মরুভূমিতে জাহাজের সমাধিক্ষেত্র !

Please log in or register to like posts.
News

মরুভূমিতে জাহাজের সমাধিক্ষেত্র! কেবল অস্বাভাবিকই নয় কেমন অবাস্তবও মনে হয়! একটি দুইটি নয় বহু জলযানের শেষ আবাস রয়েছে শুষ্ক এই মরুভূমিতে। এখন আর অবশ্য ঠিক জাহাজ বলা চলে না ওগুলোকে বরং মরচে পরা জাহাজের কঙ্কাল বললেই ভালো মানায়। বয়সের ভারে চলতে না পারা জলযান রাখার বন্দর অনেক দেশেই রয়েছে, এই সব জায়গাকেই বলা হয় জাহাজের গোরস্থান বা সমাধিক্ষেত্র। কিন্তু তাই বলে মরুভূমিতে নয় পানিতেই থাকে সেই বন্দর। রূপকথা অথবা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মত শোনালেও সত্যিই ধূধূ মরুভূমির উপর জলযানের সমাধিক্ষেত্র রয়েছে উজবেকিস্তানে। একসময়কার বিশাল জলাশয় থেকে সাদা বালুর মরুভূমিতে পরিণত হওয়া এক লেকের স্মৃতি চিহ্ন হয়ে রয়েছে জাহাজের এই সমাধিক্ষেত্র।

moynoq moynaq 17.jpg

অ্যারাল সাগর(The Aral Sea) নামের এই লেকের অবস্থান কাজাকিস্তানের উত্তর প্রান্ত আর উজবেকিস্থানের দক্ষিণ প্রান্ত জুড়ে। একসময় এই লেককে পৃথিবীর চতুর্থ দীর্ঘতম লেক হিসেবে বিবেচনা করা হত। ২৬ হাজার বর্গ মাইলের বিশাল এই লেকের বুকে প্রায় ১১০০ এর মত ছোট-ছোট দ্বীপ ছিল। স্থানীয় ভাবে লেকের নাম ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘দ্বীপদের সমুদ্র’। সময়ের সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া এই জলাশয়ের শুষ্ক জমিনে ছড়িয়ে আছে সেখানেই এক সময় রাজত্ব করা জাহাজের কঙ্কাল। রোদে পুড়ে আর সময়ের গ্রাসে ধীরে ধীরে বিশাল মরচের স্তূপে পরিণত হতে থাকা এই সব জলযানের গায়ে আজও পানির সাথে যুদ্ধ করা জেলেদের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। এখানে ওখানে মাছ ধরবার সরঞ্জামও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় মরুভূমিতে। বিস্ময়কর এই জাহাজের সমাধিক্ষেত্র দেখে বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন এখানেই ছিল এমন একটি লেক যার আকৃতি গোটা স্কটল্যান্ড থেকেও বড়।

প্রকৃতির খেয়ালে অনেক ভাবেই প্রভাবিত হয় পরিবেশ, কিন্তু অ্যারাল সাগর নামের এই লেকের ধ্বংসের পেছনের কারণ পুরোপুরি মানব সৃষ্ট। নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনে সবসময় একধাপ এগিয়ে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়নের বড়কর্তাদের পরিকল্পনার ফসল এই মরুভূমি। এক সময় যে লেক ঘুরে বেড়ানো ছাড়াও মাছ ধরার জন্যে বিখ্যাত ছিল, সেই জলাশয়কে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলে এই পরিকল্পনা। অ্যারাল সাগরের পানির মূল উৎস ছিল স্থানীয় দুইটি নদী আমু দারইয়া (Amu Darya) এবং স্যর দারইয়া (Syr Darya)। ষাটের দশকের শুরুর দিকে সোভিয়েত বিশেষজ্ঞরা সিদ্ধান্ত নেয়, কৃষি কাজের সেঁচের জন্যে তারা দুই নদীর গতিপথ কৃত্রিম ভাবে পরিবর্তন করবে। মরুভূমিতে সেঁচের মাধ্যমে চাল, তরমুজ আর তুলা উৎপাদনের জন্যে তারা এই পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ‘সাদা স্বর্ণ’ বলে পরিচিত তুলার আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে মূলত তাদের এই আগ্রহ। পরিকল্পনা অনুযায়ী বদলে দেয়া হয় নদীগুলোর প্রবাহ পথ। সেই সাথে মৃত্যু ঘটতে শুরু হয় অ্যারাল সাগরের। প্রাথমিক ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেঁচের পরিকল্পনা সুফল বয়ে আনে। ১৯৮৮ সালে বিশ্বের সর্বাধিক তুলা রপ্তানিকারী দেশ হিসেবে উঠে আসে উজবেকিস্থান। এরপর ১৯৬০ থেকে ২০০০ সাল অর্থাৎ ৪০ বছরে তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়। একই সময়ে নদী থেকে সেঁচের পানি উত্তোলনের পরিমাণও হয়েছে দ্বিগুণ।004.jpg

স্থল পরিবেষ্টিত উজবেকিস্তানের শুষ্ক পরিবেশে জলাশয় টিকে থাকা এমনিতেই দুষ্কর। সেখানে মূল প্রবাহ বন্ধ করে দেয়ায় অ্যারাল সাগরের গভীরতা এবং আকার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ১৯৯৭ সালের মধ্যে লেকের পানি কমে মূল লেকের ১০% এ এসে দাঁড়ায়। পানি কমার সাথে সাথে জলযান চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে বিশাল এই লেকটি। পার্শ্ববর্তী তুলার কারখানা থেকে দূষণ ছড়ানোয় মাছের মড়ক দেখা দেয় অবশিষ্ট পানিতেও। সেই সাথে ধূলি ঝড় আর আবহাওয়ার অত্যাচার বাড়তে থাকে। মাত্র ৫০ বছরের মাঝে ৯০ ভাগ শুকিয়ে যাওয়া এই লেককে পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য পরিবেশ বিপর্যয় হিসেবে হলা হয়ে থাকে। শুধু লেকের পানিই নয় এর প্রভাব পরে লেকের তীরের ছোট্ট শহর ময়নাকে (The city of Mo’ynaq)। বর্তমানে এই মরুভূমির সবচেয়ে কাছের উপকুল ১০০ মাইলের বেশি দূরে সরে গেছে। এক সময়কার অ্যারাল সাগর নামের বৃহৎ লেকের মৃতদেহ এখন অ্যারালকাম মরুভূমি (Aralkum desert) নামে পরিচিত। একসময় যে জলাশয়ে বছরে ৫০ হাজার টন মাছ পাওয়া যেত এবং যার মাধ্যমে জীবিকার সংস্থান হত লক্ষাধিক মানুষের, সেই লেক এখন বিষাক্ত আর বালুময় মানবসৃষ্ট এক মরুভূমি ছাড়া কিছু নয়। কোন এক সময় সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করা বিশাল এই লেক এখন ভৌতিক কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর অংশে পরিণত হয়েছে।

B 001.jpg উজবেকিস্থানের একমাত্র বন্দর নগরী ছিল ময়নাক শহর । এই শহরের অবস্থান অ্যারাল সাগরের একবারে ধার ঘেঁষে। একসময় শহরবাসীর কলরবে, মাছ ব্যবসায়ী আর জেলেদের পদচারণয় মুখোর ছিল এ অঞ্চল। মাছ ধরা আর এই ব্যবসার কাজে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ জড়িত ছিল এ শহরের। লেকের পানি কমতে থাকায় ৮০র দশক থেকে ময়নাকের জনসংখ্যাও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। মানব সৃষ্ট এই বিপর্যয় কেবল মরুভূমিতে জলযানের সমাধিই নয় সেই সাথে ময়নাক শহরকে পরিণত করে ভূতুড়ে এক নগরীতে। সোভিয়েত যুগের বিশাল সাইনবোর্ড আজও আগ্রহী ভ্রমণকারীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে চলেছে শহরে। শহরের পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি, আর মাছ ব্যবসার চিহ্ন মনে করিয়ে দেয় এক সময়ের কর্মব্যস্ত নগরীর কথা। রঙ জ্বলে যাওয়া দেয়াল চিত্রে দেখা যায় মাছ ধরার আর লেকের পানিতে ঘুরে বেড়ানোর ছবি। টিনজাত মাছ রপ্তানির জন্যে চালু করা কারখানাও এখন কেবল অতীতের স্মৃতি চিহ্ন।

moynoq moynaq 11.jpg

কিছু মানুষ এখনো বাস করে এই শহরে। কারাকাল্পাক জাতীর মানুষেরা এই এলাকায় বসবাস করে প্রায় হাজার বছর ধরে। পূর্বপুরুষের আবাস ছেড়ে চলে যাওয়া এই অধিবাসীদের গরমের প্রচণ্ড উত্তাপ ছাড়াও শীতের সময় তুষারপাতও সহ্য করতে হয় তাদের। শহরের অধিবাসীদের বেশিরভাগই হয় বৃদ্ধ নাহয় অপরিণত বয়স্ক। কর্মক্ষম সকলেই কাজের জন্যে দূরে কোথাও পাড়ি জমায়। বর্তমানে এই শহরের মানুষের মূল জীবিকা ভূতুড়ে মুরুভূমির জাহাজের সমাধিক্ষেত্র আর পরিত্যক্ত শহর দেখতে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য কিছু অর্থ।

পরিবেশ বিজ্ঞানী আর বিশেষজ্ঞদের  মতে সেঁচের জন্যে নদীর গতি পথের যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেই পথ যদি পুনরায় বদলানো যায় তাহলে মরুভূমিতে পরিণত হওয়া এই লেক আবারো আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। কিন্তু মূলত দুইটি কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। প্রথম কারণ, নদীর গতি পথ বদলানোর জন্যে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা উজবেকিস্থানের দেয়া সম্ভব নয় এবং দ্বিতীয় কারণ, নদীর ধারা পরিবর্তন করলে তারা হারাবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উপায় তুলার উৎপাদন। পার্শ্ববর্তী দেশ কাজাকিস্তান অ্যারাল সাগর বাঁচাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। লেক কে বাঁচিয়ে রাখতে  কাজাকিস্তান, বিশ্ব ব্যাঙ্কের সহায়তায় ৮.১ মাইল দীর্ঘ কোক অ্যারাল বাঁধ (Kok-Aral dam) নির্মাণ করে ২০০৫ সালে। এই বাঁধ নির্মাণের ফলে লেকের উত্তরাঞ্চল ধীরে ধীরে আবারো পুনরুজ্জিবত হতে শুরু করেছে। হয়তো কোন একদিন আবারো প্রাণ ফিরে পাবে অ্যারল সাগর। আবারো শত জাহাজে ভরে উঠবে এই লেক। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত বিশ্বের একমাত্র মরুভূমিতে জাহাজের গোরস্থান হয়ে থাকবে এই বিস্ময়কর স্থান।

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?