Now Reading
প্রতিবিম্বঃ শেষ পর্ব



প্রতিবিম্বঃ শেষ পর্ব

জাবিরের মাথায় লেগে থাকা জট গুলো আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করে। জান্নাত কি সেই ছোট মেয়ে? কি চায় জান্নাত? প্রতিশোধ? কিন্তু যে মারা গিয়েছে সে তো ছোট ছিল, জান্নাত তো যুবতী। কনফিউশনে না ভুগে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো নিহান কে,

– সে বাচ্চা মেয়ে কি আজকের জান্নাত?

– হ্যাঁ

– সে তো ছোট ছিল? আর ওর প্রপার ফিউনারেল হয়েছিল।

– হয়নি, হয়নি বলেই আজ এত ভোগান্তি তোর।

– আমাকে সব খুলে বল নিহান।

নিহান এবার বলতে শুরু করলো , “ ২ সপ্তাহ আগে জাকিয়ার একটা ফোন কল পাই। ও কাঁদতে কাঁদতে বলে যে একটা মেয়ে তার বাচ্চাকে ভয় দেখায়। আমি বললাম পুলিশে কমপ্লেইন করতে, কিন্তু ও মানা করে দিল। বললো “মেয়েটা মানুষ না, তাই পুলিশ কমপ্লেইন নিবে না”। আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম এই বলে – “মানুষ নয় তো ভুত নাকি”? জাকিয়া ভয়ার্ত গলায় হ্যাঁ বাচক উত্তর জানায়। আমাকে এই ব্যাপারটার একটা সুরাহা করতে অনুরোধ করে। আমি খোঁজে লেগে পড়ি। আমার কিছু নিজস্ব সোর্স আছে যাদের মাধ্যমে আমি জানতে পারি সেই বাচ্চা মেয়েটাই জাকিয়ার পরিবারকে চিন্তিত করে তুলেছে। তোর কাছে থেকে কল পাবার পর প্রথম চিন্তা এটাই করেছিলাম যে তুই এই ব্যাপারেই কথা বলতে চাস। সেদিন সেই খেলার স্থানে আমাদের সাথে আরেকজন ছিল, রাফি। ছোট ফুপির ছেলে। গত মাসের ২৪ তারিখ থেকে সে কোন কথা বলতে পারছেনা। কিছু হয়েছে ওর সাথে যাতে সে প্রচণ্ড শক খেয়েছে। ডাক্তার বলেছে –অতিরিক্ত চিৎকার করার ফলে ভোকাল কর্ড ছিড়ে গিয়েছে ওর। রাফির সাথে বোঝাপড়ার পর্ব শেষ হতেই জাকিয়ার বাচ্চাকে বিরক্ত করা শুরু করে। আমি খোঁজ পেয়ে যাই আর সেটা বন্ধ করতে সক্ষম হই। এর মাঝেই তোর ফোন, বুঝে যাই তোর সাথে কিছু হচ্ছে। সোর্স লাগিয়ে কিছুটা আচ করতে পারলাম। দেরি না করে চলে এলাম।”

জাবির স্তব্ধ হয়ে বসে এতক্ষন শুনছিল। এতক্ষনে বিষয়গুলো পরিষ্কার হচ্ছে। হঠাৎ বুকের উপর হাত দিল।  তাবিজটাই এতদিন জাবিরকে সুরক্ষিত রেখেছে। ছোটকালে সেই ঘটনার পরপরই দাদা এনে দিয়েছিল। জাকিয়া, নিহান আর রাফিকেও দিয়েছিল। নিহানের গলায় এখনো ঝুলছে। জাকিয়া আর রাফি হয়ত এতদিনে ফেলে দিয়েছে তাবিজ। তাই ওদের অনিষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে সেই আত্মা।

“এখন আমরা কি করব?” – নিহানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিল জাবির।

“ এখন আমাদের সেই বাড়িতে যেতে হবে। ওর কোন ব্যবহৃত বস্তু থাকলে খুজে বের করতে হবে। সেটাই পারবে আমাদের বাচাতে। কারন অনিষ্ট সাধনের জন্য মত্ত থাকা আত্নাদের ব্যবহৃত যে কোন দ্রব্য তাদের প্রিয় হয়ে থাকে। সেটা তাকে ফিরিয়ে দিয়ে তার কাছ থেকে জীবন বিনিময় করতে হবে। ” – নিহান জবাব দিল।

“আচ্ছা নাহিদ কেন মারা গেল? ” – জাবির আবার জিজ্ঞেস করলো।

“নাহিদ জান্নাতের আসল পরিচয় জেনে গিয়েছিল। নাহিদ হয়ত এসব নিয়ে রিসার্চ করতো। পরিচয় জেনে যাওয়া মাত্রই জান্নাত সেটা টের পেয়ে যায় আর নাহিদের কোন প্রটেকশন না থাকার কারনে প্রান হারাতে হয় । এসব আত্না প্রচন্ড শক্তিশালী হয়ে থাকে, কারন এদের লক্ষ্য এর ব্যাপারে এরা সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” – নিহান জানালো।

নিজের জন্য বন্ধু নাহিদের প্রাণ গেল এটা ভেবে মুষড়ে পড়লো জাবির। কিন্তু এটা মন খারাপ না করে এই আত্মা থেকে মুক্তি পাবার পথ খুঁজে বের করার সময় বলে নিহান সান্ত্বনা দিল জাবিরকে।

গাড়ি ইন্দিরা রোডের জান্নাতদের বাসার সামনে এসে থামালো জাবির। থমথমে একটা ভাব বিরাজ করছে পুরো বাড়িতে আর সেটার প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে পরিবেশেও।

গাড়ি থেকে নামলো ওরা। আজকেই কি পারবে জান্নাতের হাত থেকে নিজেদের মুক্তি দিতে? আজকেই কি পারবে জান্নাতকে ওর যথাযথ স্থানে ফিরিয়ে দিতে?

প্রথমে নিহান তারপরে জাবির প্রবেশ করলো বাড়িতে। একটা ঝাঁঝালো বাতাস ছুঁয়ে দিল ওদের। একসাথে শত সহস্র ঘন্টা বাজছে মনে হচ্ছে। আকাশটাও মুহূর্তে কালো মেঘে ঢেকে গেল। নিহান ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে পড়তে শুরু করলো। ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে নিহানের গলা। মেঘের গর্জন আর নিহানের জোর উচ্চারণে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠছে প্রতি সেকেন্ডে। দেয়ালগুলো পড়ে যাবে মনে হচ্ছে। বালির ঝড় সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে মনে হচ্ছে।

এমন সময়ে নিহান পড়ে গেল। ওর গলার থেকে লকেট ছিটকে দূরে সরে গেল। এই সময়টার অপেক্ষাতেই ছিল আত্মাটা। নিহানকে মাটি থেকে উপরে তুলে ফেলল। দেয়ালের সাথে সটান হয়ে ঝুলে আছে নিহান। শ্বাস নিতে পারছে না। মুখ থেকে গলা কাটা প্রাণীর মত ঘড় ঘড় শব্দ বের হচ্ছে।

জাবির হুঁশ হারিয়ে এদিক ওদিক ছুটতে । ছুটতে ছুটতে হঠাৎ পায়ের সাথে কিছু একটা ধাক্কা লেগে পড়ে গেল। মাটিতে পড়ে সামনে তাকাতেই দেখলো একজোড়া চোখ ওর দিকে তাকিয়ে নিষ্ঠুর হাসি হাসছে।

হামাগুড়ি দিয়ে সামনে আসছে আত্মাটা। ভয়ে জাবিরের গলা শুঁকিয়ে গেল। সাথে সাথে গলায় হাত দিয়ে দেখলো তাবিজটা নেই। আত্মাটা ততক্ষনে জাবিরের গায়ে জেঁকে বসেছে। জাবির এর শরীর থেকে ঘামের নহর বয়ে যাচ্ছে।

কানের কাছে আত্মাটা মুখ এনে জাবির এর নাম ধরে ডাকতে থাকল।

ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসলো জাবির। সারা শরীর ঘেমে গেছে। ডিসেম্বরের শেষের এই কনকনে শীতেও এসি ছেড়ে ঘুমোতে হয় জাবিরের। এই অবস্থায় ও ঘেমে গোসল হয়ে গেছে তার।

এতক্ষন তাহলে স্বপ্ন দেখছিল? নিজের সারা শরীর হাতিয়ে দেখল। কোন আঘাত এর চিহ্ন নেই । খুব বড় একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল সুস্থ আছে দেখে।

কোথা থেকে যেন শব্দ আসছে। আচ্ছা, ওর মোবাইল বাজছে। এই সাত সকালে কার ফোন?

ফ্লিপ কভার টা খুলে স্ক্রীনের দিকে তাকাতেই সব স্থির হয়ে গেল ওর।

সেই পরিচিত নাম্বার আর উপরে নোটিফিকেশন ভেসে আছে – ১৯ টা মিসকল…

About The Author
Kazi Mohammad Arafat Rahaman
পড়াশোনা - ব্যাচেলর করছি কম্পিউটার সায়েন্সে। ভাল লাগা - গান, ফুটবল আর বই। খারাপ লাগা - নাই। খারাপ লাগেনা। অনুভূতিহীন। শখ - অনেক আছে। লক্ষ্য - ইন্টারপ্রেনার হতে চাই।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment