Now Reading
আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ১ম পর্ব



আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ১ম পর্ব

আজ আমার দ্বিতীয় বিয়ে। আমি এখন বারান্দায় বসে সন্ধ্যের তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর ফুলে সজ্জিত গাড়ি করে আমাকে মেয়ে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে বিয়ে পড়ানোর জন্য। বিয়ে এবং বাসর নিয়ে প্রতিটা ছেলের মাঝেই অনেক আগে থেকে নানা ধরণের ফ্যান্টাসি কাজ করে, বিয়ে করতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে সেটা হয় প্রকট। তবে আজ আমার সেরকম কিছু কাজ করছে না। হয়তোবা কাজ করতো যদি এটা আমার দ্বিতীয় বিয়ে না হতো। আজ এই মুহূর্তে এই তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার বার বার ইরিনার কথা মনে পড়ছে। প্রথম বিয়েটা আমার ইরিনার সাথেই হয়েছিল।

তখন আমি ভার্সিটির চতুর্থ বর্ষে পড়ি। প্রাইভেট ভার্সিটি, বাড়ি থেকে প্রচুর টাকা নিতে হয়। প্রথম তিন বছর বাবার টাকা দিতে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু চতুর্থ বর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে বাবার টাকা দিতে একটু সমস্যা হচ্ছিল। বাবা মুখে আমাকে কিছু না বললেও আমি বুঝতে পারছিলাম। তাই নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিই বাবার উপর চাপ কিছুটা কমাবো। হঠাৎ করে যেহেতু চাকরী পাওয়া সম্ভব নয় তাই সিদ্ধান্ত নিলাম টিউশনি করানোর। লিফলেট ছাপানো মারফত অতি সত্ত্বর একটি টিউশনি জুটে যায় গুলশানের অভিজাত এলাকায়। স্টুডেন্ট একটি মেয়ে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। শুরুতে অনেক অবাক হয়েছিলাম এটা ভেবে যে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়া একটা মেয়ের অভিভাবক কিভাবে তার মেয়েকে পড়ানোর জন্য একজন ইয়াং হাউজ টিউটর রেখে দিল। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে বুঝতে পেরেছি তারা অনেক আধুনিক হওয়াই এসবকে আমলে নিত না। মেয়েটি অনেক মেধাবী এবং ভদ্র ছিল। আমি পড়িয়ে খুব মজা পেতাম বুঝানোর জন্য পরিশ্রম কম হতো বলে। দুই মাস পড়ানোর পর আস্তে আস্তে আমি অনুভব করতে শুরু করলাম আমি মেয়েটির প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। এজন্যে অবশ্য আমি নিজেকে দোষ দিতাম না, আমি জানতাম এটা আমার বয়সের দোষ। তবে আমার যেটা করার ছিল তা হলো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। আমি নিজেকে প্রতিনিয়ত বুঝানোর চেষ্টা করেছি ও আমার ছাত্রী আর আমি তার শিক্ষক। শিক্ষক আর ছাত্রীর মধ্যে এটা এভাবে কখনোই হতে পারে না। কিন্তু আমি দিন দিন তার প্রতি আরো দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম। অবস্থা এতটাই বেগতিক হয়ে গেলো যে একপর্যায়ে আমি সিদ্ধান্ত নিই এই টিউশনিটা আর করাবো না। হুট করেতো আর যাওয়া বন্ধ করে বাদ দেওয়া যায় না, এতে অভদ্রতা হয়ে যায়। তাছাড়া তার বাবা-মা আমাকে তার শিক্ষক হিসাবে সর্বোচ্চ সম্ভব সম্মান করতো, তাই হুট করে বাদ দিয়ে তাদেরকে অসম্মান করতে পারি না। সেজন্যে সিদ্ধান্ত নিলাম তার মা-বাবার সাথে কথা বলে কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে বাদ দিব। এদিকে তার মা-বাবা আমার সাথে প্রায়ই গল্প করতো, আমার সকল খোঁজ-খবর রাখতো বলে তাদেরকে দেখানোর মত কোনো যুক্তিযুক্ত অজুহাত পাচ্ছিলাম না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিই কেবল তার মার সাথে আমার সমস্যাটার ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বলে বাদ দিব এবং এমন সময়ে তাদের বাসায় যাবো যখন সে কলেজে আর তার বাবা অফিসে থাকবে। যেদিন গেলাম সেদিন যাওয়ার আগেই তার মাকে ফোন করে বলে রেখেছিলাম আমার অসময়ে আসার কথা। তো আমি কথা অনুযায়ী গিয়ে কলিং বেল চাপলাম। সাথে সাথে কাজের লোক এসে দরজা খুলে দিয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসতে বললো। আমি বসে মাত্র পত্রিকাটা হাতে নিয়ে চোখ বুলাতে শুরু করছি আর তখনি তার মা এসে বলছে, ‘আরে বাবা তুমি এসে পড়েছ, আমি তোমার জন্যই অপেক্ষায় ছিলাম। তা কী এমন তোমার জরুরি কথা বলো দেখি।’
‘সত্যিই ব্যাপারটা অনেক জরুরি। কিন্তু ঠিক কিভাবে যে বলবো বুঝতে পারছি না। আপনিই বা কিভাবে নিবেন ভেবে অনেক অস্বস্তি হচ্ছে।’
‘ডোন্ট হেজিটেট মাই বয়। তুমি যেকোন বিষয়ে খোলাখুলি আমাকে বলতে পারো। টাকা-পয়সার প্রয়োজন হলেও বলে ফেলো, একটুও দ্বিধা করো না। তোমার বিপদে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে পারলে আমি অনেক খুশিই হবো।’
‘না না আন্টি, টাকা-পয়সার কোনো ব্যাপার না। আপনারা আমাকে যে সম্মানী দেন তাতে আমার খুব ভালোভাবেই চলে যায়। আসলে বিষয়টা অন্য ধরনের। এখনো বুঝতে পারছি না কিভাবে বলবো কিন্তু আমি জানি আমাকে এটি বলতেই হবে।’
‘তো বলে ফেলো মাই বয়।’
‘আসলে আন্টি আমি এখন যে বয়সটা পার করছি তা খুবই বিপদজনক। এই বয়সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন। আপনিও যেহেতু এই বয়স পার করে এসেছেন সেহেতু আপনারও বুঝার কথা। একদিন দুইদিন হয়তোবা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, কিন্তু প্রতিদিনের ব্যাপারে ভরসা করা যায় না। আমি গত একমাস থেকে আপনার মেয়ের প্রতি দুর্বল হয়ে গিয়েছি। গত একমাসই নিজেকে অনেক কষ্টে নিয়ন্ত্রণে রেখেছি কিন্তু নিজের প্রতি আর ভরসা করতে পারছি না। আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন আমার কথা। এমতাবস্থায় আমি আর তাকে পড়াতে চাচ্ছি না। আপনার কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি তাকে আর না পড়ানোর জন্য আমাকে অনুমতি দিন। এতে আমার এবং আপনাদের সকলের জন্যেই ভালো হবে।’
কথাগুলো আমি নিচের দিকে তাকিয়ে বলছিলাম। কেবল হাতজোড় করে অনুমতি চাওয়ার সময় আমি আন্টির দিকে তাকিয়েছিলাম। সে সময় আমি নিজের জল ভরা চোখে আন্টির চোখেও জল দেখেছিলাম।
‘তোমাকে অনুমতি দিলাম বাবা, দোয়া করি তুমি অনেক বড় হও।’
এটা শোনার পড়েই আমি আন্টিকে বললাম, ‘আজ তাহলে উঠি আন্টি। আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আঙ্কেলকে আশা করি আপনি বুঝাতে পারবেন। আর…আর ওকে যেকোন একটা অজুহাত দেখিয়ে দিবেন। ওর মুখোমুখি আমি আর হতে চাই না। ভালো থাকবেন, আসসালামু আলাইকুম।’

আমি বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাটছি। চোখ দিয়ে সমানে জল গড়িয়ে পড়ছে। রুমালটা ভিজে একাকার। টিস্যু সব শেষ হয়ে গিয়েছে। রুমালটা একটু চেপে ওটাই আবার ব্যবহার করতে লাগলাম। বারবার কান্না পেলেও খুব হালকা মনে হচ্ছে নিজেকে। আজ হয়তো আমি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং যৌক্তিক সিদ্ধান্তটা বাস্তবায়ন করতে পারলাম। এরপর আরো সপ্তাহখানেক অনেক খারাপ লেগেছে, ওর মুখটা বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে, কিন্তু একসময় সয়ে গিয়েছে। দু মাস পর একদিন হঠাৎ তার মার নাম্বার থেকে ফোন, ‘বাবা তুমি কোথায়? একদিন বাসায় আসতে পারবা? প্লিজ না করো না।’

চলতে থাকবে…

About The Author
Rihanoor Islam Protik
আমি একজন প্রযুক্তি প্রেমী মানুষ। প্রযুক্তি নিয়ে পড়ে থাকতেই বেশি ভালো লাগে। তবে লেখালেখিটা শখের বশে করি। আশ্চর্যের বিষয় হলো লিখতে গিয়ে আমি সকল কষ্ট ভুলে থাকতে পারি।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment