Now Reading
২০০ বছরের পুরনো আমগাছ : যার অবস্থান বাংলাদেশে!!



২০০ বছরের পুরনো আমগাছ : যার অবস্থান বাংলাদেশে!!

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন বয়সী অনেক পুরনো গাছ। এর কোন কোনটি ২০০-৩০০ বছরেরও বেশি বয়সী। আবার কোনটির বয়স তার চেয়েও বেশি। তেমনই ঠাকুরগাঁওয়ের একটি আমগাছের কথা সেদিন জানতে পারলাম ফেসবুকে একজনের পোষ্ট থেকে। একটি আমগাছ যার বয়স নাকি ২০০ বছরেরও অধিক!!

মনের ভিতর বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ায়, কিছুদিন আগে এক ছুটির দিনে চলে গেলাম সেই ২০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী আম গাছটি দেখতে। আগেই বলে রাখি আমার এই আধুনিক যুগের পার্টি, ধুমধাম অনুষ্ঠানের চেয়ে গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতেই বেশি ভালো লাগে। এর জন্য এমন প্রকৃতি বিষয়ক কোন কিছুর খোঁজ পেলেই, দেখতে ছুটে চলে যাই। আর আসার সময় সাথে করে নিয়ে আসি বিশাল ভালো লাগার বেশ কিছু মুহূর্ত ও স্মৃতি।

আমি ঢাকার কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে যাওয়ার জন্য নাবিল পরিবহন বাসের টিকেট কেটে  ছিলাম। ভালই লাগছিল চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে যেতে। মাঝে বঙ্গবন্ধু সেতুও দেখা হয়ে গেল এই সুযোগে। আমাকে ঠাকুরগাঁওয়ের বাস স্ট্যান্ডে নামিয়ে দিয়েছিল। যেখানে নামিয়ে দিয়েছিল সেখান থেকে সোজা চলে গেলাম সেই প্রকাণ্ড আমগাছটি দেখতে । একদম বাংলাদেশের আবহমান গ্রামবাংলার একটি গ্রামীণ পরিবেশ, যেখানে নেই কোন ঢাকা শরের যানজট, কোলাহল, ধুলাবালি। এমনি আপনার মন চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

সতেজ বাতাস, গ্রামীণ পরিবেশ দেখতে পেলাম কতদিন পর। বাস স্ট্যান্ড থেকে নেমে ভ্যানে উঠে আমগাছটির কথা বলতেই চালক রাজী। কথাবার্তায় বুঝলাম আমগাছটি দেখতে নিয়মিত অনেক মানুষ আসে। কিছুক্ষণ পর যেখানে নামিয়ে দিল, সেখানে নেমেই তো আমি অবাক। আমি কি দেখছি এটা। এটা তো আমগাছের বাগান!!

কিন্তু কাছে যেতেই ভুল ভাঙ্গল। এটা কোন আম বাগান নয়। এটা চারিদিকে ডালপালা মেলে ধরা এক বিশাল আম গাছ। যেটাকে এক নজর দেখার জন্যই আমি ঢাকা থেকে এখানে ছুটে এসেছি। যেদিক তাকাই, দেখি আমগাছটি ডালপালা ছড়িয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। বয়সের ভারে গাছটির কাণ্ড, ডালপালা কয়েকটি নুয়ে পড়েছে মাটির সাথে। কৌতূহলী চোখে দেখছি আর ভাবছি আমগাছটিতে আমের মৌসুমে কি পরিমাণ আম ধরে  থাকে?

স্থানীয় বয়স্ক মানুষদের কাছ থেকে জানা যায়, এই আম গাছের বয়স নাকি ২২০ বছর! (সত্যি সত্যি ২২০ বছর কিনা, তার পরীক্ষা এখনো হয় নি। তবে গ্রামের মানুষদের দাবি এর বয়স ২০০+ হবেই।) আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার এখনো নাকি সেই আমগাছ প্রচুর পরিমাণে আম দিয়েই যাচ্ছে। শুনে বেশ অবাক লাগল।

তবে গাছটি কে কবে লাগিয়েছেন, তার সঠিক কোন তথ্য স্থানীয়রা দিতে পারলেন না। সবাই জানালেন এই গাছের কাহিনী তারা তাদের পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে শুনে আসছেন। তাদের বাবা, দাদাদের আমলেরও আগে থেকে গাছটি আছে।

তবে গাছটি যেই জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছে ,সেই জায়গার মালিক  নুর ইসলাম জানালেন, জায়গাটি তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে উনার বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন । আর আম গাছটি তার তিন পুরুষ ধরে দেখছেন, সেই হিসেবে গাছটির বয়স ২২০ বছর তো হবেই। গাছটি সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায়, তারা এটিকে ঘিরে এখন পর্যটন স্পট বানানোর পরিকল্পনা করছেন।

আর যে ইউনিয়নে গাছটির অবস্থান, সেই গ্রামের ইউপি চেয়ারম্যান জানালেন, গাছটি তাদের গ্রামের গর্ব। প্রতিদিন আমার মত নাকি  দূর দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এই গাছ দেখতে এখানে আসে।

এখানে এই গাছটিকে ঘিরে সারা বছর বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, উৎসব, পূজা পার্বণে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। বলতে গেলে এই গ্রাম সহ আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের বিনোদনের স্থান এই গাছটি।

চলুন কিছু তথ্য জেনে আসি গাছটি সম্পর্কে –

গাছটির অবস্থান:

গাছটি ঠাকুরগাঁও জেলায় ভারতের সীমান্তবর্তী হরিনামরা গ্রামে প্রায় ২.৫ বিঘা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত।  এর উচ্চতা প্রায় ৮০-৯০ ফুট। আর পরিধি প্রায় ৩৫ -৩৬ ফুটেরও বেশি।

গাছটির সম্পর্কে কিছু তথ্য:

গাছটি দেখতে বিশাল বটগাছের মত (যদিও আম গাছ)। তার এক একটি কাণ্ডই দেখতে একটি আম গাছের সমান বড়। গাছটির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। মনের ভিতর যেন এক প্রশান্তির পরশ লাগে।

গাছটিতে সূর্য পুরী আম ধরে। এটি ঠাকুরগাঁওয়ের এক বিখ্যাত জাতের আম। আমটি বেশ সুস্বাদু, রসালো এবং ছোট আটি বিশিষ্ট। আর গাছটির বয়স অনেক বেশি হলেও এখনও প্রচুর আম ধরে।

যেভাবে যেতে পারবেন:

১। যদি ঢাকা বা অন্য জেলা থেকে গাছটি দেখতে যেতে চান, তাহলে প্রথমেই আসতে হবে ঠাকুরগাঁও। এরপর সেখান থেকে হরিনামরা গ্রামে যেতে হবে। সেখানে আপনি ভ্যান পাবেন। সেই ভ্যানে করে একদম গাছটির কাছাকাছি এসে নামিয়ে দিবে আপনাকে।

২। এছাড়া নিজস্ব গাড়ি নিয়েও ঘুরে আসতে পারবেন।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা:

১। এখানকার নিরাপত্তা নিয়ে তেমন কোন ঝামেলা নাই। আশে পাশে সবাই আমাদের বাংলাদেশের আবহমান গ্রাম বাংলার সহজ সরল মানুষ। তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না । আর আপনি কোন বিপদে পড়ে সাহায্য চাইলে, তারা সহজ সরল মনেই আপনাকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসবে।

২। যারা যাবেন, তাদের প্রতি একটাই অনুরোধ এটা আমাদের বাংলাদেশের প্রকৃতি। তাই ময়লা, আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলে এই জায়গাটি নষ্ট করবেন না।

কারণ আসার পথে দেখলাম বেশ কয়েকটি বিরিয়ানির প্যাকেট ফেলে রাখা হয়েছে। হয়ত কোন গ্রুপ পিকনিকে এসেছিল। আর পানির বোতল তো যেখানে সেখানে ফেলে চলে গেছে।

এতে কি হচ্ছে? বলুন তো? কার ক্ষতি হচ্ছে? আমাদেরই কিন্তু ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে দিন দিন। তাই এ ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট সচেতন হওয়া উচিত। যেন যেখানে সেখানে আমরা ময়লা, প্লাস্টিকের প্যাকেট, বোতল ফেলে পরিবেশ নোংরা না করি।

রেফারেন্স লিঙ্ক:

 

১। http://www.deshebideshe.com/news/details/31200

২।http://archive.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDdfMTVfMTNfM181N18xXzU2MzA1

About The Author
TANVIR AHAMMED BAPPY
TANVIR AHAMMED BAPPY
3 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment