Now Reading
আমার ভালবাসার রাজকন্যা : পর্ব -০২



আমার ভালবাসার রাজকন্যা : পর্ব -০২

( প্রথম পর্বের পর থেকে……)

প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের ভিতর আমরা পাটুরিয়া ফেরী ঘাটে চলে এলাম। ঢাকা থেকে ফরিদপুরসহ বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলাগুলোতে যেতে হলে, এই প্রমত্ত পদ্মানদী পাড়ি দিয়েই যেতে হয়। ভোরে ভোরে যেহেতু রওয়ানা দিয়ে ছিলাম তাই ঘাটে আগেই পৌঁছে আমাদের বাস ফেরীতে উঠে পড়ল। কিছুক্ষণের ভিতর অন্য বাসগুলো উঠে যাওয়ায়, ফেরীও ছেড়ে দিল।

ফেরী ছেড়ে দিতেই মিলি বলল, “কখনো ফেরীর ছাদে বসে নদীর দৃশ্য উপভোগ করেছ?”

আমি হেসে বললাম, “ফেরীতে কখনো এর আগে উঠি নাই।”

এটা শুনে তো মিলি হাসতে হাসতে শেষ। আর আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে  শুধু দেখছি ওকে। হাসলে ওর গালে টোল পরে। তাতে ওকে আরও মিষ্টি লাগে দেখতে। মানুষ কেমনে এত সুন্দর হয়! হাসি থামিয়ে মিলি বলল, “চলো আজকে তোমাকে ফেরী দেখাব, হিহি।”

দুইজনে সামনে গিয়ে দেখি অনেকেই বাস থেকে নেমে ফেরীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরাও নেমে, সারি সারি বাসের ভিতর দিয়ে, ফেরীর ছাদের দিকে এগুতে লাগলাম। এর মধ্যে মিলির হাতের সাথে বেশ কয়েকবার আমার হাতের স্পর্শ হতেই মনের ভিতর কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।

সিঁড়ি বেয়ে  ছাদে উঠেই চারদিক তাকিয়ে দেখি শুধু পানি পানি। মাঝে মাঝে ২-১ টা নদীর চর দেখা যাচ্ছিল, তাতে সবুজ ঝোপঝাড়ে ২-৩টা গরু ঘাস খাচ্ছিল। চারদিকের এত পানির মাঝখান দিয়ে গরুগুলো কিভাবে ওখানে গেল, সেটাই আমার মাথায় ঢুকছিল না।

যাই হোক, সকালের হালকা রোদে, একজন সুন্দরীর পাশে দাড়িয়ে আমাদের দেশের এত সুন্দর গ্রামীণ আবহ বাংলার দৃশ্য উপভোগ করার যেই মুহূর্ত , যেই অনুভূতি, সেটা বলে বোঝানো যাবে না। কিছুক্ষণ থাকার পর মিলি বলল, “বিজয় চলো, নেমে যাই। আমরা দৌলতদিয়া ঘাটের কাছে চলে এসেছি। বাসে উঠতে হবে।”

সিঁড়ি দিয়ে দুইজনে কথা বলতে বলতে নামার সময় অসাবধানতা বশত মিলি সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই আমি ধরে ফেললাম ওকে। ও ভয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার নীচে নামা শুরু করল। এরপর আর কোন কথা না বলে, আমরা বাসে উঠে যার যার সিটে গিয়ে বসলাম।

সিটে বসেই মিলি বলল, “তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।”

কারণ জানতে চাইলে বলল যে, “তুমি তখন আমাকে না ধরলে, আমি তো পড়েই যেতাম। তখন কি হত?”

আমি শুধু হাসলাম। আমিও এতক্ষণ ওর সাথে থাকার পর আস্ত আস্তে আমার লাজুক ভাব অনেকটাই কেটে গেছে। এরপর নিজেদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতেই ঘণ্টা খানেকের ভিতর পৌঁছে গেলাম ফরিদপুরে। সবাই যে যার ব্যাগ নিয়ে বাস থেকে নামার জন্য প্রস্তুত। বাস থামতেই দেখি রিক্সা ও অটো সব ভিড় করে আছে। যেহেতু সকালে রওনা দেওয়া, তাই সারাদিনের ভ্রমণ ও ক্লান্তি দূর করতে নাশতা করার জন্য প্রথমেই চলে গেলাম হোটেল খন্দকারে। সেখানে নাশতা করার পর পাশের এক আবাসিক হোটেলে ছেলে মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা রুম ভাড়া নিলাম। সেখানে রুম গুলো বেশ ভালো। সবাই ফ্রেশ হয়েই সোজা চলে গেলাম এইবারের ট্যুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান পল্লী কবি জসীম উদ্ দীনের বাড়িতে। অটো রিজার্ভ করেই চললাম পল্লীকবির বাড়ি দেখতে।

বাসে একসাথে বসলেও অটোতে আর আমাদের একসাথে বসা হল না। আমি আর মিলি আলাদা আলাদা অটোতে বসলাম। কিন্তু ওকে দেখতে পাচ্ছিলাম না বলে ভালো লাগছিল না। কিন্তু কি আর করা। অটোতে যেতে যেতে দেখলাম, ফরিদপুরের  নিউ মার্কেট, অম্বিকাপুর রেলওয়ে স্টেশন। আচ্ছা এই নিউমার্কেট কি সব জেলাতেই আছে নাকি ১টা করে? কারণ আমি এর আগে যত জেলাতেই গেছি, বেশিরভাগ জেলাতে এই নিউমার্কেট  নামে ১টা মার্কেট থাকেই।

যাই হোক কিছুক্ষণের ভিতর আমরা পল্লীকবির বাড়িতে পৌঁছে টিকেট কেটে প্রবেশ করি। সেখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি ঘর। সবই কবি এবং তার আত্মীয় স্বজনদের। নতুন করে সেখানে তৈরি করা হয়েছে জাদুঘর ও রেস্ট হাউস। বাড়িগুলো দেখলাম। একটা ঢেঁকীও ছিল সেখানে । মিলি আর সেঁজুতি দুইজনকেই দেখলাম ঢেঁকির উপর দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। সেখানে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে আমরা কবির কবর জিয়ারত করতে গিয়ে দেখলাম কবরের পাশেই রয়েছে কিছু গাছ। সেখানে কবিসহ তার পরিবারের মানুষজনের কবর রয়েছে। ১টি কবরের সামনে রয়েছে সেই বিখ্যাত ডালিম গাছ। যেটা নিয়ে তার লেখা বিখ্যাত কবর কবিতা, কবির শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর একটি। এরপর তার সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম সেখানকার কেয়ারটেকারের কাছ থেকে। বাড়ি থেকে বের হতেই দেখি সামনেই আছে একটি বিশাল মাঠ। যেখানে নাকি ঐতিহ্যবাহী জসীম পল্লী মেলা অনুষ্ঠিত হয় প্রতি শীতে। সেখানেও বসার ব্যবস্থা আছে। তা দেখে দারুণ লাগলো। সিদ্ধান্ত নিলাম কোনো এক শীতে এই মেলা দেখতে আবার আসব।

পাশ দিয়েই বয়ে গেছে কুমার নদ। নামেই নদ, দেখতে তো খালের চেয়ে খুব একটা বড় না। কিন্তু সব মিলিয়ে জায়গাটা দারুণ। আমরা সবাই যে যার মত ছবি তুলতে শুরু করলাম। ভাবলাম মিলির সাথে ছবি তুলব। কিন্তু বাস থেকে নেমেই কেন জানি মনে হচ্ছে ও আমাকে একটু এড়িয়ে যাচ্ছে। ও সেঁজুতির পাশেই বেশি থাকছে। আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। সবার সামনে ওর সাথে গিয়ে কথা বলতে কেমন জানি লজ্জা লাগে।

বেশ কিছুক্ষণ ছবি তুলে, ঘুরাঘুরি করেই রেস্টুরেন্টে চলে গেলাম দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য। একবারে দেশী খাবার সব। আমাদের গ্রাম বাংলার দেশী খাবারের কাছে বিদেশী খাবারের স্বাদ তো কিছুই না।

এরপর মিলি আমাদের সবাইকে নিয়ে গেল ফরিদপুরের বিখ্যাত দোকান বাগাটের মিষ্টি খেতে। যদিও মিষ্টি খুব একটা পছন্দ করি না আমি। কিন্তু সবাই বলে ফরিদপুরে এসে নাকি এই দোকানের মিষ্টি না খেলে ফরিদপুরে আসাই বৃথা। কয়েক রকমের মিষ্টি, দই আছে দোকানে। কিন্তু সবগুলিই অনেক সুস্বাদু। আসলেই এই জিনিস না খেলে ভালো কিছু মিস করতাম।

মিষ্টি পর্ব শেষ করেই সবাই ছুটলাম ফরিদপুরের অন্য দর্শনীয় স্থানগুলি দেখতে।

ঘুরাঘুরির এক ফাঁকে সবার অগোচরে মিলিকে একা পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?”

মিলি বলল, “আমি কই এড়িয়ে গেলাম। বরং আমি নিজেই জোর করে তোমার সাথে কথা বলেছি। কিন্তু তুমি তো নিজে থেকে আমার সাথে কথা বলই না। ভাবলাম তুমি হয়ত আমার সাথে কথা বলতে তেমন পছন্দ করো না। অন্যদের সাথে তো কত হেসে হেসে কথা বল। কিন্তু আমার সাথে এমন চুপ করে থাকো কেন?”

 

চলবে……………

About The Author
TANVIR AHAMMED BAPPY
TANVIR AHAMMED BAPPY

You must log in to post a comment