Now Reading
ইয়োরু-সান নি তোদোকে অথবা রাত্রিনামা



ইয়োরু-সান নি তোদোকে অথবা রাত্রিনামা

এই শহরে রাত্রি নামে কেউ থাকে না।

এখানে রক্ত মাংসের কোন পুতুল পাওয়া যাবে না যার নাম রাত্রি।

এই পৃথিবীর প্রাচীন বা আধুনিক,

সরস বা নীরস,

মৃত বা জীবিত,

কোন বায়ুতেই রাত্রি কখনো নিঃশ্বাস নেয় নাই।

এই শহরের কোন বয়সী বৃক্ষের পাতাকে শখ করে কখনো সে একটু ছুঁয়েও দেখে নাই।

ঝিগাতলার মোড়ে প্রচন্ড রোদে রাজা সিটি বাসে বসে

সে কখনোই কপালের ঘাম মুছে অতি বিরক্তি নিয়ে

পাঁচ পাঁচটা সেকেন্ড নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে নাই।

 

রাত্রির স্রষ্টা আমি।

তাকে আমি নিজের মতো করে, একদম

নিজের হাতে বড় যত্ন করে তৈরি করেছি।

(হাতে কীভাবে? মাথায় হবে, মাথায়।কিন্তু “নিজের মাথায় সৃষ্টি করেছি” খুবই বিশ্রী শোনাচ্ছে।)

সে আমার অলস অনুর্বর মস্তিষ্কের ফসল, শুনেছি

অলস মস্তিষ্ক নাকি শয়তানের আস্তানা

তারপরো, তারপরো কীভাবে কীভাবে যেন এই অলস মস্তকে,

এই গোবর ভরা দুর্গন্ধময় মৃত্তিকার রুক্ষ বুকেই

শত আলোকবর্ষের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের মতো এক পদ্মফুলের জন্ম!

সেই পদ্মফুলটার নামই রাত্রি।

 

রাত্রি আমার নিজস্ব সৃষ্ট ভ্রম, রাত্রি কুহক,

এই পৃথিবীর কোন মানব সন্তান কখনো রাত্রিকে দেখে নাই।

রাত্রি আমার হ্যালুসিনেশন, আমার মানসিক রোগ।

সে মিথ্যা জেনেও মাঝেমাধ্যে মাঝরাতে আমি তোতাপাখিটাকে খামচে ধরে

রাত্রির আত্নাকে টান দিয়ে বের করে নিয়ে আসি,

আত্নাটাকে হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখি।

কোনটা সত্য,কোনটা মিথ্যা, কোনটা সঠিক,কোনটা বেঠিক

শাশ্বত কিংবা বিভ্রমের জাগতিক সীমাকে অতিক্রম করে

আমি দেখি, অবাক হয়ে দেখি!

একজন অপ্সরীর স্নিগ্ধ শরীরের সুমিষ্ট ঘ্রাণে আমার ঘরটা জীবন্ত হয়ে উঠছে!

নেশা নেশা লাগে, আমার মাথা বনবন বনবন বনবন করে ঘোরে।

এটা কি বোধ? এটা কেমন বোধ? এটাই কি জীবনানন্দের সেই বোধ

যেটা তাকে মড়ার খুলির মতো করে ধরত?

আমার কিন্তু ভালোই লাগে, হ্যাঁ খুব ভালো লাগে।

খুব খুব খুব ভালো।

 

রাত্রি আমার মাদক,আমার মারণনেশা!

এই মাদককে আমিই আবিষ্কার করেছি, বানিয়েছিও নিজেই,

স্বেচ্ছায় মিশিয়েছি নিজের শরীরের প্রতিটা কোষে, রক্তে,

স্বেচ্ছায় খুঁড়েছি নিজের কবর এবং সেই কবরে আমি ঢুকেও গেছি।

দেখেন আগুনের সাথে নেশার কি অবাধ সম্পর্ক!

সিগারেট,ইয়াবা থেকে গঞ্জিকা এরা নিজেরাও আগুনে পোড়ে

যে নেয় তাকেও ধীরে খুব ধীরে কিন্তু পোড়ায়,

কিন্তু রাত্রি নামক মাদকটা কি অসম্ভব রকমের শীতল!

আমার মুঠো করা হাতও ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে।

তারপরো আমি অজানা অনলে পুড়ে ছাই হয়ে যাই!

আমার সৃষ্ট নরকে আমারই দহন ঘটে!

আমি পুড়ি হ্যাঁ আমি জেনে শুনেই পুড়ি।

রাত্রি নামক মাদকটা কিন্তু নিজে পোড়ে না, আমাকে পোড়ায়,

ভীষণভাবে পোড়ায়।

এবং জানেন পৃথিবীর সব মাতব্বর,সকল সবজান্তাওয়ালাদের

দ্বারে দ্বারে গিয়ে আমি জিজ্ঞেস করে দেখেছি,

সাধুর পায়ের তলায় পরে থেকেছি দশ কোটি বছর,

শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক , যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিকের জুতা পালিশ করতে করতে চকচকা বানিয়ে দিয়েছি,

খরচ করেছি কোটি কোটি কোটি কোটি সেকেন্ড

কিন্তু নাহ! কেউই পারল না সন্ধান দিতে!

কারো কাছেই এই মাদক থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় নেই।

এই আসক্তি থেকে মুক্তির উপায় পার্থিব কোন সত্তাই জানে না।

কোন মতব্বরের বাচ্চা শালারা কিছুই বলতে পারল না।

কি ভয়ংকর কথা, না?

 

রাত্রি কখনো ঢাকা কলেজের গলিতে দাঁড়ানো মামার ভেলপুরি খায় নাই।

আমি তাকে সেই ভেলপুরি খাওয়াই।

রাত্রি কখনো ২৭ নাম্বারে দুপুরে ধুম করে নামা ঝুম বৃষ্টি

রিক্সায় বসে বসে অবাক হয়ে দেখে নাই।

আমি তাকে সেই বৃষ্টি দেখাই।

রাত্রি কখনো মতিঝিল থেকে হেঁটে হেঁটে আরামবাগের রাস্তা হয়ে কমলাপুর কবরাস্থানের পাশের চটপটি ফুচকার দোকানটার ফুচকা খায় নাই।

আমি তাকে সেই ফুচকাও খাওয়াই।

এই পৃথিবীর যা আমাকে আনন্দ দেয়,

যা আমাকে হাসায়, যা সচল রাখে আমার হৃদয় নামক রক্ত পাম্পের যন্ত্রটাকে,

যা আমার জট ধরা চুলকেও উড়ায় মন খারাপ করা বাতাসে,যা আমাকে দুই হাতে আগলে রাখে

তার সবটুকু হ্যাঁ সবটুকুই আমি নির্দ্বিধায় রাত্রির হাতে তুলে দেই।

শুধু একটা, একটা আনন্দই আমি কখনো তাকে দিতে পারি না

আমার একটা নেশা আছে, যে নেশা আমাকে খুবলে খুবলে খায়,

যার নির্দয় কঠোর আঘাতে ফিনকি দিয়ে উঠে রক্ত,

আফসোস, এই রক্তের কোন রঙ নেই।

আমার একটা “রাত্রি’’ আছে

কিন্তু হায়!

রাত্রির কোন “রাত্রি” নেই।

এই আহত হওয়ার আনন্দ সে ছুঁয়ে দেখতে পারে না।

এই আনন্দ গলির পথ তার অচেনা।

এই ব্যাপারে সে অজ্ঞ।

 

আমি যে বৃষ্টি দেখেছি সেই বৃষ্টির সীমায় রাত্রি কখনো ছিল না,

আমি যে কৃষ্ণকায় মেঘের নীচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা গাছের পাতা ছিঁড়ে গেছি

সেই মেঘের আলো রাত্রির কর্নিয়াকে কখনোই স্পর্শ করে নাই

আমি যেই ট্র্যাফিক জ্যামে বসে আজকে সন্ধ্যার বৃষ্টি দেখে ফেললাম সেই জ্যামে রাত্রি কোন অস্তিত্ব কি আছে?

কোথায় তুমি রাত্রি?

আমার কোনো অংশে কি তুমি আসলেই আছ?

 

তারপরো বাসে বসে বসে এই বেরসিক বৃষ্টি দেখে কেন আমার তোমাকে স্মরণ হয়?

কেন আমার তোমার কথাটাই মনে করতে হলো?

কেন মনে পড়তেই হলো?

কেন এতকিছু লিখে যেতে হলো?

কে বলবে?

কে জানে!

 

যেহেতু আমার হাতেই রাত্রির জন্ম,

সেহেতু একদিন আমার হাতেই তার বিনাশও হওয়ার কথা।

মাঝেমধ্যেই ভাবি নিজ হাতে তাকে খুন করে গুম করে ফেলি

কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হয়

রাত্রি নিজেই তো একটা মারণাস্ত্র!

তাকে আমি খুন করব কীভাবে?

বুলেট দিয়ে কাউকে হত্যা করা যায় সেটা সত্য

কিন্তু বুলেটকে আবার হত্যা করে কীভাবে?

রাত্রি একটা মারণাস্ত্র, রাত্রি আমারই বানানো ফ্র্যাকেন্সটাইন যে তার স্রষ্টার বিনাশের খলনায়ক(?)

রাত্রি আমার কাপুরুষতার পরিচয়,

রাত্রি আমার প্রশ্রয় দেওয়া সত্যের ক্ষয়,

রাত্রি আমার ঢাল-

যাকে ব্যবহার করে আমি খুব একটু আলাদা সেজে নিই!

তবে আমাকে হত্যা করার অধিকার এবং সামর্থ্য খুব সম্ভবত শুধু রাত্রিরই আছে।

এক্ষেত্রে আমার কি কিছু করার আছে?

যে স্বেচ্ছায় শূলে চড়তে চায় তাকে কে ঠেকিয়ে রাখবে বলেন!

 

আচ্ছা এত কথা রাখো, রাত্রি একটু শোনো তো

খুব ভালো করে ,আরে একটু মনোযোগ তো দাও,

এই লেখাটা একটু দেখ তো

পুরা লেখাটাতে কি একটা বাক্যই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা না?

পুরা লেখাটার প্রতিটি বাক্যই কি “তোমাকে ভালোবাসি,রাত্রি” বলছে না?

ইয়োরু মানে জানো তো?

ইয়োরু অর্থ হলো রাত,রাত্রি,নিশা,নিশি,যামিনী।

একটা বিষয় জানো

যত সহজে আই লাভ ইউ বলে ফেলা যায় তত সহজে কিন্তু “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলা যায় না।

নিজের ভাষাটা বড় আপন,বড় কাছের,বড়ই বোধ্য, লজ্জাটা একটু বেশীই লাগে।

আমারো লইজ্জা করে,খুব খুব লজ্জা!

“ইয়োরু-সান, সুকি দেশিতা।

হোন্তোনি সুকি দেশিতা।

হোন্তো দা!

হোন্তো হোন্তো হোন্তো!

সুকি সুকি সুকি!’’

 

আমার আকাশে,

আমাদের আকাশে আজ সন্ধ্যায় খুব বৃষ্টি হয়েছিল

তোমার ওখানকার খবর কি?

তোমাদের ওখানে কি আজ বৃষ্টি নেমেছিল?

তোমার আকাশে কি এখন আর বৃষ্টি হয়?

 

( পাদটীকাঃ ইয়োরু একটা জাপানী শব্দ। ইয়োরু-সান নি তোদোকে এর অর্থ “To, miss Yoru” অথবা এভাবেও বলা যায় “Reach, miss Yoru.” যে কয়টা জাপানি বাক্য ব্যবহার করেছি সেগুলোর বঙ্গানুবাদ করে দিলাম,

“ রাত্রি, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

আসলেই ভালোবাসি।

এটা সত্য!

সত্য সত্য সত্য!

ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি!

 

জাপানি ভাষার প্রতি বেশ দূর্বলতা এবং টুকটাক ভাষাটা জানা থাকার কারণে রাত্রির সাথে এই লুকোচুরিটা খেলা গেল।হা হা হা )

About The Author
রাফাত
রাফাত
যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা এই জেনে।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment