সাহিত্য কথা

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (শেষ পর্ব)

আজ প্রথমেই কিছু কথা বলে নিই। অনলাইনে একটা রোমান্টিক ঘটনা বা গল্পের প্রতি মানুষের এত আবেগ, চাহিদা, অনুরোধ, ভালোবাসা- এর আগে কখনোই দেখিনি যা এই ঘটনার ক্ষেত্রে দেখেছি। এটা আমার জীবনের বাস্তব ঘটনা নাকি আসলেই কি , তা আমি রহস্য হিসেবেই রেখে দিতে চাই। শেষটা পাঠকদের মাঝে কিছু একটা জানার প্রবল আগ্রহ আর হাহাকার রেখে শেষ করে দিচ্ছি বলে কিছু মনে করবেন না, শেষটা নিজেদের মতো করে মিলিয়ে নিবেন একটা নিছক গল্প ভেবে। শুধু এতটুকুই বলবো, ঘটনা আজ যেখানে শেষ হয়ে যাচ্ছে, এর পর যেকোন কিছু লেখা বা বলাটা শুধু শুধু বাড়িয়ে বলা হবে।

আজ এতগুলো দিন যারা এক একটা পর্বের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন, তাদের সবার প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রইলো। আপনারা কমেন্টে কিংবা আমার ফেসবুক ইনবক্সে ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন, ভালো কিছু মন্তব্য করেছেন – বলেই আজ শেষ পর্ব পর্যন্ত আসতে পেরেছি। আপনাদের সকলের প্রতি আমার সালাম; পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন, ভালোবাসুন নিজের দেশ, মানুষ, ভাষা ও ঐতিহ্যকে। ভালোবাসা অবিরাম…………

 

সপ্তম পর্বের পর থেকে……………

 

খাট কেনার কথা শুনে ইসাবেলার ভ্রু কুচঁকে গিয়েছে। সে আমাকে আবার জিজ্ঞেস করলো, কি হলো, নতুন এই খাট দিয়ে কি হবে? ওকে এক সাইডে ডেকে নিয়ে বললাম, এই খাট আমার জন্য, মানে যতদিন তুমি থাকবে। ইসাবেলা তো সেই রেগে-মেগে অস্থির। আমি ওকে শান্ত করে বললাম, শোনো, একটা পুরুষ আর একটা মেয়ে পাশাপাশি থাকা মানে কি জানো? আগুনের পাশে মোম রাখা। আর আগুনের পাশে মোম রাখলে গলে যাবে এটাই স্বাভাবিক, তো তোমার মতো এতটা আকর্ষণীয় একটা মেয়ের পাশে আমি যদি রাতে ঘুমায়, নিজেকে কন্ট্রোল করাটা খুব বেশী কঠিন, ব্রাসেলস-এ থাকতে বুঝেছি। শয়তান ইবলিস এসে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভর করে, আর আমি চাইনা শয়তান কোনো সুযোগ পাক। তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো।

ইসাবেলা শান্ত ভদ্র বুঝমান মেয়ে, আমার কথা সহজেই বুঝে নিল, বললো, আমি চাইনা আমার কারণে তোমার কোনো ক্ষতি হোক। ব্যস, একটা খাট কিনে নিলাম, কোম্পানি গাড়িতে করে দিয়ে গেল। পরদিন একসাথে ভার্সিটি গেলাম, বন্ধুদের সাথে ইসাবেলাকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। বন্ধুরা তো খুব দুষ্টু। একজন তো বলেই ফেললো “মামা, সেই একটা মাল পটিয়েছিস!” বললাম, এইসব মাল টাইপের শব্দ উচ্চারণ করবিনা তো, তোর বোন থাকলে তাকে কেউ মাল ডাকলে কি তোর ভালো লাগবে বল? যাইহোক জানি বন্ধু একটু মজা করেছে, আকর্ষণীয় ফিগার এর কোনো মেয়েকে দেখলেই আজকাল একটা জেনারেশান তাদেরকে মাল বলে সম্বোধন করে, এটা খুবই খারাপ মনে হয় আমার কাছে।

আমার ক্লাস টাইমে ইসাবেলা ক্যান্টিনে বসে রাগবি খেলা দেখছিল। আমার ক্লাস শেষ হলে আমি আর ও একসাথে ভার্সিটি ক্যান্টিনে খেয়ে নিলাম। খেয়ে বাসায় এসে কাপড় ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে আমি ঘুম, বিকেলে আরেকটা ক্লাস আছে। আর ইসাবেলা গিয়েছে কাজ খুজঁতে। ও আমার সাথেই থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ও কাজ পেয়ে গেল একটা শপিং-এ। আর আমি এদিকে ভার্সিটি, ক্লাস, পরীক্ষা – এইসব নিয়ে ব্যস্ত। রাতে দুজন একসাথে ডিনার করি বাসায়, মুভি দেখি। ও অংকে ভালো হওয়াতে আমার জন্য খুব সুবিধা হলো। তাছাড়া ব্রিটিশ একসেন্ট শুনতে শুনতে আমি দিনে দিনে সেটাতেও পারদর্শী হয়ে উঠছিলাম।

আল্লাহর রহমতে সব গুলো টেষ্ট পাস করি, ফলে ফাইনাল এক্সামে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়েনা, ইসাবেলাও খুব খুশি, আমাকে বলে, এইবার তো তাহলে নেদারল্যান্ড ইমিগ্রেশনও ফেরদৌসকে আটকাতে পারবেনা। একটা কথা বলে রাখা ভালো, নেদারল্যান্ড-এ উচ্চশিক্ষায় প্রথম দুই বছর খুব বেশী ক্রিটিক্যাল, একবার দুই বছরে মিনিমাম ৬০ ক্রেডিটের ঝামেলা পার করে ফেলতে পারলে বাকি সময়টা অনেক ইজি হয়ে যায়, যদিও অনেকের অনেক বিষয় যা পাস করতে পারেনি, পরে পাস না করতে পারলে ভার্সিটি সেই স্টুডেন্টকে বের করে দেয় আর নতুন ভার্সিটিতে ভর্তি না হতে পারলে মহাবিপদ।

সেমিষ্টারে ভালো রেজাল্ট করাতে মশিউর ভাই আমাকে তথা আমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন। ডিসেম্বর মাস, কনকনে ঠান্ডা বাইরে। মাইনাস ৫ কিংবা ৭; তুষারপাত এই সময়ে নরমাল। আমস্টারডামের সব লেক বরফে জমে গিয়েছে। স্কেটিং করে সবাই। দেখতে দারুণ লাগে।

ভাই এর বাসায় ঢুকেই বিরিয়ানির ঘ্রাণে তো আমার মাথা নষ্ট। আর ইসাবেলা তো ঘ্রাণ শুকেই পেট ভরিয়ে ফেলবে এমন অবস্থা। ধুমসে খাওয়া শুরু করে দিলাম, সেই স্বাদ, যেন বহুকাল বিরিয়ানি খাইনি। কিন্তু ইসাবেলার তো অবস্থা কেরোসিন, মশিউর ভাই এর খেয়াল ছিলোনা যে আমাদের সাথে একজন নন-দেশী খাবে, ভাই তাই ঝাল দিয়ে রান্না করেছে, আর ইউরোপিয়ানরা ঝালকে খুব ভয় পায়, বরফ পানির সাথে বিরিয়ানি খেতে হলো ওকে। আর খাওয়া শেষে আইস মুখে নিয়ে প্রায় ২০ মিনিট বসে ছিল, সেদিন আমার ওদিকে তাকানোর সময় ছিলো না। আমি বিরিয়ানিতে মজে গিয়েছিলাম, শেষে পেটে একবিন্দু ফাঁকা জায়গা না নিয়েই বাসায় এসেছিলাম, অতিরিক্ত খাওয়ার মজা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। ইসাবেলা তো বলেই বসলো, আমার ঝাল খেয়ে কষ্টের সময় তোমাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, এখন বোঝো কেমন মজা?

পরদিন আমি বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলাম, ভুলে মোবাইল রেখে এসেছিলাম, ইসাবেলা ছিল বাসাতে। আম্মু ওদিকে কল দিয়েছিল। আম্মুর সাথে কথা বলে ও জানতে পারে সেই গিফট এর কথা। বাসায় এসে দেখি সবকিছু এলোমেলো মানে ইসাবেলা রাগে কাপড় এলোমেলো করে রেখেছে। মেয়ের রাগ আছে বেশ, তেজী।  আমাকে জিজ্ঞেস করে, কোথায় সেই গিফট যেটা তোমার মা আমার জন্য পাঠিয়েছে? কি করেছো?

আমি ওকে সবকিছু বোঝানোর চেষ্টা করি, কিন্তু মেয়ে এইবার একদম বেঁকে বসেছে। ওর সামনে সেই গিফট প্যাক রাখলাম, বললাম, দেখো আজ পর্যন্ত ওপেন করিনি, তোমাকে বিশেষ কোনো দিনে উপহার দিবো বলে, কিন্তু তারপরেও তার অভিমান ভাঙ্গার নয়, রাতে ডিনার না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে। একটু রাত হলে ( দেশে তখন সকাল ) আমি আম্মুকে কল দিয়ে সব ঘটনা বলি, আম্মু যদিও জানেনা ও আমার বাসাতেই থাকে, মাইন্ড করতে পারে না বুঝেই। আম্মু বলে ওর সাথে আমাকে আবার কথা বলিয়ে দিও, আমি বুঝিয়ে বলবো। পরদিন ব্রেকফাষ্ট আমার সাথে করেনি রাগ করে। বাসায় এলে ওকে বললাম আমার আম্মু তোমার সাথে কথা বলবে। আমার আম্মুর সাথে দেখলাম তার দারুণ ভাব হয়ে গিয়েছে অলরেডি। আম্মু দেশে যেতে বলেছে আমাদেরকে, যেহেতু আমার এক্সাম শেষ। আমি আসলে দেশে যেতে চাইছিলাম না একদম, ভাবছিলাম ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাজ করে কিছু টাকা জমালে খারাপ হতোনা। তারপরেও কিছু কথা ভেবে দেশে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম, আর ইসাবেলাও খুব চাপাচাপি করছিল, বলছিল ক্রিসমাস আর নতুন বছরটা সে আমার পরিবারের সাথে বাংলাদেশে কাটাতে চায়।

কি আর করা, আম্মু-আব্বুর চাওয়া, ইসাবেলার আগ্রহে ক্রিসমাসের আগেই ইতিহাদ এয়ারলাইন্সে দুইটা টিকেট কেটে নিলাম বার্লিন টু ঢাকা। ভার্সিটিকে জানিয়ে দিলাম আমি ফেব্রুয়ারিতে ব্যাক করবো, ইসাবেলা হয়তো ফিরে আবার রটার্ডামে মশিউর ভাই এর KFC তে জয়েন করবে, কারণ ওখানে স্যালারি ভালো, পুরোনো কাজের স্থান তার।

ফ্লাইট ছিল ১৮ই ডিসেম্বর, ২১শে ডিসেম্বর আমার ছোট বোনের জন্মদিন। আমরা পনেরো তারিখে বার্লিন চলে গেলাম, ইসাবেলার জার্মান বান্ধবী লিনার বাসায় ছিলাম, তার সৌজন্যে পুরো বার্লিন ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সবার জন্য কেনাকাটা করে নিলাম। ছোট বোনের জন্য একটা ল্যাপটপ জন্মদিনের গিফট।

আচ্ছা, একটা কথা বলে নিই, বার্লিন থেকে আসার মূল কারণ হলো বার্লিন-ঢাকা ফ্লাইটের ভাড়া কম, অনেক কম।

বার্লিনে হঠাৎ একটা ইন্ডিয়ান পার্লার খুঁজে পেয়েছিলাম সৌভাগ্যবশত। (মালিক কোলকাতার মহিলা – সুপ্রিয়া দেবী)। ফ্লাইট ছিলো বিকেলে, লিনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লাগেজ নিয়ে ইসাবেলাকে সকালেই নিয়ে গেলাম সেই পার্লারে শাড়ি পড়াতে। সুপ্রিয়া তো খুব খুশী ব্রিটিশ কন্যাকে বাঙ্গালী সাজে সাজাতে পেরে। আম্মু টিপ, চুড়ি গায়ে জড়ানো চাদঁর, নূপুর- সব দিয়েছিল যা প্রয়োজন সাজার জন্য। আমি বাইরে বসা ছিলাম, ইসাবেলার সাজতে প্রায় দুই ঘন্টা লেগে গেল, ও যখন বাইরে এলো, মনে হচ্ছিলো এক অপরূপা সুন্দরী যেন তার রূপের সকল সৌন্দর্য নিয়ে আমার সামনে এসে বলছে, আমাকে শুধু তোমার করে নাও। শাড়ির ওপর একপাশে চাঁদর, টিপ, চুড়ি, পায়ে নূপুর। জানিনা কতক্ষণ ওর দিকে এক পলকে তাকিয়ে ছিলাম, ইসাবেলার ডাকে ঘোর ভাঙলো, বললো, চলো এবার, দেরী হয়ে যাবে নাহলে।

সুপ্রিয়াকে ধন্যবাদ আর বাংলাদেশ আসার নিমন্ত্রণ জানিয়ে চলে এলাম আমরা। ট্যাক্সিতে ওঠার পর খুব আবেগী কন্ঠে ইসাবেলা আমাকে আর আমার আম্মুকে ধন্যবাদ জানালো। ইসাবেলা অনেক খুশী যা তার চোখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম। ভালোবাসার মানুষের চোখ দেখেই অনেক কিছু আন্দাজ করা যায়। ট্যাক্সি ড্রাইভার একজন অস্ট্রিয়ান, খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদেরকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন, শুভকামনা জানালেন যেন একসাথে থাকতে পারি সারাজীবন।

ট্যাক্সি থেকে Berlin Tegel Airport-এ নামার পর থেকে শুরু করে বিমানে ঢোকা পর্যন্ত এমনকি বিমানে ঢোকার পরেও বেশ ভালোবাসাময় বিড়ম্বনা পোহাতে হলো ইসাবেলাকে, সাউথ এশিয়ানরা তো আছেই, ইউরোপিয়ান, আমেরিকান সবাই এসে শুধু ইসাবেলার সাথে সেলফি তোলে আর আমাদের কথা জানতে চায়, সবাই মোটামুটি ভাবে যে আমি ইন্ডিয়ান আর ইসাবেলাকে নিয়ে ইন্ডিয়া যাচ্ছি, কিন্তু তাদের ভুল ভাঙ্গে আমাদের সাথে কথা বলার পরে। আমরা দারুণ উপভোগ করেছি। জার্মান ইমিগ্রেশন অফিসার যখন আমাদের সাথে সেলফি তুললেন, তখন আরেকবার দেখলাম, ভদ্র জাতির ভদ্রতা আর উদারতা। উনি বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন। উনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এলাম, এদিকে বিমান বালাও সেলফিতে আক্রান্ত, অনেক দেশী ভাই তাদের ফ্যামিলি নিয়ে দেশে যাচ্ছেন যারা জার্মিনিতেই স্থায়ী। তারাও এসে দেখা করে গেলেন, মনে হচ্ছিলো, আমরা বিশেষ করে ইসাবেলা সেলিব্রেটি হয়ে গিয়েছে এক জামদানী শাড়ি পরাতে কিংবা বাঙ্গালীয়ানা সাজে সাজার কারণে। নিজের দেশকে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়াতে এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে।

বিমান আর কিছুক্ষণ পরেই আবু-ধাবির উদ্দেশ্যে রওনা দিবে, দুই ঘন্টা ট্রানজিট, তারপর আবু-ধাবি থেকে ঢাকা। বিমান ছাড়ার আগে আম্মুকে কল দিলাম, বললাম, আম্মু আমরা আসছি। ইসাবেলা ভাঙ্গা বাংলায় বললো, আম্মু তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

বিমান আকাশে উড়লো।

ইসাবেলা আমার বুকে নিশ্চিত ভরসায় মাথা গুজে দিল। পরম মমতায় ওকে আগলে রাখলাম !!

( শেষ )

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

ম্যানস্ পার্লার!

Maksuda Akter

ভুতের সাথেই বসবাস!

Maksuda Akter

গোধূলি লগন । পর্ব – ০১

saiful antur

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy