নামের মৃত্যু নেমে আসছে ফাটলের গা বেয়ে। সোভিয়েত কর্তারা সিদ্ধান্ত নেয়, বাইরে থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে সরাসরি জলাশয়ে পৌঁছাতে হবে। ৪০০ খনি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীর নিচের সেই জলাশয়ে যাবার পথ হিসেবে ১৬৮ মিটার (৫৫১ ফিট) সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু করে। এমন বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার আতংক আর মৃত্যু ভয় ছাড়াও, বৈরি আবহাওয়াও তাদের কাজ আরও কঠিন করে তোলে। অবশেষে শেষ হয় সুরঙ্গ তৈরির কাজ। যে খনি শ্রমিকরা এ কাজে অংশ নিয়েছিল তাদের এক-চতুর্থাংশ বয়স ৪০ পেরুনোর আগেই মারা যায় তেজস্ক্রিয়তার কারণে।

মাটির নিচের পথ ধরে জলাশয়ে প্রবেশ করেন পানি নিষ্কাশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মীরা। সেখানেও বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় তাঁদের। গেট ভালভগুলো পানির নিচে ডুবে রয়েছে। চুল্লীর সরাসরি নিচে থাকা এই পানি কতটা বিষাক্ত হতে পারে সেটা পরিমাপ না করলেও ভালভাবেই কল্পনা করা যায়। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও দেশের স্বার্থে আর ইউরোপবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন অকুতোভয় তরুণ ভ্যালেরি বেজপালভ, অ্যালেক্সি আনানেকো এবং বরিস বারানভ তেজস্ক্রিয় পানিতে নেমে ভালভ খুলে জলাশয়ের পানি বের হওয়া নিশ্চিত করেন। এ ঘটনার ২০ দিনের মধ্যে তেজস্ক্রিয়তার সাথে লড়াই করে তিনজনই হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। যদিও তাদের মৃত্যুর সময় নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। দ্বিতীয় এই বিস্ফোরণ আটকানো সম্ভব হলেও হাঁফ ছাড়বার উপায় নেই সোভিয়েত কর্তাদের। মধ্যরাতের চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীর বিস্ফোরণে যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য চুল্লীর ছাদে আর আশেপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল সেখান থেকেও ছড়াচ্ছে বিষাক্তটা। অতিমাত্রায় তেজস্ক্রিয় এই বর্জ্য দ্রুত অপসারণ না করা গেলে পার্শ্ববর্তী চুল্লীর কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই সাথে মানুষের শারীরিক ঝুঁকি তো রয়েছেই।

নতুন এই সমস্যা নিয়ে আবার ভাবতে বসে সোভিয়েত বিশেষজ্ঞরা। ততদিনে তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহতা সবাই জেনে গেছে। এর অসীম শক্তি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে অবলীলায়। সিদ্ধান্ত আসে পারমাণবিক বর্জ্য অপসারণে দূর নিয়ন্ত্রিত রোবট ব্যবহার করা হবে। মহাশূন্য অভিযানে পাঠানোর জন্যে তৎকালীন সোভিয়েত সরকার এ ধরনের রোবট নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছিল। রোবটের সাহায্যে শক্তিকেন্দ্রের ছাদের উপরের পারমাণবিক বর্জ্য (যার বেশির ভাগ ইউরেনিয়ামের টুকরো)নিচে ফেলা হবে। নিচে বিশালাকার ক্রেনের সাহায্যে এই দূষিত পদার্থগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থায় মাটিতে পুঁতে ফেলা হবে যাতে দূষণ ছড়াতে না পারে।

তেজস্ক্রিয়তা কেবল জীবিত প্রাণীদের উপরই নয় সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির উপরও প্রভাব ফেলে। সরাসরি সংস্পর্শে এলে পুরোপুরি বিকল করে দিতে পারে যে কোন যন্ত্রকে। দুইদিন কাজ করার পর তাই একে একে বিকল হতে থাকে সোভিয়েত রোবট। ঘনিয়ে আসা এই বিপদের সমাধানে অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত নেয়া অভিযান পরিচালকরা। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এ কাজে মানুষ ব্যবহার করার। তেজস্ক্রিয়তা-রোধী বিশেষ পোশাক আর টুপি পরে ছোট ছোট দলে ভাগ মানুষ প্রবেশ করবে ইউরেনিয়ামের টুকরো ভরা ছাদে। মাত্র একবার ছাদ থেকে দূষিত ইউরেনিয়ামের টুকরো বাইরে ফেলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে ফিরে যাবে তারা। কারণ ৪৫ সেকেন্ড সময়ের বেশি পারমাণবিক পদার্থের সংস্পর্শে থাকলে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা একশ ভাগ। পালা করে নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক কর্মীরা এই অসম্ভব কাজ করতে থাকে। একই সাথে চলতে থাকে স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা। যার নাম ‘প্রোজেক্ট সার্কোফেগাস’। স্টিল আর কনক্রিটের বিশাল এক কাঠামো এই সার্কোফেগাস। ক্ষতিগ্রস্ত চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে এই কাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০০ টন তেজস্ক্রিয় কোরিয়াম, ৩০ টন বিষাক্ত ধুলো আর ১৬ টন ইউরেনিয়াম আর পটাশিয়াম সার্কোফেগাস এর ভেতর ঢাকা পরে। দুর্ঘটনার ২৪ দিনের মাথায় এর কাজ শুরু হয় এবং ২০৬ দিনের মাঝে এই বিশাল কাঠামো কাজ শেষ করা হয়। বেশ কয়েকটি ধাপে সার্কোফেগাস এর কাজ করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আলাদা আলাদা অংশ তৈরি করে এনে একসাথে জোড়া দিয়ে কাঠামোটি দাড় করানো হয়। ১৯৮৬ সালের নভেম্বরে পুরোপুরি ভাবে ঢেকে দেয়া হয় অভিশপ্ত এই পারমানবিক চুল্লীকে।

অদ্ভুত হলেও সত্যি এতো বিশাল কর্মযজ্ঞে স্বেচ্ছাসেবীদের অবদান ছিল অনেক বেশি। কাগজে কলমে চেরনোবিলের এই বিপর্যয়ে মোট মৃতের সংখ্যা ধরা হয় মাত্র ৩১ জন। পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের কর্মরত ব্যক্তিদের বাইরে সেই তালিকায় আছে প্রাথমিক ভাবে আগুন নেভাতে যাওয়া দমকল কর্মী এবং পানির ভালভ খুলতে যেয়ে মারা যাওয়া সেই তিন বীরের নাম। বিভিন্ন হিসাব থেকে জানা যায় লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বিপদকালিন কাজে অংশ গ্রহণ করেছিল। এদের মাঝে অনেকেই তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয় এবং স্বাভাবিক সময়ের আগে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু সেসব নিবেদিতপ্রাণ মানুষের কোন তালিকা বা পরিচয়য়ের নথি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। চেরনোবিলের মৃত্যু কূপের সাথে তাদের নাম পরিচয়ও ঢাকা পরে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশাল ক্ষমতার আড়ালে।

এভাবেই সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ মানব ইতিহাসের ভয়ানক এই বিপর্যয় সামাল দেয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে পতন হয়, সেই কবর খোঁড়ার প্রথম ধাপ শুরু হয়েছিল এই চেরনোবিল দুর্ঘটনার মাধ্যমে। অদৃশ্য এই মৃত্যু-দূতকে সার্কোফেগাস কি সত্যি ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে সঠিক ভাবে? একত্রিশ বছর পরে আজও কতটা বিপজ্জনক চেরনোবিল এলাকা? সেসব থাকবে ধারাবাহিক এই সিরিজের শেষ পর্বে।

 

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?