Now Reading
মমতার গহীনে



মমতার গহীনে

-আচ্ছা আপনি লাইট অফ করলেন কেন?

-আমি আপনার চোখের দিকে তাকাতে চাইনা।

-মানে?

-আপনার অসাধারন একজোড়া চোখ আছে। খুব লোভনীয়। তাই লোভে পড়ার আগে আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই।

-করুন।

-বিয়েটার ব্যাপারে আপনি কি কিছুদিন সময় চান? আই মিন ভাবার জন্য।

-আপনার দিক থেকে প্রবলেম না থাকলে আমারও কোন সমস্যা নেই।

-না বলছিলাম কি, একজন মানুষকে একবার দেখেইতো চেনা যায়না। আপনি যেমনটা ভাবছেন আমিতো তেমনটা নাও হতে পারি।

বাকিটা জীবন একসাথে থাকতে হবে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু হলেও সময় নেওয়া উচিত।

-আমি আমার পরিবারকে বিশ্বাস করি। তারা আমার ভালো হোক সবসময় চায়।

_____________

 

মেয়েটার প্রতি আমার প্রেমের শুরু তখন থেকেই। তীর গেথে যাওয়ার মত করে আমার হৃদয়েও তার প্রতি ভালোবাসা গেথে গিয়েছিলো নিভৃতে, অজান্তে।

সে গেথে যাওয়া ভালোবাসাকে সঙ্গী করে আজ আমাদের পথচলার তিন বছর। একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান আমাদের। ইরা। ৮ মাস বয়স।

মীমের ব্যস্ততা গুলো এখন ইরাকে ঘিরেই। ইরা পুপু-চুচু টাইপ সংকেত দেওয়াটা লপ্ত করে নিয়েছে ভালো করেই। মেয়ের পুপু-চুচু সংকেতেই মীম বুঝে যায় তার কি লাগবে।

ইরা যদি পুপু-পুপু বলে শব্দ করতে থাকে তাহলে দৌড়ে এসে মীম তার মুখে খাবার তুলে দেয়। পুপু-পুপু মানেই হচ্ছে তার ক্ষিদা পেয়েছে, এবার তাকে খাবার দাও!। আর ডায়পার চেঞ্জ করার জন্য সে চুচু-চুচু করতে থাকে। মানে সে আসল কাজ সেরে ফেলেছে এবার তাকে চেঞ্জ করাও!।

কিন্তু গোসলের জন্য এখনো মনে হয় সে কোন সংকেত আবিষ্কার করতে পারেনি। ডেটল মাখানো পানিতে নামাতেই তীব্র চিৎকারে তুলপার শুরু করে। ভয়ংকার চিৎকার। বাসা জুড়ে বীনা মেঘে বজ্রপাত নয়, একেবারে ঝড় উঠে।

অবশ্য এতে মীম বিরক্ত হয়না। বরং মেয়ের কান্না যেন তাকে আরো যত্ন করে গোসল করানোর জন্য অনুপ্রাণিত করে!। মাঝে মাঝে দুকথার কয়েকটা শাসন। “এই মেয়ে বাবার মত হওয়া চলবেনা, চুপচাপ সময়ের কাজ সময়ে করে নিতে হবে”।

অথচ এমনটা কথা ছিলোনা। কথা ছিলো অক্ষরে অক্ষরে বাবার মত হওয়ার।

 

ইরা তখন ৯ মাসের গর্ভাবস্থায়।

সে রাতে ঝকঝকে পূর্ণিমা। মীমের দীর্ঘশ্বাস গুলো আমার কাধে উষ্ণতা ছড়াচ্ছিলো। সুখের উষ্ণতা। যে উষ্ণতায় ছিলো মা হতে চলা কোন এক মেয়ের ভালোবাসা, মমতা, আবেগ আর স্বপ্নের এক পশলা মিশ্রন। প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসেই ছিলো চীরসুখের এক গভীরতম আভাস।

-আচ্ছা আমাদের যদি ছেলে হয়ে যায়!

-দুই-দুইবার আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে তো মেয়ে হওয়ার সম্ভবনার কথাই বললো। বাকিটা আল্লাহ জানে।

-জানো আমার কেনো জানি মনে হয়, আমার পেটের বাবুটা ছেলে। সে সারাক্ষন শুধু জ্বালায়। তোমার মত!। মেয়ে বাবু হলে আমার মত শান্ত থাকতো! এতো এতো পেটের ভিতরে জ্বালাতন দিতোনা!

-উহু, সে জ্বালায়না। খানিক পরপর সে তোমাকে তার বাবার অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তুমিতো ভুলেই যাও, সারাক্ষন শুধু আমার বাবু আমার বাবু করতে থাকো!

-উহ আসছে অবদান ওয়ালা! আচ্ছা যদি মেয়ে হয় তাহলে তোমার ইচ্ছেমত মানুষ হবে আর ছেলে হলে আমার ইচ্ছে মতো।

-অকে ডান।

-এখন বলো মেয়ে হলে তুমি তোমার মেয়ের কি নাম রাখবে?

-জ্যোৎস্না বানু! আমাদের ঘরে যখন কারেন্ট চলে যাবে তখন আমাদের জ্যোৎস্না বানু ফুরফুর করে আলো ছড়িয়ে বেড়াবে। ছেলের ব্যাপারে তুমি কিছু ভাবছো নাকি?

-এখনো ঠিক করিনি। মনে মনে পাঁচটা নাম বাছাই করে রেখেছি। তারপর যে নামের পাশে মোমবাতির আগুন ভালো জ্বলবে সেটাই রাখবো!

-এগুলো তোমাকে কে শিখিয়েছে?

-আম্মু! ছোটবেলায় নাকি আমার নামটাও এভাবে রাখা হয়েছিলো। তাই আমিও আমার মতো করে আমার ছেলের নাম রাখবো।

-এত পরিশ্রম করতে হবেনা। ছেলে হলে তুমি নাম রাখতে পারো, চাঁদ মিয়া। যে দিনের বেলায় চুরি করে সূর্যের রোদ খাবে আর রাতের বেলায় নিজের নাম করে জ্যোৎস্না বিলাবে। নামে গুনে সমানে সমান! ঠিক তোমার মতো!

-এই সাবধান, আমার ছেলের ব্যাপারে নাক গলাতে হবেনা। নিজের মেয়েকে নিয়েই ভাবো!

 

শেষমেষ এক আলোকবর্ষের সবগুলো আলো একসাথে জড়ো হয়ে মীমের কোল জুড়ে একটা মেয়ে শিশুই আসলো। কিন্তু চীর ধরলো আমার কপালে। মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তা নিয়ে অধিকার খাটানোতো দূরের থাক, আমার ইচ্ছামত নামটাও রাখা হলোনা।

খুব ইচ্ছে ছিলো আমার মেয়ের নাম জ্যোৎস্না বানু হবে। জ্যোৎস্না বানু বড় হবে। কোন এক ঘোর আমাবশ্যায় টেলিফোনের ওপার থেকে কেউ একজন বলে উঠবে, “এই জ্যোৎস্না বানু খুব অন্ধকার জানো। অন্ধকার আমার খুব ভয়ের। আসবে একটু আলো হয়ে আমার ঘরে?

দুজন মিলে আমাবশ্যাকে বুরো আঙুল দেখিয়ে জ্যোৎস্না বিলাস করবো! আসোনা। এপাশ থেকে জ্যোৎস্না বানু খিটখিট করে দু-পাটি হেসে দিবে। লজ্জা মাখা কন্ঠে ফিসিফিস করে বলবে, জ্যোৎস্না বানু তোমার পাশেই আছে। হাত বাড়িয়ে নয়, মন বাড়িয়ে দাও দেখবে জ্যোৎস্না বানুকে ছুঁতে পারবে! ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস আসবে। প্রেমের ছলে ছেলেটির হেরে যাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। নিঃশব্দে দুজন অনেকটা সময় কাটিয়ে দিবে। তারপর হঠাত করে আমাবশ্যা কেটে যাবে!

হলোনা। কিছুই হলোনা। মেয়েটা বড় হলে জ্যোৎস্না বানু দিয়ে একটা ফেইসবুক একাউন্ট খোলার বুদ্ধি দিয়ে দিবো। অবশ্যই ফেইক একাউন্ট হবেনা!

এইতো গেলো নামের কথা। আমি নাকি মেয়েকে অনেক শক্ত হাতে কোলে নেই! তাই যখন তখন চাইলেও কোলে নেওয়া যাবেনা। কোলে নিতে হলে মীম তোয়ালে পেঁচিয়ে মেয়েকে একেবারে শীতকালীন পোশাকের মডেল বানিয়ে দেয়। তাও একগাধা সতর্কীকরন নোটিশ দিয়ে। সবটুকুর অর্থ, মেয়ে যেনো ব্যাথা না পায় কোন ভাবে!

আমিও খুব সতর্ক থাকি। মেয়েকে কোলে নেওয়া মুহূর্তেই আমার কানে বাজে, “ সাবধান মেয়ে যেনো ব্যাথা না পায় কোন ভাবে!”

 

নারী মীম আর মা মীম কে আমি আলাদা করার চেষ্টা করি। পথচলার তিন বছরে আমি কখনোই তার কপালের ভাঁজে বিরক্তির ছাপ দেখিনি। যা দেখেছি সেটা হলো মমতার এক অসীম ক্ষমতা। ঠোঁটের কোনে আলতো হাসি রেখে নরম হাতে সব কিছু সহজ করে আগলে রাখার ক্ষমতা। শর্তহীন ভালোবাসায় সংসারটাকে এক অদ্ভুত মায়া গন্ধে কাবু করে রাখার মতো ক্ষমতা। মেয়েগুলো এমনিই হয়। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির রহস্যে সবচেয়ে বড় রহস্য মেয়ে। যারা চোখে যন্ত্রনা দেখেও অন্তরে ভালোবাসা নিয়ে মুখে হাসি রাখে অতি যত্নে, সাবধানে। বুঝতে দেওয়া যাবে না। কিছু বুঝতে না দেওয়াটা তাদের অনেক বড় একটা দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে তারা সজাগ থাকে বেঁচে থাকার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। বিসর্জনের যুদ্ধে সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হলো নারী। যারা হেরে যায়না কিন্তু হারিয়ে দেয় সকল অনিয়মকে!

 

চাঁদ আজ আলো ছড়িয়েছে নিজের সর্বস্ব দিয়ে। বোকা চাঁদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। লজ্জা পেলো বোধহয়। নিজেকে খানিকটা মেঘের মাঝে লুকিয়ে নিলো। মীম খুব শক্ত করে আমায় জড়িয়ে আছে। হারিয়ে যাবেনা, হারাতেও দিবেনা এমন কঠিন বিশ্বাসের জড়িয়ে ধরা! পাগলীটা হয়তো আমার হার্টবিটের আওয়াজ বুঝতে পেরে গেছে। সেই আমার বেঁচে চলার একমাত্র হাতেখড়ি, আমার বিশ্বাস গুলোর একমাত্র শক্তি। একসাথে দুটি হৃদয়ের ভার বহনের দায়িত্বে ঘাবড়ে গেছে হয়তো। তাই ভয় মেশানো জড়িয়ে ধরার মাত্রাটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে!

-আমার একটা কথা রাখবে?

-বলেই দেখোনা!

-ইরাকে তোমার মতো একটা মীম করে গড়ে তুলবে? ঠিক তোমার মতো।

মীমের দীর্ঘশ্বাস গুলো আমার কাধে উষ্ণতা ছড়ায়। সুখের উষ্ণতা। যে উষ্ণতায় মাখানো মা হয়ে যাওয়া কোন এক মেয়ের ভালোবাসা, মমতা, আবেগ আর স্বপ্নের এক পশলা মিশ্রন। চীরসুখের এক গভীরতম আভাস।

*********************************

About The Author
Sajib Sikder
Sajib Sikder

You must log in to post a comment