Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (শেষ পর্ব)



চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (শেষ পর্ব)

চেরনোবিল, নামের সাথে জড়িয়ে আছে যেন দুর্ভোগ আর মৃত মানুষের আর্তনাদ। বিপর্যয়ের সময়কার কাহিনী সেই সাথে সোভিয়েত বাহিনীর ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবেলার কাহিনী ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে। দুর্ঘটনার ৩১ বছর পর চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র আর প্রিপিয়াট শহরের বর্তমান অবস্থা সিরিজের এই শেষ পর্বে আলোচনা করা হবে।chernobyl2.jpg.size.custom.crop.1086x724.jpg

প্রিপিয়াট, এক সময়ের আধুনিক আর কোলাহলে পরিপূর্ণ শহরে এখন প্রবেশ করলে মনে হতে পারে, হলিউডের কোন ভৌতিক ছবির জন্যে বানানো কোন সেটে প্রবেশ করছেন। প্রতি বছর প্রকৃতি আপন খেয়ালে একটু একটু করে প্রিপিয়াট শহরকে গ্রাস করে নিচ্ছে। একসময়ের রৌদ্র উজ্জ্বল আকাশচুম্বী স্থাপনাগুলোর গায়ে গজিয়েছে লতানো গাছ, ফাটল ধরা ছাদ জায়গা করে দিয়েছে গাছদের বেড়ে উঠার জন্যে। সময়ের ছাপ পড়ছে ক্ষতবিক্ষত দেয়াল আর মার্বেল পাথরের মেঝেগুলোতেও। তুষারপাত, বৃষ্টি আর তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে একসময় হাজারো মানুষের পদচারণে মুখর ব্যস্ত রাস্তাগুলো। আগাছা আর ঝরা পাতার নিচে এখনো খুঁজে পাওয়া যায় তাড়াহুড়োয় ফেলে যাওয়া শহরবাসীর প্রিয় কোন বস্তু অথবা সৈনিকদের ব্যবহার করা তেজস্ক্রিয়তা বিরোধী মাস্ক।

ইউক্রেনের বিশেষ কিছু পর্যটন কোম্পানি চেরনোবিলের নির্দিষ্ট অংশে ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দেয়। তারপরও বিশেষ অনুমতি এবং সাথে অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক নিয়ে প্রবেশ করা যায় চেরনোবিলে। পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের আশেপাশে যে সব স্থানে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সহনশীলতার মাঝে এসেছে কেবল সেই অংশে যাবার অনুমতি দেয়া হয় দর্শনার্থীদের। পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের ১৯ মাইল জায়গা জুড়ে রয়েছে বিশেষ সংরক্ষিত অঞ্চল। সাধারণ মানুষের প্রবেশ সেখানে পুরোপুরি নিষেধ। তেজস্ক্রিয়তার কোন প্রভাব যাতে না পরে সে জন্যে বিশেষ নির্দেশ থাকলেও নিয়মের তোয়াক্কা না করে বেশিরভাগ দর্শনার্থী শহরের ঘরবাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। কয়েক ঘণ্টার জন্যে সেখানে অবস্থান করতে দেয়া হলেও দুর্ঘটনা-ক্ষেত্রের ৩০ কিলোমিটারের ভেতরে স্থায়ী ভাবে কাউকে বসবাসের অনুমতি দেয়া হয় না।1.jpg

ভৌতিক নগরের বিশেষ দর্শনীয় বস্তুগুলোর মধ্যে অন্যতম হল বিশাল এক নাগরদোলা যা বছরের পর বছর ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রঙিন শরীরে বয়সের ছোপ পরতে শুরু করেছে। বাম্পারকারের বিশাল শতচ্ছিন্ন ছাউনি আর উজ্জ্বল রঙের গাড়িগুলোর মরচে পরা শরীর মনে করিয়ে দেয় ভয়াবহ সেই দুর্যোগের ভয়াবহতা। বাস স্টেশন, দমকল অফিস, বাচ্চাদের স্কুল কিংবা স্থানীয় হাসপাতাল সবখানেই ছড়িয়ে আছে হুট করে চলে যাওয়া প্রিপিয়াটবাসীর জীবনের ছাপ। রাস্তায় মরচে পরা গাড়ির সাথে মে ডে উদযাপনের জন্যে প্রস্তুত করা ব্যানারগুলোও অপেক্ষায় আছে কখনো না হওয়া কুচকাওয়াজের শব্দের। বিশাল সাইনবোর্ড বছরের পর বছর ধরে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে চলছে সবাইকে মৃত এই শহরে।2.jpg

প্রিপিয়াট শহর ১৯৮৬ সালের পর থেকে জনশূন্য হলেও চেরনোবিল শক্তিকেন্দ্র কিন্তু বন্ধ হয়ে যায় নি। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত মোট চারটি পারমানবিক চুল্লি বসানোর কাজ সম্পন্ন করে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ। সেই সাথে কাজ চলতে থাকে আরও দুইটি চুল্লীর। ৮৬ সালে চার নম্বর চুল্লীর বিস্ফোরণের ফলে সেই দুইটি চুল্লীর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অবশিষ্ট তিনটি পারমাণবিক চুল্লী আরও কয়েক বছর কার্যকর ছিল, কারণ ইউক্রেনের বৈদ্যুতিক চাহিদা মেটানোর জন্যে অন্য কোন ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক ভাবে নেয়া সম্ভব ছিল না। ২ নম্বর পারমাণবিক চুল্লী ১৯৯১ সালে, ১ নম্বর চুল্লীটি ১৯৯৬ সালে এবং সর্বশেষ ২০০০ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় চেরনোবিলের তিন নম্বর এবং সর্বশেষ পারমাণবিক চুল্লী। Chernobyl-520066.jpg

বিস্ময়কর হলেও সত্যি চেরনোবিলের পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে এখনো প্রায় ৪০০০ মানুষ কাজ করে। এই কর্মচারীদের মধ্যে প্রকৌশলী, বিশেষজ্ঞ আর শ্রমিক রয়েছে। তাদের মূল কাজ ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লীর রক্ষণাবেক্ষণ করা। পার্শ্ববর্তী অপর চুল্লীগুলো নিস্ক্রিয় করা এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ অপসারণের সময় যাতে কোন রকম দুর্ঘটনা না ঘটে সে জন্যে এই কর্মীদের নিয়োগ করা হয়েছে। তেজস্ক্রিয় এই অঞ্চলে কর্মীরা কিভাবে কাজ করে তা নিয়ে যে কারও কৌতূহল জাগতে পারে। পূর্ণ বিবরণী জানা না গেলেও এটুকু জানা যায়, তেজস্ক্রিয়তা রোধী বিশেষ পোশাক ছাড়াও বিশেষ তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে কাজ করা লাগে সেখানে। প্রত্যেক কর্মচারীকে মাসে দুই সপ্তাহ চেরনোবিলে কাজ করবার পরবর্তী দুই সপ্তাহ তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

চেরনোবিলের নিষিদ্ধ এলাকার মাঝে রয়েছে বিশাল এক বন। প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই বনের নাম ‘রেড ফরেস্ট’। যে অঞ্চলের কোন কিছুই সাধারণ নয় সেখানকার বনও তাই অসাধারণ। চেরনোবিল বিস্ফোরণের ফলে এই অঞ্চলের পাইন গাছের পাতা মরে লালচে হয়ে গিয়েছিল। অশুভ সেই মৃত বনের নাম তাই রাখা হয় রেড ফরেস্ট। দুর্ঘটনা পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সময় বিষাক্ত এই বন কেটে ফেলা হয় এবং অন্যান্য তেজস্ক্রিয় পদার্থের সাথে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়।। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বন্য অঞ্চলকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত এলাকাগুলোর একটি বলা হয়ে থাকে। অনেকের মতে এই জঙ্গলে আশ্রয় নেয়া বন্য পশু-পাখি যারা তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয়েছিল, পরবর্তীতে তাদের মৃতদেহ সেখানকার মাটিতে মিশে জায়গাটি আরও বিষাক্ত করে তোলে। যার ফলে পরবর্তী সময় সেখানে জন্মানো গাছ এবং প্রাণীদের মধ্যে অদ্ভুত আকৃতি এবং গঠন দেখতে পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে রেড ফরেস্টে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে যার ফলে আশঙ্কা দেখা দেয় তেজস্ক্রিয় বাষ্প ছড়িয়ে পরার।18pa142mfvc1fjpg.jpg

দুর্ঘটনার ৩১ বছর পর কি বলা চলে ইউক্রেন, রাশিয়া বা ইউরোপ চেরনোবিলের বিষাক্ত ছোবল থেকে পুরোপুরি নিরাপদ? না, সে কথা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ‘সার্কোফেগাস’ নামের বিশাল এক কাঠামোর মাধ্যমে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক চুল্লীকে ঢেকে দেয়া হয়েছিল সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে গত পর্বে। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত বৈজ্ঞানিকরা ঘোষণা করেন সার্কোফেগাস ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত তেজস্ক্রিয়তা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে। সেই সময়ই ইউরোপিয়ান ব্যাঙ্কের সহায়তায় একটি বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়, যাতে সার্কোফেগাসের রক্ষণাবেক্ষণে অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি না হয়। কিন্তু বিগত ৩১ বছরে নানান ভাবেই ক্ষতির সম্মুখীন হয় সার্কোফেগাস। বৃষ্টিপাত এবং তুষার গলা পানির কারণে সার্কোফেগাসের ধাতব শরীরে মরচে পরতে শুরু করে। সেই সাথে ভেতরের পারমাণবিক বর্জ্য পর্যবেক্ষণের জন্যে রাখা বিশাল ছিদ্রগুলো দিয়েও ভেতরে পানি প্রবেশ করে। মরচের প্রভাব ছাড়াও সার্কোফেগাস ক্ষয় হবার পেছনে তেজস্ক্রিয়তা দায়ী। সেই সাথে তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করায় কিছু ত্রুটি প্রাথমিক ভাবেই রয়ে গিয়েছিল এই কাঠামোতে।new-safe-confinement-chernobyl-NPP-ukraine-2.jpg

১৯৯৬ সালে ঘোষণা করা হয় সার্কোফেগাসের ভেতরে ঢুকে মেরামত করা সম্ভব নয় সেখানের তেজস্ক্রিয় পরিবেশের কারণে। কিন্তু সময়ের সাথে ক্ষয়ে যাওয়া এই স্থাপনার উপর আর বেশিদিন ভরসা করাও সম্ভব নয়। তখনই নতুন আরও নির্ভরযোগ্য নতুন একটি কাঠামোর কথা পরিকল্পনা করা হয়। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন বন্দীশালা বা নতুন আশ্রয় New Safe Confinement (NSC or New Shelter)  এর কাজ শুরু হয়। ২০০৯ সালের মাঝে শেষ করবার লক্ষ্যে কাজ শুরু হলেও নানান জটিলতায় শেষ পর্যন্ত বলা হয় ২০১৫ সালে সম্পন্ন হবে নতুন এই কাঠামোর কাজ। অর্থনৈতিক জটিলতায় আবারো কাজ পিছিয়ে যায়। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ীয় ২০১৭ সালের শেষ দিকে নতুন এই স্থাপনার কাজ সম্পন্ন হবে। এতে মোট খরচ হচ্ছে ২.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এনএসসি নামের এই স্থাপনা মূলত তৈরি করা হচ্ছে কোন ধরনের তেজস্ক্রিয় বাষ্প বা অন্য কোন পদার্থ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লী থেকে বের না হতে পারে। সার্কোফেগাসের উপরে একে বসিয়ে দেয়া হবে যাতে পুরো চুল্লীটি সুরক্ষিত থাকে। এর ফলে কমপক্ষে ১০০ বছর নিশ্চিত থাকা যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস।

অনেক বিশেষজ্ঞ অনেক রকম মতামত প্রকাশ করলেও সবচেয়ে কম করে হলেও ১৮০ থেকে ৩২০ বছর লাগবে চেরনোবিল এলাকা মানুষের বসবাসের উপযোগী হতে। মাটির নিচের দূষণ অথবা পানি নিশ্চিত রূপে নিরাপদ হতে আরও বেশি সময় লাগবে বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লী থেকে পারমাণবিক বর্জ্য কবে নাগাদ সরানো হবে এই বিষয়ে সঠিক কিছু জানা যায় নি। যেমন জানা যায়নি অগণিত মৃত মানুষগুলো সম্পর্কে। রহস্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যের সামান্য অংশই হয়তো আলোচনা করতে পেরেছি।  চেরনোবিলের কাহিনী এই পর্যন্তই থাকলো। আগামীতে দেখা হবে নতুন কোন কাহিনী নিয়ে। ধৈর্য ধরে পুরো সিরিজটি পড়ার জন্যে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

 

About The Author
Abdullah-Al-Mahmood Showrav
সাধারণ মানুষ, সাধারণেই বসবাস। লিখতে ভালবাসি, লিখতে শেখা হয়নি এখনো। অপেক্ষায় আছি একদিন ঠিক শিখে যাব।
4 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment