সাহিত্য কথা

আমার ভালোবাসার রাজকন্যা : পর্ব- ০১

অনেকদিন কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। ক্লাস, পরীক্ষা দিতে দিতে রীতিমত হাঁপিয়ে উঠেছি। কোন জায়গা থেকে যদি ঘুরে আসতে পারতাম। একদিনের জন্য হলেও এই ব্যস্ত ঢাকা শহর ছেড়ে একটু শান্তির পরশ পাওয়ার জন্য ছুটি পেতে মন খুব ছটফট করছিল। সেমিস্টারের শেষ ফাইনাল পরীক্ষা আজ। শেষ হলেই বাঁচি। কয়েকদিন ধরে পড়ার যেই চাপ চলছে, পড়তে পড়তে আবার পাগল না হয়ে যাই। পরীক্ষার পড়া শেষ করতে করতেই দেখি সকাল ১০ টা বেজে গেছে।

১০.৩০ থেকে তো পরীক্ষা শুরু……………

ওহ, আজকেও দেরী হয়ে গেল। নাহ আমাকে দিয়ে আর হবে না। নিজেকে গালমন্দ করতে করতে কোনরকম গোসল করে, নাকমুখ বুজে কিছু খেয়ে ছুটলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে। কপালটা ভাল যে বিশ্ববিদ্যালয়টা কাছেই আছে বাসার, নাহলে আজকে আর পরীক্ষা দেয়া লাগত না। ক্যাম্পাসে গিয়েই দেখি বন্ধুরা সব বই নিয়ে যেই ভাবে পড়ছে, সারা বছর যদি এমন ভাবে পড়ত, তাহলে কে যে প্রথম হত সেটা শিক্ষকদের বাছাই করতে ঘাম বের হয়ে যেত।

যাই হোক, শিক্ষকদের আর না এখন  জ্বালাই।

আমাকে দেখেই আকাশ বলে উঠল, “কিরে বিজয়, আজকেও দেরী করে এসেছিস। একটু আগে রওয়ানা দিলেই তো পারিস। কোনদিন এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে দম না শেষ হয়ে যায় তোর?”  আমিও তবে রে, বলে ধাওয়া দিলাম ওকে।

আকাশ আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সেই ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছি। এখনো বন্ধুত্বটা কিন্তু আগের মতই আছে।

হঠাৎ মিলির সাথে দেখা…………………

মিলি হচ্ছে সেই মেয়ে, যার উপর পুরো ক্যাম্পাসের সব ছেলেরাই ক্রাশ। আর আমি তো একটু বেশি ক্রাশ। শুধু ভয়েই কিছু বলতে পারি না। আমার সাথে মিলি কথা বলতে এলেই আমার হাত পা কাঁপতে থাকে। এটা ভয়ে নাকি নার্ভাসে তা জানি না। এত মিষ্টি একটা মেয়ে, ভয় পাওয়ার তো কথা না। তাহলে, নার্ভাস হবে হয়ত। এসেই জিজ্ঞাসা করল, “হাই বিজয়, কেমন আছো? পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন?” শুনেই তো আমার বুক দুরুদুরু করা শুরু হল। তাও সাহস নিয়ে বললাম, “এই তো ভাল আছি। তুমি কেমন আছো?” মাথা নেড়ে জানালো যে ভালই আছে। এরপর পরীক্ষা নিয়ে টুকটাক কথা বলতে বলতে, পরীক্ষা শুরুর সময় হয়ে যাওয়ায় সবাই যে যার সিটে গিয়ে বসলাম।

এরপর কোন রকম পরীক্ষা দিয়েই ক্যাম্পাসে আড্ডা শুরু আমাদের। অনেকদিন পর আজকে একটু ছুটি পেলাম। বন্ধুদের সাথে আড্ডা, দুষ্টুমির ফাঁকেই, মিলিকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলাম। মাঝ মাঝে হাসছিল। হাসলে ওকে অনেক সুন্দর লাগে। একটু পরেই মিলির চোখে ধরা পড়ে গেলাম। আমার দিকে জিজ্ঞাসু ভঙ্গীতে তাকাতেই, আমি শুধু মুচকি হেসে মাথা নেড়ে অন্যদিকে তাকালাম। কেন জানি মিলির চোখে চোখ রাখতে লজ্জা লাগে। কিন্তু অন্য মেয়েদের বেলায় এটা হয় না। শুধু মিলির বেলায় কেন হয়, বুঝি না আমি।

আড্ডার এক ফাঁকে হঠাৎ রিয়াদ প্রস্তাব করল, “দোস্তরা, পরীক্ষা তো শেষ। চলো না, কোথাও থেকে ঘুরে আসি।” কথাটা শুনেই তো আমি এক পায়ে রাজি। এটাই তো চাইছিলাম।

সবাই প্লান করা শুরু করলাম, যে কোথায় যাওয়া যায়। কেউ বান্দরবান, কেউ সিলেট বা কক্সবাজার প্রস্তাব করলেও, এই গরমে এত দূরে যেতে মন চাইছিল না। আর সাথে মেয়েরাও আছে। তাই ১ দিনে গিয়ে আবার ফেরত আসা যায়, এমন কোথাও যেতে হবে। এর ভিতর মিলি প্রস্তাব করল,  “আমরা ফরিদপুর যেতে পারি।” শুনেই তো কেউ হাসে, কেউবা নাক সিটকায়, যে বাংলাদেশে এত জায়গা থাকতে এই মেয়ের ফরিদপুরে যাওয়ার কথা কেন মনে হল।

রিয়াদ মিলিকে বলল, “আচ্ছা মিলি, ফরিদপুর যে যেতে চাও সেখানে কি কিছু আছে ঘুরে দেখার মত?”

মিলি বলল, “অনেক কিছুই আছে দেখার মত। আসলে আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা হবার কারণে, বাবার প্রায়ই বিভিন্ন জেলায় বদলী হওয়া লাগে। আর আমাদেরও ছোটবেলা থেকে একেক সময় একেক জেলাতে যেতে হত। অনেক জেলাতেই গিয়েছি, থেকেছি, কিন্তু ফরিদপুর শহরটা একটু অন্য রকম ভাল লেগেছে। ছোট শহর। কোন কোলাহল নাই। গাড়ির আধিক্য নেই, কালো ধোঁয়া নেই। শান্তিতে ১ টা দিন ঘুরে বেড়ানো যাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা ওখানে আমাদের পল্লীকবি জসীম উদ্ দীনের বাড়িও রয়েছে। যেখানে কবি তার জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন, অনেক কবিতা লিখেছেন।

যাই হোক, অনেকে রাজি না হলেও, কি আর করা, মিলির কথা বলে কথা। শেষ পর্যন্ত সবাই রাজি। আর আমি তো এক পায়ে রাজি।

প্লান করা হল, আগামী পরশু দিন সকালে আমরা ফরিদপুর যাচ্ছি পল্লীকবির বাড়ি দেখতে। দেখতে দেখতে দিন কেটে যেতে লাগল। কিন্তু যাওয়ার আগের রাতটা আর শেষ হতে চায় না। কখন সকাল হবে আর কখন যে যাব। হঠাৎ ঘুমানোর মাঝে স্বপ্ন দেখলাম বাসে আমরা যাচ্ছি। আমি মিলির পাশের সিটে বসে আছি। বাসের খোলা জানালা দিয়ে বাতাস আসছে, আর তাতে মিলির চুল আমার মুখের উপর বার বার চলে আসছে। সে যে কি রকম ভাল লাগার মুহূর্ত বলে বোঝানো যাবে না। যার সাথে এমন ঘটে শুধু  সেই বুঝে।  হঠাৎ দেখলাম, বাস আঁকা বাঁকা দুলছে। ভাবলাম এমন হচ্ছে কেন। ড্রাইভার কি ঘুমায় ঘুমায় গাড়ি চালাচ্ছে নাকি।

এমন মুহূর্তে হঠাৎ কানে এলো যে মা বলছে, “এই বিজু , উঠিস না কেন। তুই না পিকনিকে যাবি? ( মা আমাকে আদর করে বিজু বলে ডাকে। মানে মায়ের অতি আদর ভালোবাসায় বিজয় নামটা সংক্ষেপে বিজু হয়ে গিয়েছে )। চোখ খুলে দেখি, মা আমাকে ধরে ধাক্কা দিচ্ছে। আর আমি কিনা ঘুমের মধ্যে ভাবছিলাম বাস ঝাঁকি খাচ্ছে। হা হা।

ঘড়িতে দেখি ৫.৩০ বাজে…………………………

আমাদের গাবতলীতে থাকার কথা সকাল ৬.৩০ এ। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে, নাশতা করে, বাবা মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চললাম পল্লীকবির গ্রামে। যার কবিতা এত পড়েছি আজ কিনা তার বাড়ি দেখতে যাচ্ছি আমরা। অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছিল। এত সকালে  ঢাকার রাস্তা পুরো ফাঁকা। যদি এমন ঢাকা শহর থাকত সবসময়।

গাবতলী গিয়ে দেখি আমাদের ২-৩ জন এরই মধ্যে চলে এসেছে। রিয়াদ আগেই আমাদের সবার বাসের টিকেট কেটে রেখে ছিল। আস্তে আস্তে বাকী সবাই চলে এসেছে। কিন্তু আমার চোখ যে খুঁজছে অন্য কাউকে। বাস ছাড়তে আর মাত্র ৫ মিনিট বাকি।

 

কিন্তু আমার রাজকন্যা কোথায়?

 

সবাই এসেছে কিন্তু মিলি যে এখনও আসে নাই। মনে মনে ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম যে মিলি না আসলে, আমিও যাব না।

এটা ভেবেই যেই বাস থেকে নামলাম, অমনি দেখি বাসের একটু দূরে, লাল-কালো সালোয়ার কামিজ পরিহিতা এক যুবতী বাসের দিকে আসছে। দেখেই মনটা খুশিতে ভরে গেল। কারণ সে তো আর কেউ নয়, সে যে আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যাটি। মিলিকে আজ দেখতে পুরো স্বর্গের অপ্সরী লাগছে। যদিও কোনদিন স্বর্গের অপ্সরী দেখি নাই। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে মিলির সৌন্দর্যের কাছে স্বর্গের অপ্সরীরা তো কিছুই না। দৌড়ে গেলাম তার কাছে। আমাকে দেখেই হাই বলে উঠল। বলল, “কোথায় যাও?”

বললাম, “কোথাও না। সবাই এসেছে কিনা তাই খোঁজ নিচ্ছিলাম।”

মিলি বলল, “সবাই চলে এসেছে?”

আমি বললাম, “সবাই এসেছে, শুধু তুমি বাদে। তাড়াতাড়ি চলো, বাস ছেড়ে দিবে।”

তাড়াতাড়ি হেঁটে বাসে উঠতেই মিলিকে দেখে সবাই হই হই করে উঠল। মিলি সবার সাথে কুশল বিনিময় করতে করতে সবাই যে যার মত সীট নিয়ে বসে পড়ল। আর ছেলেরা সবাই মিলিকে অনুরোধ করছিল তাদের পাশে বসতে। মিলি শুধু অল্প হেসে তাদের ধন্যবাদ দিয়ে সেঁজুতির সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। এর মধ্যে বাস ছেড়ে দিল। আমার সীট আবার শেষের দিকে পড়েছে, ভাবলাম মিলি তো আর এত পিছনে বসতে আসবে না । তাই কিছুটা হতাশ হয়েই কানে হেড-ফোন লাগিয়ে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রাস্তার পাশের দৃশ্য দেখছিলাম।

এভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর হঠাৎ দেখি মিলি পিছনে আমার দিকে আসছে। ভাবলাম, “কাহিনী কি আবার?” কান থেকে হেড ফোন টা নামাতেই, রাজকন্যাটি  আমার সিটের পাশে এসে মিষ্টি করে হেসে বলল, “কি করছ একা একা? ওদিকে সবাই বাসে হই-হুল্লোড় করছে।”

বললাম, “আমার হই-হুল্লোড় ভাল লাগে না। নিরিবিলিকেই উপভোগ করতে বেশী পছন্দ করি।”

মিলি মুচকি হেসে বলল, “তুমি তো দেখছি আমার মত। আমিও কোলাহল খুব একটা পছন্দ করি না। আচ্ছা, আমি কি তোমার পাশে একটু বসতে পারি?”

কথাটা শুনতেই আমার হার্ট বিট গেল বেড়ে। আরে, মনে মনে যার পাশে বসতে চাইছিলাম, এখন সে কিনা আমার পাশেই বসতে চাইছে। যদিও আমি কিছু বলার আগেই, মিলি আমার অনুমতির তোয়াক্কা না করেই বসে পড়ল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি বাসের বেশ কয়েকজন আমাদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখছে। যা হোক, আমি ওদের গুরুত্ব দিলাম না। কিন্তু মনে মনে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান ভাবছিলাম। যেই মেয়ের উপর সবাই ক্রাশ, আর সেই সুন্দরী মিষ্টি মেয়েটি কিনা আমার পাশে বসে আছে। এরপর দুইজনের টুকিটাকি কথা, বন্ধুদের হই-হুল্লোড় আর বাসের অন্য যাত্রীদের উঁকিঝুঁকির ভিতর দিয়েই আমাদের বাস  চলতে লাগল ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে ।

( চলবে )……………………

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

প্রেম কাহিনী – ২ এবং শেষ পর্ব

Samiul Santo

প্রতারিতের প্রতারণা

Rihanoor Islam Protik

রহস্য চারিদিকে পর্ব—১

Salina Zannat

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: