Now Reading
ঘুরে আসুন হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় নুহাশ পল্লী থেকে



ঘুরে আসুন হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় নুহাশ পল্লী থেকে

বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নাম শুনেছেন কিন্তু নুহাশ পল্লীর নাম শুনেন নি, এমন মানুষ বাংলাদেশে বোধ হয় খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। প্রয়াত কথা সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় বাগানবাড়ি এবং অত্যন্ত সুন্দর একটি শুটিং স্পট হচ্ছে এই নুহাশ পল্লী। যা তিনি নিজ হাতে, নিজের মনের মত করে সাজিয়েছেন। আমরা হুমায়ূন আহমেদের বেশীরভাগ নাটকে নুহাশ পল্লীকে দেখেছি অথবা তার গল্পে পড়েছি। কমবেশি সবারই কিছুটা কৌতূহল রয়েছে এই নুহাশ পল্লীকে নিয়ে।

 

নুহাশ পল্লী নিয়ে কিছু কথা:

১৯৯৭ সালের দিকে হুমায়ূন আহমেদ নিজস্ব উদ্যোগে গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামে প্রায় ৪০ বিঘা জায়গার উপর গাছপালাতে পরিপূর্ণ এই বাগানবাড়ি গড়ে তুলেন। হুমায়ূন আহমেদের  বড় ছেলে নুহাশের নামের সাথে মিল রেখেই এই বাগানবাড়ির নাম নুহাশ পল্লী দেওয়া হয়। যা এখন পিকনিক স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামে চারদিকে শাল গজারি গাছপালার ভিতরে নুহাশ পল্লীর অবস্থান।

আগে নুহাশ পল্লীতে জনসাধারণকে ঢুকতে না দিলেও, হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে নুহাশ পল্লীকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

নুহাশ পল্লীর গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই প্রথমে আপনার চোখে পড়বে “মা ও শিশু” নামের একটি সুন্দর ভাস্কর্য। এছাড়াও এখানে আরও সুন্দর এবং মজার বেশ কিছু ভাস্কর্য রয়েছে। এরপর রয়েছে সুন্দর একটি সুইমিংপুল। হুমায়ূন আহমেদ প্রায়ই তার প্রিয় মানুষদের নিয়ে নুহাশ পল্লীতে এসে এই সুইমিংপুলে নেমে যেতেন। শুনেছি ভারতের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও একবার এখানে হুমায়ূন আহমেদের সাথে গোসল করতে নেমেছিলেন।

এছাড়াও বড় একটি সবুজ ঘাসের বিশাল চত্বর রয়েছে। চারিদিকে এত গাছপালা সহ প্রকৃতির মাঝে থাকলে, আসলেই মন জুড়িয়ে যায়। সেখানে বেশ বড় একটি দাবা খেলার কোর্ট এবং দাবার ঘুঁটি সাজানো রয়েছে। মূলত বাচ্চাদের খেলার জন্যই এই দাবার কোর্ট বানানো।

এর একটু সামনে গেলেই পাবেন আকর্ষণীয় একটি ট্রি হাউজ। একটি গাছের উপর ঘর বানানো রয়েছে।

এর পাশেই রয়েছে “বৃষ্টি বিলাস” নামে একটি কটেজ। হুমায়ূন আহমেদ বৃষ্টি খুব পছন্দ করতেন। তিনি এখানে বসে বৃষ্টি দেখতেন বলে, এর নাম দিয়েছিলেন “বৃষ্টি বিলাস”।

নুহাশ পল্লীতে আরও রয়েছে সান বাঁধানো একটি বিশাল পুকুর। এই পুকুরটির নাম লীলাবতী। লীলাবতী ছিল হুমায়ূন আহমেদ এবং উনার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের কন্যা সন্তান, যে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মৃত্যুবরণ করে। তার স্মৃতি রক্ষার্থে এই পুকুরটির নামকরণ করা হয়। এই পুকুরের মাঝখানে একটি কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে তাতে একটি কাঠের সেতু দিয়ে মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে । এর নাম “দ্বীপ বিলাস”।

এই পুকুরের এক পাশে রয়েছে “ভুত বিলাস” নামে আরেকটি কটেজ। “ভূত বিলাস” নামে এখানে একটি গল্প চালু আছে। এর বারান্দাতে বসে থাকলে আপনি নাকি মধ্যরাতে ভূত দেখতে পাবেন।

নুহাশ পল্লীতে প্রচুর পরিমাণে গাছ রয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ গাছ অনেক ভালোবাসতেন। তাই যেখানে যেতেন, গাছ সংগ্রহ করে নিয়ে আসতেন। উনি গাছকে কতটা ভালবাসতেন, তা একটা কাহিনী থেকে বুঝা যায়। একবার নুহাশ পল্লীতে গাছের শুকনো পাতা পুড়ানোর সময় একটি লেবু গাছে আগুন ধরে যায়। এতে রেগে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ সেই পাতা পুড়ানো কর্মচারীকে নুহাশ পল্লী থেকে বের করে দেন এবং সেদিনের মত শুটিং বন্ধ করে দেন।

নুহাশ পল্লীর অন্যতম আকর্ষণ নাকি এর ঔষধি বাগান। এখানে এত পরিমাণ ঔষধি গাছের সংগ্রহ আছে, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রায় ৩০০ প্রজাতির নাকি ঔষধি, কাঠ, ফুল এবং ফলের গাছ রয়েছে।

এছাড়াও নুহাশ পল্লীতে শুটিংয়ের জন্য বেশ কিছু বিশেষভাবে বানানো ঘর বাড়ি রয়েছে। কারণ হুমায়ূন আহমেদের বেশিরভাগ নাটক এবং সিনেমার শুটিং এই নুহাশ পল্লীতেই হত।

এগুলো ছাড়াও আপনি আরও দেখতে পারবেন হুমায়ূন আহমেদের আবক্ষ মূর্তি , মৎস্য কন্যা, প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রাণীদের বেশ কিছু মূর্তি।

সবশেষে কাঁচ দিয়ে ঘেরা হুমায়ূন আহমেদের সমাধি, যেখানে তিনি নিরিবিলি পরিবেশে শায়িত আছেন।

নুহাশ পল্লীর ম্যানেজারের কাছ থেকে জানা যায়, এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সবার জন্য নুহাশ পল্লী উন্মুক্ত থাকে। প্রতিজনের প্রবেশ মূল্য ২০০ টাকা। আর নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত কর্পোরেট প্রোগ্রাম বা পিকনিকের জন্য নুহাশ পল্লী ভাড়া দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ ৩০০জনের জন্য নুহাশ পল্লী ভাড়া দেওয়া হয়। এমনি দিনগুলিতে ৫০,০০০ টাকা আর সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলিতে ৬০,০০০ টাকা করে প্যাকেজ আকারে ভাড়া দেওয়া হয়ে থাকে।

বুকিং/যোগাযোগের জন্য:

ম্যানেজার বুলবুল  — ০১৭১২০৬০৯৭১,

 

যেভাবে যাবেন:

১। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে গাজীপুর চৌরাস্তাতে আসবেন। সেখান থেকে বাসে করে হোতা পাড়া বাজারে এসে নামবেন। এরপর সেখান থেকে অটো বা টেম্পো নিয়ে সোজা নুহাশ পল্লীর গেটে পৌঁছে যাবেন।

২। তবে যারা ঢাকা থেকে আসতে চান, তারা গুলিস্তান থেকে প্রভাতি বনশ্রী বাসে করে সরাসরি হোতা পাড়া এসে নামতে পারবেন। আবার মতিঝিল থেকে গাজীপুর পরিবহনে এসেও হোতা পাড়া নামতে পারবেন।

৩। এছাড়াও ঢাকা – ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে নিজস্ব গাড়িতেও আসতে পারবেন স্বনামধন্য লেখক হুমায়ূন আহমেদের নুহাশ পল্লীতে, যেখানে সবকিছু তিনি নিজের হাতে শিল্পীর রঙ তুলি দিয়ে আঁকা ছবির মত সাজিয়েছেন।

 

বর্তমান অবস্থা:

যদিও এখন নুহাশ পল্লীর অবস্থা আগের মত নেই। ঠিকমত দেখাশোনা করার অভাবে, নুহাশ পল্লীর সৌন্দর্য দিন দিন ধ্বংস হতে চলেছে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে, তার এত যত্নের সাজানো নুহাশ পল্লীর আজকের এই অবস্থা দেখলে, সত্যি খুব কষ্ট পেতেন। শুধু হুমায়ূন আহমেদ কেন, নুহাশ পল্লীর বর্তমান অবস্থা দেখলে, উনার ভক্তদেরও মন খারাপ হয়ে যাবে।

আগের সেই সবুজ, সাজানো গোছানো নুহাশ পল্লী এখন ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়েছে, হয়ত হুমায়ূন আহমেদের না থাকার হাহাকারকে বুঝিয়ে দিচ্ছে।

১. সুইমিং পুলে পানি নাই।

২. নিয়মিত মানুষের আনাগোনার কারণে, ঘাস জন্মাতে পারে না।

৩. পুকুরের সান বাঁধানো সিঁড়ির করুন অবস্থা। সিঁড়ির বেশকিছু অংশ এখন ভগ্নপ্রায়।

৪.এছাড়া যেখানে সেখানে, পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট ফেলে রাখা হয়েছে।

এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই নুহাশ পল্লী আর হুমায়ূন আহমেদের সাজানো গোছানো নুহাশ পল্লী থাকবে না।

আমাদের সবার উচিত হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত এই নুহাশ পল্লীকে নিয়মিত যত্ন করা, তার স্মৃতিকে ধরে রাখা।

About The Author
TANVIR AHAMMED BAPPY
TANVIR AHAMMED BAPPY
1 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment