Now Reading
কি খবর, রাত্রি?



কি খবর, রাত্রি?

সূচনাপর্ব

 

“তুমি কি রোকসানা আপার বাড়ীতে আসলেই যাবা না?”

-“নাহ।”

“সবাই যাচ্ছে আর তুমি যাবা না কেন? আমি তো যাচ্ছি না আমার জ্বর তাই। জ্বর না থাকলে আমিও নাচতে নাচতে যাইতাম।”

-“যাইতে ইচ্ছা করতেসে না।”

“তুমি কি আমার জন্য যাইতেস না? আমি যাব না তাই?”

-“না তো। তোমার জন্য বেড়ান বাদ দিব কেন? বেড়াইতে যাওয়া বাদ দেওয়ার মতো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তো তুমি না রাত্রি আপা।”

“এ্যই পিচ্চি,তুই এত পাকা পাকা কথা শিখসিস কোত্থেকে?”

আমি উত্তরে কিছু বললাম না।ঠোট গোল করে শিস দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

রাত্রি আপাকে আমি মুখের উপর “যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ না” বলে দিলাম। আপা? কীসের আপা?! রাত্রি, হ্যা শুধুই রাত্রি। সে আমার ফুফাতো বোন হোক, হোক বয়সে পাঁচ বছরের বড় তাতে কি কিছু যায় আসে? ভালোবাসা কি একটা অংক নাকি যে হাজারটা সূত্র আর নিয়ম মেনে এরপর প্রেমে পরতে হবে? প্রণয় কখন কীভাবে কাকে স্পর্শ করবে এইরকম নিয়মাবলী কোন সংবিধানে আছে? তার উপর অংকে আমি এমনিতেই কাচা, অংক আমার মাথায় কিছুতেই ঢোকে না, অতি সহজ সহজ সরল অংকের হিসাবও আমার কখনোই মিলে না।

তাকে এভাবে কথাটা বলার পর বুকের বাম পাশে খচ করে ধরে নাই সেটা বললে মিথ্যা বলা হবে। কি আর করার! আমি আমাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। শুধু আমি না আমার ধারণা সবাই-ই তাই। খুব সম্ভবত নিজেকে ভালোবাসি বলেই রাত্রিকে আমি ভালোবাসি। নিজের আনন্দে থাকার প্রয়োজনেই রাত্রিকে আমার প্রয়োজন। নিজের ভালো থাকার প্রয়োজনেই যার প্রেমে পরেছি তাকে পাশে বসিয়ে রাখতে ইচ্ছা করে, দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা বিরক্তিকর আঠার মতো সাথে লেগে থাকতে ইচ্ছা করে, তাকে ভালো রাখার প্রচন্ড অভিপ্রায় জাগে।

 

রাত্রি চলে যাচ্ছে। যাক।চলে যাক। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখছি। আমার চোখের সামনে দিয়ে সে চলে গেল। আমি মাথা নীচু করে ফেললাম। ভয়াবহ রোদের কারণে আমার চোখ জ্বালা করছে। আমার ঘর্মাক্ত হাত পা আমি সমানে চুলকিয়ে যাচ্ছি। শরীর থেকে ঘামের বীভৎস গন্ধ বের হচ্ছে। চুলকানি কিংবা দুর্গন্ধ দুইটাকেই অবশ্য ছাপিয়ে গেছে চোখের জ্বালাপোড়া।আনন্দের ব্যাপার সে আজকে নীল সালোয়ার কামিজটায় নাই। নাহলে এই বিদায় সহ্য করা আমার জন্য অসম্ভের কাছাকাছি হতো।

 

 

কোরাস

 

আমি জানতে পারলাম রাত্রির বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেছে। সে জানতে পারল না অন্য একজন তার প্রণয় দংশনে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে এতদিন বেলতলায় শুয়ে ছিল এবং ভবিষ্যতেও শুয়েই থাকবে। এই “একজন” ব্যক্তিটা ন্যাড়া না। তার মাথায় ঘন দীর্ঘ ঝাকড়া চুল। সমস্যাটা এখানেই। এ কারণেই ন্যাড়ার মতো একবার ভুল করেই তার শিক্ষা হয় না, সে ভুল করে, নিজের ভুল নিজেই অনুধাবন করে কিন্তু তারপরো সে বারবার ভুল করতেই থাকে, বারবার বেলতলায় ফেরত যায়। তাকে যেতে হয়। আমাদের পুরোটুকুর উপর কি আসলেই আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে? তাহলে ভুল জেনেও আমরা একই ভুল বারবার করি কেন? আমাদের নিজেদের কতটুকুকে আমরা আসলেই চিনি? আমার কতটুকুকে প্রকৃতপক্ষে আমি নিজেই চালাই?

তো যাক, আমি কাজে মন দিলাম।অনেক কাজ। অনেক অনেক কাজ। মানুষ হয়ে যেহেতু জন্মেছি সেহেতু পেট পূজা করতেই হবে। কোন এক জ্ঞানী ব্যক্তি নাকি বলেছেন “পেটে ভাত না থাকলে প্রেম জানালা দিয়ে পালায়।” কথা মিথ্যা না। খাদ্য অপরিহার্য। প্রেম না। নাকি প্রেমও অপরিহার্য? জ্ঞানী তুমি কোথায়? তোমার জ্ঞান এখন কি বলে?

 

উপসংহার

 

“কেমন আছো?বহুদিন পর তোমাকে দেখলাম ভাইয়া।”

-“আছি। তোমার কি অবস্থা? বাচ্চাদের খবর কি?”

“এই তো আছি ভালোই।ওরাও ভালো।”

-“বাই দ্যা ওয়ে, আমার চুল পাইকা গেলেও আমি কিন্তু আগের মতোই বেয়াদব আছি। আপু তো আগেও কখনো ডাকি নাই খুব সম্ভবত আজকেও ডাকব না। তোমার বাচ্চাদেরকে সরাও। নাইলে তারা মামার কাছ থেকে বেয়াদবি শিখবে।”

রাত্রি কথাটা শুনার পর হাসতে শুরু করল। এই হাসিটা দুই যুগ ধরে দেখা হয় নাই। নিয়তি? নাহ!

 

হঠাৎ করে সে গম্ভীর হয়ে গেল। টেবিলে সাজিয়ে রাখা হাজারটা খাবার থেকে চমচমের পিরিচটা আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল,

“আচ্ছা উপম, তুমি আমার বিয়ে হওয়ার পর আর এইদিকে আসো নাই কেন? সবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিসো। এমনকি তোমার ফোন নাম্বারটা পর্যন্ত আমরা খুজে খুজেও কখনো পাই নাই। সবাই তোমার কথা অনেক বলত। এমনকি শফিক যখন চাচা মারা গেলেন তখন কিন্তু মামা,মামী সবাই আসলেন অথচ তুমি কিন্তু আসলা না! কারণটা কি?এত কীসের ব্যস্ততা তোমার?”

“কোন একটা লেখায় জানি পড়সিলাম মেয়েরা যে কোন পুরুষের চোখের দিকে তাকায়া বুইঝা ফালাইতে পারে সে তার দিকে কোন দৃষ্টিতে তাকাইতেসে । তাকায় দেখ তো কিছু বুঝো কীনা।”

রাত্রি উত্তর দিল না। সে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। কিছুক্ষন পর চায়ের কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে আবার তার দৃশ্যকল্পে আগমন।সে হাসল। আবারো সেই দুই যুগ আগের হাসি। হাসতে হাসতেই বলল,

“ঠিকই লিখসে তোমার লেখক।আগেও বুঝতাম।এখনো বুঝতেসি।’’

-“বাহ!চমৎকার!”

“জীবন কি এইসব ছোটো খাটো বিষয়ে আটকায় যায়? জীবন কি এতটাই ছোট? আচ্ছা তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাটা কি বলো তো আমাকে।”

-“খুব সম্ভবত তোমাকে নিয়া ৩২ নাম্বারের লেকে বাদাম খাইতে না পারা।”

 

রাত্রি কিছু বলল না। সে আবারো হাসছে। এটা কিন্তু সেই দুই যুগ আগের হাসি না। হাসতে হাসতে রাত্রির হেচকি উঠে যায় এমন অবস্থা। রাত্রিকে হাসিখুশি এবং আনন্দিত রেখেই আমি যেভাবে হুট করে আসছিলাম সেইভাবে হুট করেই বের হয়ে গেলাম। আমার কাজ শেষ। এখানে আমাকে আর দরকার নাই।

 

বাসের সিটটা ভালো পেয়েছি। জানালার পাশে। বাতাসে আমার বেধে রাখা চুলও একটু একটু উড়ছে। আমি গান্স এন রোজেস এর ডোন্ট ক্রাই গুনগুন করছি,

Talk to me softly

There’s something in your eyes ….

About The Author
রাফাত
রাফাত
যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা এই জেনে।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment