Now Reading
তাহসান-মিথিলা বিচ্ছেদ এবং আমাদের মানসিকতা



তাহসান-মিথিলা বিচ্ছেদ এবং আমাদের মানসিকতা

খুব খারাপ লাগে যখন দোষটা নিজেদের উপরই দিতে হয়। না দিয়েই বা উপায় কি দোষটা যখন নিজেদেরই? আমরা নিজেরা বলতে আসলে আমরা বাঙালী জাতিকেই বুঝিয়েছি।

সম্প্রতি তাহসান-মিথিলা জুটির বিচ্ছেদ নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় তুমুল ঝড় হচ্ছে। ঝড় হওয়াটাই স্বাভাবিক, আমি নিজেও বিষয়টা মানতে পারছি না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে যখন এটা নিয়ে তাদেরকে গালাগালি করতে দেখি, তাদেরকে বাজে ভাবে হেয় করতে দেখি। ব্যাপারটি নিয়ে আমি নিজে কিছু বলবো না, তবে তাহসানের ডিভোর্স নিয়ে দেওয়া পোস্টটিতে একজন মেয়ের কমেন্ট মোটামুটি হুবুহু তুলে ধরছি- “তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমরা বলার আসলেই কি কেউ? খারাপ আমাদের সবারই লাগতেছে যেহেতু আমরা তাদের ফ্যান, কিন্তু তাই বলে কি আপনারা মনে করেন না তাদের সিদ্ধান্তকে আমাদের সম্মান জানানো উচিৎ? হ্যাঁ, তারা আমাদের কাছে একেবারে পার্ফেক্ট জুটি ছিল কিন্তু আপনারা কি ভাববেন না যে একেবারে না পারলেই মানুষ এমনটা করে? হোক তারা আইডল, সেলিব্রেটি কিন্তু দিনশেষে তারা কিন্তু মানুষই। তাই অনুগ্রহ করে তাদের এবং তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করুন।” আশা করি এই কমেন্টের পর এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার প্রয়োজন নেই। তবে বলার আছে অন্য আরেকটি ব্যাপারে। সেটা হচ্ছে তাহসানকে পচানো নিয়ে।

নিউজ ফিড ঘাটলেই মাঝে মাঝে তাহসানকে পচিয়ে ও ব্যঙ্গ করে বিভিন্ন স্ট্যাটাস চোখে পড়ে। আমি অবাক হয়ে যাই এটা দেখে যে একজন মানুষ অন্যকে পচাতে গিয়ে নিজে কতটা বাজেভাবে পচে যাচ্ছে। আরো অবাক হয়ে যাই যখন দেখি ফেসবুকের কিছু ভালো লেখক ও ব্যক্তিত্বরাও তাহসানকে ব্যঙ্গ করে স্ট্যাটাস দেয়। আমি অবশ্য মনে মনে তাদের ধন্যবাদই দেই এ কারণে যে তারা আসলে নিজেদের ভালো মানসিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কুৎসিত মানসিকতাটাকেও সামনে নিয়ে আসে বলে। এতে এদের থেকে ভবিষ্যতে সাবধান থাকারও একটা সুযোগ তৈরি হয়ে যায়। আচ্ছা, আসলেই কি তাহসান পচার যোগ্য? আমি তা কোনভাবেই মনে করি না। তাহসানের মত একজন মাল্টি-ট্যালেন্টেড পার্সন কখনোই পচার যোগ্য হতে পারে না। সে একাধারে একজন সফল গায়ক, গীতিকার, সুরকার, গিটার বাদক, কি-বোর্ড বাদক, সফল অভিনেতা, সফল প্রেমিক, সফল স্বামী (যদিও এখন এটা আর বলা যাচ্ছে না), সফল বাবা, সফল বক্তা, মডেল, উপস্থাপক এবং স্বনামধন্য ভার্সিটির লেকচারার। এছাড়াও সে অত্যন্ত মেধাবী ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ একজন মানুষ। নটরডেম, ঢাকা ভার্সিটির আইবিএ ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি থেকে লেখাপড়া করেছেন। উনার এতসব গুণগুলোই কি উনার পচার কারণ? উনার পাহাড়সম সফলতাই কি আমাদের উনাকে পচাতে উৎসাহিত করে? অনেকে বলেন উনি এবং উনার অভিনয় নাকি মেয়েদের মত। আমার কাছে মোটেও তা মনে হয় না। অবশ্য আমার নিজস্ব মতামতকে আমি এখানে প্রাধান্য দিতে চাচ্ছি না। ধরলাম উনি সত্যিই মেয়েদের মত, উনার কথার ভঙ্গিতে সমস্যা, যদি তাই হয়ে থাকে তবে তা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। এটা নিয়ে কোনভাবেই আমরা উনাকে পচাতে কিংবা ব্যঙ্গ করতে পারি না। এতোসব গুণ রেখে আমাদের কেন কেবল তার দোষটাই চোখে পড়বে?

শুরুটা করেছিলাম নিজেদের উপর দোষ দিয়ে। হ্যাঁ, আসলেই আমাদের অনেক দোষ। আমাদের চোখে অন্যের ভালো গুণটা ধরা পড়ে না। আমরা আছি কেবল কার কী খুঁত, কে কী দোষ করলো সেটা নিয়ে। এভাবে কোনদিন উন্নতি হবে না। অন্যকে ছোট করতে গিয়ে আসলে নিজেকেই ছোট করা হয়। ভালো-খারাপ মিলিয়েই মানুষ। কারো খারাপ জিনিসটাকে বড় করে না দেখে বরং তার ভালো দিকগুলো দেখতে হবে, সেজন্যে প্রশংসা করতে হবে এবং সেই ভালো জিনিসগুলো থেকে নিজের জন্য কিছু নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। একজন মানুষের দুয়েকটা খারাপ গুণ থাকতেই পারে, তাই বলে পুরো মানুষটাকে ফেলে দেওয়া যাবে না। সম্প্রতি আমার কয়েকজন প্রিয় লেখক ও ব্যক্তিত্ব তাহসানকে মেয়ে বলে ব্যঙ্গ করে স্ট্যাটাস দিয়েছিল। আমি খুবই আশাহত হয়েছিলাম এবং তাদের মানসিকতা সম্বন্ধে নতুনভাবে জানতে পেরেছিলাম। তাই বলে আমি তাদের ব্লক করে দেইনি, কারণ তাদের থেকে প্রায় সময়ই অনেক ভালো কিছু বের হয়ে আসে, আমি সেসব থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করি। এছাড়াও আমি জাফর ইকবাল স্যারের অনেক বড় ভক্ত, তাই বলে বলবো না উনি ধোয়া তুলসি পাতা। উনার মাঝে অনেক হিপোক্রেসি আছে। ইমানদারের উপর আঘাত হানলে উনার কিছু হয় না অথচ একজন ইসলাম বিদ্বেষী কথিত নাস্তিকের উপর আঘাত আসলে উনার মন কাঁদে। এজন্যে আমি পুরো জাফর ইকবালকে ফেলে দেইনি। আমি উনার থেকে ভালো জিনিসগুলো নেওয়ার চেষ্টা করি।

কেউ ভালো কিছু করলে তার প্রশংসা করে তাকে উৎসাহিত করুন। কারো প্রশংসা করা মানে নিজেকে ছোট করা না বরং নিজের উদার মানসিকতার পরিচয় দেওয়া, নিজেকে আরো বড় করা। অন্যকে ছোট করা মানে নিজেকে বড় করা নয়, বরং নিজেকে তার থেকেও ছোট করা। মনে রাখবেন, কাউকে নিচে নামাতে হলে কিন্তু আগে নিজেকেই নামতে হয়। আর উপর থেকে ঠেলে নিচে নামাবেন? তাতেও কিন্তু তাকে ঠেলার সময় তার সাথে সাথে নিজেকে নিচে নামতে হবে। সুতরাং নিজে ছোট হতে চাইলে অন্যকে ছোট করুন, আর নিজে বড় হতে চাইলে অন্যকে বড় করুন।
কেউ আপনার সমালোচনা কিংবা হিংসা করলে হতাশ হবে না। ওই যে কথায় বলে না, “কখনো তাদের ঘৃণা করো না যারা তোমাকে হিংসা করে। বরং তাদের হিংসাকে সম্মান করো। কারণ তারাই সেই মানুষ, যারা বিশ্বাস করে তুমি তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।”

About The Author
Rihanoor Islam Protik
Rihanoor Islam Protik
আমি একজন প্রযুক্তি প্রেমী মানুষ। প্রযুক্তি নিয়ে পড়ে থাকতেই বেশি ভালো লাগে। তবে লেখালেখিটা শখের বশে করি। আশ্চর্যের বিষয় হলো লিখতে গিয়ে আমি সকল কষ্ট ভুলে থাকতে পারি।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment