সাহিত্য কথা

আজও কেন এমন হয় ৭–পর্ব [শেষ পর্ব ]

প্রথম পর্ব থেকে  ষষ্ঠ পর্বের পর  – [শেষ পর্ব ]

– এতক্ষন আমি ওদের দিকে নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে ছিলাম । যেন ওরা কি বলছে বা করছে সে ব্যাপারে আমার কিছুই করার নেই । ওরা ওদের ইচ্ছেমত ছটফটানির সাথে সাথে ওদের মনের বিচিত্র সব ভাব প্রকাশ করছে ।  কিন্তু হটাত এমন  ত্রাহি চিৎকার করছে-  এবার আর  চুপ করে স্ট্যাচু হয়ে  থাকা যায় না । খুব কাছাকাছি কেউ না থাকলেও পথিক বা আর কেউ এদিকে এলে শুনতে পেতে পারে । উঠে টেপ দিয়ে ওদের মুখ বেঁধে দিলাম । আরও আতংকিত হয়ে  বাঁধনগুলো  খোলার জন্য চরম ছটফট করছিল । কিন্তু সেটা তো  সম্ভব নয় । সময় নিয়ে বেশ করে বেঁধেছি ।

– যখন দেখল কিছুতেই কিছু হচ্ছে না তখন  আতংকিত বিস্ফারিত চোখে,  নিজের ইম্পরট্যান্ট পার্টটির দিকে তাকাচ্ছে দুজনেই । আর চোখের ভাষায় আমাকে কাকুতি মিনতি ভয় ধমক দয়াভিক্ষা  যা পারছে প্রকাশ করছে । আমি উঠে ওদের খুব কাছাকাছি এসে ধীর কোমল কণ্ঠে বললাম , ‘উহ , এত অস্থিরতার কি আছে ডিয়ার, যে অংশটিকে বেশি ভালবাসতে, বেশি গুরুত্ব দিতে, যাকে ছাড়া চলেই না, যার জন্য এতো কিছু– তাকে তো আমিও  খুব গুরুত্ব দিয়ে মায়া মমতায় জড়িয়ে নিয়েছি । মিথ্যেই অভিযোগ করছ ।‘

– আমি কাজলের পেন্সিলটা নিয়ে এগিয়ে গেলাম । একে একে দুজনের কপালে গালে বুকে পেটে লিখে দিলাম  আমি ধর্ষক, আমি খুনি, আমি অত্যাচারী,  আমি জুলুমকারী,  আমি ইভটিজার,  আমি মাতাল,  আমি জুয়াড়ি,  আমি সন্ত্রাসী  ইত্যাদি যা যা  ওদের কর্মকাণ্ড বলে শুনেছি  । যে সব ওরা নিষ্ঠার সাথে করে বলে শুনেছি ।  লিখছিলাম জোরে জোরে উচ্চারন করে , যেন ওরা শুনতে পায় । শুধু শুনতে পেলে তো হবে না দেখাও চাই । তাই  আয়নার দরকার । খুঁজাখুঁজি করে একটি আয়না পেয়ে গেলাম ।

-লিখা শেষ করে  আয়নাটি  এনে ওদের সামনে একটি চেয়ারের সাথে হেলান দিয়ে জুত মতো বসিয়ে দিলাম । ওরা এটায় নিজের নিজের প্রতিচ্ছবি দেখুক ।

-দুজনেই অসম্ভব অবিশ্বাস্য চোখে আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে । দেখছে  বহু মিশ্রিত অনুভবের ঘোলাটে চোখে । একটি পূর্ণ নারী,  বালিকা নারী, ও নারী শিশুর  দেহ মন হৃদয় আর আত্মাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ব্যাবচ্ছেদ করে এবং কখনও কখনও মেরে ফেলে যারা,  তাদেরই আত্বজ, তাদেরই সাথী, তাদেরই অনুগামী এই বিভীষিকাময় নারকীয় কিট – দেখুক নিজেকে । কি তার প্রাপ্য ।  সেই ভিকটিম নারীটির কষ্টের গভীরতম অনুভবের কিঞ্চিৎ অনুভব করুক ।

-আমার কাজ শেষ । এই ঘরে আমার চিহ্ন গুলো মুছে দিলাম । আমাকে বেরুতে হবে । আলো ফোটার আগেই প্রথম বাসটি ধরতে হবে ।  আবার ওদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে চোখের ওপর চোখ রেখে বললাম , ‘জানিনা তোমাদের ভাগ্যে কি আছে  ? কি হবে এর পরে  ?  আশাকরি শুধরে যাবে । আরও কঠিন কোন শাস্তি হতে পারে এই ভাবনা মাথায় রেখে । আর শুধরাবে তাদেরও,  বিষাক্ত মনের সেই সব পাপীকে । যারা তোমাদের দলভুক্ত । তোমাদেরই মত পিশাচ । হা,  সবচেয়ে বড় কথা,  আদৌ যদি  পৃথিবী তোমাদেরকে  আরও কিছুদিন চায় ।‘

-আমার ব্যাগ নিয়ে বের হবার সময় ওদের গোঙানির শব্দ কানে আসছিলো । যেন কোন আহত  হিংস্র পশু । অবশেষে পশুদের আওয়াজ পশুদের মতই হচ্ছে ।  পেছনে না তাকিয়ে  বেরিয়ে এলাম । বাইরে ঝোপে লুকিয়ে রাখা আমার ব্যাগ উঠিয়ে নিলাম ।

-তখন শেষ রাত একটু পরেই আজান দিবে । বিলের পাড় ধরে আসার সময় ব্যাগটা পায়ের কাছে রেখে চারিদেকে তাকিয়ে আমার প্রিয় জায়গাটিকে দেখলাম ।  যেখানে এলে আমার মন ভালো হয়ে যেতো । দুহাত দুদিকে মেলে দিয়ে চোখ বন্ধ করে নির্মল বাতাসটুকু টেনে নিলাম নিজের  ভেতর । ঝির ঝির করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে । অপুর্ব  আনন্দময় অনুভতি হচ্ছে আমার । প্রকৃতিও যেন  জেনে গেছে  আমি কি করেছি । প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ তো প্রকৃতিও পছন্দ করেনা । যারা বিধাতার নিয়মের বাইরে, অকল্যাণ – যা কিনা তাঁর সৃষ্টিকে, অনৈতিকতায় আহত করে, ধ্বংস করে,  স্বেচ্ছাচারিতা করে, তাঁদের শাস্তি তো অনিবার্য ।  তাই তো প্রকৃতি  আমাকে আদরে আদরে কোমল পরশে সোহাগ করছে । চাঁদ আর তারাটিও যেন খুব কাছে চলে এসে হাসছে, রাতের ফোটা ফুলগুলোও সুগন্ধে জড়িয়ে নিচ্ছে ।

-জানিনা কবে আবার এই গ্রামটিকে দেখতে পাবো । আদৌ দেখতে পাবো কি ? এই বিশাল প্রশ্ন নিয়ে আমি গাড়িতে উঠলাম ।

-বাস ছুটছে ঢাকার পথে । নিজেকে নির্ভার মনে হচ্ছে ।  সবাই জানে গতকালই আমার বাড়ি  চলে গেছি আমি । গতকাল ভোরে সুমিদের বাড়ি গিয়েছিলাম । যাবার আগে ওকে একটু দেখবো আর কিছু কথা বলবো ।  আমাকে দেখেই ওর মা তেড়ে এলো । আমাকে টেনে এক কোনায় নিয়ে রাগত স্বরে জানতে চাইলেন আমি কেন আবার এর মাঝে আসছি । আমাকে কিছু বলতেই দিচ্ছিলেন না । আমার কোন কথা শুনতে তিনি রাজি নন । উনার ভালো উনিই বোঝেন । এবং উনার মেয়ের বিষয়ে আমি যেন কক্ষনও মাথা না ঘামাই  । অবশেষে, আমি আজ চলে যাচ্ছি এটা বুঝিয়ে বলার পর  সুমির সাথে কথা বলার অনুমতি পেলাম । সফুরা আমাকে ইশারায় দেখিয়ে দিলো ঘরে যেখানে ওর মেয়ে আছে ।

-ঘরে ঢুকে দেখি বেশ বড় একটি মাত্র কামরা । ঘর বলতে এই একটি মাত্র কামরাই । সুমিকে দেখতে পাচ্ছিলাম না । ওর মা ইশারায় কোনার দিকে দেখালেন । দেখলাম এক ভীষণ কষ্টময় দৃশ্য ।  ওর মা ওকে ঘরের এক কোনায় চৌকিতে শুইয়ে রেখেছে ।   কাপড় ঝুলিয়ে দিয়ে চৌকিটা আড়াল করে রাখা হয়েছে– যেন কেউ ঢুকেই ওকে দেখতে না পায়  । এখানেই থাকতে হবে ।  স্কুল বা অন্য কোথাও যাওয়া  তো দূর,  উঠোনে যাওয়াও মানা । সুমি কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়েছিল । আমাকে দেখেই উঠে বসলো । চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে । শুকিয়ে গেছ । শরীরের এখানে ওখানে ব্যান্ডেজ । হাঁপাচ্ছে বসে বসে ।

-এখানে এভাবে পর্দার আড়ালে শুইয়ে রাখার অর্থ  কি ?  অবাক হয়ে এর কারন জানতে চাইলে যা শুনলাম , তা হল যতদিন না ওর উপর হওয়া  লজ্জাজনক নির্যাতনের  সব  চিহ্ন গুলো মিলিয়ে যায় ততদিন সুমিকে এভাবেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে । যেন দুনিয়া জানতে না পারে এ নির্মম বেদনাদায়ক  লজ্জার কাহিনী । মেয়ে বলে কথা । ভবিষ্যৎ আছে না ওর ? সুমির আর সুমির মায়ের এই বুকভাঙ্গা  নিঃশব্দ  কান্না,  আহাজারি,  এই ক্ষরন  আমাকে পায়ের আঙ্গুল থেকে মাথার তালু পর্যন্ত শরীরে মনে ভাবনায় চেতনায় একেবারেই এক আলাদা একজন মানুষে পরিনত করলো । যে শুধু কোমলই নয় কঠিনও হতে পারে ।

– ওর মা সরে গেলে ওর পাশে এসে বসলাম । ওকে একা পেয়ে কিছু কথা  বলেছিলাম,  ‘তোর জন্য তেমন কিছু তো করতে পারলাম না সুমি । তোকে সুবিচার দেয়ার খুব ইচ্ছে ছিল । ইচ্ছে ছিল তোর জন্য এমন কিছু করি যেন তুই শক্ত ভাবে নিজের পায়ে দাড়িয়ে  কিছু করতে পারিস । জানিনা কখনও সে ইচ্ছা পূর্ণ হবে কিনা ।‘ সুমি করুন ছলছল চোখে তাকিয়ে কি বুঝল কে জানে । মানসিক ভাবে অথর্ব মেয়েটির চিবুক ধরে বলেছিলাম , ‘শোন সুমি , আজ কাল পরশু বা যেদিনই হোক- ওই দুই বদমাশ কুকুরদের নিয়ে  একটা জিনিস দেখবি । শুনবি । ভেবে নিস এটা তোর জন্য আমার কিছু একটা করার চেষ্টা । সাবধান কাউকে কিছু বলতে যাবিনা । শুধু চুপচাপ দেখবি আর শুনবি ।

-সুমি আমার আরও কাছ ঘেসে বসলো । ওর নিষ্প্রভ চোখে একটু যেন আলো ফুটেছে । আমি খুব মমতায় ওর হাতখানি ধরে বলতে লাগলাম,   ‘শোন সব চেয়ে জরুরি যেটা,  লিখা পড়ার ব্যাপারে এতদিন কি কি বলেছিলাম মনে রাখিস । পড়বি খুব পড়বি । বড় হবি । যতটা হলে মনে প্রশান্তি আসে, উদারতা আসে, শুদ্ধতা আসে ।  এবং সেইসাথে ময়লা আবর্জনা আর সব পোকামাকড় ঝেড়ে মুছে সাফ করতে পারিস চাইলেই । ঠিক ততটুকু বড় হতে হবে তোকে । এই কষ্টকে কষ্টে নয়,  হতাশায় নয় । নিজেকে বিশাল করতে এই কষ্টকে শক্তিতে রূপান্তরিত করবি । জানিনা কতটুকু বুঝতে পারছিস । কিন্তু মনে রাখিস কথাগুলো,  কোন একদিন বুঝে যাবি ।‘

-আমার কথায় ওর দুচোখে একটুকরো আশার আলোর সাথে কষ্টের বন্যার অবিরল ধারা নেমে এলো ।  এবার হটাত ও আমার হাঁটুর উপর মাথা রেখে  হু হু করে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো । সাথে আমারও চোখের পানি টুপটুপ করে পড়ছিল ওর মাথায় ।

 

©সেলিনাজান্নাত

ঢাকা-রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

জীবন যেখানে বন্দি (প্রথম পর্ব)

Pritom pallav

আজ আমার বিয়ে – পর্ব ৫ম

Rohit Khan fzs

হাওর এক্সপ্রেস – পর্ব ৩য়

Rohit Khan fzs

3 comments


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Mohammad Johirul Islam June 28, 2017 at 9:07 pm

porbo gullo valo legeche


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Salina Zannat June 28, 2017 at 9:18 pm

thanks– good wishes for you


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Footprint Police July 4, 2017 at 4:42 pm

Spelling Error = Yes

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: