পম্পেই – হারানো নগরীর খোঁজে

Please log in or register to like posts.
News

পম্পেই নগরী, ইতিহাসের অতলে হারিয়ে যাওয়া অন্যতম বিস্ময়কর এক শহর। ইটালির ক্যাম্পানিয়া প্রদেশে প্রাচীন এই নগরীর অবস্থান। বর্তমানে উপকুল থেকে বেশ দূরে সরে গেলেও প্রাচীন এই নগরী এক সময় ছিল একেবারে উপকুলের ধার ঘেঁষে। ২৪ আগস্ট ৭৯ (anno Domini) এডি বা খ্রিষ্টাব্দে ঘটে যাওয়া ভয়ানক এক অগ্নুৎপাতে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এই শহর। as-a-resort-for-romes-rich-elegant-villas-lined-wide-paved-streets.jpg

বিশেষজ্ঞদের মতে পম্পেই নগরীর গোড়াপত্তন হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম বা ষষ্ঠ শতকে। এই অঞ্চল রোমান সাম্রাজ্যের আওতায় আসে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে। আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগে ইটালির নেপ্লিস উপসাগরের ধারে গড়ে উঠেছিল এই প্রমোদ নগরী। মাউন্ট ভিসুভিয়াসের একেবারে কাছেই ছিল এর অবস্থান। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪০০০ ফিট উঁচু বিশ্বের অন্যতম আগ্নেয়গিরি মাউন্ট ভিসুভিয়াসের অগ্নুৎপাতেই সমাধিস্থ হয় পুরো এই শহর। বিশাল সেই অগ্নুৎপাতে পুরো পম্পেই শহর ঢাকা পরে ২০ ফিট আগ্নেয় ছাই-ভস্মের নিচে। শহরের ভেতরে আটকা পরা সকলেই প্রাণ হারায় এই দুর্যোগে। সঠিক ভাবে বলা না গেলেও মৃতের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ২০০০। ছাইয়ে ঢাকা পরে ইতিহাসের পাতা থেকেও যেন হারিয়ে যায় পম্পেই নগরী। ধ্বংসের প্রায় ১৫০০ বছর পর ১৫৯৯ সালে প্রাথমিক ভাবে একটি দল হারানো এই নগরীর কিছু অংশ আবিষ্কার করে। পরবর্তীতে প্রাচীন এই শহর পুরোপুরি উদ্ধারের কাজ শুরু হয় ১৭৪৮ সালে অর্থাৎ পুনরাবিষ্কারের প্রায় ১৫০ বছর পর। বিগত ২৫০ বছরের বেশি সময় ধরে পম্পেই নগরী, রহস্য সন্ধানী এবং ভ্রমণ বিলাসী পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।pompeii-with-vesuvius-backdrop.jpg

গত তিন শতাব্দী ধরে ভূতত্ত্ববিদ এবং সাহায্যকারী বিশেষজ্ঞ দলের চেষ্টায় শহরের প্রায় ৭৫ ভাগ অংশ উন্মোচিত করা সম্ভব হয়েছে আধুনিক বিশ্বের মানুষের সামনে। অদ্ভুত হলেও সত্যি অগ্নুৎপাতের ফলে ধ্বংস হওয়া এই নগরীর অনেক কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে অবিকৃত অবস্থায়। প্রাচীন এই রোমান নগরী মূলত ছিল উচ্চবংশীয় রোমানদের অবকাশযাপন কেন্দ্র। নেপ্লিসের তীরের রঙিন আর উৎসবমুখর প্রসিদ্ধ নগরী ছিল এই পম্পেই। আমোদ আয়েশের কোন ব্যবস্থা বাকি ছিল না সে শহরে। অবকাশযাপনের  জন্য পাথুরে কারুকার্য করা বাড়ি আর পাথর বাঁধানো প্রশস্ত রাস্তার চিহ্ন আজও চোখে পরে পম্পেই নগরে। শহরে বিনোদনের ব্যবস্থার কমতি ছিল না। ছোট খাবারের দোকান থেকে বড় রেস্তোরা, রাস্তার সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যে পাথরের মূর্তির ফোয়ারা কিংবা বিশাল সব বিশেষ স্নান ঘরের চিহ্ন সর্বত্র দেখা যায় এক সময়ের চোখ ধাঁধানো এই শহরে। ২০০০০ লোক একসাথে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারার ‘অ্যাম্পিথিয়েটার’ (যার ভেতরে থাকে মঞ্চ এবং চারপাশে অর্ধচন্দ্রাকারে সাজানো বসার স্থান ধীরে ধীরে উপরে উঠে যায়) ছিল সেখানে। বিলাসবহুল সেই নগরীতে ২০০০ বছর আগেও ছিল জটিল ধরনের পানি সরবরাহের উন্নত ব্যবস্থা এবং ভ্রমণকারীদের যাতায়াতের জন্য বিশাল বন্দর। শহরের বাইরের প্রাচীরে ছিল আধুনিক প্লাস্টারের মত একধরনের আস্তরণ এবং এর উপর সুকৌশলে আঁকা ছিল রঙিন সব চিত্র।Amphitheatre_in_Pompeji.JPG

রাজকীয় বিশ্রামাগার ছাড়াও সাধারণ ঘরবাড়ির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় খননের ফলে। বিশেষ ভাবে তৈরি রাজকীয় কিছু বাড়ির সংস্কারের কাজও করা হয়েছে পরবর্তীতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংস হলেও নরম ছাই আর মাটির আস্তরণের নিচ ঢাকা পড়ায়, সে বাড়ি গুলোর মূল স্থাপনার বেশিরভাগ অংশই অক্ষত অবস্থায় ছিল। যে কয়টি বাড়ি সংস্কারের পর পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের মূল বিন্দুতে পরিণত হয়েছে, তার মধ্যে কাসা ডেল ফাউনো (Casa del Fauno) এবং কাসা ডেল মেনান্দ্রো (Casa del Menandro) অন্যতম। অদ্ভুত জটিল কায়দায় বানানো এই স্থাপনাগুলোর মেঝেতে রয়েছে সে সময়কার মোজাইক আর মার্বেল পাথরের কারুকাজ। অন্দরমহলের দক্ষ নির্মাণশৈলী এ যুগের মানুষের কাছেও বিস্ময়কর মনে হয়। রাজকীয় এই বিশ্রামাগারগুলোর সামনে সুবিশাল বাগানের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। কাসা ডেল মেনান্দ্রোতে রয়েছে নিজস্ব হাম্মামখানা বা স্নানঘর। কেবল বিশাল সব স্থাপনা আর প্রাচীরই নয়, ভূবিজ্ঞানীদের নিরলস চেষ্টায় পম্পেই নগরী থেকে উদ্ধার করা হয় সে সময়কার দৈনন্দিন কাজে ব্যবহিত নানান সামগ্রী। তৈজসপত্র আর অস্ত্র বেশিরভাগ প্রাচীন সভ্যতায় পাওয়া গেলেও পম্পেই থেকে উদ্ধার করা সবচেয়ে বিখ্যাত জিনিষ হচ্ছে রুটি। আগ্নেয় ভস্মে চাপা পরে অদ্ভুত উপায়ে সংরক্ষিত এবং প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে সেই রুটি।  এছাড়া প্রাচীন রোমান মুদ্রা এবং বহু আত্ম প্রতিকৃতির দেয়ালচিত্র উদ্ধার করা হয় পম্পেইয়ের সমাধি থেকে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে হারিয়ে যাওয়া শহরের আরও অনেক স্থান যার মধ্যে মাছের বাজার, পানশালা আর মন্দির অন্যতম।romans-of-the-first-century-ad-lived-in-pompeii-and-pretty-much-turned-it-into-a-vacation-destination-for-the-wealthy-the-seaside-city-overlooked-the-gulf-of-naples.jpg

দুর্যোগ যখন ঘনিয়ে আসতে শুরু করে তখন পম্পেই শহরে প্রায় ২০০০০ লোক অবস্থান করছিল বলে ধারনা করা হয়। অগ্নুৎপাতের আগে ভিসুভিয়াসের গর্জনে সচকিত হয়ে উঠে পুরো নগরবাসী আর তাদের বেশিরভাগই বিপর্যয়ের আগে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পেরেছিলেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অগ্নুৎপাত শুরু হবার পর ১৮ ঘণ্টা একটানা গলিত লাভা সেই সাথে উত্তপ্ত পাথর আর ছাই-ভস্মের বৃষ্টি ঝরায় মাউন্ট ভিসুভিয়াস। ভয়াবহ সেই অগ্নুৎপাতে উৎসবের নগরীর সাথে সমাহিত হয় শহর ছেড়ে যেতে না পারা ২০০০ মানুষ। তবে নগরবাসীর মৃত্যুর জন্যে আগ্নেয় ছাই-ভস্মের সাথে অগ্নুৎপাতের ফলে নিঃসরিত হওয়া বিষাক্ত গ্যাসেও দায়ী। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, অগ্নুৎপাতের ফলে যে ছাই-ভস্মে পম্পেই নগরী ঢাকা পরে, সেই ছাই-ভস্মের আস্তরণই সব কিছুর সংরক্ষক হিসেবে কাজ করে। বাতাস এবং আর্দ্রতার সংস্পর্শে আসতে বাঁধা দিয়ে প্রাচীন এই রোমান নগরীকে প্রাকৃতিক মমিতে পরিণত করে আগ্নেয় ভস্ম।even-everyday-household-items-were-uncovered-most-famously-some-loaves-of-bread-this-is-the-the-granai-del-foro-which-stores-the-many-amphorae-and-body-casts-that-were-made-in-the-late-19th-century.jpg

অন্য সবকিছুর মত প্রাচীন এই নগরী খননে বের হয়ে আসে ছাই-ভস্মে ঢাকা মৃত দেহ। দেহগুলো যখন অনুসন্ধানীরা খুঁজে বের করেন তখন দেখা যায়, তাদের কঙ্কালগুলোর চার পাশে ছাই-ভস্মে একধরনের ছাঁচের তৈরি হয়েছে। চাবির উপর মোমের প্রলেপ দিয়ে ছাঁচ তৈরির মত সেই ভস্ম ছাঁচে সে সময়ের মানুষের মুখের আদল আর কাপড়ের ছাপ জমে ছিল স্পষ্ট ভাবে। খননকারীরা প্লাস্টারের সাহায্যে সেই ছাঁচ থেকে মানুষের আদলে মূর্তি গড়েন এবং সংস্কারের পর ঠিক সেখানেই রেখে দেন যেখানে তাঁদের মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। মৃতদের কেউ হয়তো ছিল সিঁড়ির নিচে, কেউ ঘরের কোণে আবার কেউ বা ছিল একজন আর একজন কে জড়িয়ে ধরে। ইউনেস্কো থেকে ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে নির্বাচিত এই রোমান শহরে বছরে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন পর্যটক ঘুরতে আসেন। সংস্কারের পর খুলে দেয়া শহরের অলিগলি আর রাজকীয় সব বাড়িগুলো অনায়াসে ঘুরে দেখতে পারেন তারা।Pompeii-Picture-10.jpg

১৯৪৪ সালের পর থেকে মাউন্ট ভিসুভিয়াস আর অগ্নুৎপাত করেনি অর্থাৎ সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে এটি পৃথিবীর অন্যতম বিপদজনক আগ্নেয়গিরি এবং যে কোনদিন আবারো সক্রিয় হতে পারে এই প্রাকৃতিক দানব। সদ্দবস তারপরও সমগ্র বিশ্বের মানুষের আগ্রহের কমতি নেই পম্পেই নগরের বিষয়ে। ধ্বংসের পর দু’হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও পম্পেই নগরী আজও মানুষকে হাতছানি দিয়ে ডেকে চলেছে নিজের রহস্যের মাঝে।

Reactions

2
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

2

Nobody liked ?