Now Reading
হাঙ্গরের সাথে প্রতিযোগিতায় নামবেন যে খ্যাপাটে সাঁতারু!



হাঙ্গরের সাথে প্রতিযোগিতায় নামবেন যে খ্যাপাটে সাঁতারু!

সাঁতারের ইতিহাস নিয়ে একটু ভাবতে গেলেই আমাদের মাথায় সবার আগে আসে মাইকেল ফেলপস্ এর নাম। অলিম্পিকে তেইশ বার গোল্ড মেডেল পাওয়া আমেরিকান সাঁতারু ফেলপস্, এবার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিশাল এক সাদা হাঙ্গরকে। এই খবরের প্রচারণা যেন তাক লাগিয়ে দিয়েছে মানুষের মনে। সবাই এখন একরাশ কৌতূহল ভরা চোখ আর ব্যাপক উত্তেজনা নিয়ে তাকিয়ে আছে বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই প্রতিযোগিতার অপেক্ষায়। ডিসকভারি চ্যানেল থেকে প্রকাশিত সম্প্রতি এক সংক্ষিপ্ত ভিডিও চিত্রে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। মাইকেল ফেলপস্ এর এই প্রতিযোগীতাটি হবে প্রকৃতপক্ষে ডিসকভারি চ্যানেল প্রকাশিত ‘Shark Week’ অনুষ্ঠানেরই একটি অংশ। এই অনুষ্ঠানটি একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান যা ১৯৮৮ সাল থেকে এই চ্যানেলে প্রকাশিত হয়ে আসছে। হাঙ্গর নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা দূর করতে আর সংরক্ষণের উদ্দেশ্যেই এটি প্রচারণা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং চ্যানেলটির সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম হিসেবে গণ্য হয়। এই বছর এরই অংশ হিসেবে ফেলপস্ সাঁতার প্রতিযোগিতায় নামতে যাচ্ছেন হাঙ্গরের বিপরীতে। আগামী তেইশ জুলাই, রবিবার রাত আটটায় প্রতিযোগীতাটি প্রচার করা হবে।

মাইকেল ফেলপস্ এর বত্রিশ বছরের জীবনী ঘাটতে গেলে সবার আগে চলে যেতে হবে মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোর শহরে। এখানেই তিনি ১৯৮৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে ছোট। সাত বছর বয়স থেকেই তিনি সাঁতার কাটা শুরু করেন তার বোনদের অনুপ্রেরণায়। তার মা শুধু চেয়েছিলেন ফেলপস্ যাতে সাঁতার শিখুক। পরবর্তীতে ফেলপস্ এবং তার বোনেরা সাঁতারের প্রেমে পরে যান। দশ বছরে পদার্পণের আগেই তিনি তার বয়স গ্রুপ অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ে রেকর্ড গড়ে তুলেন এবং ক্রমে কোচ ববের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ফেলপস্ অলিম্পিকে মোট তেইশটি গোল্ড মেডেল জিতেছেন এবং অলিম্পিকে তিনি সর্বমোট আটাশটি মেডেলের অধিকারী। ২০০৮ সালের বেইজিংয়ে খেলায় তিনি আটটি গোল্ড মেডেল পান এবং মার্ক নামের একজন আমেরিকান সাঁতারুর ১৯৭২ সালের রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেন। এছাড়াও আন্তর্যাতিক কিছু প্রতিযোগিতায় তিনি ৮৩ টি মেডেল জিতেছেন যার মধ্যে ৬৬ টি সোনার, ১৪ টি রূপার ও ৩ টি ব্রোঞ্জের। এরই পাশাপাশি তিনি আটবার জিতে নিয়েছেন বার্ষিক বিশ্বসেরা সাঁতারুর পুরস্কার ও এগারোবার জিতেছেন বার্ষিক সেরা আমেরিকান সাঁতারুর পুরস্কার। ফেলপস্ এর এই ঈর্ষনীয় সাফল্যের মধ্যে তিনটি বিষয় ছিল যা তাকে বাকিদের থেকে আলাদা করেছিল। প্রবল ইচ্ছা, পরিশ্রম ও শারীরিক গঠন! হ্যা, শারীরিক গঠনের দিক থেকে ফেলপস্ সবার থেকে ভিন্ন। তার উচ্চতা ছয় ফুট চার ইঞ্চি হলেও সাঁতারের সময় তিনি তার হাত ছয় ফুট সাত ইঞ্চি পর্যন্ত প্রসারিত করতে পারেন যা তার উচ্চতার চেয়ে তিন ইঞ্চি বেশি। সাধারণত বাকি সব সাঁতারু, সাঁতারের সময় হাত নিজের উচ্চতার সমানই প্রসারিত করতে পারেন। সুতরাং বেশি প্রসারিত করার জন্য ফেলপস্ এর হাত সাঁতারের সময় যেন অধিক কার্যকরী প্যাডেলের মতোন কাজ করে। এছাড়াও তিনি শারীরিক গঠনের জন্য আরও কিছু সুবিধা ভোগ করেন। কোন কাজ করার সময় অথবা অতিরিক্ত একটানা পরিশ্রমে আমাদের দেহে ল্যাক্টিক এসিড তৈরী হয় যা আমাদের গতিকে কিছুটা কমিয়ে দিয়ে থাকে। এই এসিডের অপসারণে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে ফেলপস্ এর দেহে এই ল্যাক্টিক এসিড ঠিক অর্ধেক পরিমাণে তৈরী হয়। যার ফলে পরিমাণে কম বলে এটি অপসারণেও তুলনামূলক কম সময় লাগে। ফলে এটিও ফেলপস্ এর জন্য অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে কাজ করে। শারীরিক কিছু সুবিধা বাকিদের তুলনায় বেশি থাকলেও সাফেল্যর জন্য যে প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমের দরকার তার কোন কমতি নেই মাইকেল ফেলপস্ এর মধ্যে। সেজন্যেই তিনি এতোদূর আজ এগিয়ে আসতে পেরেছেন।

ফিরে আসা যাক হাঙ্গর এর সাথে প্রতিযোগীতার বিষয়ে। ফেলপস্ মানব ইতিহাসে সর্বশেষ্ঠ সাঁতারুর উপাধি তো পেয়েছেন, এখন তিনি পণ করেছেন হাঙ্গরের সাথে প্রতিযোগিতার। হাঙ্গর পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত শিকারী প্রাণিদের মধ্যে অন্যতম। হাঙ্গর বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে শারীরিক গঠন লাভ করেছে তার বদৌলতেই দ্রুততম প্রাণিতে রুপান্তরিত হয়েছে। যে বিশাল সাদা হাঙ্গরটি ফেলপস্ এর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চলেছে সেটিও এর ব্যতিক্রম নয়। অপরদিকে ফেলপস্ হচ্ছেন সর্বকালের শেষ্ঠ সাঁতারু। তার দ্রুত বেগের পিছনে কারণ তার অঢেল পরিশ্রম ও অনুশীলন। তার সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ছয় মাইল, যেখানে একটা হাঙ্গরের গড় গতি ঘন্টায় পঁচিশ মাইল। একজন মানুষের জন্য ঘন্টায় ছয় মাইল করে সাঁতার কাটা অভূতপূর্ণ সাফল্য হলেও একটা হাঙ্গরের তুলনায় তা কিছুই নয়। আর হাঙ্গর জলজ প্রাণি হওয়ায় স্বভাবতই তার অন্যান্য দিক থেকেও মানুষের থেকে সাঁতারের ক্ষেত্রে সক্ষমতা বেশি। প্রতিযোগিতাটি ঠিক কিভাবে ঘটতে চলেছে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। হাঙ্গরটিকে প্রতিযোগিতার সময় ক্ষুধার্ত রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে। আর ফেলপস্ কি কসরত করবেন সেটাও এখনো অজানা। এছাড়া ডিসকভারি চ্যানেল খুব বেশি কিছু এখনো প্রকাশ করেনি এবং ফেলপস্ নিজেও তেমন কিছু জানাননি। খুব সম্ভব্যত পুরো বিষয়টি দর্শকদের জন্য এক চমক হিসেবেই রাখা হয়েছে। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে সাঁতারের এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া মাইকেল ফেলপস্ এর পক্ষে অসম্ভব মনে হলেও, পুরো পৃথিবী উৎসুক হয়ে আছে জানার জন্য ফেলপস্ কি কৌশল অবলম্বন করবেন দ্রুত গতির এই বিশাল সাদা হাঙ্গরকে হারাতে। ফেলপস্ কি পারবেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিশাল এই হাঙ্গরকে হারাতে?

About The Author
Anika Tasnim Biva
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment