Now Reading
জানা অজানা রূপকথা | পর্ব -১



জানা অজানা রূপকথা | পর্ব -১

স্লিপিং বিউটি বা ঘুমকুমারী

রূপকথা বা লোকগাথা লোকমুখে প্রচলিত হতে হতে এক সময় লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয় ; স্রোতের মতো বহমান এ গাথা দেশ, কাল, জাতিভেদে রূপ বদলায়।
একটা সময় ছিল যখন গল্পের আসর বসতো, ছোট ছেলেমেয়েরা দাদি নানির কাছে রূপকথার গল্প শুনতো। যুগ পাল্টেছে, সময় পাল্টেছে, পাল্টেছে গল্পের মাধ্যম ; কিন্তু রূপকথার প্রতি এক অজানা টান আমাদের মনে রয়েই গেছে। তাই আমাদের পরিচিত রূপকথাগুলো প্রতিনিয়ত নতুন রূপে হাজির হচ্ছে আমাদের সামনে।

স্লিপিং বিউটি বা ঘুমকুমারী বা ঘুমন্ত রাজকুমারী ‘র গল্প আমরা প্রায় সবাই জানি। এক রাজকন্যা, যে দুষ্টু ডাইনীর অভিশাপে আজীবনের জন্য ঘুমিয়ে যায়, এক রাজপুত্রের চুম্বন যাকে জাগিয়ে তোলে। কিন্তু জার্মান লোকগাথার গল্পটি কি আসলেই এমন ছিল? নাকি কালের বিবর্তনে পরিবর্তিত রূপ ধারণ করেছে?

‘ স্লিপিং বিউটি ‘ রূপকথার সবচেয়ে প্রচলিত যে রূপটি রয়েছে তা মূলত এসেছে জার্মান লোকগাথা সংগ্রাহক গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের ‘ লিটল ব্রায়ার রোজ ‘ থেকে। লোকমুখে প্রচলিত গল্প থেকে গ্রিমভ্রাতৃদ্বয় এটি সংগ্রহ করেন। প্রায় একই ধরনের একটি গল্প ফরাসি লেখক চার্লস পেরল ১৬৯৭ সালে প্রকাশ করেন তার ‘ হিস্টোরিস ও কন্তেস দু তেমস পাসে ‘ গ্রন্থে। পেরলের গল্পটি ইতালীয় কবি ও রূপকথা সংগ্রাহক জিয়ামবাতিস্তা বাসিল কর্তৃক প্রকাশিত ‘সান,মুন এন্ড তালিয়া ‘ ( ১৬৩৪ সালে প্রকাশিত) -এর উপর ভিত্তি করে রচিত, যা মূলত লোককাহিনীকে ভিত্তি করে লেখা। তবে ‘স্লিপিং বিউটি ‘র প্রাচীনতম রূপ মনে করা হয় ফরাসি গীতিকাব্য ‘ পারসেফরেস্ট ‘কে।

পেরল ও গ্রিমভ্রাতৃদ্বয়ের বর্ণিত গল্পগুলো শিশুতোষ হলেও বাসিলের বর্ণনা কিছুটা ভিন্ন।

‘ লিটল ব্রায়ার রোজ ‘ এবং পেরলের আখ্যান

পেরল গল্পটিকে দুটি অংশে বর্ণনা করছেন।

প্রথম অংশ
এক রাজ্যে নিঃসন্তান রাজা-রাণীর বহু প্রতীক্ষার পর জন্ম নেয় ফুটফুটে এক কন্যা শিশু। সারা রাজ্য উল্লাসে মেতে উঠে। রাজকন্যার দীক্ষিতকরণ অনুষ্ঠানে সাত পরীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাদের স্বর্ণের থালা আর অলংকারশোভিত পেয়ালায় আপ্যায়ন করা হয়। এমন সময়ে এক ডাইনী বুড়ি , যে প্রাসাদে বহুকাল ধরে বসবাস করে আসছে, অনুষ্ঠানে প্রবেশ করে। তাকেও আপ্যায়ন করা হয়, তবে সাধারণ থালা আর কাচের পেয়ালায়। তার প্রতি রাজা রাণীর এমন উদাসীনতা দেখে ডাইনী রেগে যায়।
এদিকে সাত পরীর মধ্যে ছয় পরীই রাজকন্যাকে উপহার দেয়া সম্পন্ন করে : সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা, দয়া,উদারতা, নাচ ও গান। এমন সময়ে ডাইনী রাজকন্যাকে অভিশাপ দেয় যে, একদিন রাজকন্যার আঙুল তাঁতের চর্কির সুঁইয়ে বিদ্ধ হবে এবং রাজকন্যা মারা যাবে। রাজা-রাণী আতংকে, দুঃখে মুষড়ে পড়ে। এমন অবস্থায় সপ্তম পরী রাজকন্যাকে জীবন উপহার দেয়, তবে অভিশাপ সম্পূর্ণ প্রতিহত করতে পারে না। রাজকন্যা মৃত্যুর বদলে একশ বছরের জন্য ঘুমিয়ে যাবে এবং কোন রাজপুত্রের চুম্বনে জেগে উঠবে। একমাত্র সন্তানের এমন পরিণতি ঠেকাতে রাজা রাজ্য থেকে সব তাঁত সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।
এভাবে দিন গড়িয়ে মাস,মাস গড়িয়ে বছর যেতে থাকে। রাজকন্যার ষোল বছর পূর্ণ হয়। একদিন রাজা রাণী প্রাসাদের বাইরে ঘুরতে যান এবং তাদের অনুপস্থিততে রাজকন্যা প্রাসাদের কক্ষগুলো ঘুরে দেখতে লাগল। একটা ঘরে সে দেখতে পেল এক বৃদ্ধা অদ্ভুত কিছু করছে। সে বৃদ্ধার কাছে তার কাজ সম্পর্কে জানতে চাইল, নিজেও করে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করল। বৃদ্ধার দেখানো পদ্ধতিতে সুতা কাটতে গিয়ে রাজকন্যার হাতে সুঁই ফুটে গেল এবং অভিশাপ পূর্ণ হলো। রাজা রাণী ফিরে এসে রাজকন্যার এ অবস্থা দেখে শোকে দিশেহারা হয়ে গেলেন।
রাজক্যার জন্য প্রাসাদের সবচেয়ে সুন্দর কক্ষটি প্রস্তুত করা হয়,তাকে সোনা-রূপা খচিত খাটে শুইয়ে দেয়া হয়। সেই সপ্তম পরীটিকে প্রাসাদে তলব করা হয়। ভবিষ্যতদ্রষ্টা পরী দেখতে পায়, জেগে ওঠার পর রাজকন্যা একা হয়ে পড়লে বিপদের সম্মুখীন হবে। তাই সে প্রাসাদের সকলকে ঘুম পাড়িয়ে দেয় একশ বছরের জন্য এবং প্রাসাদের বাইরে গাছপালা দিয়ে বেষ্টনী করে দেয়।
একশ বছর অতিবাহিত হল। এক রাজপুত্র প্রাসাদটি খুঁজে পায়। তার সহচররা তাকে প্রাসাদটি সম্পর্কে বিভিন্ন গল্প শুনাতে থাকে। এক বৃদ্ধ তাকে জানায় যে প্রাসাদে এক রাজকন্যা ঘুমিয়ে আছে, এক রাজপুত্রের অপেক্ষায় যে তাকে জাগিয়ে তুলবে। রাজপুত্র সত্য উদঘাটনের জন্য সকল বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে প্রাসাদে পৌঁছায় এবং সত্যিই এক ঘুমন্ত রাজকুমারীকে খুঁজে পায়। রাজপুত্র নিমিষেই তার প্রেমে পরে যায় এবং চুম্বনে তাকে জাগিয়ে তোলে। রাজকুমারীর সাথে সমস্ত প্রাসাদ জেগে ওঠে। অতঃপর রাজকুমারের সাথে রাজকন্যার বিয়ে সম্পন্ন হয়।

দ্বিতীয় অংশ
বিয়ের পর রাজপুত্র নিজ রাজ্যে ফিরে যায়। তবে তার মাকে বিয়ের ব্যাপারে কিছু জানায় না, কারণ তার মা ছিল এক রাক্ষসী। এদিকে রাজকন্যার দুই সন্তানের জন্ম হয়, যাদের নাম রাখা হয় ‘অরোর’ (ঊষা) আর ‘জুর’ (দিবা)।
রাজপুত্রের সিংহাসনে আরোহনের সময় হলে সে তার স্ত্রী-সন্তানদের নিজ রাজ্যে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে। কিন্তু তার মা তার অগোচরে রাজকন্যা ও তার সন্তানদের বনের মধ্যে থাকার ব্যবস্থা করে এবং তার পাচককে আদেশ রাজকন্যার সন্তানদের হত্যা করে তাকে রান্না করে খাওয়াতে। কিন্তু পাচক সন্তানদের বদলে রাণীকে ভেড়ার মাংস পরিবেশন করে। অতঃপর রাণী রাজকন্যাকেও হত্যার আদেশ দেয়, এবারও পাচক রাজকন্যার বদলে ভেড়া পরিবেশন করে। রাণী শীঘ্রই পাচকের প্রতারণা ধরে ফেলে এবং রাজকন্যা ও তার সন্তানদের সাথে তারও শাস্তির ব্যবস্থা করে। তাদের বিষাক্ত সাপে পূর্ণ কুয়ায় ফেলে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। এমন সময়ে রাজপুত্র হাজির হয় এবং সব সত্য জানতে পেয়ে রাণীকে ঐ কুয়ায় ফেলে শাস্তির ব্যবস্থা করে।
অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।

তবে গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের বর্ণনায় দ্বিতীয় অংশের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। তারা গল্পটিকে একটি অংশেই বর্ণনা করেন। তাদের মতে, রাজকন্যার ঘুম ভাঙার পর রাজপুত্রের সাথে তার বিয়ে হয় এবং তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।

‘সান, মুন এন্ড তালিয়া’ – বাসিলের আখ্যান

এক রাজার ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যাশিশু। রাজকন্যার ভবিষ্যৎ জানার জন্য রাজা গণকদের তলব করলেন। তারা রাজাকে জানাল, তাঁতের চরকার টাকু (শন থেকে সুতা কাটায় ব্যবহৃত ref. spindle of flax) আঙুলে ফুটে রাজকন্যা মৃত্যুবরণ করবে। তবে পরবর্তীতে তারা জানতে পারে রাজকন্যার প্রাণসংশয় না থাকলেও সে এক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হবে।
যথারীতি ভবিষ্যতবানী পূর্ণ হয়। রাজকন্যাকে মখমলের বিছানায় শুয়িয়ে দেয়া হয়।রাজা দুঃখ সহ্য করতে না পেরে প্রাসাদ ছেড়ে চলে যায়।
বহুকাল অতিবাহিত হয়।এক রাজা প্রাসাদের পাশে দিয়ে যাওয়ার সময় তার বাজপাখি উড়ে প্রাসাদের মধ্যে চলে যায়। রাজা আওয়াজ করেও কারো সাড়া না পেয়ে মই বেয়ে উপরে উঠে যায় এবং তালিয়াকে দেখতে পায়। রাজা তালিয়ার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়। অচেতন অবস্থায়ই তালিয়া গর্ভবতী হয় এবং যমজ সন্তানের জন্ম দেয়, যাদের মধ্যে একজন একজন তার আঙুল চুষতে থাকে। ফলে তার আঙুল থেকে শনের টুকরাটি বের হয়ে এবং সে জেগে ওঠে। তালিয়া বুঝতে পারে সে মা হয়েছে, কিন্তু কিভাবে তা বুঝতে পারে না। সে তার সন্তাদের নাম রাখে ‘সান’ ( সূর্য) ও ‘মুন’ (চন্দ্র)
অতঃপর রাজা একদিন আবার তালিয়ার সাথে দেখা করার জন্য মনস্থির করে। রাজা এসে তালিয়া ও তার সন্তানদের দেখতে পায়। তাকে সব খুলে বলে এবং তাকে বিয়ে করে। কিছুদিন পর রাজা আবার নিজ রাজ্যে ফিরে যায়।
রাণী একদিন রাজাকে ঘুমের মধ্যে তালিয়া ও তার সন্তানদের নাম নিতে শোনে এবং মন্ত্রীকে হুমকি ও ঘুষ দিয়ে তালিয়া সম্পর্কে জানতে পারে। রাণী তখন রাজা সেজে তালিয়াকে চিঠি লেখে যে সে যেন তার সন্তানদের তার সাথে দেখা করতে পাঠিয়ে দেয়। তালিয়া রাজার কথা মতো তার সন্তানদের পাঠিয়ে দেয়। রাণী সান-মুনকে বন্দী করে এবং পাচককে আদেশ দেয় তাদের হত্যা করে রান্না করতে। রাণী রাজাকে তার নিজ সন্তান দিয়েই আপ্যায়ন করতে চাইল, পাচক বাচ্চাদেরকে হত্যা না করে তার স্ত্রীর কাছে রেখে আসে এবং তাদের বদলে দুটো ভেড়া রান্না করে পরিবেশন করে। পরবর্তীতে রাণী তালিয়াকে রাজ্যে আমন্ত্রণ জানায়, তার ইচ্ছা ছিল তালিয়াকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা। কিন্তু সঠিক সময়ে সবকিছু জানতে পেরে তালিয়াকে উদ্ধার করে এবং রাণীকে পুড়িয়ে মারার আদেশ দেয়।
অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।

‘ পারসেফরেস্ট ‘

জেলাডিন নামক এক রাজকন্যা প্রেমে পড়ে ট্রয়লাস নামক এক রাজপুত্রের। রাজা ট্রয়লাসকে নিজেকে রাজকুমারীর উপযুক্ত প্রমাণ করার জন্য কিছু কাজ সমাধা করততে পাঠান। ট্রয়লাসের অনুপস্থিতিতে জেলাডিন এক জাদুকরী ঘুমে আচ্ছন্ন হয়। ট্রয়লাস ফিরে এসে তাকে এ অবস্থায় দেখতে পায়, তাদের বিয়ে হয় এবং ঘুমন্ত অবস্থায়ই তাদের সন্তানের জন্ম হয়। সন্তান জন্মের পর মায়ের আঙুল চুষতে থাকে এবং সে জেগে ওঠে।

রাজকন্যার নাম একেক লেখকের বর্ণনায় একেক রকম পাওয়া যায়। পেরল রাজকন্যার কোন নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করেননি। গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয় রাজকন্যার নাম দেন ‘ব্রায়ার রোজ’, তবে তাদের কোন কোন অনুবাদে রাজকন্যার নাম পাওয়া যায় ‘রোজামন্ড’। বাসিল রাজকন্যার নাম উল্লেখ করেন ‘তালিয়া’।

ব্যাখ্যা

কোন কোন লোককাহিনী বিশ্লেষক মনে করেন ‘স্লিপিং বিউটি ‘ বা ঘুমন্ত রাজকন্যার লোককাহিনীটিকে সৌরবর্ষ দ্বারা চন্দ্রবর্ষের প্রতিস্থাপনকে নির্দেশ করে। গল্পের চরিত্রগুলোকে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন অনেকে। রাজকন্যা প্রকৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। ডাইনী বুড়ি হচ্ছে শীত, যে প্রকৃতিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে যতক্ষণ না পর্যন্ত রাজপুত্র (বসন্ত) এসে তার ঘুম ভাঙায়।

এভাবেই যুগে যুগে মানুষের মুখে মুখে, লেখকের লেখনীতে আমাদের চেনা রূপকথাগুলো তাদের রূপ বদলায়।

| রেফারেন্স –
১. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Sleeping_Beauty
২. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Charles_Perrault
৩. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Brothers_Grimm
৪. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Sun,_Moon,_and_Talia
৫. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Perceforest

About The Author
Zabin Khan
Zabin Khan
লিখতে ভালোবাসি

You must log in to post a comment