সাহিত্য কথা

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৬)

পঞ্চম পর্বের পর থেকে………..

ইসাবেলার বাবা খুব রসিক মানুষ। মজা করে কথা বলেন। এসেই বললেন, একটা ইংলিশ সিংহী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। ভাগ্যিস, বেঙ্গল টাইগার হাতে আচঁড় মারেনি! এটা শোনা মাত্র লজ্জায় ইসাবেলা আমার হাতটাও ছেড়ে দিল। আমরা সবাই হেসে উঠলাম। ওর ফর্সা গাল লাল হয়ে উঠলো।

ইসাবেলা যখন লজ্জা পায়, ওকে খুব মায়াবী লাগে দেখতে। ইচ্ছে করে, সারাজীবন ওর ঐ লাজুক মুখ দেখে যদি সময়টা কাটিয়ে দিতে পারতাম!

এরপর আরো কিছু গল্পগুজব করে বাসায় এলাম সবাই। ইসাবেলার রুমে গেলাম প্রথম। ঢুকেই মনে হলো, একটা ছোট বাচ্চার রুমে ঢুকেছি। খুব বেশি সাজানো গোছানো আর পুতুলে ভরা। সাথে অনেক  ট্রফি। কাছে গিয়ে দেখলাম ট্রফিগুলো সব ক্রিকেটের। আমি তো একেবারেই অবাক! এতদিন দুজন দুজনাকে জানি অথচ সে যে মহিলা লীগে এক সময় ক্রিকেট খেলতো তা আমাকে বলেইনি।

জিজ্ঞেস করলাম, কেন বলোনি যে তুমি ক্রিকেট খেলতে? ও যা বললো, তা একটু কষ্টদায়ক। ফিল্ডিং প্র্যাকটিস করতে গিয়ে তার হাতের হাঁড়ে ফাটল ধরেছিল। বহু দিন ভুগেছিল, অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছিল। তাই ক্রিকেটের প্রতি তার মায়া উঠে গিয়েছিল। আর ক্রিকেট খেলেনি। এমনকি ক্রিকেট খেলাও নাকি সে সহ্য করতে পারেনা।

বললাম, তুমি এগুলো বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছো না মনে হচ্ছে। থাক বাদ দাও। ইসাবেলাকে বললাম, আমি আজ রাতে সবার জন্য রান্না করি, কেমন? ওরা সবাই তো খুব খুশি। পাশের শপ থেকে বাসমতী চাল আর দুইটা চিকেন আনলাম। বাসায় এসেই রান্না শুরু করে দিলাম। ইসাবেলা আমাকে হেল্প করলো।

আমি সত্যিই জানিনা আমি কেমন রান্না করি, আমার রান্না ভালো কি মন্দ আমার বন্ধুরাই ভালো জানে। তবে বন্ধুরা খেয়ে কোনদিন খারাপ বলেনি। কিন্তু সেদিন জানিনা কি হলো, আমার চিকেন-কারী খেয়ে ওরা সবাই মুগ্ধ। এমনকি আমার নিজের কাছেও অনেক সুস্বাদু লেগেছিল। একটু ধনিয়া পাতা দিতে পারলে আরো স্বাদ হতো কিন্তু কোনো দোকানেই পাইনি। শহরের একটু বাইরে হলে এমন সমস্যা হবে এটাই স্বাভাবিক তাছাড়া ইংরেজরা ধনিয়া পাতার সাথে মনে হয়না অতটা অভ্যস্ত।

ইসাবেলার বাবা আমার রান্না খেয়ে তো বলেই ফেললো, “এখানে অনেক টুরিস্ট আসে পাশের ইকো পার্কের জন্যে। আমি একটা রেস্টুরেন্ট খুলে বসি,  তুমি শেফ হও”।

বাংলাদেশী খাবার মানুষ খুব পছন্দ করবে। ইউরোপিয়ান বা ওয়েস্টার্নদের কাছে  যদিও এগুলো ইন্ডিয়ান ফুড নামেই পরিচিত। আই মিন, কারী, মসলা জাতীয় খাবার গুলো। কিন্তু আমি কখনোই ইন্ডিয়ান বলতে আগ্রহী নই। কারণ,  খাবার প্রায় সিমিলার বলে বাংলাদেশী ফুড তো ইন্ডিয়ান ফুড হবেনা তাইনা?

উনাকে বললাম, আমি যে রেষ্টুরেন্টে রান্না করবো, সেখানে শুধু বাঙ্গালী খাবার তৈরী হবে। সাথে ডাচ, পর্তুগীজ, ইটালিয়ান আর ইংরেজি খাবার তো অবশ্যই। কিন্তু কোথাও লেখা থাকতে পারবেনা ইন্ডিয়ান ফুড। কারণ, মানুষ বাংলাদেশী ফুড খেলেও বলবে ইন্ডিয়ান ফুড। ব্যাপার টা এমনই দাঁড়িয়ে গিয়েছে দেখলাম। তাই আমি চাই আমার দেশের খাবারকে হাইলাইট করতে। এর আগে এক ফরাসি মালিককে একই কথা বলেছিলাম, সে রাজী হয়নি, কিন্তু পরে ঠিকই কল করেছিল,  আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।

ইসাবেলার বাবা উদারমনা বাংলাদেশ প্রেমী। তিনি বলেলন, আমিও তো এটাই চাই। উনার কথায় খুব বেশী খুশি হলাম আর আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে, আমি যদি কোনদিন ইংল্যান্ডে স্থায়ী হবার চিন্তা করি তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশী শেফ হিসেবে দায়িত্ব নিবো। উনিও আমার উত্তরে খুশি হয়ে মজা করে বললেন, “কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার শেফ হলে মন্দ হবেনা, আমি অবশ্য দুইটার জন্যই পে করবো, কারণ আমার পুরোনো ল্যাপটপটা প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায় আর আমি ওটাকে এতটাই ভালোবাসি যে ছাড়তেও পারিনা, নষ্ট হয়ে গেলে ঠিক করে দেবে।” উনি বেশ পুরোনো একটা ডেল এর ল্যাপটপ ব্যবহার করেন যেটা ডাক্তারি ভাষায় এক কথায় কোমায় চলে গিয়েছে, মাঝে মাঝে জীবিত হয়, আবার কোমায় চলে যায়।

রাতে ঘুম আসেনা। আকাশে ভরা পূর্ণিমা চাঁদ। ইসাবেলা খুব টায়ার্ড থাকায় ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার একদমই ভালো লাগছিলো না। ওকে তারপরেও ফেসবুকে নক করলাম। কল দিলাম। ঘুম জড়ানো কন্ঠে যখন ফেরদৌস নাম ধরে ডাকে, আমার হৃদয়ে কেমন একটা শিহরণ বয়ে যায়। লিখে বা বলে বোঝাতে পারবোনা এই অনুভূতি। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, এখনও কেন ঘুমাওনি?

বললাম, তুমি একটু বারান্দায় এসো। বাইরে অনেক সুন্দর পূর্ণিমা চাঁদ। ও চোখ মুছতে মুছতে এলো। বিধাতা যেন ওর চোখে মুখে পূর্ণিমাতিথি ঢেলে দিয়েছেন। এসেই বললো, আমাকে এমন মাঝরাতে না ডাকলে কি হতো না? নাহ, হতো না। তোমার সাথে আমার খুব প্রয়োজনীয় কথা রয়েছে। যা না বলা পর্যন্ত আমি একটুও শান্তি পাচ্ছি না। আমায় একটু শান্তি দাও তুমি, প্লিজ। আমার করুণ চাহনি দেখে মনে হলো ওর চোখের ঘুম চলে গিয়েছে। বলে, প্লিজ এভাবে কথা বলে না ফেরদৌস। আমার সাথে কেন এভাবে অসহায় চোখে কথা বলবে? তুমি কি চাও আমি কষ্ট পাই,  বলো?

আমি বললাম, তুমি কেন কষ্ট পাবে? তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? নাকি আমরা শুধুই বন্ধু? আসলে কি?  তুমি আমাকে কোন দৃষ্টিতে দেখো আমি পরিষ্কার জানতে চাই! কষ্টটা কি আমার বেশি না? এভাবে আর কতদিন? আমি তো দিনেদিনে বিরহের অনলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছি। না আমি রাতে ঘুমোতে পারি, না আমি কাজে মন বসাতে পারি, এভাবে চললে তো আমি কয়দিন পর সামনের সেমিস্টারে ফেইল করে বসবো, আর নেদারল্যান্ড সরকার আমাকে বের করে দিবে। কি হবে আমার তখন??

ও বলে, কি আর হবে, তুমি ইংল্যান্ড এর বাসিন্দা হয়ে যাবে। নেদারল্যান্ড সরকার তোমার পরীক্ষায় পাশ না করার দায়ে বের করে দিলেও ইংল্যান্ড সরকার তো তোমাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাবে। নাকি?

আমি ওর কথার আগা মাথা কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করি, মানে কি? কি বোঝাতে চাচ্ছো তুমি? ইংল্যান্ড সরকার বা ইমিগ্রেশন কেন আমাকে আমন্ত্রণ জানাবে? আমি তো এখানে কিছুই না একজন শর্ট টার্ম টুরিষ্ট ছাড়া কিংবা এমন ভিআইপি কেউও হয়ে যায়নি।

আমার কথা শুনে ইসাবেলা হেসে দেয়। সেই ভুবনভোলানো হাসি আমার অন্তর-আত্নাকে কাপিঁয়ে তোলে।

সে আমাকে বলে, এইবার তো শর্ট টার্ম টুরিষ্ট ভিসা নিয়ে কয়েকদিনের জন্য অতিথি হয়ে এসেছো। ইন কেস, কথার কথা বলছি, তুমি যদি আমার কারণে ফেইল করে বসো আর এইজন্য নেদারল্যান্ড ইমিগ্রেশন তোমাকে না রাখতে চায়, পরেরবার ইংল্যান্ড ইমিগ্রেশন তোমাকে সারাজীবন থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানাবে! কি জনাব, এখনো আমার কথা কি তোমার মাথায় ঢোকেনি? নাকি মাথা একদম গোল্লায় গেছে যে এই সামান্য ব্যাপারটিও ধরতে পারছো না?

( আমার প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলছি, আচ্ছা, আপনারা কি ইসাবেলার কথাটা ধরতে পেরেছেন? নাকি আমার মতো এখনো বুঝে উঠতে পারেননি? )

 

চলবে…….

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

জীবনের কালবৈশাখ

Maksuda Akter

আন্ডারগ্রাউন্ডঃ পর্ব ১

ভুতের সাথেই বসবাস!

Maksuda Akter

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy