সাহিত্য কথা

বালা লাগছে প্রেম করছি কইফত দিমু ক্যালা পর্ব—১

বাদশা প্যারিসের উচ্ছ্বল হাসিমুখের দিকে অপলকে তাকিয়ে আছে । বাদশার মুগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে প্যারিস বলল, ‘এই, এমন করে তাকাও কেন ? এতো কি দেখো ?’ তবুও বাদশাকে চুপ দেখে ও আবারও বলল,  ‘এই, বলনা কি দেখছ এমন করে ।‘

-‘কেমুন কইরা ?’ পলক না ফেলে, চোখ না সরিয়ে ওভাবেই বলল বাদশা ।

-‘এই যে এমন গভীর হয়ে ? নিবিষ্ট হয়ে ।‘

-তুমার হাছি দেখতে আছি । পিরিছ । ইমুন হাছি,  দেইখা দেইখা আমি পাগল  ওইয়া যাইতে লাগছি ।‘

-প্যারিস কৃত্তিম গাম্ভীর্য নিয়ে বলল, ‘ও কে । আর হাসবো না । কাউকে পাগল করার অপরাধে অপরাধী হওয়া কি ঠিক ? নিশ্চয়ই নয় ।‘

-নদীর দুরন্ত বাতাসে উড়ে উড়ে যাওয়া প্যারিসের অবাধ্য চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে সরিয়ে বাদশা বলল, ‘এমুন কথা তুমি কেমতে কইলা ? তুমি কেমতে না হাছবা । তুমি না হাছলে আমি তো ডাবল পাগল ওইয়া জামু । এতো ছুন্দর কইরা হাছ । কি ছুন্দর যে লাগে তুমার হাছি । এক একটা হাছি হাছ, আর আমার এক একটা বচ্ছর আয়ু বাইরা যায় ।‘

– ‘ইসস ।‘

‘হাছা কইতাছি , এক্কেরে কছম—–।‘

-‘আমি বলেছি কিছু, বল ? আমি তো জানি ।‘

ওদের কথার মাঝখানে ফুসকাআলা এসে বলল, ‘এই নেন আপনেগো পেলেট ।‘ বাদশা একটি প্লেট প্যারিসের হাতে তূলে দেয় । অন্যটি নিজে নিয়ে ওর পাশে দাঁড়ায় ।

-ওরা দুজন, প্যারিস আর বাদশা । দাঁড়িয়েছিলো বুড়িগঙ্গা নদীর উপর ব্রিজটিতে । নদীর পানির দিকে তাকিয়ে ফুসকা খেতে খেতে প্যারিস বলল, ‘এই শোন, রেলিং এ প্লেট রেখে খেতে খেতে তো প্লেটই পড়ে যাবে । নদীতে ।‘

-‘এই কথা ? এর লিগগ্যা কি খাইবা না ? পড়লে পড়বো । ফুসকাআলারে একটা পেলেটের লিগগ্যা পাঁচটা পেলেটের দাম দিমুনে ।‘

-‘সত্যি ফেলে দিলাম ।‘  বলে প্যারিস সত্যিই ফুসকার প্লেটটা নদীতে ফেলে দিলো ।

-ফুসকাআলা দৌড়ে এলো , ‘করেন কি আফা, পেলেট ফালাইয়া দিলেন ।‘

-‘এই মিয়া ছুনো ।‘ বাদশা সামনে এসে দাঁড়ালো । ‘ পেলেট পড়ছে কি পড়ে নাই এইডা দেখন তোমার কাম না ।  তোমার কাম তুমি ফুসকা বানাইবা আর মেডামেরে আইনা দিবা । দিতেই থাকবা বুঝছ ? থামাথামি নাই ।‘

-ফুসকাআলা দ্বিতীয় প্লেটটা এনে বাদশার হাতে দিলো । বাদশা প্লেটটা নিয়ে প্যারিসের হাতে দিয়ে বলল, ‘এই লও পিরিছ, পেলেট  ফালাইতে ফুরতি লাগতাছে, লও ফালাও ।‘

-প্যারিস আবারও প্লেটটি  নিয়ে খুব সহজ ভাবে নদীতে ফেলে দিল । ফুফকাআলা দৌড়ে এলো, ‘কামডা কি অইল মেডাম , নদীর মইদ্দ্যে পেলেট ফিক্কা মারতাছেন । কিল্লিগগ্যা ?’

-বাদশা আবারও সামনে এসে দাঁড়ালো,  ফুসকাআলার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ছুনো মিয়া, চিন্তা করো ক্যালা ? একটা পেলেটের বদলি তুমারে দছটা পেলেটের টেকা দিমুনে । চিন্তার কাম নাইক্কা । তুমি খালি ফুসকা বানাইবা আর মেডামেরে দিবা । বুঝছ আমার কথা ? কেচাকেচির দরকার নাই ।‘

-ফুসকাআলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকাতে থাকে ।

-‘কি মিয়া কথা কানে লও না ক্যালা ? যাও ফুসকা বানানি ছুরু করো ।‘

-ফুসকাআলা অনিচ্ছা সত্বেও মাথা নেড়ে চলে যায় । আর বিস্ময়য়ের চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে ফুসকা বানাতে থাকে । ফুসকাআলার চোখের সামনে দিয়ে যখন পঞ্চম প্লেটটিও নদীতে পড়লো আর প্যারিস একটি ফুসকা মুখে দিয়েই নিষ্ঠার সাথে নদীর পানিতে প্লেট ফেলার কাজটা করে যাচ্ছিলো তখন ফুসকাআলার সাথে সাথে আরও কিছু উৎসাহী দর্শকও হা করে তাকিয়েছিল ।

– পাশে দাঁড়িয়ে বাদশা তাকিয়েছিল হাসিমুখে । যেন একটি শিশু অন্য একটি শিশুর সাথে মজার কোন খেলায় মেতেছে ।

-ঠিক এই সময় সারমান ওদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো মোটর বাইকে করে । সারমান প্যারিসের একমাত্র ভাই । যদিও আরও একটি বোন আছে প্যারিসের । ওরা দুজনই বড় । আজ সারমানের কি একটা কাজে পুরনো ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জ যেতে হয়েছিলো । ফিরতি পথেই ও দেখতে পেল প্যারিসকে । একটি ছেলের সাথে নদীর পাড়ে দাড়িয়ে খুব হাসছে ।

-বাইকটাকে একটু দূরের টিক্কা কাবাবআলার গাড়ির আড়ালে রেখে ও দাঁড়িয়ে ছিল হতবাক হয়ে । এখানে এতো দূরে বুড়িগঙ্গার উপরে অচেনা একটি ছেলের সাথে ? ওরা যথেষ্ট আধুনিক ফ্যামিলি । বন্ধু থাকাটাকে স্বাভাবিক চোখেই দেখে । কিন্তু এতো দূরে হটাত প্যারিসকে দেখে ও কৌতূহলে এগিয়ে এলো প্যারিসকে আড়াল করে ।

-ও চাইছিল যে প্যারিস যে ছেলেটার সাথে এতো দূর এসে ঘুরছে, সে ব্যাক্তিটা কেমন । আজ অবধি প্যারিসকে কোন ছেলের সাথে এতটা আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে দেখেনি ও । বরং ছেলেদের সাথে ও কে খুব গুনে হিসাব করে কথা বলতে দেখেছে । পলিন, মানে বড় বোন,  যেমন খুব বন্ধু নিয়ে মেতে থাকতো, প্যারিস মোটেই তেমনটা  নয় । প্যারিস যখন নদীর দিকে তাকিয়ে নৌকা গুনছিল আপন মনে,   তখন সারমান চট করে ফুসকার গাড়ির আড়ালে এসে দাঁড়ালো। বাদশা তখন  কথা বলছিল ফুসকাআলার সাথে । সারমান ওকে ডাক দিলো, এই, এই যে ভাই শুনুন।

-কি, আমারে কইতাছেন?

-জি আপনাকে।

– এগিয়ে এলো বাদশা, ‘কি হইছে?’

-সারমান প্রথমে কি বলবে ভেবে পেল না। ‘না মানে বলতে চাইছিলাম কেরানীগঞ্জ নদীর কোন পাড়ে।‘

-ও আইচ্ছা এই কথা। আপনের বাম হাতের দিকে ওইল পুরান ঢাকা আর ডাইন হাতে ওইলো কেরানীগঞ্জ। এই যে বিরিজ দেখতাছেন, এর এই পাড়ে ওইল ঢাকা ওই পাড়ে কেরানীগঞ্জ । বুঝবার পারছেন ?’

– আচ্ছা। ধন্যবাদ। ছেলেটার সাথে কথা বলতে বলতে ওর ভাষা শুনে মনে মনে বিরক্ত হচ্ছিলো সারমান। আর  যখন দেখল ছেলেটি চিৎকার করে প্যারিসকে বলছিল,   ‘পিরিছ তুমারে আরও মছলা  দিবার কমু।‘  কথাটা শুনে ও ভেতরে ভেতরে মহা খ্যাপা হয়ে গেলো। প্যারিস,  এতো সুন্দর একটা নামকে বলছে পিরিচ। এ কেমন ভাষা । আমার আদরের বোনটাকে কাপ পিরিচ প্লেট বানিয়ে ফেললো। ডিসগাসটিং । এমন একটা ছেলের সাথে প্যারিস কথা বলছে কি করে?

images (4).jpg

কোমরে দুহাত দিয়ে রাগত চোখে ও ভাবছিল। আমার বোন প্যারিস,  যে কিনা ব্রিটেনে জন্ম নিয়ে ওখানেই বড় হয়েছে, সব দিকেই অসাধারন একটি মেয়ে । আর সে এমন একটি রাবিশ টাইপের ছেলের সাথে ভাব করছে। যে ছেলে তার নামটা পর্যন্ত ঠিক ভাবে উচ্চারন করতে পারছে না। পিরিচ। হোয়াট ইজ পিরিচ? আমার বোন কোন ক্রোকারিজ? রান্না ঘরের বাসন কোসন?

-গাইয়াটা আবার এই দিকেই আসছে। নিজের রাগকে সামলে ভাবে ও । ‘এখন নয় সারমান, নট নাউ । নো সিন ক্রিয়েট। সারমান নিজের মুখটাকে যথা সাধ্য কোমল করে বলল, ‘কি ভাই ফ্রেন্ড বুঝি? ফ্রেন্ড নিয়ে ঘোরার জন্য চমৎকার জায়গা।‘

-‘ আরে কি কন। বহুত সুন্দর জাগা। এক্কেরে। নদীর বাতাছ খাইবেন মন ভইরা। আপনের মনে অয় পুরান ঢাকা ছোম্পরকে কুন আইডিয়া নাইক্কা। এই হানে বহুত ছুন্দর ছুন্দর জাগা আছে।‘

-ও আচ্ছা । তাই ?’

-‘  ঘুইরা ঘাইরা না দেখলে বুজবার পারবেন না । পুরান ঢাকা আইছেন, আহেন ।  আমগো লগে বইসা  অহন ফুসকা খান ভাইছাব । খুব ছাদের ফুসকা ।‘  বলে বাদশা ফুসকার অর্ডার দেয় । ‘এই মিয়া,  এই ফুসকা,  ভাইয়েরে ফুসকা দেও । যেই কই প্লেইট খাইবার চায় দিবা । বিল আমি দিমু নে ।‘

-‘ না আমি খাবো না ।‘ সারমান জোরালো  অসম্মতি জানায় ।

-‘খাইবেন না ?  ক্যান ? পুরান ঢাকা আইছেন, দেখা ওইছে, একটু মেহমানদারী করবার দেন ।‘

-‘আমি ফুসকা খাই না ।‘

-‘কি কন বাই, তাজ্জুব কথা ? ফুসকা খায় না এমুন মানুছ আছে নি ? খাইয়া দেখেন, বহুত ছাদের ।‘

-‘এরা হাইজিন না । আর জিনিসটাও  হাইজিনিক না ।‘

-‘হাই জিন আর লো জিন, এতো ভাবতাছেন ক্যালা ? জিনেরে ডরান নি কুনু ? কথাটা বলে বাদশা হাসতে থাকে । হা হা হা । গুলু মিয়ার কাম কাজ পরিছকার আছে । বিছছাস কইরা খাইয়া দেহেন ।‘

-বাদশার সাথে কথা বলতে বলতে ওর এমন ঢাকাইয়া উচ্চারণে সারমানের মেজাজ ক্রমশই খিঁচে যাচ্ছিলো । নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে ও বলল,  ‘ভাই একটা কথা –।‘

-‘কি কথা ।‘

চলবে———।

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

০২/০৭/২০১৭ইং

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

ভালবাসার প্রকারভেদ

Rohit Khan fzs

স্বপ্নের প্রহর।

Shad Bin Akram Niloy

মাতৃভাষা এবং সাহিত্য

Nur Hossain

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy