Now Reading
শহরের বাহিরে এবং ভিতরে!



শহরের বাহিরে এবং ভিতরে!

৫ম শ্রেনিতে পড়ি তখন। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে সাইকেলে বই গুলোকে বাধা অবস্থাতে রেখেই দৌড়ে চলে গেলাম রাস্তার পাশে গর্তটিতে। যেখানে আমরা ক্রিকেট খেলি! হঠাৎ বড় খালা এসে বলল, কালকে তর খালু দেশে আসবে। তুই আমাদের সাথে এয়ারপোর্ট যাবি। যা গিয়ে রেডি হ। কথাটা শোনতেই শরীরের মধ্য দিয়ে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে চোখ বোঝে এক দৌড়ে চলে গেলাম বাড়িতে। মা আমি এয়ারপোর্ট যামু!

-তরে কে কইল?

-দেহ খালায় আইছে।

অজানা কোন সুখ এসে মনের মধ্যে তার অস্থিত্ব জানান দিচ্ছিল। অতি উত্তেজনায় কাপতে ছিলাম। আমি ঢাকা যামু!! বাড়ির সমস্ত ছেলে মেয়ে গুলোকে দৌড়ে দৌড়ে নিজের আনন্দের খবরটা জানিয়ে দিলাম। সবাই অনেকটা কৌতূহল এবং আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার অনেকটা হিংসাও! আর আমি এমন ভাব নিয়া তাদের দিকে তাকাচ্ছিলাম, মনে হয় তাদের বুঝাতে চা্চ্ছি দেখ বেটারা আমি ঢাকা যাইতেছি, সো আমেরিকা যাওয়া কোন ব্যাপারনা! সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। রাতের অলসতা আমার উত্তেজিত স্নায়ুকে হার মানাতে পারেনি। এপিঠ ওপীঠ করে কোন মতে রাত ২টা বাজিয়েছি। ৩টার সময় আমাদের গাড়ি ছাড়ার কথা। কিন্ত গাড়ি ছাড়ে প্রায় সারে ৪টার দিকে। কোন রকমে রাবেয়া আপুকে হার মানিয়ে ড্রাইভারের পাসের ছিট-টা দখল করি। গাড়ি চলে। ঘূর্ণায়মান গাড়ির চাকার সাথে তাল মিলিয়ে সকালটাও চলে আসে খব দ্রুত। আর আমি জানালা দিয়ে মাথা বের করে হা করে তাকিয়ে থাকি রঙ বেরঙের দালান গুলোর দিকে। কি যে এক অদ্ভুদ অনুভূতি! প্রতিটা ভবনের তলা গুনতে শুরু করি। আলামিন একবার ঢাকা এসে গ্রামে গিয়ে ১০ তলা বিল্ডিং-এর কথা বলছিলো। আমি প্রাইমেরি স্কুলের একতলা ভবনের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলাম, ইশ ১০ তলা বিল্ডিং যেনো দেখতে কেমন! ছোটখাট বিল্ডিং গুলো ছাড়া কোন বিল্ডিং-এরই পুরাটা গুনে শেষ করতে পারিনা। একটা গুনতে না গুনতে গাড়ি আরেকটার কাছে চলে যায়। আরেকটার পর আরেকটা! ঢাকা শহরে এত বিল্ডিং? অবাক হয়ে যাই। শেষমেশ ১২ তলা পর্যন্ত একটা গুনেছি। আমার বুকের ভেতর অঝরে কাঁপতে থাকা ছোট্ট হৃদয়টাতে তখন আনন্দের উপচে পড়া ভিড়, প্রবল উত্তেজনা। বাড়ি গেলে গল্প হবে! তবে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলাম একটা বিল্ডিং-এর উপর। দুই-তলা। কিন্তু রাস্তায় চলে! এ কেমন বাড়ি? প্রবল উত্তেজনায় চিৎকার দিয়ে রাবেয়া আপুকে বলি, আপু দেখো বিল্ডিং কেমন গাড়ির মত চলে! রাবেয়ার আপুর সাথে সবাই তাকালো। তারপর যেটা ঘটলো সেটা দেখে আমি হঠাৎ করেই কেমন চুপসে যাই। হাওয়া ভর্তি বেলুনের সবটুকু হাওয়া বেড়িয়ে গেলে যেমন চুপসে যায় ঠিক তেমন চুপসে যাওয়া। সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার মত অবস্থা। রাবেয়া আপুকে দেখে মনে হচ্ছিলো গাড়িতে জায়গা থাকলে সে হাসতে হাসতে শুয়েও পড়তো। কি এমন বললাম? আমার খুব করে ইগোতে লাগে। তারপর আমায় অবাক করে দিয়ে ড্রাইভার বলে এটা বিল্ডিং না, এটা দোতলা বাস। আমার মধ্যে যেন হঠাৎ করে শক লাগে। আমি প্রথমবারের মত মনে হয় ততোটা আশ্চর্য হয়েছিলাম। দোতলা বাসও হয়? অথচ আমাদের গ্রামের একমাত্র বিল্ডিং প্রাইমারি স্কুলটাও একতলা! কি অদ্ভুদ ঢাকা!  আমি আবার উত্তেজনা অনুভব করি। খানিক আগে আমাকে নিয়ে করা তাচ্ছিল্যের হাসাহাসি নিমিষেই ভুলে যাই। মনযোগের সবটুকু দিয়ে তাকিয়ে থাকি বাহিরে। এই শহরে বাসে বাসে পত্রিকা, বাদাম, বুট  বিক্রি করা হয়। কি আশ্চর্য, পানিও বিক্রি করা হয়! অথচ আমাদের টিউবওয়েলের পানি খাওয়ার মত কেউ নাই। একদুইবার পানি তোলার পরে সারাদিন নিথর পরে থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমি পানি কিনেছিলাম শুধু এই ভেবে, ঢাকার পানি মনে হয় অন্যরকম। কেমন বোতলে করে বেঁচে! পানির বোতল কোলে নিয়ে বসেছিলাম। এ পানি খাবোনা, গ্রামে নিয়ে যাবো বলে! সকালের ঢাকার রাস্তা, মানুষ, হকার, গাড়ি, বিল্ডিং এমনকি রাস্তার ধূলাবালিও আমায় মুগ্ধ করেছিল সেদিন। আমার প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছিলো এসব কিছু আমার জন্য, শুধুই আমাকে মুগ্ধ করার জন্য। আমার মুগ্ধ হৃদয়ে অজস্র গল্প বুনা হয়েছিল সেদিন। আমাকেও যে গল্প করতে হবে আলামিনের সাথে!

এটাই ছিল আমার প্রথম ঢাকা আসা।

………………………………

পড়াশোনা নামক পার্ট টাইম চাকরিটা নিয়ে যখন এই শহরে পাড়ি জমাব, বিদায় ক্ষনে আমার মা চোখের পানি গুলো গড়গড় করে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্ত আমি সেই কান্নার অর্থ বুঝিনি। তখন আমার চোখে মুখে ছিল শহরের রঙিন দালান গুলোর টগবগে স্মৃতির মিহীন ক্যানভাস। মনে ছিল ইচ্ছা। আমিও সেই যেকোন একটা দালানের বাসিন্দা হবো।  

পরিশেষে আজ এই স্বপ্নের শহরে আমার বসবাস। ধূলা-বালি ও কালো ধূয়ায় মিশ্রিত দূষিত বাতাস আর যান্ত্রিক যন্ত্রনার অসহনিয়তা আমার আবেগে জড়ানো সকল স্বপ্নকে ভেঙ্গে এনে দিয়েছে বাস্তবতা। আর এ বাস্তবতাটা শহুরে জীবনে কতটা সুখের তা আমার মত একজন ব্যাচেলরই বলতে পারবে। এই বাস্তব জীবনে অনেকবার আকাশে তাকিয়েছি। কিন্ত কখনো রংধনু দেখিনি। দেখেছি ঘন কালো মেঘ। কখনো দোয়েল পাখিটাকে শূন্যে ভাসতে দেখিনি। দেখেছি উড়োজাহাজ। মানুষের প্রতি মানুষের মমতাহীনতা, একটাকার আশায় কাছে এসে হাত পাতা বৃদ্ধ ভীখারির পেটে লাথি দেয়া আর স্বার্থপরায়নতার কর্মকান্ড গুলো আমার দৃষ্টি শক্তিকে ঝাপসা করে দিয়েছে। আর এই ঝাপসা চোখে মধ্য রাতের অন্ধকারে রাস্তার পাশের লেম্পের আলোতে আমি প্রায়ই খুঁজে বেড়াই কবি গুরুর ফটিককে। কারন এই মুহুর্তে আমিও যে ফটিকের পথের অনুসারি!

পাগলামির কারনে মায়ের হাতে মার খেলে নিজের প্রতিশোধের আগুন জালিয়ে দিতাম ছোট ভাইয়ের পিঠে। তারপর যা ঘটত তার জন্য আগে থেকেই প্রস্তত থাকতাম। রিপিট মায়ের হাতে ধাওয়া খেয়ে বাড়ি থেকে পলাতক। সন্ধ্যা হতেই মা যখন নামাযে দাড়াতো তখন পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকে খাটের নিচে লুকিয়ে যেতাম। ততক্ষনে দেখতাম পাগল দাদিটা কয়েকবার পুরো গ্রামে আমাকে খুজে বেরিয়েছেন। চোখে না দেখলেও রাতের অন্ধকারে তার পা গুলো অনবরত চলত সজিবের খোঁজে। আর মা? সন্তান কে মেরে নিজেকে অপরাধী ভেবে গভীর শোকে বসে থাকত খাবারের প্লেট নিয়ে।

আর আজ এই স্বপ্নের শহরটাতে অনেক বার না খেয়ে ঘুমিয়েছি। কিন্ত কোন মায়াবি হাতের স্পর্শ আমি পাইনি। ভাইকে না মারা সত্ত্বেও মধুমাখা কণ্ঠে কখনো শোনিনি বাবা খেয়ে ঘুমা। আজ আমার শরীরের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ চমকায়। উত্তেজনায় কাপি। রাতে ঘুম হয়না। যখন ভাবি গ্রামে যাব। স্নায়ু গুলো রাতের অলসতার কাছে হেরে গিয়ে যদি চোখের দুটি পাতা এক হয় তখন স্বপ্ন দেখি,………ঘুরে বেড়াচ্ছি সবুজে ঘেরা ধান ক্ষেতের লাইল ধরে, শাস নিচ্ছি প্রানভরে। যে বাতাসে নেই ধুলা-বালি আর কালো ধূয়ার বিষ। আছে শুধুই অক্সিজেন। তরতাজা অক্সিজেন! সু্যোগ পেলেই ঢিল মেরে দিচ্ছি কারো আম গাছে। বাবু,উজ্জ্বল,সুমন দের সাথে সাইকেল দৌড়াচ্ছি আধা-ভাঙ্গা সেই চিরচেনা পিচঢালা পথটি ধরে।

***************************

 

About The Author
Sajib Sikder
Sajib Sikder
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment