Now Reading
আজও কেন এমন হয় — পর্ব—২



আজও কেন এমন হয় — পর্ব—২

— আজ যাবার পথে ওদের দেখিনি । কিন্তু ফেরার পথে নির্জন স্থানটিতে  ঠিকই দাড়িয়ে আছে  দেখলাম । ওরা আমার পেছন পেছন ধীরে বাইক চালিয়ে আসছিলো আর দুই পাজী বেসুরো গলায় গাইছিল—‘তু চিজ বাড়ি  হে মাস্ত মাস্ত ।‘  আরেক জন গলা মেলাল–  ‘আমার বাইকের পেছনে হেব্বি সাজিয়ে, তোকে নিয়ে যাবো রে ডার্লিং বানিয়ে ।‘

— এসব অশালীন কথায় আমি ভেতরে ভেতরে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে আছি । আমি একজন শিক্ষক হয়ে এখানে এসেছি । এসব বাক্য আমার তো বটেই , অন্য যে কারও জন্যেও খুবই অশালীন । ওরা হটাত বাইক থামিয়ে দিলো । আমি আরও কিনার ঘেসে হাঁটছি । ওরা বেশ দূরে দাড়িয়ে হা হা করে হাসছে । আর ঠিক তখন  হটাত ফুল স্পিড তূলে আমার গা ছুঁয়ে ছুটে গেল । আমি এমন ভয় পেলাম যে একটি গাছের শেকড়ে পা বেঁধে উপুড় হয়ে পড়লাম ।  আবারও ওরা একটু দূরে দাড়িয়ে কিছু সময় হাসতে হাসতে শিস দিতে দিতে চলে গেল । এদিকে  আমার দুহাতের চামড়া ছিলে গেল ।

—বাসায় ফিরেও মনটা খুব খারাপ  ছিল । বিকেলে  বিলে ঘুরতে চলে গেলাম । এখানটায় এলে আমার মন ভালো হয়ে যায় । কি সুন্দর জায়গাটা । উপরে বিস্তৃত নীল আকাশ, নিচে বিস্তৃত বিল ।  মেঘেরা দুরন্ত বাতাসে ছুটে যাচ্ছে । নিচের পানি তির তির করে কাঁপছে । নড়ছে গাছের পাতারা । নড়ছে ফসলের গাছ গুলো । সাথে শিশুদের আনন্দ কলকাকলি ।

— দুতিন দিন ওদের আর দেখা যায় নি । কখনও একটানা দেখি আর কখনও দুইতিন দিনের জন্য হাওয়া । মনে মনে ভাবি না জানি কোন কুকর্মের জন্য গিয়েছে । আজও  বিকেলে আমি বিলের ওদিকটায় হাঁটছি । হটাতই পেছনে কারও আওয়াজে চমকে তাকালাম। এবং দেখি সেই দুই ছেলে দাড়িয়ে হাসছে । আমি তাকাতেই কালগ্লাস  বলল,  ‘কি ম্যাডাম বাতাস খান?’  ওদেরকে আমি কালো গ্লাস ও লম্বু বলে মনে মনে ডাকি । কারন ওদের একজন সবসময় কালো গ্লাসো পরে থাকে,  অন্যটি বেশ লম্বা ।

—  লম্বু বলল,  ‘ভালো ভালো জিনিস রেখে শুধু বাতাস খাচ্ছেন কেন ?’

— কালো গ্লাস বলল, বাতাস খেয়ে আগে  নিজেরে ফিট করুক, তারপর ভালো জিনিস ভালো হজম হবে।‘

—‘ভাই এক্কেবারে আসল কথা বলছ । শহরের মেম । গ্রামের বাতাস দরকার ।‘

—  ক্ষেতের চিকন আইল জুড়ে ওরা দাড়িয়ে হাসছে আর উল্টো পাল্টা কথা বলছে ।  আইলের এক পাশে ক্ষেত অন্যপাশে ডোবা। মাঝখানে চিকন আইলটি । ওরা না সরলে যাওয়া সম্ভব নয়। আমি বললাম,  ‘সরে দাঁড়ান যেতে দিন।‘  লম্বু বলল, ‘ যান ম্যাডাম যান।‘  কিন্তু কালো গ্লাস বলল,  ‘আগে বলেন কবে খাওয়াবেন।‘

—‘সরে দাঁড়ান ।‘

—‘দাওয়াত না পেলে যে পা নড়ছে না ম্যাডাম ।‘

— ‘মানে?’ আমি বললাম

— ‘মানে? হি হি  মানে?’  দু’জন হি হি করে হাসতে থাকে।

— আমি কঠিন গলায় বললাম,  ‘যেতে দিন।‘

— এবার দুজন দুপাশে সরে দাঁড়ায়। আমি দ্রুত হাঁটছি । এর মধ্যে লম্বু আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল,  ‘খুব খিদা লেগেছে ম্যাডাম। ভুলে যাবেন না । কালকে আপনার বাসায় কি একটু খাওয়াদাওয়ার ব্যাবস্থা করা যায় ? ‘

—কালো গ্লাস বলল,  ‘তুই শালা একটা হারামি । এতো তর তর করছিস কেন ? সময় দে । ম্যাডামকে ,  যান ম্যাডাম সময় দিলাম ।‘

— আমি কোন উত্তর না করে একরকম দৌড়েই বাসায় ফিরে এলাম। অসুস্থতার কথা বলে পরদিন স্কুলে গেলাম না। কি হচ্ছে এগুলো ? এদের কথা কাকে বলা যায় , বুঝতে পারছি না ।

— গতকাল স্কুলে যাওয়া হয়নি। প্রাইমারি স্কুলে ছুটি কম। যেতেই হবে। বাচ্চাদের পড়াশোনার বিষয়টাও আছে । সামনে পরিক্ষা । তাই স্কুলের বড় আপা কথা শোনালেন । এ সময় ছুটি নেয়া চলবে না। বাচ্ছাদের পড়ায় ক্ষতি হবে। পরিক্ষা খারাপ করবে। নানান কথা মাথা নিচু করে দশ মিনিট বড় আপার কথা শুনলাম। আমার সমস্যাও সত্যি বড় আপার কথাও সত্যি। ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য তো দায়িত্বে অবহেলা করা যাবে না।

—আজ পথে দুই যন্ত্রণাকে দেখিনি। এই স্বস্তিটুকু ক্ষণস্থায়ী  জানি,  তারপরও ভালো লাগছে । পথের দুপাশের অসাধারন সৌন্দর্যকে দেখছি । আমার বাংলাদেশের সবুজ সুন্দরতা । আজ কি প্রশান্তি ।  যেদিন ওরা থাকে সেদিন তো কেঁচো হয়ে থাকি । উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকি আপন  গন্তব্যে । অন্ধ বোবা কালা এক অবলা । যদিও আমি নিজেকে ততটা অবলা ভাবি না । কিন্তু এই পরভুমে কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে আছি । ইভ টিজিং বহু দেখেছি । এরা বাড়াবাড়ি করছে । কারও সাথে আলাপ করতেই হয় এসব নিয়ে  ।

— কিছু তো করতে হবেই । কি করি ?  কি করি ? ভাবতে ভাবতে রাতে আমি সুমিকে নিয়ে আব্দুল চাচার বাড়ি গেলাম । আব্দুল চাচা বাড়ি নেই । গঞ্জে  গেছেন । আমাকে দেখে খুব খুশি তিনি । আমি চাচির সাথে বসেই কথা বলতে লাগলাম । চাচি আমাকে আদরে বসালেন ।  চাচি ব্যাস্ত হলেন  আমাকে আপ্যায়নে, প্রথমে লাল রঙের শরবত নিয়ে এলেন। আমি বারবার মানা করার পরও প্লেটে করে চমচম পিঠা, মুড়ির মোয়া, নারিকেলের নাড়ু নিয়ে এলেন। আমাকে খুব যত্ন করে খাবার দিতে লাগলেন। চাচি নিজের হাতের পায়েস কত মজাদার সেটা বলে দাওয়াতও দিয়ে ফেললেন ।

—  কিন্তু আমিতো এসেছি ঐ পাজী দুই ছেলের ব্যপারে কথা বলতে ।  কিন্তু কিভাবে কি বলবো বুঝতে পারছিনা । চাচি ভীষণ খুশি মনে হাসছেন আর কথা বলছেন  কত কথা । আমার কথা উনার কথা । কত কি । এতদিন এলাম না কেন সেই অভিযোগ করলেন ।  তিনি গেরস্ত বাড়ির বউ । কোথাও বের হন না। বাড়ির কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন । অতএব আমি যেন সব সময় যাই । ব্যবহারে কি ভীষণ অমায়িক ।  গাঁয়ের সুদ্ধ সরল পরিচ্ছন্ন মন । বাংলার চির চেনা এক নারী । আর সেই একই গাঁয়ের এমন দুর্মুখ ছেলে, অবাক কাণ্ড। এই দুটো পাজী একেবারেই দলছুট।

— কথার এক সুযোগে আমি ওই দুটি ছেলের কথা জিজ্ঞেস করলাম। থমকে দাড়িয়ে গেলেন তিনি ।  ‘কার কথা বলছেন টিচার  আপা ?’ এতক্ষনের হাসিখুশি মানুষটি মিইয়ে গেলেন যেন  মুহূর্তেই ।

চলবে————-।

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা – রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

About The Author
Salina Zannat
Salina Zannat
2 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment