পারফিউমঃ একজন খুনির গল্প

Please log in or register to like posts.
News

কখনও কখনও সিনেমা আমাদেরকে আবেগতাড়িত করে। কখনও বা ভাবিয়ে তোলে নিজেদের সমাজ কিংবা পর্দার রহস্যময় চরিত্রগুলো সম্পর্কে।

তেমনই এক সিনেমার নাম “Perfume: The Story of a Murderer” টম টাইকার পরিচালিত প্রখর ইন্দ্রিয় অনুভূতির গল্প নিয়ে বানানো এই মুভিটির মূলভিত্তি ১৯৮৫ সালে পাবলিশ হওয়া প্যাট্রিক সাসকিন্ড এর বিখ্যাত জার্মান উপন্যাস Das Parfum; যা এ পর্যন্ত ৪৯ টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

সিরিয়াল কিলারদের গল্প কিংবা সিনেমা সবসময়ই আলাদা একটা উত্তেজনা সৃষ্টি করে পাঠক অথবা দর্শকদের মাঝে। কিন্তু পারফিউম মুভিটি একটু অন্যরকম সিরিয়াল কিলারের গল্প।

1st.jpg

সিনেমার উপর এক নজরঃ

জন ব্যাপিস্ট গ্র্যানুইলি নামের এক অতিমানবীয় ঘ্রাণশক্তি সম্পন্ন যুবককে নিয়েই পুরোটা সিনেমা আবর্তিত হয়। প্রেক্ষাপট হিসেবে প্যাট্রিক সাসকিন্ড এর মূল উপন্যাস অনুসারে, ১৭৩৮ এর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জন্ম নেয় এক বিরল ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু। তখনকার প্যারিস আর এখনকার প্যারিসের মধ্যে ছিল আকাশ-পাতাল তফাৎ। নোংরা-আবর্জনায় ভরপুর ছিল পারফিউম এর এই নগরী!

শিশুটি এই দুর্গন্ধময় নগরীতে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বেড়ে ওঠে তার সেই শক্তি। সেরা এবং সুন্দর সব ঘ্রাণ তার নাকে ধরা পড়ে যেত সহজেই। বহু দূর থেকেও সে খুঁজে বের করে ফেলতো ঘ্রাণের উৎস। ঘটনাক্রমে গ্র্যানুইলি, শহরে মাল ডেলিভারির সুযোগ পেল। তাও আবার পারফিউমেরই এক দোকানে! সিনেমার শুরুটা মূলত এখান থেকেই।

3rdjpg.jpg

ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ এবং অমানুষও করে তোলে। পারফিউম এর এই গল্পটি তার অনন্য এক উদাহরণ।

সব ঘ্রাণকে আলাদা আলাদা করে অনুভব করার ক্ষমতাসম্পন্ন গ্র্যানুইলি শহরে এসে সুন্দরী এক তরুণীর হাতে থাকা তাজা ফলের ঘ্রাণের পিছু নেয়। বিধাবাম! তার অতিমানবীয় ইন্দ্রিয়শক্তি মস্তিষ্কে আরো উৎকৃষ্ট কিছুর খবর জানিয়ে দেয়! গ্র্যানুইলি করে ফেলে তার প্রথম ভুল!

আর ভুল থেকেই শুরু হয় তার অসীম সেই শক্তির প্রতি অনুভব আর ভয়ংকর এক আকর্ষণ!

 

ব্যবচ্ছেদ ও সমালোচনাঃ

সিনেমার গল্প বলার ভঙ্গি অসাধারণ। দর্শকদের আঠার মত লাগিয়ে রাখার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করেননি পরিচালক। তাই উপন্যাসের সাথে হুবহু মিল না থাকলেও সিনেমাটি দর্শকদের কাছে উপভোগ্য হয়েছে। ১৫টি এওয়ার্ড ঝুলিতে পুরে নেয়া মুভিটি পেয়েছে এ পর্যন্ত ১৮টি নমিনেশন।

মূল চরিত্রে অভিনয় করা Ben Whishaw তার অসামান্য অভিনয় দক্ষতা দিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য করেছেন পুরো মুভিতে। স্বাভাবিক! কারণ এ তো “এক নায়কেরই গল্প!” এছাড়াও ৮ টি বিভিন্ন এওয়ার্ড ও ১৫ টি নমিনেশন পাওয়া এই ইংলিশ অভিনেতা জেমস বন্ড সিরিজের “Q” চরিত্রেও এসেছিলেন দর্শকদের সামনে।

 

সমালোচকদের চোখে “পারফিউম”-

IMDB তে ক্রাইম, ড্রামা, ফ্যান্টাসি Genre এ থাকা এই সিনেমা  201,276 মানুষের রেটিং পেয়েছে; যার গড় ৭.৫।

ওদিকে Rotten Tomatoes এ ৫৮% ভোট পেয়েছে। যার মধ্যে ৫৩ জন ক্রিটিক সমালোচনা করেছেন মুভিটির। ওদিকে দর্শকদের ৭২% ভোট বলে অন্যকথা! ক্রিটিকদের কঠোর সমালোচনার পরেও দর্শকদের ভালোভাবেই যেন টানতে পেরেছে এই অতিমানবীয় সিরিয়াল কিলার!

 

 

১৩টি খুন এবং শ্রেষ্ঠ সুগন্ধিঃ

পাঠকদের আকৃষ্ট করতে সিনেমার একটু ভিতরে যাওয়া যাক। গ্র্যানুইলি প্রথম শিক্ষা লাভ করে বালদিনি নামে এক পারফিউম প্রস্তুতকারক এর কাছে। প্রতিদন্দ্বীদের সেরা পারফিউম এর রহস্য উদঘাটন করতে হিমশিম খাওয়া বালদিনির কাছে যেন আশীর্বাদ হয়ে আসে গ্র্যানুইলি!

ধীরে ধীরে বালদিনির সব জটিল সমস্যার সমাধান দেয়ার মাধ্যমে প্রিয় হয়ে ওঠে সে। সেই সাথে শিখে নেয় পারফিউম তৈরির প্রাথমিক সব বিষয় এবং কোনো বস্তু থেকে ঘ্রাণ আলাদা করার পদ্ধতি।

নানারকম ছোটখাট টুইস্ট এর মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া সিনেমার একপর্যায়ে ক্ষমতা কিংবা প্রতিভার অতিরিক্ত প্রভাবে গ্র্যানুইলির ভেতর এক নিষিদ্ধ নেশা চেপে বসে।

2nd.jpg

শহরে আসা প্রথম ভুলের মাধ্যমে সে খুঁজে পায় নারীদেহের ঘ্রাণ। তার নাকে ধরা পড়া শ্রেষ্ঠ ঘ্রাণ! সে চেষ্টা চালায় সেসব ঘ্রাণ সংগ্রহে। একে একে সফল হতে থাকা গ্র্যানুইলির কাজে প্রচুর বাঁধা বিপত্তি আসে।

তারপরেও অতিমানবীয় ক্ষমতা আর নিষিদ্ধের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তাকে অন্ধ এবং মনুষ্যত্বহীন বানিয়ে দেয়। ঈশ্বর প্রদত্ত শক্তি থাকা সত্ত্বেও গ্র্যানুইলি তা ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারেনা। ধীরে ধীরে সে পরিণত হয় একজন সিরিয়াল কিলারে।

4.jpg

পাপ বাপকেও ছাড়েনা। গ্র্যানুইলিও এক পর্যায়ে ধরা পড়ে যায়। কিন্তু তার আগেই সে তার জীবনের লক্ষ্য; যার জন্য সে সব বিসর্জন দিলো, সেটা সে পূরণ করে নেয়। নিজেকে পরিণত করে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুগন্ধী প্রস্তুতকারক। তৈরি করে দুনিয়ার সেরা সুগন্ধী। যাতে মিশে আছে ১৩ টি নারীদেহের নির্যাস!

 

শেষকথাঃ

Perfume: The Story of a Murderer একটি অন্য ধাঁচের সিনেমা। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, ক্রাইম থ্রিলার কিংবা ফ্যান্টাসি মুভি, যাই বলি না কেন; যেকোনো সিনেমাই আমাদেরকে বিনোদিত করার পাশাপাশি সুক্ষ্ম কোনো মেসেজ দেয়।

সেই মেসেজটা কি? সেটা একেকজনের কাছে একেক রকম হতেই পারে। আমার কাছে অবশ্যই “পারফিউম” একজন খুনির গল্প। সেইসাথে এটা এক অতিমানবীয় ক্ষমতার অভিশাপের গল্প। ক্ষমতা সবসময় আশীর্বাদ হয়ে আসেনা অথবা আমরা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারিনা।

যে ক্ষমতা আমাদের প্রেম-ভালোবাসা,কামনা-বাসনা,আশা-আকাঙ্খা কিংবা মনুষ্যত্বকে বিলীন করে দেয়, সে ক্ষমতা কখনই আমাদের কাম্য নয়!

সবশেষে কথা না বাড়িয়ে ছোট করে বলতে হয় একটা কথাই, ভালো সিনেমা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে।

আর “Perfume: The Story of a Murderer” এর শেষ দৃশ্যে আপনার জন্য রাখা হয়েছে চমৎকার এক টুইস্ট! এখনো না দেখে থাকলে দেখে নিতে পারেন ইউটিউব ঘেঁটে। আশাকরি উপভোগ্য হবে আপনার সময়টা।

 

সতর্কতাঃ

R-rated (Restricted) হওয়ায় অপ্রাপ্তবয়স্ক কিংবা পরিবারের সাথে সিনেমাটি দেখার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করার অনুরোধ থাকলো।

 

ছবিসূত্রঃ IMDB,Google

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?