Now Reading
আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ৩য় এবং শেষ পর্ব



আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ৩য় এবং শেষ পর্ব

আমাদের বাড়ির পাশেই একটা পুকুর রয়েছে যেটা সে সময় পানিতে ভরা ছিল। চিৎকার শুনে আমি বাইরে বেরিয়ে প্রথমে কিছু দেখতে না পেলেও পুকুরের দিক থেকে আসা পানিতে ছটফটানির এক ধরনের শব্দ শুনি। সাথে সাথে সেদিকে দৌড়ে গিয়ে দেখে বুঝতে পারি তারা দুজনেই পানিতে পড়ে আছে। আমার ইরিনা সাঁতার জানতো না, তারপরেও দেখি সে ডুবে ডুবে তার দুহাত দিয়ে আমাদের তিয়াশাকে পানির উপরে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে এক অনন্য হৃদয় বিদারক ভয়ঙ্কর এবং মধুর দৃশ্য। মা নিজে মরে যাচ্ছে অথচ তার সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, একই সাথে এর মত ভয়ঙ্কর ও মধুর দৃশ্য আর কী হতে পারে? এখনো এই ঘটনাটির কথা আমাদের অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। দৃশ্যটা দেখে আমি তৎক্ষণাৎ ঝাঁপ দিয়ে নেমে তিয়াশাকে ওর হাত থেকে নিয়ে এক হাত দিয়ে তিয়াশাকে ধরে রেখে অন্য হাত দিয়ে ওকে তুলে ধরার চেষ্টা করি। এরইমধ্যে আরেকজন ঝাঁপ দিয়ে নেমে আমার হাত থেকে তিয়াশাকে নিয়ে উঠে যায়। আমি এদিকে প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকি ইরিনাকে তোলার জন্য। কিন্তু ওর দিক থেকে কেমন যেন কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না। শরীরটা অনেক ভারী ভারী মনে হচ্ছিল। পুরো দেহটা পানির নিচে ছিল। ইতোমধ্যে আরো কয়েকজন ঝাঁপ দেয় এবং সবাই মিলে একপর্যায়ে ওকে পাড়ে তুলতে সক্ষম হই। পেটে চাপ দিয়ে পানিও বের করেছিলাম অনেক। পানি বের করার সময় একবার শুধু কাশি দিয়েছিল। কে জানতো সেটাই ছিল আমার চোখে দেখা আমার ইরিনার, আমার প্রিয় ইরিনার শেষ স্পন্দন!

এরপর দ্রুত ডাক্তারও আনা হয়েছিল, কিন্তু ওকে আর ফেরানো সম্ভব হয়নি। শুনেছিলাম সেদিন ডাক্তারের মুখে ওর চলে যাওয়ার কথা শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। পাক্কা ছ’ঘন্টা নাকি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। যখন জ্ঞান ফিরে তখন ওর ধোয়ানো শেষ, জানাজা পড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। জানাজা পড়ানোর আগে একবার আর পরে একবার এই দুবার আমায় তাকে দেখতে দেওয়া হয়েছিল। আমি নাকি সেদিন অনেক পাগলামো করছিলাম। তাই কবর দেওয়ার সময় আমাকে যেতে দেওয়া হয়নি। এরপর চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আমি নাকি আবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। মোটামুটি দুদিন পর নাকি জ্ঞান ফিরেছিল, এর মাঝে নাকি স্যালাইনও দিয়ে রাখা হয়েছিল। এভাবেই আমার জীবনের সুখ নামক চশমার একটি হাতল ভেঙে যায় আর সুখটিও খসে পড়ে। এরপর আরো মাসখানেক আমি অপ্রকৃতস্থ ছিলাম। দুনিয়াবি কোন কিছুতে আমার তেমন মনযোগ ছিল না। আমার মেয়েকে দেখলেই আমি কান্না করে দিতাম। এতো বললাম কেবল আমার কথা। এছাড়াও আমাদের উভয়ের পুরো পরিবারটিও একেবারে ভেঙে পড়েছিল। আমার বাবা-মার অতি আদরের পুত্রবধু এবং তাদের দুই বছরের আদরের নাতনীর মার এভাবে চলে যাওয়াটা তারাও কোনভাবে মানতে পারেনি। আর ওদিকে ওর বাবা-মা তাদের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে স্বাভাবিকভাবেই একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। তারপর আস্তে আস্তে মাসখানেকের মাথায় আমরা যখন সবাই কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করি তখন ওর বাবা-মা আমাদের কাছে অনুরোধ করে আদরের নাতনী তিয়াশাকে তাদের কাছে রাখার জন্য। তারা তিয়াশাকে তাদের কাছে রেখে একমাত্র সন্তান হারানোর দুঃখকে কিছুটা প্রশমিত করতে চাচ্ছিল। আমি প্রথমে রাজি না হলেও পরে অনেক চিন্তা করে দেখলাম যে ঢাকায় আমাদের বাসা থেকে তাদের বাসা বেশি দূরে না হওয়ায় ঘন ঘন যাওয়ারও একটা সুযোগ থাকবে এবং তারাও তাদের একমাত্র মেয়ে হারানোর কষ্ট থেকে কিছুটা রেহাই পাবে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিই। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই তিয়াশাকে তাদের কাছে রাখা হয়। এরপর আস্তে আস্তে আমদের স্বাভাবিক জীবন শুরু হতে থাকে। মা-বাবাকে নিয়ে ঢাকায় গিয়ে আমি আবার অফিস করতে শুরু করি। ওদিকে ইরিনার বাবা-মাও আমাদের তিয়াশাকে নিয়ে জীবন যাপন করতে থাকে। প্রায় প্রতিদিনই আমি অফিস শেষে তিয়াশাকে দেখতে যাই, মা-বাবাও যায় প্রায়ই। উনারও তিয়াশাকে নিয়ে বেড়াতে আসেন মাঝে মাঝেই। এভাবে দেখতে দেখতেই দুটি বছর চলে যায়। এর মাঝে আমার নতুন করে বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে অনেক কিন্তু আমি না করে দিয়েছি। একদিন আমার ছোট ফুপু একটি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, মেয়ের নাম আদ্রিয়ানা। বিয়ে করার ইচ্ছে না থাকায় আমি শুনেই না করে দিলেও মা কেমন যেন এবার আর ছাড়ছিলেন না। মার চাপাচাপিতেই আমি একসময় বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যাই। মা নাকি এই ব্যাপারটি নিয়ে আমার ইরিনার বাবা-মার সাথেও কথা বলেছিল। তাদেরও নাকি এই মেয়ের ব্যাপারে পূর্ণ সম্মতি ছিল এবং বলেছিল এই মেয়েকে বিয়ে করলে নাকি তারাও খুশি হবে। কী জানি বাবা কী আছে এই মেয়ের মাঝে, সবারই এতো তোড়জোড়! আমার আর রাজি না হয়ে উপায় ছিল না।

আজ একটু পর এই মেয়েকে বিয়ে করতেই বের হবো। গতরাতে ইরিনাকে স্বপ্নে দেখেছিলাম, স্বপ্নেও ও দেখি আমাকে বিয়েটা করতে বলছে। অবশেষে আদ্রিয়ানা নামক মেয়েটাকে বিয়ে করার জন্য পুরোপুরি মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। হয়েও যায় সেদিন আমাদের বিয়েটা। তিয়াশা নতুন মাকে বিয়ের রাতেই বাসায় আনার পর থেকেই যে কী খুশি ছিল বলার মত না। ওর নতুন মাও ওকে কাছে পেয়ে ছাড়ছিল না। ওদের দুজনের কান্ড দেখে শেষমেশ বাসর রাতে তিয়াশাকে আমাদের সাথেই রেখেছিলাম। নতুন মায়ের আদর পেয়ে বাবার কথাতো প্রায় ভুলেই যাবার যোগাড়। ভাগ্যিস নতুন মায়ের সামনেই বাবা বসে ছিল নাহলে নির্ঘাত ভুলে যেতো। তবে নতুন মায়ের নতুন আদরে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারেনি। তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এরপর ওকে পাশে শুইয়ে রেখে সারারাত গল্প করেছিলাম আমি আর আদ্রিয়ানা। আমার আর ইরিনার সকল কাহিনী প্রায় একরাতেই বলে শেষ করেছিলাম ওকে!

আস্তে আস্তে বাড়ি থেকে বিয়ের আমেজ শেষ হয়ে যায়। আত্মীয়স্বজন যার যার মনে নিজেদের বাসায় চলে যায়। তিয়াশাকেও ওর নানা-নানী নিয়ে চলে যায়। আমি আর আদ্রিয়ানা অনেক রাখতে বলেছিলাম আর দুটো দিন, কিন্তু নানা অজুহাতে সেদিন আর রাখেনি। আমার নতুন সংসার জীবন শুরু হয়ে যায়। আদ্রিয়ানা মেয়েটা সত্যিই অনেক ভালো। ওর নিজের তুলনা ও কেবল নিজেই ছিল। তবুও আমি আদ্রিয়ানার মাঝে বারবার আমার ইরিনাকে খুঁজেছি। পেয়েছিও অনেক। আদ্রিয়ানাও আমার চাহিদা বুঝে সে অনুযায়ী নিজেকে ইরিনার মত করে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতো। শুনেছি মেয়েরা নাকি তাদের স্বামীর ভালোবাসার ভাগ অন্য কোনো মেয়েকে দিতে চায় না। কিন্তু আদ্রিয়ানার মধ্যে ওমনটা কখনো দেখিনি। ও নিজেই মাঝে মাঝে আমাকে ইরিনার ব্যাপারে গল্প করতে বলতো। করতামও আমি আর ও সেটা মনযোগ দিয়ে শুনতো। কিছুদিন পর পর তিয়াশাকে দেখতে যেতাম দুজনই। এভাবে চলতে চলতেই এসে যায় আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। রাত বারোটায় ও আমাকে সাথে নিয়ে চুপিচুপি ছোট্ট একটা কেক কেটেছিল সে রাতে। এরপর ও আমাকে এমন একটা উপহার দেয় যা আমাকে রীতিমত সে রাতে সারপ্রাইজড করেছিল। সেটা ছিল বিশাল একটি ফ্রেমে বাঁধানো ইরিনার ছবি। তারপর ও নিজেই সেটা সে রাতে দেওয়ালে থাকা আমার একটি বড় ছবির পাশে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। সেদিন ওকে জড়িয়ে ধরিয়ে কেঁদেছিলাম আমি অনেক। কিন্তু কে জানতো সকালে এরচেয়েও বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে! সে রাতে রাতভর আমরা অনেক দুষ্টুমি করেছি, আদর করেছি। সেজন্যে পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়ে যায়। ঘুমে থেকে জেগে দেখি ও পাশে নেই। বাথরুমের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ভাবলাম ও হয়তো গোসল করছে। একটু দুষ্টুমি করার জন্য বাথরুমের সামনে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিতেই দেখি বাথরুম পুরো ফাঁকা। হতাশ হয়ে ভাবলাম হয়তো গোসলের কাজ আগেই সেরে ফেলে এখন রান্না করছে। কিচেনে গিয়ে দেখি সেখানেও নেই, কেবল মা একা রান্না করছে। মাকে জিজ্ঞেস করলাম ও কোথায়। মা বললো জানে না কিছু, হঠাৎ নাকি বেরিয়ে গেছে। আমিতো অবাক, এভাবে হঠাৎতো কখনো কাউকে কিছু না বলে ও বেরোয় না। ফোন দিলাম, বললো কিছুক্ষণের মাঝেই আসছে। কোথায় আছে জিজ্ঞেস করায় বললো সেটা সারপ্রাইজ, বলা যাবে না। কী আর করার! আমি ফোনটা রেখে ভাবতে লাগলাম কী এমন সারপ্রাইজ ও আমাকে আবার দিতে যাচ্ছে। রাতেইনা আমাকে ইয়া বড় একটা সারপ্রাইজ দিলো, ওটা দেওয়ার পর আর কী সারপ্রাইজ হতে পারে! শেষমেশ কোনো কূল-কিনারা করতে না পেরে আমি গোসল করে ফ্রেশ হয়ে ওর জন্য বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আধঘণ্টা পর কলিং বেল বাজলো। আমি উঠে দরজা খোলার জন্য রুম থেকে বেরুতেই দেখি মা ইতোমধ্যে দরজা খুলে দিয়েছে আর আদ্রিয়ানা একেবারে খালি হাতে প্রবেশ করছে। আমি সারপ্রাইজের আশায় আশায় বসে থেকে ওকে এভাবে খালি হাতে ফিরতে দেখে মনে মনে এক প্রকার সারপ্রাইজডই হলাম। ও হঠাৎ সামনে এসে আমার চোখ বন্ধ করতে বললো এবং না বলা পর্যন্ত খুলতে না করলো। আমিও তাই করলাম। ও আমার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গেলো। মনে হলো দরজার সামনে নিয়ে গেলো। এবার চোখটা খুলতে বললো। আমি চোখ খুলে যা দেখলাম তাতে আমি সত্যিই হঠাৎ মারাত্মকভাবে সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম!

আমি দেখলাম আমার মেয়ে তিয়াশা আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকে চোখ খুলতে দেখেই ও দৌড়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরলো। পাশ থেকে আদ্রিয়ানা বলছিলো ও ইরিনার বাবা-মাকে নাকি অনেকদিন ধরেই বোঝানো-সোঝানোর পর আজ থেকে একেবারের জন্যই তিয়াশাকে এনে পড়েছে আমাদের মাঝে। আর উনারা নাকি কথা দিয়েছেন খারাপ লাগলেই এখানে চলে আসবেন, আজকের এই বিশেষ দিনেতো আসবেনই। সব মিলিয়ে সে দিনটাই ছিল ইরিনা চলে যাবার পর আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন। তবে সেদিন এটুকুতেই শেষ হয়নি। রাত বারোটা পেরোনোর আগেই আমিও সেদিন আদ্রিয়ানাকে একটা সারপ্রাইজ দিয়েছিলাম। ওরও একটি ছবি আমি ইরিনারটার মতই বড় করে বাঁধাই করে এনে আমার ছবিটার অন্যপাশে লাগিয়ে দিয়েছিলাম। ও সেসময় এতটাই খুশি হয়েছিল যে যতটা খুশি আমি ওকে আমাদের বিয়ের পরে কখনো হতে দেখিনি। সেদিনের সে রাতটি ছিল আমার দ্বিতীয় বিয়ের দ্বিতীয় বাসর। সে রাতে আদ্রিয়ানাকে কানে কানে আরো একটা সারপ্রাইজ দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আগামী এনিভার্সারির আগেই আমাদের জীবনে খোদা চাহেতো নতুন অতিথি চাই।

আগের পর্বগুলো:

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ১ম পর্ব

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ২য় পর্ব

About The Author
Rihanoor Islam Protik
আমি একজন প্রযুক্তি প্রেমী মানুষ। প্রযুক্তি নিয়ে পড়ে থাকতেই বেশি ভালো লাগে। তবে লেখালেখিটা শখের বশে করি। আশ্চর্যের বিষয় হলো লিখতে গিয়ে আমি সকল কষ্ট ভুলে থাকতে পারি।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment