Now Reading
প্রতিবিম্বঃ পর্ব ৩



প্রতিবিম্বঃ পর্ব ৩

জাবির এখনো ঘোড় কাটাতে পারছেনা । প্রিয় বন্ধুর অস্বাভাবিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেনা। মাটিতে এলিয়ে পরে থাকা আর্তনাদরত নাহিদের মা কে ধরে বসে আছে জাবির। নাহিদের বাবা নেই। ৮ বছর আগে বার্ধক্যজনিত কারনে উনি মৃত্যুবরণ করেন। একটা ৫ তালা বাড়ি আছে জিগাতলায়, সেটার ভাড়া দিয়ে নাহিদের পড়াশোনা আর সংসার খরচ চলত। ছেলের মৃত্যুতে ভদ্রমহিলা চরমভাবে মুষড়ে পড়েছেন।

নাহিদকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুলিশ ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দিবে। নাহিদের আম্মা চায়নি ছেলের লাশ নিয়ে কাটাকাটি হোক, তবে পুলিশ আর ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের অনেক রিকোয়েস্টে এর পরে উনি রাজি হয়েছেন।

 

জাবির বাসায় ফিরে গেল। শাওয়ারে দাঁড়িয়ে থাকলো অনেক সময়। কেন নাহিদ ফাসি দিল নিজেকে? কেনইবা তার শরীর অর্ধেক পুড়ে গিয়েছিল? ওর শরীরে আগুন থাকলে তো ঘরেও আগুন এর ধোয়া বা কালো দাগ থাকার কথা দেয়ালে, কিন্তু সেগুলো নেই তো। আর যে মানুষ নিজেকে পুড়িয়েছে, সে কেন ফাসি দিবে? আর আগে যদি ফাসিই দেয় তাহলে ফাস লেগে মরেই তো যাবে। পুড়বে কিভাবে?

হিসাব মিলছে না। নাহিদ আত্নহত্যা তো করেনি। কারন একজন আত্নহত্যাকারী একটা পথ বেছে নিবে মৃত্যুবরণ করার জন্য। দুইটা অপশন একসাথে এপ্লাই কেউ করবে না। তার মানে ওকে হত্যা করা হয়েছে?

শাওয়ার করে বের হয়ে দেখে ডর্ম মনিটরের ফোন। দেখা করতে বলেছেন প্রক্টর স্যার। নাহিদের বন্ধু বলতে এক জাবিরই আছে। পুলিশ তদন্তের স্বার্থে ওকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়।

রাত ৯ টায় গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল জাবির। সরাসরি প্রক্টর এর অফিসের সামনে এসে থামলো। ভিতরে ডুকে দেখলো লোকাল থানার দ্বায়িত্বরত পুলিশ অফিসার আর কিছু সেন্ট্রি আছে। স্যার জাবিরকে কো-অপারেট করার অনুরোধ করলেন।

পুলিশ অফিসার জাবিরকে জিজ্ঞেস করলেন ,

– নাহিদ কে কিভাবে চিনেন?

– একসাথে পড়ি আমরা, একই সেমিস্টার এ। শুরু থেকেই আমরা ভাল বন্ধু।

– ২ বছর ধরে আপনারা দুজনেই বন্ধু? আর কেউ বন্ধু নেই নাহিদের?

– আমার জানা মতে নেই ।

– আচ্ছা, নাহিদের লাশ দেখে আপনার কি ধারনা?

– ও সুইসাইড করেনি। আর লাশ দেখে সবাই বুঝেছে যে কেউ একসাথে দুইটা সুইসাইডাল মেথড এপ্লাই করতে পারেনা।

– সেটা রিপোর্ট পেলেই জানা যাবে। ওর কি কারো সাথে শত্রুতা ছিল?

– আমার জানামতে না। শান্ত হাসিখুশি ছেলে ও।

– আচ্ছা, আরো ইনফরমেশন লাগলে আপনার সাথে যোগাযোগ করবো।

– ধন্যবাদ।

বের হয়ে এল অফিস থেকে। সারের অফিসের সামনে থেকে ডর্মের ৩ তালায় নাহিদের রুমের জানালা দেখা যায়। তাকাতেই মন ভারী হয়ে এলো জাবিরের। নাহিদ ছাড়া ওর কোন বন্ধু নেই। একা হয়ে পড়েছে অনেক।

ক্যাম্পাস ৩ দিনের ছুটি ঘোষনা করেছে। সকাল সকাল হাসপাতালে চলে এলো জাবির। আজকে নাহিদের লাশ পরিবারের কাছে দিয়ে দেয়া হবে। ওর গ্রামের বাড়িতে লাশ নিয়ে যাওয়া হবে। ওখানেই দাফন করা নাহিদকে। সেখানেই নাহিদের বাবাকে দাফন করা হয়েছিল। বাবার পাশেই ঘুমুবে ছেলে।

লাশ পেতে পেতে রাত ৮ টা বেজে গেল। লাশ নিয়ে রাতেই ওর গ্রামের বাড়ি চাদপুরের দিকে রওনা দিল জাবিররা। জাবিররা বলতে জাবির, ওর তিনজন ক্লাসমেট, ডিপার্টমেন্ট কো-অর্ডিনেটর, নাহিদের এক চাচা আর নাহিদের মা। যদিও ৪ ঘন্টার রাস্তা , কিন্তু লাশের গাড়ির মন্থর গতির কারনে গ্রামে পৌছাতে পৌছাতে ভোর হয়ে গেল। ১০টায় জানাজা শেষ করে দাফন শেষ করলো ১২ টার দিকে। ঢাকা ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে এলো।

২ দিন কিভাবে যেন কেটে গেল টের পেল না জাবির। ঘুমিয়েই কাটিয়েছে বেশিরভাগ সময়। একবার ভেবেছে জান্নাতকে কল করবে। কল করে কিছুক্ষন কথা বলবে। আবার ভাবলও – একবার মিট করেই কল দিয়ে কাউকে বিরক্ত করা ক্যালিবারের ছেলে ও না। আর নাম্বার কই পেয়েছে জিজ্ঞেস করলে কি বলবে? ব্যাপারটা ছ্যাবলামো হয়ে যায়।

 

দুদিন পর রাতে ১০টার দিকে ডর্মের এক ক্লাসমেট এর কাছ থেকে কিছু নোটস নিয়ে ফিরছিল জাবির। ডর্ম থেকে বের হয়ে হেটে হেটে লনের সামনে আগাতে লাগলো। কিছুক্ষন হাটার পর লনের শেষ মাথায় দেখল একটা মেয়েকে। হেটে এদিকেই আসছে। এত রাতে এখানে কে আসবে? কৌতুহল বেড়ে গেল ওর। কাছে যেতেই চিনতে পারলো।

– আরে জান্নাত তুমি?

– হ্যা, ভাল লাগছেনা তাই হাটতে বেরিয়েছি।

– হাটতে বেরিয়েছ মানে? মেয়েদের ডর্মে থাক নাকি তুমি?

– জ্বী। ঢাকায় কেউ নেই রিলেটিভ। তাই ডর্মে উঠেছি।

– আচ্ছা। তো, মন খারাপ নাকি?

– আজকে আমাদের একজন স্টুডেন্ট সুইসাইড খুন হয়েছে।

– হ্যা, নাহিদ। আমার বন্ধু।

– আমি দুঃখিত আপনার বন্ধুর জন্য।

– ইটস ওকে। ভেবেছিলাম তোমাকে একবার ফোন দিব।

– কেন? আর আপনি আমার নাম্বার কোথায় পাবেন।

– আছে আমার কাছে। জুনিয়রদের লগবুকে দেখেছিলাম। পরে টুকে নিয়েছি।

– অ আচ্ছা। আপনি কি ডর্মে থাকেন নাকি?

– না, আমার বাসা বনানী।

– তো এখানে রাতে?

– ক্লাসমেটের কাছ থেকে নোটস নিতে এসেছি।

– আচ্ছা, বাসায় যান তাহলে। পরে দেখা হবে।

– আল্লাহ হাফেজ।

 

চলে এলো জাবির। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে একটু সামনে এসে লুকিং গ্লাসে পিছে ফিরে জান্নাত কে দেখতে চাইলো। কথা বলার সময় আচমকা মেয়েটাকে অনেক আপন মনে হয়েছিল। কিন্তু পিছে ফিরে জান্নাতকে আর দেখতে পেল না। হয়ত চলে গেছে। মিথ্যে বললো জান্নাতের কাছে যে নাম্বার জুনিয়র লগবুক থেকে পেয়েছে। নাম্বার তো নাহিদ দিয়েছে কিভাবে ম্যানেজ করে যেন।  ফোন বের করে জান্নাতের নাম্বারে একটা টেক্সট করলো।

মেসেজ সেন্ড হলো না। দুই তিনবার ট্রাই করলো। মেসেজ যাচ্ছেই না। ফোন করলো ডিরেক্ট । অপর পাশ থেকে বলছে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এই নাম্বারের। স্ট্রেঞ্জ তো ব্যাপারটা। কাছেই একাডেমিক ভবন। একবার গিয়ে নাম্বারটা চেক করবে নাকি? চাচাকে চা-পানের জন্য ৫০ টাকা দিলেই এক্সেস করতে দিবে লগবুক।

গেল জাবির একাডেমিক ভবনে। লগবুক খুলে মেকানিক্যাল ১ম সেমিস্টার এর স্টুডেন্ট দের নাম চেক করতে লাগলো, কিন্তু সেখানে জান্নাত নামের কারো নাম নেই।

বের হয়ে ভাবতে লাগলো।কিন্তু কোন কুলকিনারা করতে পারল না। হটাৎ মনে পড়লো –  রাত ৮ টার পর মেয়েদের ডর্ম থেকে কারো বের হওয়া মানা। আর বের হলেও পারমিশন ছাড়া প্রক্টর অফিস এর লনে কারো আসার অনুমতি নেই।

তাহলে জান্নাত কিভাবে লনে এলো? লগবুকে ওর নাম নেই কেন?

About The Author
Kazi Mohammad Arafat Rahaman
Kazi Mohammad Arafat Rahaman
পড়াশোনা - ব্যাচেলর করছি কম্পিউটার সায়েন্সে। ভাল লাগা - গান, ফুটবল আর বই। খারাপ লাগা - নাই। খারাপ লাগেনা। অনুভূতিহীন। শখ - অনেক আছে। লক্ষ্য - ইন্টারপ্রেনার হতে চাই।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment