সাহিত্য কথা

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৭)

ষষ্ঠ পর্বের পর থেকে……

আমি আসলে ইসাবেলার কথা সম্পূর্ণভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম, একটু না বোঝার ভান করেছিলাম এই জন্যই যে আমি তার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম।  তার কথাটা ছিল মূলত এটাই যে, সে আমাকে বিয়ে করে ফেললে আমি এমনিতেই ইংল্যান্ড এর বাসিন্দা হয়ে যাবো। এই আর কি!

কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমি এমনটা কখনওই চাইনা। পাস তো আছেই সাথে আমার যথেষ্ট যোগ্যতা আছে ৭৫% মার্ক্স তুলে স্কলারশিপ পাবার। কিন্তু স্টাডি যে খুব ইজি তা নয়। আমি যখন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন দেখেছি শিক্ষকেরা জানেন না কিভাবে প্রোগ্রামিং করতে হয়। কারণ তারা জানবেন কিভাবে? তারা তো ছাত্র থাকাকালীন সময়ে রাজনীতি আর ভণ্ডামি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। শিক্ষকদের বাসায় ইলিশ মাছ নিয়ে পাস করে লবিং করে শিক্ষক হয়েছেন। আমাদের কি শেখাবেন? আমাদের নিজেদের দায়িত্বে পড়াশুনা করতে হতো। কিন্তু এখানে? বেশিরভাগ শিক্ষক PhD করা। তাদের জ্ঞানের পরিধি সুদূর বিস্তৃত। ক্লাস লেকচার ২ ঘন্টা যে কিভাবে কেটে যায় বোঝায় যায়না। আর বুঝতে না পারলে আপনাকে না বুঝিয়ে সেই শিক্ষকের ভেতর স্যাটিসফ্যাকশন আসবে না।

যাইহোক,  ওর মুখ থেকে সরাসরি বিয়ের কথাটা বের করাতে পারলাম না। লাজুক মেয়ে বলে কথা!

পরদিন দুপুরের ফিরতি ফ্লাইটে আমি চলে এলাম নেদারল্যান্ডস।  ইসাবেলা ইংল্যান্ড রয়ে গেল। বললো, পরে আসবে। আমি আর দশদিন KFC তে কাজ করে ভার্সিটিতে চলে এলাম। মশিউর ভাই আমার বোনাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।  কারণ কিছুদিন আমি একইসাথে দুই পদে কাজ করেছিলাম। অসম্ভব ভালো একটা মানুষ। আমার জন্য অনেক করেছেন। যখন যেভাবে চেয়েছি ঠিক সেভাবেই।

ভার্সিটি ফিরে আবার বন্ধুদের সাথে দেখা, কে কোথায় ছিল, কে কত ইউরো সেইভ করলো, কেউ দেশে গিয়েছিল কিনা, কে গার্লফ্রেন্ডের সাথে ছিল – অনেক গল্প। নতুন সেমিস্টারে দেশ থেকে নতুন কেউ এলো কিনা। নতুন কোন টিচার আমাদের ক্লাস নেবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমার মনটা পরে ছিল ইসাবেলার কাছে। যদিও প্রতিদিন নিয়ম করে অনেক কথা হতো। আমি ঘুম থেকে উঠলেও ইসাবেলা, ঘুমোতে গেলেও সে, ক্লাসে মহিলা টিচারের ভেতরেও ওকে খুঁজে পাওয়া, ওর মতন সোনালী চুলের কাউকে দেখলেই মনে হয় এই বুঝি ইসাবেলা। বড় এক মানসিক যন্ত্রণা।  ভালোবাসাময় এক যন্ত্রণা।

মন খারাপ হলে আম্মু ওর জন্য যে গিফট প্যাক পাঠিয়েছিল,  ঐটা দেখি আর ভাবি ইসাবেলা যেদিন জামদানী শাড়ি পড়বে, কেমন দেখাবে ওকে? কপালে যদি একটা টিপ, হাতে চুড়ি  থাকে? পুরোপুরি বাঙ্গালি মেয়ে সাজলে নিশ্চিত সুন্দর লাগবে ওকে।  ও এখন পর্যন্ত এই গিফট এর কথা জানেনা। সারপ্রাইজ দেবো বলে জানাইনি ওকে।

সেদিন ছিল রবিবার।  ক্লাস নেই। ঘরে বেঘোরে ঘুমোচ্ছি। হঠাৎ বেল। আমার তো মাথা গরম। ছুটির দুইটা দিনও শান্তি করে ঘুমোতে পারিনা। রাগে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু দরজা খুলে আমি বাইরে দাঁড়ানো মানুষকে দেখে তো মহাখুশী। কি পাঠক- পাঠিকা, কি ভাবছিলেন,  ইসাবেলা এসেছে? নাহ! সে এলে তো হতোই। আমার মনের অব্যক্ত যন্ত্রণার একটু হলেও অবসান হতো। মশিউর ভাই এসেছেন আমার এখানে একদিন বেড়াতে। PSV EINDHOVEN এর ফুটবল ম্যাচ দেখার জন্য। উনি আবার ফুটবল প্রেমী।  আমার জন্যও টিকেট এনেছেন। ভালোই হলো, বিকেলে দুজন একসাথে খেলা দেখতে গেলাম। শেষ মিনিটের নাটকীয় গোলে PSV জিতে যায়। সত্যি কথা, আমার মন ইসাবেলাতে আসক্ত। এসব কি আর ভালো লাগে?  ইসাবেলার মুখটা ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগেনা। দিনে দিনে কেমন একটা নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো মনে হয় নিজেকে।

দেখতে দেখতে অক্টোবর মাস চলে এলো, ইসাবেলা আর এলো না। আমার প্রতীক্ষার প্রহর দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। ফোন করলেই বলে বাবার ব্যবসার কাজে ব্যস্ত। হতেই পারে, অনেক ব্যবসা ওদের।

কম্পিউটার আর্কিটেকচার পরীক্ষা দিয়ে সোজা বাসায় চলে এলাম, পরীক্ষা মন মতো হয়নি তাই মন খুব খারাপ। ফ্রেশ হয়ে মাত্র একটু ঘুমিয়েছি আর এর ভেতর দরজায় নক। মনে হচ্ছিলো, দরজায় এক একটা নক পড়ছিলো আর আমার বুকে গুলি বিধছিল। কারণ, ঘুম হঠাৎ ওভাবে ভেঙে গেলে আমার মানসিক অস্থিরতা বেড়ে যায়। হবে কোনো বাংলাদেশী বন্ধু, ফুটবল খেলার জন্য ডাকতে এসেছে। কি আর করা, দুই-তিন মিনিট ইচ্ছা করে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে তারপর দরজা খুললাম। কিন্তু এ আমি কাকে দেখলাম? আমি যেন আমার চোখ দুটোকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না, আমার বিদেশ জীবনে এত আনন্দ কখনো আসেনি বোধহয়। কি পাঠক, এইবার আর আপনারা হতাশ হচ্ছেন না, আমিও না। হ্যাঁ, অবশেষে ইসাবেলা এসেছে। এক তোড়া ফুল আর আমার প্রিয় Hofner ব্রান্ড এর গীটার নিয়ে। আমি আমার মনের আনন্দ ধরে না রাখতে পেরে যা আগে করিনি তাই করে বসলাম, গালে একটা আলতো চুমু। তারপর কোলে করে ভেতরে ঢোকালাম, ও তো ভয় পেয়েই চিৎকার, “পড়ে যাবো, পড়ে যাবো, আমাকে নামাও”। ওকে বললাম, আজ আমার দিন, আমি যা বলবো তাই হবে, তুমি একদম চুপ। কোলে করে এনে আমার বিছানায় ফেলে দিলাম, ও তো ব্যথায় ওমা! করে উঠলো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, জিজ্ঞেস করলাম কি হলো? বললো সেদিন ঘোড়ায় চড়া শিখতে গিয়ে ঘোড়া নাকি ওকে ফেলে দিয়েছে আর তাতে কোমরে প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছে। বললাম, আমার তো মাথা ঠিক নেই, সরি, বুঝতে পারিনি। ও আমাকে স্থির করতে বলে ইটস ওকে, ডন্ট ওরি। ভয় পেওনা, হালকা লেগেছে, ফোমের বিছানা না হলে নিশ্চিত আমাকে আর খুজেঁ পেতেনা। আমি বললাম, এই ধরণের কথা যেন আর মুখ থেকে বের না হয়!

জিজ্ঞেস করলাম, তো কোন হোটেলে উঠেছো? এই কথা শুনে ও যেন আকাশ থেকে পড়লো, বললো, what? Are you kidding? You are here, why should I go for a hotel ah? আমি ওর কথায় দারূণ মজা পেলাম, ইচ্ছে করে ওকে ক্ষেপাতে লাগলাম আরো, বললাম, Who am I to you? I am not even your boy friend, isn’t it? ও তখন কি বলবে বুঝে উঠতে না পেরে মনের কথাটাই বলে ফেললো, You aren’t my boy friend, So? At least you are my best friend forever. কথাটা সিরিয়াসলি নিলাম না, আবার জিজ্ঞেস করলাম, So are you still single? বললো, তা নয়, তবে আমার কেউ একজন তো আছে। রাগের ভান করে বললাম, তো তুমি সেই একজনের কাছে যাও, আমার কাছে কেন থাকতে এসেছো, আমার তো একটাই খাট, তোমাকে কোথায় রাখি?

ওর তখন চোখে মুখে রাগ, পারলে আমাকে ছিঁড়ে-কুটে ফেলে এমন অবস্থা। পাঠক-পাঠিকাদের বলছি, কেউ হাসবেন না কেমন, আমি দেশ থেকে যাবার সময় ইতিহাদ এয়ারলাইন্সে ২৩+২৩ কেজি=৪৬ কেজি বহন করার সুযোগ পেয়েছিলাম, তো আমার প্রিয় কোলবালিশটাকেও সঙ্গে করে এনেছিলাম, আর সেই কোলবালিশ নিয়ে ইসাবেলা আমার দিকে তেড়ে এলো, আমি তো ভয়ে এক দৌঁড়ে টয়লেটে। যাইহোক, দুই মিনিট ভয়ে ভেতরে থেকে বাইরে এসে দেখি ও নেই। আমার তো মাথায় হাত, দেখি দরজা খোলা, সে হনহন করে বাইরে হেঁটে চলেছে, আমি দৌঁড়ে গিয়ে তাকে আটকায়, বলি, কি হয়েছে? এমন কেন করছো? ও বলে, কেন এমন করবো না? আমি তো তোমার কেউ না, সরো, আমাকে যেতে দাও। কিন্তু ও আমার সাথে শক্তিতে কি কুলিয়ে ওঠে? ধরে নিয়ে আবার ঘরে আসি, বলি, আমি তোমার যেই হই না কেন, আমার বাসা মানেই তোমার বাসা, আমি জানি , আমি তোমার বয়ফ্রেন্ড না, আমি এই শব্দটাকে পছন্দ করিনা বলেই তুমি বয়ফ্রেন্ড শব্দ উচ্চারণ করোনা, আমি তো তোমার সেই মানুষ। নাকি? ইসাবেলার মন মরা মুখে সেই ভুবনভোলানো হাসি দেখলাম বহুদিন পরে। বিদেশী মেয়েরা কথায় কথায় এই একটা কাজ খুব পারে, জড়িয়ে ধরা, কি আর করা, আমার কথা শুনে সেও আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ঐ জড়িয়ে ধরা পর্যন্তই। কেউ আবার গভীরভাবে নিবেন না প্লিজ, আমি ঐসব বিয়ের আগে পছন্দ করিনা, সেও জানে- আগের এক পর্বে পড়েছিলেন। নিয়ত করেছিলাম ক্লাস টেনে থাকতে, যা হবে বিয়ের পরে বউ এর সাথে। যাইহোক, ওকে বললাম ফ্রেশ হতে, ও শাওয়ার নিতে চলে গেল, আমি গেলাম Lidl-এ । Lidl হলো জার্মান-ভিত্তিক ইউরোপের খুব জনপ্রিয় একটা সুপারমার্কেট। বাজার করে এনে রান্না করতে শুরু করলাম, ও খুব টায়ার্ড থাকায় ঘুম।

বিকেলে গেলাম শপিং করতে।

একটা খাটের দোকানে ঢোকায় ইসাবেলা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, এখানে কি কাজ? বললাম, একটা সিংগেল খাট কেনা লাগবে। ও তো অবাক, বলে তোমার তো দুইজন থাকার জন্য বিশাল বড় খাট আছেই, এইটা কার জন্য?

 

চলবে……….  ( তবে ঘটনা শেষের দিকে চলে এসেছে , ঠিক যা ঘটেছিল, যেভাবে ঘটেছিল, সেভাবেই তুলে ধরার চেষ্টা করছি  )

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

অদৃশ্য অভিমান। বাবা আমায় ভালোবাসে না!

Maksuda Akter

জীবন্ত স্মৃতির পাতা….

Maksuda Akter

একজন শুভ্র!

Khalequzzaman Emon

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy