Now Reading
আসলে কি হচ্ছে বিএফডিসি’তে…! (একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট)



আসলে কি হচ্ছে বিএফডিসি’তে…! (একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট)

বর্তমানে চলচিত্র পাড়ায় বেশ অস্বস্থি বিরাজ করছে বলা যায় সদ্য সমাপ্ত চলচিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনের পর থেকে দুটি পক্ষ পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে । এই দুই পক্ষের একটায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন চলচিত্র শিল্পী সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি খল অভিনেতা মিশা সওদাগর এবং অন্য আরেকটি পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নায়ক শাকিব খান। চলচিত্র সংশ্লিষ্টতা থেকে কখনো কখনো ব্যাক্তি পর্যায়েও আক্রমণ করা হচ্ছে, এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দুষছে চলচিত্র কলুষিত করা কিংবা কার কত অবদান তা পরিমাপ করা নিয়ে। মূল ঘটনা প্রকাশ্য হয় যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ছবি নিয়ে । মিশা সওদাগর এর নেতৃত্বাধীন পক্ষে আছে চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির নেতা খোরশেদ আলম খসরু, পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন, নায়ক ফারুক,রুবেল, রিয়াজ,সাইমন,ডিপজল, জায়েদ খানসহ একটি বিরাট অংশ- যারা চাইছে সমতার ভিত্তিতেই যৌথ প্রযোজনার ছবি । আর শাকিব খানের নেতৃত্বাধিন পক্ষে আছে জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার মোহাম্মদ আজিজ, পরিচালক কাজী হায়াৎ, চলচিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ, নায়ক শুভ, নায়িকা নুসরাত ফারিয়া,মাহিয়া মাহি সহ অনেকেই যারা চান যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ যেন বন্ধ না হয়। এই দুই পক্ষের চাওয়া দেখলেই যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারেন, বলবেন তাহলে সমস্যা কোথায়? দুই পক্ষের চাওয়াইতো প্রায় এক…!

এই কৌতূহল থেকে বেশ কিছুদিন অনুসন্ধান করে এবং ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে জানার চেষ্টা করেছি মূল সমস্যাটা কোথায়…! বিগত বেশ কিছুদিন যাবতই এমন অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছিল চলচিত্র পাড়ায় যদিও চলচিত্র সংশ্লিষ্ট ছাড়া মিডিয়া কিংবা অন্যকেউ তেমন কিছু বিস্তারিত জানত না। কিছুদিন আগেই যখন অপু বিশ্বাস এর সাথে শাকিব খান এর বিয়ে এবং তাদের বাচ্চার খবরটা চাউর হয় ঠিক তখনি শাকিব ইঙ্গিত করেন তার প্রতি একটি অশুভ চক্র ও শক্তি কাজ করছে। শাকিব এও অভিযোগ করেন যে তার ক্ষতি করতে পারে এই চক্রটি। এর পর থেকেই মূলত দ্বন্ধ প্রকাশ্য রূপ নিতে থাকে। চলচিত্র পরিচালক ও প্রযোজক সমিতিকে কটাক্ষ করার অজুহাতে শাকিবকে নিষিদ্ধ করে বাধ্য করা হয় সমিতির কাছে ক্ষমা চাইতে । চলচিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে শাকিব এর সমর্থন দেয়া ওমর সানি-অমিত হাসান প্যানেল হেরে যায় এবং ফল ঘোষণার রাতেই নব নির্বাচিত মিশা সয়দাগর-জায়েদ খান প্যানেলের লোকজন কর্তৃক শাকিব এর উপর শারীরিক হামলা হয় । শাকিব এই ঘটনার জন্য সরাসরি তাদেরকে ইঙ্গিত করে মামলা দায়ের করেন, শাকিব খান এর উপর হামলা চলচিত্র সংশ্লিষ্টরা ভালভাবে নেয়নি। এদিকে নব নির্বাচিত শিল্পী সমিতির নেতারা যাতে শপথ নিতে না পারে তার জন্য আদালতে রিট করা হয় ওমর সানি-অমিত হাসান প্যানেল থেকে, এ বিষয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ কপি আসার আগেই তড়িঘড়ি করে শপথ নিয়ে নেয় নব নির্বাচিত শিল্পী সমিতির নেতারা । অনেকেই হয়ত ভাবছেন যৌথ ছবির প্রসঙ্গে এসব বিষয় আসছে কেন? কেননা প্রতিটি ঘটনা একটা আরেকটার সাথে সংশ্লিষ্ট।

বাংলা চলচিত্র যথেষ্ট সমৃদ্ধ, কালজয়ী অনেক অভিনেতাই সৃষ্টি হয়েছে এই বাংলা চলচিত্রের হাত ধরে ঠিক তেমনি অনেক কালজয়ী চলচিত্রও নির্মিত হয়েছে। কিন্তু মাঝখানের একটা সময়ে চলচিত্রে অশ্লীলতা প্রবেশ করে ব্যাপক আকারে, আবির্ভাব ঘটে পলি,মুনমুন, ময়ূরীদের মত অশ্লীল ছবির ক্ষণজন্মা নায়িকাদের । এদের দিয়ে অনেক জুনিয়র ও সুযোগ সন্ধানী পরিচালক নির্মাণ করতে থাকেন একের পর এক অশ্লীল ছবি আর দেশের আনাচে কানাচে প্রায় সকল প্রেক্ষাগৃহে চলতে থাকে এসব ছবি । বলা যায় মানুষের ছবি দেখার রুচিই এক প্রকার বদলেই গিয়েছিল। এই রেশ থাকাকালীন নায়ক মান্না এর সাথে সাথে চলচিত্রে আবির্ভূত হন নবাগত নায়ক শাকিব খান এর। তাদের নিয়ে তৈরি হতে থাকে মোটামুটি সুস্থ ধারার ছবি, তখন দর্শকদের মাঝে পুনরায় ফিরে আসে সুস্থ ছবি দেখার প্রবণতা। সামাজিক ও অ্যাকশন নির্ভর ছবিতে অভিনয় করে দীর্ঘ ১যুগে শাকিব একাই চলচিত্রে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয় এবং তৈরি করে নেয় তার একক অবস্থান। প্রায় প্রত্যেক প্রযোজক তাদের ছবিতে শাকিবকে কাস্ট করতে হন্যে হয়ে পড়ে, অধিকন্তু বাধ্য হয়ে অশ্লীল ছবি নির্মাণ পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যায় এবং সেইসব পরিচালকরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে চলচিত্র জগতে। এরই মাঝে ফাঁকে ফোঁকরে নিজ অর্থায়নে অনন্ত জলিল চেষ্টা করেছেন কিছু ছবি নির্মাণের কিন্তু তাও ব্যাবসাসফল হয়নি উল্টো নিজেকে নায়ক রুপে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ছবিতে প্রাধান্য থাকায় দর্শকদের সমালোচনায় পড়েন তিনি। এরই মধ্যে দেশী ছবি নির্মাণের পাশাপাশি শুরু হয় আরেক নতুন ট্রেন্ড, আর তা হল যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত চলচিত্র। মূলত ঢাকার ঢালিউড ও কলকাতার টালিউড এর যৌথ নির্মাণ বলা হলেও ছবিতে একক আধিপত্য থাকত টালিউড এর, বেশিরভাগ ভাগ ছবির শিল্পী কলাকুশলী থাকত সেখানকার এবং ছবির দৃশ্যায়ন হত ওপার বাংলায়। পর্যায় ক্রমে সেই প্রাধান্যতা কমে আসে, বাংলাদেশের অনেক শিল্পী কলাকুশলীরা সম্পৃক্ত হয় এসব ছবিতে এবং তাদের প্রোডাকশন ও কাজ করতে আসে ঢাকায় । যৌথ প্রযোজনার ছবিতে কাজ করার জন্য বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত অফার পেতে থাকে নায়ক রাজ রাজ্জাক, শাকিব খান, মাহিয়া মাহি, নুসরাত ফারিয়া, অমিত হাসান, জয়া আহসান সহ অনেকেই। এদিকে হল মালিকরাও যৌথ প্রযোজনার ছবি প্রদর্শনে অধিকতুর আগ্রহি হয়ে পড়ে। কেননা এই ছবির বাজেট বেশী হওয়ায় নির্মাণ শৈলী, ডিজিটাল ইফেক্ট ও সাউণ্ড, ভিএফ এক্স, কস্টিউম, হাই ক্লাস ইকুপমেনট এর ব্যাবহার ইতাদি এতটাই নিখুঁত যে ছবিগুলো দর্শকদের সহজেই কাছে টেনে নিয়েছে। অন্যদিকে দেশের কম বাজেটে নির্মিত ছবিগুলো এক প্রকার মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং ব্যাবসায়িক ফ্লপ হতে থাকে। এমতাবস্থায় চলচিত্র সংশ্লিষ্ট যারা আছে তাদের ভিতর একটা ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ছবির বিরুদ্ধে যা পর্যায়ক্রমে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যন্ত গড়ায়।

যাই হউক বর্তমান প্রসঙ্গে আসি, মূলত এই ঈদে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা যৌথ প্রযোজনার নির্মিত দুটি ছবির বিরুদ্ধেই চলচিত্র সংশ্লিষ্ট একাংশের অবস্থান, তারা ইতিমধ্যেই মিছিল, সমাবেশ, অবস্থান ধর্মঘট সহ 1.jpgসরকারের উচ্চ পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে যেন ছবিগুলা মুক্তি না পায়। এরইমধ্যে দুটি ছবির একটি নবাব ছাড়পত্র পেয়ে গেছে, নবাবে প্রিভিউ কমিটি কোনো অনাপত্তি জানায়নি কিন্তু বিপত্তি বাঁধে অন্য ছবি বস২ নিয়ে, এ ছবিতে প্রিভিউ কমিটি আপত্তি জানিয়েছে। কারণ হিসেবে জানা যায় বস২ নির্মাণে যৌথ প্রযোজনার নিয়ম সঠিকভাবে মানা হয়নি, তাই এটি ছাড়পত্র পাচ্ছেনা। দুটি ছবিরই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টি মিডিয়া প্রেস কনফারেন্স করে ঘোষণা দিয়েছে যে যদি দুটি ছবির একটিও যদি প্রচারে ছাড়পত্র না পায় তবে তারা একটিও প্রচার করবেনা। এই ঘোষণার ঠিক পরদিন ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ এর উপর শারীরিক আক্রমণ হয়, জনাব নওশাদ একাধারে প্রদর্শক সমিতির সভাপতি, মধুমিতা সিনেমা হলের মালিক, প্রযোজক ও পরিবেশক এবং চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড এর সদস্য। এ নিয়ে আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে সিনেমা পাড়া।  ইতিমধ্যে ঢাকার রাজপথে নামে শাকিব খান, আরেফিন শুভ ও জাজ মাল্টিমিডিয়া এর ভক্ত সহ চলচ্চিত্র প্রেমী ও সাংবাদিকবৃন্দ। তাদের শ্লোগান ছিল- দর্শকের পছন্দ, স্বাধীনতা ও চাহিদা পূরণে বাঁধা দেয়া চলবে না ।সিনেমা হল বাঁচলে, চলচ্চিত্র বাঁচবে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বস২ ও প্রিভিউ কমিটির ছাড় পায়। অন্যদিকে মিশা সওদাগরের নেতৃত্বাধীন অংশটির ঘোষণা ছিল এই দুটি ছবি বন্ধে প্রয়োজনে তাদের রক্ত বিসর্জন দেবে। বিএফডিসি’তে পরিস্থিতি খুব একটা স্বাভাবিক তা কিন্তু নয়, যেকোন মুহূর্তে অশান্ত হয়ে উঠতে পারে সিনেমা পাড়া। বাংলা চলচিত্রের এ অশনি সংকেত দ্রুত কেটে যাবে এ প্রত্যাশা সবার।

About The Author
MP Comrade
4 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment