Now Reading
মুভি রিভিউঃ Dead Poets Society



মুভি রিভিউঃ Dead Poets Society

কিছু মুভি আমরা সযত্নে এড়িয়ে যাই। পছন্দের তালিকায় আমাদের সবসময় থাকে সাই-ফাই,থ্রিলার,একশন,এডভেঞ্চার কিংবা রোম্যান্স।

বায়োগ্রাফি কিংবা ড্রামা ক্যাটাগরির মুভি মানেই যেন কিছুটা ঘুম ঘুম ভাব! তবে বেশিরভাগ মাস্টারপিস গুলো এসব Genres থেকেই বের হয়ে আসে।

তেমনই একটি মুভি রিভিউ এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনা দিয়ে লেখার সূচনা।

upload.png

 

 

 

৮০’র দশকের শেষ দিকে মুক্তি পাওয়া  “Dead Poets Society” IMDB তে ৮.০ এবং Rotten Tomatos এ ক্রিটিকদের ৮৫% ভোটসহ বাগিয়ে নিয়েছিল অস্কার। সেরা চিত্রনাট্য লেখক হিসেবে এটি জমা পড়ে Tom Schulman এর ঝুলিতে।

মুভির কাহিনী আবর্তিত হয় আমেরিকার নামকরা স্কুলের কিছু ছাত্র এবং একজন শিক্ষককে নিয়ে। ঐতিহ্যবাহী Welton একাডেমীর ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম থেকে নবীন ছাত্ররা জানতে পারলো সফলতার মূলমন্ত্র,  “Tradition, Honor, Discipline, Excellence.”

গুরুগম্ভীর প্রিন্সিপ্যাল এর মাধ্যমে ছাত্ররা পরিচিত হয় তাদের সাহিত্যের নতুন শিক্ষক “মিঃ কিটিং” এর সাথে। মূলত এখান থেকেই মুভির সূত্রপাত।

আবাসিক এ থাকা ছাত্রদের একেকজনের একেকরকম স্বপ্ন। কেউ চঞ্চল, কেউ চুপচাপ, কেউ বাচাল কেউবা দুষ্টু স্বভাবের। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন এই ছাত্রদের দলটা সাহিত্যের ক্লাসের শুরুতে আবিষ্কার করে, অন্যান্য ক্লাসের মত এই ক্লাসটা গতানুগতিক নয়! সাহিত্যের শিক্ষক একেবারেই অন্যরকম একজন মানুষ।

প্রথম দিনই সে অভিনব কায়দায় ছাত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। শিষ বাজানোর পর তার ক্লাসের প্রথম বাক্যটি ছিলো রবার্ট হুইটম্যান এর বিখ্যাত কবিতার প্রথম লাইন, “ও ক্যাপ্টেন, মাই ক্যাপ্টেন” কিছুটা হতবাক ছেলেরা ধীরে ধীরে আবিস্কার করে, সাহিত্যের ক্লাসটা একঘেয়ে হওয়ার কথা থাকলেও সেটা হচ্ছেনা!

মিঃ কিটিং প্রথম ক্লাসে ছাত্রদেরকে উপলব্ধি করায়, “Seize The Day”।

এটি কিছু ল্যাটিন উক্তির অন্তর্গত একটি উক্তি যা Carpe Diem নামে পরিচিত। এর মর্মার্থ অনেকটা দাঁড়ায়,

“আজকের দিনটাকে উপভোগ করো। বেঁচে থাকো। জীবনটাকে অনুভব করো। ভবিষ্যৎ এ কি হবে তা ভেবে চিন্তিত হয়ে বেঁচে থাকার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়ো না।”

এছাড়াও মিঃ কিটিং প্রতি ক্লাসেই ছাত্রদের জন্য নিয়ে আসতো সম্পূর্ণ নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি!

MV5BMTgzODEzMjQyMV5BMl5BanBnXkFtZTcwOTM3NjAyNw@@._V1_SX1510_CR0,0,1510,999_AL_.jpg

“ক্যাপ্টেন” খ্যাত এই অভিনেতা সম্পর্কে কিছু না বললেই নয়। হলিউডে বেশ কিছু শক্তিমান অভিনেতা; যারা তাদের অনবদ্য অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের হৃদয়ে দাগ কেটেছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। Robin Williams তার অভিনয় জীবনে ৮০ টি নমিনেশন এবং ৬৩ টি এওয়ার্ড ছাড়াও চারবারের জন্য মনোনীত হন অস্কারের জন্য। এর মধ্যে Dead Poets Society তে সেরা অভিনেতার মনোনয়ন থাকলেও তিনি মূলত অস্কার পান Good Will Hunting ছবিতে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার  ক্যাটাগরিতে।

আবার ফিরে যাওয়া যাক “মৃত কবিদের দলে!”।

সংক্ষিপ্ত কাহিনীর নামে মুভির কিছু অসাধারণ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে দেয়ার পক্ষে আমি নেই। তাই সম্পূর্ণ মুভির স্ক্রিন প্লে নিয়ে কিছু কথা বলি।

ডেড পোয়েটস সোসাইটিতে দারুন এক শিক্ষা ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের সাথে যা বেমানান বটে। কিন্তু এরকম হলে আসলেই কেমন হতো!

সাহিত্য বই এর ভূমিকায় কবিতাকে সঠিকভাবে বুঝানোর জন্য গ্রাফ তুলে ধরা হয়েছে। কি ভয়াবহ এক অবস্থা! শিক্ষক হঠাৎ আমাদেরকে বললেন, “কবিতা, সাহিত্য গ্রাফ দিয়ে বুঝানো যায়না। এটাকে অনুভব করতে হয়, শব্দ দিয়ে-ভাষা দিয়ে বুঝতে হয়। ছিঁড়ে ফেলো ভূমিকার পেজটা। ছিঁড়ো, ছিঁড়ে ফেলো!”

কিছুটা হাস্যকর হলেও দৃশ্যটা গোগ্রাসে গেলার মত। শিক্ষক চিৎকার করে বলছেন, Rip it out! Rip it out!

অথবা শিক্ষক ডেস্ক এর উপর দাঁড়িয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার উপর লেকচার দিলেন। এরপর একে একে ছাত্ররাও তার ডেস্ক এর উপর উঠে হাতে-কলমে উপলব্ধি করলো ব্যাপারটা! এ যেন ক্লাসের লেকচার ক্লাসেই কমপ্লিট করে দেয়া! এরপর তা শুধু সময়ের প্রয়োজনে নিজের জীবনে প্রয়োগ হবে!

 

MV5BNjI1NTMwODY5OF5BMl5BanBnXkFtZTcwMTQ3NjAyNw@@._V1_SY1000_CR0,0,707,1000_AL_.jpg

মিঃ কিটিং যখন বলেন, “Words and ideas can change the world” তখন শরীরে একটা শিহরণ বয়ে যায়। শব্দের,কবিতার,সাহিত্যের অসীম শক্তি অনুভবে চলে আসে। বইয়ের জ্ঞান ছাড়াও জীবনে চলার জন্য কিছু উপকরণ লাগে। সেগুলোর খোঁজ দিতে পারে একজন শিক্ষক।

এসব উপলব্ধি আমাদের শিক্ষাঙ্গনে বেশ অপ্রচলিত বটে। হাতেগোনা কিছু শিক্ষক ছাড়া সবাই শুধু বইয়ের পাতায় মশগুল হয়ে থাকছেন। বই এর মত জড় একটা বস্তুকে জীবন্ত করে তোলার মন্ত্র কিংবা জীবন যে শুধুই একটা যন্ত্র নয় মিঃ কিটিং আমাদেরকে তা জানিয়ে গেছেন। তিনি দেখিয়ে গেছেন, জড়তায় ভোগা ছাত্রের ভেতর থেকে কিভাবে প্রাণশক্তির সঞ্চার ঘটানো যায়।

সিনেমায় সাহিত্যের ব্যাপারটা গাঢ় করে দেখালেও যেকোনো বিষয়কেই ভালোবেসে, অনুভব করে পড়লে বোঝা যায়। ফিজিক্স এর মত একটা বিষয়কেও অনেক শিক্ষক গাছ থেকে আপেল পড়ার মত সহজ করে বোঝাতে পারেন। এজন্য বইকে জীবন্ত করে তুলতে হয় একজন শিক্ষকের।

মুভিতে আরো একটি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। তা হচ্ছে, অভিভাবকদের ইচ্ছা পূরণের জন্য কোমল কোনো হৃদয়কে বলির পাঠা বানানো।

যে ছেলেটা অভিনয়কে ভালোবেসে ফেলেছে তাকে হতে হবে ডাক্তার! যে ছেলেটা দেশ সেরা ক্রিকেটারদের একজন হতে চায় তাকে হতে হবে ইঞ্জিনিয়ার! এভাবেই স্বপ্ন গুলোকে খুন করা হবে খুবই নীরবে। কোনো কূল-কিনারা হবেনা এই খুনের। কারণ তারা অভিভাবক।

 

Dead Poets Society ২ ঘন্টা ১০ মিনিটের মধ্যে আমাদের মাথায় তুলে দেয় এক জীবন ভাবনার উপকরণ। এই মুভি দেখার পর খুব নিরস মানুষটারও ইচ্ছা হবে একটা কবিতা পড়ে দেখতে, ইচ্ছা হবে দুইটা লাইন লিখতে। কেউ হয়তো খুঁজতে বসবে তার জীবনে মিঃ কিটিং এর মত কেউ এসেছিল কিনা। কারো কারো আফসোস হবে এমন কোনো শিক্ষকের সান্নিধ্যে আসতে না পারার। তবে এমনটা না হলেও খুব নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মিঃ কিটিং এর প্রতিটা ক্লাসই দর্শকদের কাছে সেরা ক্লাস হিসেবে বিবেচিত হবে।

ব্যতিক্রম সবকিছুকেই সংগ্রামের মুখে পড়তে হয়। অন্যরকম শিক্ষক মিঃ কিটিংকেও ভুল বোঝে কর্তৃপক্ষ। তাকে চলে যেতে হয় প্রিয় ছাত্রদেরকে ছেড়ে। কিন্তু প্রিয় শিক্ষকের বিদায় মুহূর্ত কতটা বেদনাদায়ক সেটা তার ছাত্ররাই বোঝে। ক্লাসের সবচে চুপচাপ,সহজ-সরল কিংবা ভীতু ছেলেটারও আবেগের বাঁধ ভেঙে যায় হুড়মুড় করে। সর্বোচ্চ সাহসিকতা প্রদর্শন করে তারা প্রিয় শিক্ষককে প্রিয় নামে ডেকে ওঠে। এ যেন এক অন্যরকম গার্ড অব অনার!

“O Captain! My Captain!” লাইনটি খুবই আবেগময় একটি লাইন। সিনেমা না দেখলে এটা কোনোভাবেই উপলব্ধি করা যাবেনা।

এখনো না দেখে থাকলে অবসরে দেখে ফেলুন সিনেমাটি। ইউটিউব ঘাটলেই পেয়ে যাবেন সম্পূর্ণ মুভি। আশাকরি আপনার সময়টা বৃথা যাবেনা।

ছবি সূত্রঃ IMDB

ফিচার ছবিঃ পোস্টার ক্রেডিট

About The Author
Nur Mohammad
Nur Mohammad
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment