Now Reading
প্রেমের একটু গভীরে!



প্রেমের একটু গভীরে!

 

রাত ২ টা।

বৃষ্টি ঘুমহীন চোখে  বিছানায় গা-দুলিয়ে বসে আছে। অপেক্ষা শব্দটা তার মাইগ্রেনের ব্যাথা বাড়িয়ে দিচ্ছে। চয়নের ফোন ওয়েটিং। সকাল ৮টায় ক্লাস করবে বলে বৃষ্টি আজ ১২টার মধ্যেই ঘুমাবে এই পণ সে সেই সন্ধ্যা বেলাতেই করে রেখেছিলো। সময়ের সাথে সেই পণ হেরে গিয়ে এখন অসহ্য যন্ত্রনার মাথা ব্যাথার সাথে হাত মিলিয়েছে। তাদের নতুন আরেকটা পণ, আজ তাকে ঘুমোতে দিবেনা! বৃষ্টিও তাদের যৌথ মিশনের কাছে তাকে জিতাতে চায়না, বরং হেরে গিয়ে অসহ্য যন্ত্রনা কে সহ্য ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত করাতে চায়। কারন এটাও যে তার একটা বড় পণ, সে প্রতিরাতে চয়নকে শুভ রাত্রি বলেই ঘুমোতে যায়!

শেষবারের মতো কলটাও তাকে নিরাশ করলো। ওয়েটিং। ব্যার্থ প্রচেষ্টায় অপেক্ষার কাছেই সে হেরে গেলো । কাঙ্ক্ষিত জয়ের পথে পরাজয় বরন করে নেওয়ার একটা সুফলও রয়েছে বটে। অবাঞ্ছিত চোখের পানি। যা কষ্টগুলোর গভীরতা নির্নয় করে উত্তপ্ত নিউরন গুলোকে ঠান্ডা করে দিয়ে বিশ্রামে পাঠায়। বৃষ্টিও বিশ্রামে। তবে ঘুমের ফাকেও  তার অজান্তে অনুমতিহীন চোখের পানি গুলো গালের উপর সরলরেখা একে যাচ্ছে অনবরত!

রুপবতী মেয়েদের কান্নার পর রুপে এক ধরনের সরলতা চলে আসে। অবিরাম বৃষ্টির পর মেঘ মুছে আকাশের বুকে নিখাদ সরলতার যে নীল রেখা ফুটে উঠে একরকম ঠিক সেই সরলতা। এই সরলতা চোখের তৃপ্ততা বাড়ায়। আপাতত আয়না ছাড়া এ তৃপ্ততার ভাষা বুঝার মত বৃষ্টির আশেপাশে কেউ নেই। বৃষ্টির হয়তো ভালো লাগতো যদি আয়না মুখ ফুটে বলতে পারতো “বৃষ্টি তুমি খুব সুন্দর”! গ্রহের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটাকে প্রতিনিয়ত আমার মধ্যে ধারন করতে পারায় আয়না সমাজ আজ আমাকে নিয়ে গর্বিত। আমাদের সমাজে সুযোগ পেলেই সকল আয়নারা আমাকে নিয়ে যার যার অবস্থান থেকে আনন্দ মিছিল করে, উচ্ছ্বাসের বৃষ্টি নামায়! মিছিলের স্লোগান হয় “ধন্য মোরা ধন্য, বৃষ্টি তোমার জন্য”! বৃষ্টি চুপচাপ। বোবা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে ৮ টায় ক্লাস মিস করার ব্যর্থতার বেদনায় কেমন ঘাবড়ে যাচ্ছে। কতদিন ক্লাস করা হয়না!

আজ তার একটা বড় কাজ। চয়ন শেষ রাতে মেসেজ দিয়ে রেখেছে। সে আজ দেখা করতে চায়। তাই সে আজ সাজবে। ঠিক চয়নের পছন্দের সাজে। নীল শাড়ীতে ঠোটে হালকা লাল রঙের লিপস্টিক। কপালে একটা মৃদু টিপ। চুল গুলোকে খোলা রেখে হাতে নীল রঙের চুড়ি। কানে ছোট করে ইচ্ছে রঙের এক জোড়া দুল। তাদের প্রথম দেখায় বৃষ্টি ঠিক এভাবেই সেজে গিয়েছিলো। চয়ন সেদিন কোন কথা না বলে টানা ৩০ মিনিট বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিলো। বৃষ্টিকে অবাক করে দিয়ে ৩০ মিনিট পর চয়ন কথা বলেছিলো তাও আবার রবি ঠাকুরের কবিতা দিয়ে,

“তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি

শত রূপে শত বার

জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।

চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়

গাঁথিয়াছে গীতহার,

কত রূপ ধরে পরেছ গলায়,

নিয়েছ সে উপহার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার”।

কবিতাটা এখনও তার মনে গেঁথে আছে। সাথে সাজটাও!

বর্ষার আকাশে ঘন কালো মেঘ। ঘন মেঘের মিছিলের ভীরে সূর্যটাও যেন হারিয়ে গেছে কোথায়। তাই বাধ্য হয়ে বিকালটা আলো হারানোর পথে। আঁধার অনেকটা ছেয়েছেয়ে ঝেঁকে বসেছে সবকিছুতে। বিকেলের আবছা অন্ধকারে বৃষ্টি ও চয়ন দুজন মুখোমুখি দাড়িয়ে। দেখে বুঝার উপায় নেই তারা একে অপরকে চিনে অনেকদিন। প্রায় ৭২২ দিন! মনে হচ্ছে আচমকা রাস্তায় ধাক্কা খেয়ে অপরিচিত দুইটা মানুষ প্রবল বিরক্তি নিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। যেকোন মুহূর্তে কেউ একজন অন্যজনের দিকে দোষের আঙুল তুলে প্রবল জোড়ে একটা ধমক দিবে!

অথচ এমনটা কখনো হয়নি। বৃষ্টি ও চয়নের দেখা করার একেকটা দিন ছিলো ডায়েরিতে লিখে রাখার মত বিশেষ দিন। বৃষ্টি লিখেছেও! প্রথম দেখার পর বৃষ্টি ডায়েরিতে কি যে সব হাবিজাবি লিখেছিলো। তার মনে হয়েছিলো হাবিজাবি। অবশ্য লেখার পর প্রতিটা লেখকেরই সে লেখাকে হাবিজাবি মনে হয়। তবে কি বৃষ্টি সেদিন দিন থেকেই লেখিকা হয়ে গিয়েছিলো? ডায়েরি লেখিকা বৃষ্টি সেদিন লিখে ছিলো, “ছেলেটা কেমন বোকার মত তাকিয়ে ছিলো! একনাগারে যেভাবে তাকিয়ে ছিলো আমিতো ভেবেছিলাম বোবা নাকি! তবে তার তাকিয়ে থাকার মধ্যে কি যেন একটা ছিলো। সে একটা কিছুর মধ্যে আমি নিজেকে খুজে পাচ্ছিলাম অদ্ভুত ভাবে। আমার প্রতিটা হার্টবিট যেন তীব্র আরাধনা আর সাধনায় খুজে পাওয়া ভালোবাসার গান করছিলো। আমার ধম বন্ধ হয়ে আসছিলো তার মুখ থেকে শুধু একটা শব্দ শোনার জন্য। অথচ ছেলেটা কেমন টপটপ করে আস্ত একটা কবিতা বলে ফেললো! আমারতো কবিতা পছন্দ নয়। তবে এ কবিতায় আমার শান্ত হৃদয়ে হঠাত যে অশান্ত ঝড় বয়ে এনে দিলো তার নামই কি তাহলে প্রেম? বুঝার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ছেলেটা যখন আলতো করে আমার আঙুল ছুঁয়ে দিলো আমি যেন প্রবল ধাক্কায় কোন অতল সমুদ্রে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আচমকা পড়ে গেলাম। মনে মনে প্রার্থনা করে নিলাম, আমি এই সমুদ্রটাকে চাই। এখানে ডুবে থাকতে চাই। তলিয়ে যেতে চাই ভালোবাসার ওজনে। ছেলেটা এইভাবে আঙুলে আঙুল চেপে ধরে রাখবে তো আমায়? সব সময়, সারাজীবন! আচ্ছা আমি ওকে বারবার ছেলে বলছিলো কেনো? তারতো একটা নাম আছে। আমি চয়ন নামের এই ছেলেটাকে ভালোবাসি!”

আরেকদিন কি হলো, এক টিপটিপ বৃষ্টির দিন বৃষ্টির খুব মন চাচ্ছিলো একটা কদম ফুল তার খোঁপায় গেঁথে রাখতে। চয়ন সেদিন সারাবেলা হন্য হয়ে শহর জুড়ে কদম ফুল খুজে বেড়িয়েছিলো। পায়নি। ভিজে ভিজে কাঁক ভেজা হয়ে কদম না নিয়ে এসেছিলো বৃষ্টির কাছে। তার চেহারায় সে যে কি ভয়! কদম না আনায় বৃষ্টি যদি রাগ করে কিংবা মন খারাপ কিংবা অভিমান করে তখন সে কি করবে? ভয় চেহারায় কাঁপা হাতে সে একটা কাগজ তুলে দিলো বৃষ্টির হাতে। পেন্সিল দিয়ে সেখানে আঁকা ছিলো একটা কদম ফুল! চয়ন চুপসে যাওয়া ভীতু কন্ঠে বলে উঠলো, প্লিজ রাখো? আমি গাছের কদম ফুল পাইনি। তাই তোমার জন্য হৃদয় দিয়ে কদম ফুল এঁকে এনেছি। এটা আমার হৃদয়ের কদম ফুল! বৃষ্টি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো চয়নের দিকে। বৃষ্টি ভাবে এই ছেলেটা এমন কেন? কেমন পাগল! সে রাতে সারারাত বৃষ্টি পেন্সিলে আঁকা কদম ফুল বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছিলো। তারপর সেই তারিখের গল্পটার সাথে আঁকা কদম ফুলটাকেও ডায়েরিতে আটকে দিয়েছিলো খুব যত্ন করে।

ডায়েরিতে যায়গা পাওয়া এমন অসংখ্য গল্পের চিরচেনা সঙ্গী চয়নের সামনে বৃষ্টি দাড়িয়ে আছে এক অচেনা দৃশ্যপটে। নিরবতা ভেঙ্গে হঠাত চয়নের শব্দ!    

– আমাকে ক্ষমা করে দিও বৃষ্টি!

– তোমার অপরাধ?

– তুমি মনে হয় এতদিনে ধরতে পেরে গেছো!

– কিন্তু তোমার অপরাধ নিয়েতো আমার মনে কখনো কোন প্রশ্ন তুলিনি। তাহলে ক্ষমা শব্দটা কেনো আসবে?

– কারন তোমার এমন নির্লিপ্ততাও আজ আমার ভালো না লাগার অংশ।

বৃষ্টি হাসে। বৃষ্টি কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে চায়। ভালোবাসার দোহাই দিয়ে চয়ন যেদিন তার পুরো শরীর চষে বেড়িয়েছিলো ঠিক সেদিন থেকেই বৃষ্টি নির্লিপ্ত। সেদিনের পর থেকে চয়নকে আর আগের মতো করে এক মুহূর্তের জন্যেও সে পায়নি। ঠিক যে চয়নে সে অভ্যস্ত, যে ভালোবাসায় সে তটস্থ। তারপর থেকে যেনো চয়নের কাছে বৃষ্টি চরম এক অবহেলার নাম, অনাকাঙ্ক্ষিত কিছুর নাম। তবে কি নিজেকেই সপে দেওয়া ছিলো তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ? চয়নের শারিরীক চাহিদার জোরাজুরিকে ভালোবাসার সাথে এক করে ফেলাই কি ছিলো তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ? সেতো চয়নকে ভালোবেসেছিলো। একান্ত নিজের মনে করে ভালোবেসছিলো। তবে একান্ত নিজের ভেবে ভালোবাসাটাই কি জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ? তার নিজের উপর প্রচন্ড ঘৃনা হয়। ঘৃনা আর ক্ষোভে ঝলসে যাওয়া বৃষ্টি শেষবারে মত আওয়াজ করে,

– সত্যিই চলে যেতে চাও?

– হ্যা। এখন, এই মুহূর্তে সব কিছু শেষ করতে চাই। পারলে ক্ষমা করো।

বৃষ্টি কি ক্ষমা করবে চয়নকে? অথবা নিজেকে? দুটি মানুষ দুটি পথের অভিমুখী। ফিরে তাকানোর তীব্র বাসনায় মন ছিঁড়ে গেলেও ইগোর স্বৈরশাসনে বৃষ্টি আপন পথে অনড়। আকাশটা কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। এতক্ষনের একটু থাকা আলো গুলোও কেমন অন্ধকারে এক হয়ে যাচ্ছে। বজ্রপাতের উজ্জ্বলতা খানিকের জন্য চোখ ছুঁয়ে গেলেও সেই উজ্জ্বলতা মন অবধি পৌছায়না। বরং আঁধারের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।  বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টিতে বৃষ্টি ভিজে যাচ্ছে। প্রকৃতির নিদারুন খেলায় এক বৃষ্টি মেঘ থেকে ঝরে পড়ার আনন্দে অশ্রু ঝরায় অন্য বৃষ্টি মন ভাঙ্গার বেদনায় অশ্রু লুকায়। মিতার বন্ধনে আবদ্ধ একমাত্র এ বৃষ্টিরাই জানে খবর, জগতের এ ভালোবাসার খেলায় কে কার কতটা আপন কিংবা পর!

*****************

 

About The Author
Sajib Sikder
6 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment